দীঘির কথা ভাবলে মনের ভেতর হাজার শূণ্যতা জেগে ওঠে। ব্যাকুলতারা মনের ভেতর বাসা বাঁধার তাড়া অনুভব করে। জানিনা কেন মাঝে মাঝে আমার এমন হয়। তবে, দীঘিটি আমাকে প্রচুর টানে। যখনই গ্রামে গেছি, তখনই সর্ব প্রথম নিজের বাড়ীতে না যেয়ে দীঘির পাড়ে উঠে চুপচাপ বসে থেকেছি। আমার শৈশব আমাকে এখানে ছুঁতে আসে। আমি আনমনে স্মৃতির হার্ডডিস্ক মেরামত করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। ঐযে ঠিক ওখানেইতো আমরা হাডুডু খেলতাম। আর শত বছরের পুরনো ঐ গাছটার নিচ থেকে শিমুল ফুল কুড়িয়ে বাড়ি ফিরতাম। দূরের ঐ উঁচু জায়গাটায়, যেখানে দিঘীর পাড় ভেঙ্গে ভোঁতা হয়ে গেছে, ঠিক সেখানে শীতের শিশির ভেজা সকালে জলসা বসতো। রোদ্রু জলসা। আমরা ছোটরা এখানে এসে রোদ পোহাতাম।
এমনই কিছু টুকরো স্মৃতি। কিছু ঝাপসা, কিছু ঝলসানো। অতীতের ঝাপসা আর ঝলসানো দুই ধরনের স্মৃতি নিয়েই আমার এই তেলাপোকা জীবন। আর....হুমমম... এখন যেখানে বসে আছি.... আমার বাড়ি ফেরাগুলোর মাঝে সময়ের ব্যবধান তৈরী করার জন্য এটার অবদানও কম নয়। এর কথা না হয় আজ নাই বললাম। তবে, একদিন বলবো। এযে আমার হারানো দিন, ঝরে যাওয়া অতীত আর বদলে যাওয়া সময়ের লুকনো কান্না। মাঝে মাঝে মনে হয় যা হয়েছে ভালোর জন্যই হয়েছে। মাঝে মাঝে নিজেকে খুব বেশী ঠকবাজ মনে হয়।
ওহো একটা কথাতো বলতে ভুলেই গেলাম। দিঘীতে নেমে যে আমরা উঠতেই চাইতাম না। বালিহাঁস ধরার জন্য দলবেঁধে কত ব্যর্থ সাঁতার কাটতাম। কখনো এ পাড়, কখনো ওপার...চোখ লাল করে যখন বাড়ি ফিরতাম, তখন ঝাপসা চোখে মায়ের কেবল রুদ্ধমুর্তিটিই দেখতাম। কত্ত মার খেয়েছি... তবু আমাদের তৃষ্ণা মিটতো না। দিঘীটি আমাদের এক অদ্ভুত মায়াজালে বেঁধে রেখেছিল, এখনো ঠিক তাই রেখেছে। এর সৃষ্টির মত, এর কাছে টানার আকর্ষনেও প্রচুর রহস্য লুকানো।
কত হাজার হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনার চিরন্তন স্বাক্ষী এই দিঘী। কতবার বাড়ি পালিয়েছি...কতবার...! যাবো কোথায়? আত্মীস্বজনদের যে দুচোখে দেখতে পারতাম না। তাই বরাবরই ভাইয়া আমাকে দিঘীর পাড়ের এক কোন থেকে ঠিকই ধরে নিয়ে আসতো। আমার আরও একটি দিনের ব্যর্থ বাড়ি পালানোর অবসান ঘটতো। বিনিময়ে মিলতো মায়ের সেই চিরচেনা বুকের ভেতর ঠাঁই...। মা...। সে এক অন্যরকম সৃষ্টি। তার দিকে তাকিয়ে অন্য নারীদের প্রতি ঘৃনাবোধ আমার হারিয়ে যায়।
সবাই স্বর্গে যেতে চায়, আমি চাইনা। আমি আমার মায়ের কোলকে চিরদিনের জন্য পেতে চাই...। বেশ এটুকুই চাওয়া আমার।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



