somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটকাগজ বনাম বড়কাগজ ।। সবুজ তাপস

১৪ ই জুন, ২০১৪ রাত ৮:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তরুণদের সাথে কথাবার্তা বললে শোনা যায়, প্রতিষ্ঠান বলতে তারা মূখ্যভাবে বড়কাগজকে বুঝছেন। মানে ব্যাপারটা এমন, প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার নামে তারা বড়কাগজ এবং বড়কাগজের নামে এর সাহিত্যপাতার বিরোধিতা করছেন। বড়কাগজের বিরুদ্ধে বেশকিছু অভিযোগও উত্থাপন করেন। উত্থাপিত অভিযোগগুলোর যথার্থতা কতটুকু, যেটাকে ছোটকাগজ(আকৃতির কোন পরিমাপ নেই, তবু একটা আকৃতির বাঁধাইকরা কাগজকে ছোটকাগজ বলা হচ্ছে) বলছেন তার বিরুদ্ধেও কী এসব উত্থাপন করা যায়, সাহিত্যের প্রকৃত কাগজ ছোটকাগজ না বড়কাগজ- আমার অভিযাত্রা মূলত এই নিয়ে।
ছোটকাগজ প্রতিষ্ঠানবিরোধী না অন্যকিছু
ছোটকাগজ বলতে ‘প্রতিষ্ঠানবিরোধী বারুদ-অস্ত্র’ বোঝানো হচ্ছে। প্রতিষ্ঠান বলতে যদি বড়কাগজকে বোঝানো হয়, তবে এই সংজ্ঞা যথার্থ নয়। আবার রাষ্ট্র, বিদ্যালয়, কারখানা, ব্যাংক ইত্যাদিও যদি প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ হয়, তবে প্রত্যেকটিকে ছোটকাগজের জন্মসঙ্গী বা সহায়ক শক্তি বলা যাচ্ছে। তা এই জন্যে যে, বেশিরভাগ ছোটকাগজের আলো দেখার পেছনে থাকছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আশীর্বাদ।
ছোটকাগজ এই অর্থে প্রতিষ্ঠানবিরোধী নয়, অন্যকিছু, মনে হচ্ছে। যদি বিরোধী, তবে এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন ব্যবহার করা বা বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য লালায়িত হওয়া এর চরিত্র নয়। বিজ্ঞাপন প্রচার করলে একে ছোটকাগজত্বহীন বলা যাচ্ছে। এবং এই মানদণ্ডে সরকার আশরাফ সম্পাদিত নিসর্গকে পরখ করলে ফলাফল কী পাব? এর ‘লিটল ম্যাগাজিন সংখ্যা’টি (ফেব্র“য়ারি ২০০৭) জনতা ব্যাংক ও ডেনিয়েল কর্পোরেশন লিমিটেড-এর বিজ্ঞাপন বহন করল।
ছোটকাগজকে প্রতিষ্ঠানবিরোধী তখনই বলা যাবে, যখন প্রতিষ্ঠানের অর্থ এই যে, কোন স্থিরীকৃত নীতি-প্রথা-আদর্শ, যাকে মৌল বলে মানতে বাধ্য করা হয়। এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ হিসেবে লালন শাহ্, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সাম্প্রদায়িকতা, উত্তর-আধুনিকতা, মৌলবাদ ইত্যাদির নাম উল্লেখ করা যায়।
ছোটকাগজ ও বড়কাগজ
বড়কাগজকে অনৈতিকতার প্রশ্রয়দানকারী, ছদ্মপ্রগতিশীল এবং নির্বিবাদী ধীরাবস্থার পক্ষপাতী বলা হচ্ছে। অনৈতিক কাজ হিসেবে দেখানো হয়, এটি সামাজিক শোষণের হাতিয়ার, সমাজকে বিভ্রান্ত করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা চায়। যে কাগজ এই করে – এই চায়, তা নিন্দ্য। বড়কাগজ এই করতে পারে, মানি, যেহেতু এটি নিউজসর্বস্ব। কিন্তু স্পষ্টভাবে এর বিরোধিতা করাতো সাহিত্যমগ্ন ছোটকাগজের কাজ নয়। বিরোধিতা করবে ঐ রাজনৈতিক-প্রতিষ্ঠানলালিত ছোটকাগজই, যা প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনে প্রণোদিত। সাহিত্যমগ্ন ছোটকাগজ কেবল বড়কাগজের সাহিত্যপাতার বিরোধী হবে, এই তো কথা। এই না হয়ে যদি রাজনীতিসচেতন ছোটকাগজের চরিত্র ধারণ করে, তবে এরও অনৈতিক কাজ সম্পাদনকারী বা প্রশ্রয়দানকারী কাগজ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। ছদ্মপ্রগতিশীলতার ব্যাপারে বলা যাক। প্রগতিশীলতা বলতে যদি বর্তমানের পরিবর্তন ও উৎকর্ষ সাধনের ইচ্ছা পোষণ করাকে বোঝায়, তবে বড়কাগজগুলোকেও প্রগতিশীল বলা যায়। কারণ এগুলোও সাহিত্যমগ্ন ছোটকাগজের মতো অবস্থার পরিবর্তন ও উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যে প্রগতিশীল লেখকদের ভিউজ বা মুক্তচিন্তা ধারণ করে প্রকাশ পাচ্ছে। আমার ব্যাপারটা ধরা যাক। আমি মূলত যেটাকে ছোটকাগজ বলা হচ্ছে তাতেই লিখি। এই কাগজ যদি প্রগতিশীলতার সমর্থক হয়, আমার লেখাকে প্রগতিশীল ঘরানার বলতে হচ্ছে। এই কথিত প্রগতিশীল লেখাকে আবার বড়কাগজেও দিচ্ছি, ছাপছেও। এই-যে ব্যাপার, এর দ্বারা বড়কাগজকে প্রগতিশীলতার সমর্থক এবং ধারক বলতে হচ্ছে। এবং একে নির্বিবাদী ধীরাবস্থার পক্ষপাতী বলার যুক্তি থাকছে না। প্রগতিশীলতার প্রশ্নে, (সবগুলো নয়) কিছু বড়কাগজের মতো কিছু ছোটকাগজকেও ধরা যাচ্ছে। মাঈন উদ্দিন জাহেদ সম্পাদিত পুবাকাশ, চৌধুরী গোলাম মাওলা সম্পাদিত নোঙর, সাজ্জাদ বিপ্লব সম্পাদিত স্বল্পদৈর্ঘ্যতো এ-জাতীয় ছোটকাগজ। কাগজগুলোতে সাহিত্যের নামে ধর্মচর্চা হচ্ছে, পরোক্ষভাবে ধর্মীয় রাজনীতির মূলে জল ঢালার কাজ হচ্ছে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সম্পাদনা পদাতিক এবং সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্পাদিত নতুন দিগন্তকেও ছদ্মপ্রগতিশীল ছোটকাগজের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করতে পারি। এই জন্যে যে, বাংলার প্রগতিশীলতা জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্ক্সে’র সমাজতান্ত্রিক চিন্তার বাস্তবায়নের উপর নির্ভরশীল নয়। ্কাগজগুলো পরোক্ষভাবে মার্ক্সীয় চিন্তা প্রচার করে যাচ্ছে। এই কথার বিরুদ্ধে হয়তো বলা হতে পারে, বড়কাগজতো কতকগুলো ব্যবসায়িক সূত্র বা কৌশল অবলম্বন করে। এ-ক্ষেত্রে বক্তব্য, যেগুলোকে সূত্র বা কৌশল বলা হচ্ছে, সেগুলোর প্রয়োগ কোনো কোনো ছোটকাগজও করছে। নতুন দিগন্ত, উলুখাগড়া এ-ক্ষেত্রে প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কেবল পার্থক্য এই, বড়কাগজের কৌশল স্পষ্ট এবং এই প্রকাশমান-দৃশ্যমান চরিত্র নিয়েই এর পথচলা, আর ছোটকাগজের কৌশলপ্রয়োগ অদৃশ্য এবং ছদ্মবেশধারী। এই কথারও যদি বিরোধিতা করা হয়, তবে প্রগতিশীল কাগজ বলতে কোন্ কাগজকে বোঝানো হচ্ছে, বাছবিচার ছাড়া তরুণদের (বেশিরভাগ তরুণের পঠন-পাঠন কম। কবিতা কী, তা না বুঝে ভ্রান্তিমান বাক্যরচনা করছেন) লেখাপ্রকাশকারী কোনো কাগজকে, নাকি প্রবীণ নয় কেবল নবীনদের লেখাপ্রকাশকারী কোনো কাগজকে, বোধগম্য নয়। (বড়কাগজ যদি তরুণদের লেখা বেশি ছাপাতে উদ্যোগী হয়, তবে কী তা ছোটকাগজ হয়ে যাবে?) কথাটা এই জন্যে তুলেছি, বহুলাংশে তরুণরাই (ফারুক সিদ্দিকীদের সংখ্যা খুবই কম) প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার নামে ছোটকাগজ আন্দোলন গড়ে তোলেন।বড়কাগজের বিরুদ্ধে অভিযোগ এটাও, এটি স্বগৃহীত সূত্রগুচ্ছ প্রয়োগ করে মানুষকে চিন্তাগতভাবে ব্যাকেটবদ্ধ করে। কিন্তু আমরা, ছোট-বড় দু’কাগজই মানুষকে বৃত্তবন্দী করার প্রয়াস চালাচ্ছে, দেখতে পাই। যে কাগজ যে আদর্শকে প্রগতি (প্রকৃষ্ট গতি। উচ্চতর সমাজের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন) মনে করে, তা চাচ্ছেই পাঠকসমাজ তার আদর্শবহ হোক। ব্যাপারটা বস্তুবাদী কাগজ ও ভাববাদী কাগজের ভূমিকার দিকে তাকালে স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে। একটি বস্তুবাদী লেখক তথা বিষয়বাদী পাঠকপ্রত্যাশী হলে অন্যটি এর বিপরীত কিছু চাচ্ছেই। ব্যাপারটা ঐ-যে রাজনীতিসচেতন কাগজের কথা বললাম, সেগুলোতেও দ্রষ্টব্য। তাছাড়া একই আদর্শে বিশ্বাসী দুটো কাগজের দিকে তাকালেও দেখবো, প্রতিটি নিজের অবস্থানকে-নিজের কাজকে বাঁকধর্মী তথা বস্তুনিষ্ঠ বলে পাঠককে আকর্ষণ করছে।
একটু আগে বড়কাগজের ‘স্বগৃহীত সূত্রগুচ্ছ’র কথা উল্লেখ করলাম, ছোটকাগজকর্মীরা একে এর বাণিজ্যিক নীতি বলেও নিন্দা করছেন। বড়কাগজের বাণিজ্যিক নীতি থাকবেই। কেননা, এটি দৈনিক বা সাপ্তাহিক খবরপরিবেশক-এর মালিকপক্ষ রয়েছে-এর সাথে সংশ্লিষ্ট লোকদের সম্পর্ক পেশাগত। ছোটকাগজের সাথেতো অন্য কারো নয়, সম্পাদকেরও পেশাগত সম্পর্ক নেই। যেহেতু বড়কাগজের মূখ্য কাজ সংবাদ সরবারাহ করা, সেহেতু সপ্তাহান্তে সাহিত্যপাতা বের না করলেও এর চলে। তবু বের করছে। কিন্তু এর পরও যদি একে স্বগৃহীত সূত্রগুচ্ছ প্রয়োগ করার কারণে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির পণ্যায়নে বিশ্বাসী বলা হয়, কেমন শোনায়। আমার মনে হচ্ছে-এর নয়, ছোটকাগজের বিরুদ্ধেই এই অভিযোগ আনা যায়। কেননা, ছোটকাগজ-বড়কাগজ দুটোতে মূল্যাংক লেখা থাকলেও বড়কাগজের সাহিত্যপাতায় তা নেই (অর্থাৎ দৈনিক সমকাল ও এজাজ ইউসুফী সম্পাদিত ছোটকাগজ লিরিক-এর গায়ে মূল্যাংক লেখা থাকলেও কালের খেয়ার গায়ে নেই। যে-দিন কালের খেয়া বের হচ্ছে সেদিনও দৈনিক সমকালের দাম পূর্বদিনের মতো)। আবার দুটোকেই উপযুক্ত ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে পণ্যের মতো বিক্রির জন্য ঝুলিয়ে-সাজিয়ে রাখতে দেখছি। ছোটকাগজের কোথাও মূল্যাংক উল্লেখ না থাকলে বড়কাগজের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের কিছুটা হলেও মাহাত্ম্য থাকতো। এখন ছোটকাগজ যদি দাবি করে, সাহিত্যপ্রচারের এজেন্ডা নিয়ে নেমেছে এবং এটি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির পণ্যায়নবিরোধী, তবে তার গায়ে মূল্যাংক লেখা থাকছে কেন, প্রশ্নটা যে-কারোর মনে জাগবেই। তো (শিল্প-সাহিত্যের বেলায়) কোন্ কাগজ পণ্যায়নবাদী, ছোটকাগজ না বড়কাগজ, বোঝাই যাচ্ছে। বড়কাগজের বাণিজ্যপ্রশ্নে ছোটকাগজকর্মীদের আরেকটি অভিযোগেরও যথার্থতা খুঁজে পাই না। তাদের অভিযোগ, বড়-বড় কবিদের কবিতা ছেপে এটি ব্যবসা করছে। অভিযোগকারীদের জানা দরকার, এদেশে সাহিত্যপাতা পড়ার জন্য যৎসামান্য পাঠকই বড়কাগজ কেনেন। বেশিরভাগ পাঠক ‘দেখছি’ দলের সদস্য-সাহিত্যপাতার জন্য কাগজ কেনেন না, সাহিত্যপাতার লেখা পড়েন না, কেবল কার কার লেখা আছে দেখেন। এই ‘দেখছি’ দলের বেশিরভাগ সদস্য কবিতা লেখেন, গল্প লেখেন, ছোটকাগজকর্মী…। বড়কবির কবিতা ছেপে বড়কাগজ ব্যবসা করতে পারলে ছোটকাগজ তা করে পারে না কেন? এই প্রশ্নের উত্তর কার কাছে আছে, জানি না। ছোটকাগজকর্মীদের বড়কাগজের বিরুদ্ধে এই-যে আচরণ, একে পকেটে মোবাইল রেখে মোবাইল কোম্পানিকে পুঁজিবাদী বলে গালি দিয়ে কারও মার্ক্সবাদী সাজার অপচেষ্টা করার সাথেও তুলনা করতে পারছি না ।

উপরে, হইচইপ্রবণ-চঞ্চল ছোটকাগজকর্মীরা বা লেখকরা (আগেই বলেছি, বেশিরভাগই তরুণ) বড়কাগজের নামে এর সাহিত্যপাতার বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ উত্থাপন করছেন, সেগুলোর কোনো যৌক্তিকতা আছে-কী-নেই, দেখিয়েছি। তাদের এই হইচই, যে হিসেবে লেখা ছাপাতে চাচ্ছে সে অনুপাতে বড়কাগজ জায়গা দিতে পারছে না বা দিচ্ছে না বলে, মনে হয়েছে। এর জন্য আমি মনে করি, একে তারুণ্যের পদচারণায় বাধাদানকারী বা মননশীলতা-নতুনত্ব বা নিরীক্ষায় নিস্পৃহ বলা যায় না। কিন্তু যতটুকু প্রেসার দিয়ে এটি বলা হচ্ছে, ততটুকু উপযুক্ত নয়। অর্থাৎ হইচই-এর স্কেল ‘উদারা’ হওয়ার কথা, ‘তারা’ নয়। একে সারাদেশের তরুণদের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হচ্ছে এবং সীমিত দু’ চারটি পাতায় যথাসম্ভব নবীন-প্রবীণ সবার লেখাই রাখতে হচ্ছে। এ-ক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ দৈনিক পূর্বকোণের সাহিত্য ও সংস্কৃতি, দৈনিক আজাদীর সাহিত্য সাপ্তাহিকী, দৈনিক সমকালের কালের খেয়া, দৈনিক জনকণ্ঠের জনকণ্ঠ সাময়িকী, দৈনিক সংবাদের সংবাদ সাময়িকী, দৈনিক প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকী ও দৈনিক যুগান্তরের সাহিত্য সামায়িকীর নাম উল্লেখ করতে পারি। কালের খেয়া মাঝে মাঝে এবং জনকণ্ঠ সাময়িকী প্রত্যেক মাসের প্রথম শুক্রবারে তরুণলেখকসংখ্যা হচ্ছে। কোনো কোনো সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে কেবল তরুণদের প্রাধান্য দেখি। সদ্যবিলুপ্ত দৈনিক আজকের কাগজের সুবর্ণ রেখায় তরুণদের লেখা বিশেষ গুরুত্ব পেতো।
বড়কাগজ ও ছোটকাগজের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্বমূলক সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে না, যা হাজির করা হচ্ছে তা গৌণ। এই গৌণ সম্পর্ককে মূখ্য বলে তরুণদের নিয়ে এখানে-ওখানে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম বা চিল্লাচিল্লি করছেন কেউ-কেউ, করতে থাকবেন সবসময়। প্রকৃত সাহিত্যের স্বার্থে দুটোর মধ্যে দ্বন্দ্ব হোক, আমি চাই। এমন দ্বন্দ্ব-যা অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক দিক থেকে নয়, সাহিত্যের জায়গা থেকে-মানসক্ষুধা মেটানোর লক্ষ্যে কেবল প্রতিযোগিতামূলক।
একটু আগে প্রকৃত সাহিত্যের প্রসঙ্গ এনেছি। সাহিত্যের প্রকৃত কাজটা কী ছোট-বড় দু’কাগজে থাকছে? আমি মনে করি, থাকছে তবে নিখুঁতভাবে নয়। দু’কাগজেই তরুণদের কবিতা বিভিন্ন দোষে দুষ্ট দেখতে পাই (কবিতার পাঠক বলে কবিতা সম্পর্কে মন্তব্য করছি)। অতিপঙ্ক্তি তথা অপ্রয়োজনীয় প্রসঙ্গের উপস্থিতি, অযৌক্তিক দৃশ্যকল্প নির্মাণপ্রবণতা, ভ্রান্তিমান শব্দ তথা অনুপযুক্ত শব্দের ব্যবহার, যা কবিতার বিষয় নয়-তা নিয়ে কাব্যাভিযান চালনা ইত্যাদি ব্যাপার লক্ষণীয়। ব্যাপারগুলো আকারসর্বস্ব ছোটকাগজ তথা নামধারী ছোটকাগজগুলোতে প্রকাশিত কবিতায় অতিমাত্রায় পাচ্ছি। চন্দন চৌধুরী সম্পাদিত বেহুলা বাংলা, শাহানা আকতার মহুয়া সম্পাদিত ছান্দস, হাফিজ রশিদ খান সম্পাদিত পুষ্পকরথ, ওবায়েদ আকাশ সম্পাদিত শালুক, সুমন সুপান্থ সম্পাদিত স্রোতচিহ্ন, সৈয়দ আকরাম হোসেন সম্পাদিত উলুখাগড়া, সরকার আশরাফ সম্পাদিত নিসর্গ, মনিরুল মনির সম্পাদিত খড়িমাটি, আসমা বীথি সম্পাদিত ঘুড়ি প্রভৃতি ছোটকাগজের বিভিন্ন সংখ্যায়ও দেখতে পাই, বেশকিছু কবিতা (তুলে ধরছি না, কারণ এটি কবিতাবিষয়ক গদ্য নয়) উত্তীর্ণ নয়-প্রকাশযোগ্য নয়, বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ছাপানো হয়েছে। এজাজ ইউসুফী সম্পাদিত লিরিক, হাফিজ রশিদ খান ও চৌধুরী বাবুল বড়ুয়া সম্পাদিত সমুজ্জ্বলসুবাতাস, আমার সম্পাদিত ঢেউ, মহীন রীয়াদ সম্পাদিত শঙ্খবাস ইত্যাদিও দুষ্ট, তবে এগুলোর দর্শনগত জায়গা খুবই পরিষ্কার। যে-কাগজের উদ্দেশ্য কেবল কিছু লেখা নিয়ে প্রকাশ পাওয়া, তাকে আকৃতিসর্বস্ব ছোটকাগজ ছাড়া আর কী বলা যাবে। লিরিক, সমুজ্জ্বলসুবাতাস, ঢেউ, শঙ্খবাস ইত্যাদি কাগজের দায় দার্শনিক। লিরিক উত্তরআধুনিকবাদী, সমুজ্জ্বলসুবাতাস (চতুর্দশ সংখ্যা থেকে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম সমন্বয়বাদী লিটল ম্যাগাজিন’, কিন্তু প্রথম সংখ্যা থেকেই অঘোষিতভাবে উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে ধাবমান) বাংলাদেশের সমতলি ও পার্বত্য চিন্তার ঐক্যের লক্ষ্যে কাজ করছে- সমন্বয়বাদী, আর ঢেউ (অষ্টম সংখ্যা থেকে দর্শনাশ্রয়ী) ও শঙ্খবাস (প্রথম সংখ্যা থেকেই অঘোষিতভাবে দৃষ্টান্তবাদ-সমর্থক) দৃষ্টান্তবাদী সাহিত্যকাগজ। (ছোট-বড়) কাগজদুটোতে তরুণদের কবিতা নিখুঁত পাচ্ছি না কেন? বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি গোষ্ঠীবদ্ধতাকে। গোষ্ঠীর লেখাকে প্রাধান্য দিচ্ছে বলে এমন হচ্ছে। দ্বিতীয় কারণ- সম্পাদকের অযোগ্যতা। তৃতীয় কারণ হিসেবে ভালো লেখা না-পাওয়াকে চিহ্নিত করতে পারি। এই তিন কারণ প্রকৃত সাহিত্যের কাজে কতটুকু খুঁত যুক্ত করে, ভেবে দেখা যেতে পারে।
বড়কাগজ-ছোটকাগজ দুটোই প্রকৃত সাহিত্যের নিখুঁত কাগজ (যে-কাগজ দর্শনবান- ঐতিহ্যপ্রেমী ও সমাজসতর্ক, প্রকৃত প্রগতিশীলতা ও মুক্তচিন্তার সমর্থক, দৈশিক নৈতিকতায় আস্থাবান, মূল্যবোধের প্রতি দায়বদ্ধ, শিল্পিত চেতনা উন্মেষের মাধ্যমে জনজীবনে ইতিবাচক প্রভাববিস্তারকারী, তারুণ্যের মননশীল-যৌক্তিক-পরিণত উচ্ছ্বাসের ধারক-পৃষ্ঠপোষক এবং নতুনত্ব-নিরীক্ষার উপাসক) হয়ে উঠতে পারে, বিশ্বাস করি। তবে তা ছোটকাগজের পক্ষে যত সহজ, বড়কাগজের পক্ষে তত সহজ নয়। ছোটকাগজের কলেবর নির্দিষ্ট নয় বলে এর কর্মীরা সৎ-সতর্ক-সাহিত্যসচেতন হলেই পাব। কিন্তু তারা নিখুঁত কাজ করার চিন্তা করছেন না, মহৎ কিছু করে ফেলছেন-এমন ভাব নিয়ে চেঁছামেছিতে ব্যস্ত। যদি নিখুঁত কাগজ করতেন, তরুণদের লেখাপ্রকাশপ্রসঙ্গ নিয়ে বড়কাগজের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দেয়ার মাহাত্ম্য থাকতো। বিশুদ্ধ জায়গা থেকে বড়কাগজের সাথে ছোটকাগজের দ্বন্দ্ব হোক, আমি চাই। এখন যদি ছোটকাগজের বারুদ-অস্ত্র ক্রিয়াহীন-নিস্তেজ হয়, যুদ্ধের ফলাফল কী হতে পারে, একটু ভাবতে পারি। তাহলে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার নামে বড়কাগজের বিপক্ষে (বিরোধিতা না করে নিজস্ব কাজে ব্যস্ত থাকা উত্তম) দাঁড়ানোর মানে কী? এর অর্থ যদি এভাবে নির্দেশ করি, বড়কাগজে লেখার সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে কিছু সংগঠিত (অসংগঠিত)-উদ্গ্রীব লেখকের সংগ্রাম, কেমন শোনায়। আসলে ব্যাপারটা তা-ই। আবু হাসান শাহরিয়ার একসময় ‘দৈনিক প্রথম আলো’-এর বিরুদ্ধে বাকোয়াজি করতেন। মিডিয়া, প্রতিমিডিয়া, রণজিৎ দাশ- কত্তোসব বলতেন। তার কবিতা প্রকাশ করা শুরু করলে তিনি আর কাগজটির বিরোধিতা করেন নি।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জুন, ২০১৪ রাত ৮:৫১
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গল্পঃ ভোজ

লিখেছেন ইসিয়াক, ৩০ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:৪০


গতকাল শরীরটা ভালো ছিলো না। তার জেরেই সম্ভবত ঘুম থেকে উঠতে বেশ বেলা হয়ে গেল। ঘুম ভাঙলেই আমি প্রথমে মোবাইল চেক করে দেখি কোন জরুরী কল এসেছিল কিনা। আজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফেরার ট্রেন

লিখেছেন Sujon Mahmud, ৩০ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:১২


ঈদের ছুটিটা যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল। বারোটা দিন—ক্যালেন্ডারের হিসেবে ছোট, কিন্তু হৃদয়ের হিসেবে এক বিশাল পৃথিবী। সেই পৃথিবীতে ছিল হাসি, ছিল কান্না, ছিল ঘরের গন্ধ, ছিল প্রিয় মানুষের... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাদ্রাসার শিক্ষক: একটি প্রগতিশীল (?) অগ্রযাত্রা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১:০৮


আমি আসলে জন্মগতভাবেই খুব আশাবাদী মানুষ। সত্যি বলছি। ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে যখন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন নীতিমালা জারি করল, আমি মনে মনে বললাম , অবশেষে কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন চালাতে শহরে থাকা কিন্তু বেঁচে থাকা যেন বাড়িতেই

লিখেছেন Sujon Mahmud, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৯

ঈদের ছুটিটা কেমন যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, এই তো সেদিন বাড়ি গেলাম—মায়ের হাতের রান্না, বাবার গল্প, ছোট মেয়ের হাসি, আর স্ত্রীর সেই নীরব অভিমান… সবকিছু মিলিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×