
।। ছোটবেলার গল্প ।।
অনেক দিন আগের কথা আনুমানিক ১৯৮০-১৯৮২ সন এর মাঝামাঝি হবে হয়তো, আমরা তখন মিরপুর পল্লবীতে থাকি, আমার বড় চাচা আমাদের সকলকে নিয়ে মাঝে মাঝে সন্ধ্যায় গল্প করতে বসতেন, আমরা সবাই শ্রোতা আর বড় চাচা বক্তা, বড় চাচা গল্প বলতেন গল্পে ভয়ের সময় তিনি নিজেই যেনো ভয় পেতেন আর গল্পের আনন্দের সময় তিনি নিজেও আনন্দিত হতেন (আসলে এখন বুঝি গল্পের মুল বিষয় হলো যিনি গল্প বলবেন তিনি নিজেও সেই গল্পের একজন অভিযাত্রী হিসেবে ভুমিকা পালন করবেন) বড় চাচা নিজে যে শুধু সেই গল্পের একজন অভিযাত্রী ছিলেন, তা কিন্তু না - তিনি আমাদের সবাইকে নিয়ে সেই গল্পের জগতে চলে যেতেন। বড় চাচা গল্প বলতেন আর আমরা সবাই অবাক হয়ে শুনতাম, কখনো ভয়ে জবুথবু হয়ে যেতাম, কখনোবা সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়তাম, আমাদের সাত আটজনের হাসিতে মনে হতো বাসার ছাদ উড়ে যাবে হয়তোবা । সেইসব দিনের গল্পের মধ্যে অন্যতম কয়েকটি গল্পের মধ্যে একটি হচ্ছে “হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা” এই গল্পটি আমাদের কোনো এক ক্লাসে পাঠ্য বইয়ে ছিলো কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে কেনো জানি আজ এই গল্প আর কোনো পাঠ্য বইয়ে নেই! হয়তোবা সবার কাছে এই গল্প পুরোনো হয়ে গেছে বা এই গল্প আমাদের দেশে এখন আর প্রয়োজন নেই!
মুল গল্পঃ - যেভাবে পঞ্চম শ্রেণীর বাংলা পাঠ্য বইয়ে মুদ্রিত ছিলো
---------------------------------------------------------------------------------
শহরটার নাম হামেল্ন৷ সবাই চেনে হ্যামিলন নামে ৷ ছোট্ট, সাজানো, সুন্দর শহর হ্যমিলন ৷ সেই শহরের মানুষের খুব দুঃখ ৷ সেখানে যেন ইদুর বন্যা হয়েছে ৷ বলছি ১২৮৪ সালের কথা ৷ হাজারে হাজারে ইঁদুর ৷ এখানে সেখানে, ঘরের মধ্যে যাও সেখানেও ইঁদুর ৷ এই ধরো কোন বাচ্চা স্কুলে যাবে, ব্যাগ গোছাচ্ছে, দেখা গেল ঐ ব্যাগের মধ্যে গোটা পাঁচেক ইঁদুর ছানা ৷ কিংবা স্কুলের খেলার মাঠে শিশুদের পা খামচে ধরছে ইঁদুর ৷ কি যে যাচ্ছেতাই অবস্থা ! শহরের মেয়র পড়েছেন ভারি বিপদে ৷ নগর পিতার ঘুম নেই ৷ কি করবেন তিনি...
এমনি এক ইঁদুর দিনে হ্যামিলনে এসে পৌঁছালো আজব এক লোক ৷ লোকটির পরনে খাটো নানান রঙ্গের আলখাল্লা, মাথায় চোঙ্গার মতো উপরে উঠে ঝুলে পড়া টুপি ৷ হাতে লম্বা এক বাঁশি ৷ আহা কি সুন্দর করেই না বাঁশি বাজায় লোকটি...৷
শহরের মধ্যখানে মেয়রের অফিস ৷ এক সময় সেখানকার রোদে গা জুড়াতো মানুষ ৷ আজ আর সেই অবস্থা নেই ৷ লোকজন ঘরে কোনভাবে দিন কাটায় ৷ অফিস আদালতের কাগজপত্র কেটে কুটে একাকার করে দিচ্ছে ইঁদুর আর ইঁদুর ছানারা ৷ শহরের গণ্যমান্য লোক তাই বসেছেন সভায় ৷ কি করা যায় সেই চিন্তায় সকলের কপালে পড়ে গেছে ভাঁজ৷ ঐ সভায় এসে পৌছালো সেই অদ্ভুত বাশিওয়ালা...
: আমি আপনাদের সমস্যা সমাধান করে দিতে পারি৷ আমি হচ্ছি ইঁদুর শিকারি ৷ আমি এই শহর থেকে তাড়িয়ে দিতে পারি সব ইঁদুর ৷
মেয়র একটু ভ্রূ কুঁচকে বললেন
: বিনিময়ে তুমি কি চাও ?
তখনি সমস্বরে সেখানে উপস্থিতরা বলে উঠলেন.... তুমি যা চাও আমরা তাই দেবো ৷ টাকা চাও, সোনা চাও, জমি চাও, ঘর চাও, বাড়ি চাও সব তোমাকে দেবো, কেবল আমাদের রক্ষা করো ৷
লোকটি একটু হাসলো ৷ তারপর বাইরে বের হয়ে নিজের রঙিন আলখাল্লাটার মধ্য থেকে দারুণ একটি বাঁশি বের করল..... তারপর সেই বাশি বাজাতে বাজাতে ঘুরতে থাকল হ্যামিলনের পথে ৷ সে বাঁশির এক অচেনা সুরের আকর্ষণে শহরের হাজার হাজার ইঁদুর দল বেঁধে ছুটছে লোকটির পেছনে পেছনে ৷ নর্দমার গর্ত থেকে, অন্ধকার গলি থেকে, রান্নাঘরের পেছন থেকে দলে দলে বেরিয়ে আসছে ইঁদুর ৷ সুরের সন্মোহনে পাগল যেনো ইঁদুরের দল ৷
ঐ শহরের পাশে যে নদী তার নাম ভেজার ৷ লোকটি থামলো না ৷ ভেজার নদীর পাশ দিয়ে হাঁটতে শুরু করলো সে ৷ আর তাঁর পিছু অদ্ভুত সুরের মূচ্ছর্নায় আসতে থাকলো ইঁদুরের দল ৷ এক সময় বাশিওয়ালার বাঁশির সুর থেমে গেলো৷ কি এক চক্রবাঁকে যেন এক উন্মাদনা এসে ভর করলো ইঁদুরের দলে ৷ আর সে যেনো উন্মাদনাতেই দল বেঁধে ঝাপিয়ে নদীর জলে...
হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা এভাবেই ইঁদুরের কবল থেকে রক্ষা করলো শহরবাসীকে ৷ কিন্তু এরপর?
ইঁদুর বিদেয় হবার পর শহরের মেয়র আর শহরের গণ্যমান্য লোকদের কাছে এসে চাইলো তার সম্মানী ৷ কিন্তু কি হলো জানো ... মেয়র এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা প্রাপ্য সোনাদানা তো দিলই না, আরো বরং ধমকে তাড়িয়ে দিল বাঁশিওয়ালাকে ৷
বাঁশিওয়ালা খুবই দুঃখ পেলো ৷ তার চোখে পানি ৷ প্রতিশোধ নেবার বাসনা তার মধ্যে ৷ কিছুদিন পর যখন শহরের লোকজন তাদের গীর্জায় প্রার্থনারত, সেই ক্ষুব্ধ, প্রতারিত বাঁশিওয়ালা ফিরে এলো আবার ৷
এবার তার মাথায় লম্বা লাল রঙের টোপর ৷গায়ে জড়ানো অদ্ভুত পোশাকটি অনেক লম্বা ৷ সেই পোশাক থেকে বের করল সে একটি ছোট্ট বাঁশি ৷ সেই বাঁশিটি বেজে উঠলো ৷ কিন্তু এবার বাঁশির একেবারেই অন্য সুর ৷ সেই সুরে এবার আর ইঁদুর বেরিয়ে এলো না ৷ বেরিয়ে এলো শহরের সমস্ত শিশুর দল ৷ সুরের মূর্চ্ছনায় বাঁশিওয়ালার পেছনে পেছনে সরু পথ থেকে বড় পথ ৷ পাহাড়ের কোল থেকে নদীর কুল পর্যন্ত এগিয়ে যাচ্ছে শিশুর দল ৷ এই দলে আছে শহরের মেয়রের আদরের কন্যাও ৷ এরপর বাঁশিওয়ালা শিশুদের নিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেলো ৷ এই পাহাড়, ঐ নদী, পাশের শহর সব জায়গা খুঁজেও পাওয়া গেলো না সেই শিশুদের ৷ পাওয়া গেলে কেবল দুটি শিশুকে ৷ মিছিলের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারার কারণে পিছিয়ে পড়েছিল বলে তাদের ফিরে আসতে হলো ৷ তাদের একজন অন্ধ বলে জানতে পারলো না, কোথায় গেল সবাই ৷ আরেকজন বোবা বলে জেনেও কিছু বলতে পারলো না.....
এর পর আর কোনদিন দেখা যায়নি হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালাকে ৷
গল্প সংগ্রহ:- http://www.dw.com - সমাজ সংস্কৃতি
ছবি: সার্চ ইঞ্জিন গুগল
উৎসর্গ : - আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি “ছোটবেলার গল্প” লেখাটি উৎসর্গ করছি প্রিয় পদাতিক চৌধুরি ভাইকে, আমি অতি সামান্য একজন মানুষ তারপরও জীবনে অনেক অনেক ভালোবাসা ও সন্মান স্নেহ মায়া মমতা পেয়েছি সেই ঋণ পরিশোধের উপায় আমার জানা নেই, তেমনি একজন পদাতিক চৌধুরি ভাই যার ভালোবাসায় আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি - পদাতিক চৌধুরি ভাই আপনি ভালো থাকুন ব্যস্ত থাকুন - আমার জন্য ও দোয় করবেন যতোদিন বেঁচে থাকি যেনো ভালো থাকি ব্যস্ত থাকি, পরম করুনাময় আমাদের সকলকে শান্তি দিন - আমেন ।।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জানুয়ারি, ২০২২ রাত ১২:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




