প্রারম্ভিক
ছোটবেলায় আমরা ভাবসম্প্রসারন করতাম "রাজ্য দখলের চেয়ে রাজ্য রৰা করা অনেক কঠিন"; বাসত্দবে এই প্রবাদ বাক্যটি বাংলাদেশের জন্য কঠিন সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা বাঙালি জাতি, বাংলার জন্যই আমরা বাংলাদেশী। অথচ এই বাংলাকে আমরা নিজেদের শক্ত মেরম্নদণ্ড বলে বিশ্ববাসীকে পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছি। মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় অপারেটিং সিস্টেম। এরা যখন বাংলাকে তাদের অপারেটিং সিস্টেমের অন্যতম ভাষা হিসেবে যুক্ত করার সিদ্ধানত্দ নিলো, তখন সবার আগে তাদের তালিকায় বাংলা ভাষার জন্য স্থান পেলো আমাদেরই পাশর্্ববর্তী দেশ ভারত। এই বাংলার উধর্্বতন কর্মকর্তা ও বুদ্ধিজীবীরা ব্যর্থ হলেন তাদের মাতৃভাষাকে সবার প্রথমে স্থান দিতে। আর তাই মাইক্রোসফট উইন্ডোজের প্রথম বাংলা হলো "বাংলা [ভারত]"। তবে বাংলাদেশের জন্যও আলাদা করে বাংলা ভাষা উইন্ডোজে যোগ করা হবে যা "বাংলা [বাংলাদেশ]" নামে থাকবে। যাই হোক, মাইক্রোসফট সফটওয়্যারে বাংলা ব্যবহার নিয়ে কথা হয় মাইক্রোসফটের যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক র্যাপিড রেসপন্স গ্রম্নপ এবং একুশের অমি আজাদের সাথে। জানা যায়, অজানা বেশ কিছু তথ্য।
শুরম্নর দিকের কথাঃ
অবাক করার মতো খবর হচ্ছে, সবার প্রথমে মাইক্রোসফটের সাথে বাংলা ভাষা ডেভেলপের উদ্যেগ নেন পল নেলসন নামের এক অবাঙ্গালি। পল আগে মাইক্রোসফটের টাইপোগ্রাফি বিভাগের প্রধান ছিলেন। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, পল ইংরেজি ভাষার চেয়ে বেশি পারদর্শী ছিলেন বিদেশী ভাষায়। উইন্ডোজের অনেক ফন্টই এই ভদ্রলোকের তৈরি। তবে প্রথমবারের মত ভারতীয় ভাষা হিন্দি এবং তামিলের প্রাথমিক সাপোর্ট থাকে উইন্ডোজ 2000-এ। এটা দেখার পর একুশে বাংলা যোগ করার জন্য প্রসত্দুতি নিতে থাকে। এক পর্যায়ে জানা যায়, মাইক্রোসফট কারো সাথে কোন কথা না বলে নিজে থেকেই বাংলা ফন্ট তৈরি করছে। সেই মূহুর্তে ফন্ট গঠন দলে ছিলেন পল নেলসন, পিটার কন্সটেবল, ডেভিড পেস্নটন, প্রফেসর ড: যোসি এবং উনার মেয়ে অপূর্বা যোসি। ফন্ট গঠন হয় "বৃন্দা"। এতটুকু কাজ করেই মাইক্রোসফট মনে করে 'কেলস্না ফতে' হয়ে গেছে এবং বাংলা নিয়ে যারা গবেষণা করছে তাদেরকে পরীৰা করার জন্য আমন্ত্রন জানায়। এগিয়ে যায় বাংলাদেশ থেকে একুশে সংস্থা এবং ভারত থেকে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশ থেকে প্রাথমিক কাজের জন্য নির্বাচন করা হয় বাংলাদেশের অন্যতম ওপেন সোর্স ডেভেলপার সংস্থা 'একুশে'কে। একুশে তাদের প্রাথমিক কাজ করার পর এটাকেই পরে পরিবর্তন পরিমার্জনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম বঙ্গের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। যা শেষ পর্যনত্দ ভারতীয় বাংলা হিসেবেই থেকে যায়।
বাংলা [ভারত]
সম্প্রতি, মাইক্রোসফট থেকে তাদের অপারেটিং সিস্টেমে ব্যবহারযোগ্য বাংলা ভাষার প্যাচ ছাড়া হয়; যা একমাত্র উইন্ডোজ এক্সপি সার্ভিস প্যাক-2 সাপোর্ট করে। এটি ইন্সটল করলে বাংলা ভাষার শেষ ডেভেলপটা বোঝা যায় এবং সেই সাথে আরও বোঝা যায় বাংলাদেশী বাংলা এবং ভারতীয় বাংলার সাথে কী আকাশ পাতাল তফাৎ! ভাষা ব্যবহারের প্রতিটি উচ্চারনে ভারতীয় গন্ধ পাওয়া যায়। বাংলাদেশীরা কথাকপোনের সময় চলতি ভাষা ব্যবহার করে এবং পত্রপত্রিকাতেও একই ভাষা ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু সর্বশেষ ভারতীয় বাংলায় দেখা গেলো এর সম্পূর্ণ উল্টো ব্যবহার। বিশ্বভারতীর মতে, তারা চেয়েছে একশ শতাংশ বাংলা ব্যবহারের। কিন্তু সমস্যা হলো ব্যবহারিক বিষয়টা তাদের মাথায় হয়তো ছিলো না! আমরা সাধারনত শব্দের সাথে বহুবচন ব্যবহার করি না। যেমন ইংরেজি শব্দ এধফণ -কে নথি বললেই ভালো শোনায়, নথিপত্র বললে সবৰেত্রে তা শ্রম্নতিমধুরতা ধরে রাখতে পারে না। সবচেয়ে বড় সমস্যাটা হয়ে গেছে, বিভিন্ন স্থানে বেশ 'জটিল বাংলার' ব্যবহার করা হয়েছে; যার সহজ শব্দ অভিধানে একটু কষ্ট করে খুঁজলেই পাওয়া যায়। এৰেত্রে, অমি আজাদের ৰুদ্ধ মনত্দব্য হচ্ছে, "অপারেটিং সিস্টেমতো আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পদ্য না, যে পড়ার পরে শব্দার্থ পড়ে পদ্য বুঝে নেবো!"। তিনি গধণষ এর বাংলা লিখেছিলেন 'প্রদর্শন'; কিন্তু সেটাকে বিশ্বভারতী পরিবর্তন করে লেখে 'বিৰণ'।
অন্যদিকে মজার ব্যপার হচ্ছে, আমরা বাংলাদেশীরা বাংলায় কম্পিউটিং নিয়ে লেখালেখি কালে 'উইন্ডোজ' -কে উইন্ডোজ বলে আসছি; কিন্তু সম্প্রতি মাইক্রোসফট জানিয়েছে 'উইন্ডোজ' -কে উইন্ডোজ না বলে বাংলা ভাষায় 'উইন্ডোস' বলতে হবে। জানা যায়, মাইক্রোসফটের একটি নিজস্ব ভাষা গবেষনা কেন্দ্র আছে, সেখান থেকেই এ সিদ্ধানত্দ নেয়া হয়েছে। তবে সিদ্ধানত্দ নেবার সময় কোন বাংলাদেশী বাংলা ভাষাবিদ সেখানে উপস্থিত ছিলো কিনা এই নিয়ে অনেকেই সন্দেহ পোষন করছেন।
বাংলা [বাংলাদেশ]
আগামী বছরেই প্রকাশিত হচ্ছে মাইক্রোসফটের নতুন অপারেটিং সিস্টেম উইন্ডোজ ভিসতা। সেখানেই যুক্ত হবে বাংলাদেশীদের অতি কাঙ্খিত বাংলা [বাংলাদেশ] ভাষা। 2003 সালের সেপ্টেম্বর মাসে একুশে'র সাথে মাইক্রোসফটের এনডিএ চুক্তি স্বাৰরিত হয়। এই চুক্তিতে মাইক্রোসফটের পৰে স্বাৰর করেন টাইপোগ্রাফি বিভাগের পল নেলসন এবং একুশে'র পৰ থেকে অমি আজাদ। চুক্তির ভিত্তিতে একুশে পরিবারের সদস্যরা মাইক্রোসফটকে বাংলা উন্নয়নের জন্য সব রকম সাহায্যসহ অনুবাদের কাজ করে দেয়। একুশে পরিবারের পৰ থেকে এই কাজে নিয়োজিত ছিলেন, অমি আজাদ- বাংলাদেশ, সুমিত রঞ্জন দাস -ভারত, সোলায়মান করিম -কানাডা, গৌতম সেন গুপ্তা -ভারত এবং অনুবাদের জন্য বাংলাদেশের অপেন সোর্স ডেভেলপ সংস্থা অঙ্কুরের সদস্যরা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে। বলা বাহুল্য, উইন্ডোজে বাংলাদেশী বাংলা ব্যবহারের জন্য 2002 সালে পল নেলসন একবার বিসিসি'র সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলো এবং সেই সাথে এ বিষয় নিয়ে অনেকের সাথে কথাও বলেছিলেন। কিন্তু তার অভিজ্ঞতা এতটাই তিক্ত হয়েছিলো যে, পরে তিনি আর কাউকে জানাতে রাজি হননি কি কি ধরনের কথা হয়েছিলো।
সবকিছুর পরেও একটি সমস্যা থেকে যায়; সেটি হলো বাংলায় টাইপ করার জন্য কিবোর্ড লে-আউটজনিত সমস্যা। বর্তমানে বাংলা [ভারত] ভাষার সাথে যে দু'টো কিবোর্ড লে-আউট আছে, প্রতিটিই ভারতীয়। জানতে চাওয়া হয়েছিলো, বাংলা [বাংলাদেশ] ভাষায় কোন বাংলাদেশী কিবোর্ড লে-আউট যুক্ত করা হবে কিনা। এৰেত্রে মাইক্রোসফটের যুক্তি কিছুটা ভিন্ন; তারা উইন্ডোজ ভিসতার সাথে কিছু প্রয়োজনীয় টুল দিয়ে দেবে, যা ব্যবহার করে ব্যবহারকারী যে কোন ভাষার যে কোন কিবোর্ড লে-আউট বানিয়ে নিতে পারবে। তবে বাংলা [বাংলাদেশ] -এ বাংলাদেশীদের জন্য আলাদা একটি লে-আউট থাকবে।
বাংলা ব্যবহারে প্রচলিত সমস্যা
উইন্ডোজ এক্সপি সার্ভিস প্যাক-2 এ অফিসিয়ালি প্রথম বাংলা সমর্থন আসে। কিন্তু জটিলতা সেখানে এসেই থেমে যায়নি। এতে বাংলা প্রদর্শনের জন্য যে ফন্ট 'বৃন্দা' ব্যবহার করা হয়েছে তাতে প্রদর্শনজনিত বিশাল একটা সমস্যা ছিলো। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফন্টটিকে ঠিকমতো হিন্ট করা হয় নি; যে কারনে মনিটরের পিক্সেল অনুযায়ী ফন্টটি ভালো মতো প্রদর্শিত হতে পারে না। বৃন্দার আশেপাশের ফন্টের তুলনায় বৃন্দা ছোট-বড় হয়ে যায়। তবে এর উন্নতীকরণ চলছে। সেই সাথে ইউনিকোড জনিত কিছু সমস্যাও ছিলো। প্রথম দিকের ইউনিকোড বাংলায় কোন খন্ড-ত (ৎ) ছিলো না। পরে একুশে খন্ড-ত পেলেও সেটার জন্য মাইক্রোসফট কোন নতুন আপডেট দেয় নি। এছাড়া দাঁড়ি নিয়েও একটা বিশাল ঝামেলা আছে। তবে সব কিছুই ঠিকঠাক পাওয়া যাবে উইন্ডোজ ভিসতা-তে। উলেস্নখ্য, উইন্ডোজ এক্সপির জন্য আর কোন বাংলা ভাষা আপডেট প্যাচ ছাড়া হবে না। মাইক্রোসফট ভিসত্দা নিয়ে ব্যসত্দ এবং যেসব মেশিনে এক্সপি চলতে সমস্যা হয়, সেটাতেও ভিসত্দা চালাবার জন্য বের করা হচ্ছে উইন্ডোজ ভিসত্দা স্টার্টার এডিশন। শোনা যাচ্ছে, বর্তমান লাইসেন্সধারী এক্সপি ব্যবহারকারীরা ওয়েব থেকে আপডেটের মাধ্যমে কোন টাকা পয়সা না দিয়েই স্টার্টার এডিশনে চলে যেতে পারবে। কিন্তু পাইরেটেড অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহারকারীদের এই ৰেত্রে সমস্যা হবে।
সম্প্রতি মাইক্রোসফট বাংলাদেশী ডেভেলপারদের সথে একটি মিটিং -এ সিদ্ধানত্দ নিয়েছে, তারা আগামী জুন মাসে বাংলাদেশে আসবেন। যেহেতু বাংলাদেশীরা মাইক্রোসফট ল্যঙ্গুয়েজ ইন্টারফেস প্যাক এর ভারতীয় বাংলা ভার্সনটি ঠিক একটা গ্রহন করেনি, তাই তারা এদেশে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশী ল্যঙ্গুয়েজ ইন্টারফেস প্যাক এর বিষয়বসত্দু সংগ্রহ করবেন। বাংলাদেশের বাংলাকে মাইক্রোসফট মাঠ পর্যায়ে কাজ করে একেবারে ঢেলে সাজাবেন। যাতে বাংলাদেশীদের এবার কোন অভিযোগ না থাকে। জানা গেছে, লাইসেন্সজনিত সমস্যা থাকায় তারা বর্তমান বাংলা ফন্ট বৃন্দা এর ইন্টারফেস পরিবর্তন করতে পারছেন না। তবে তারা বাংলাদেশের জন্য নতুন ফন্ট যোগ করবেন বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশের ব্যর্থতা
বাংলাদেশের 21শে ফেব্রম্নয়ারি অনুসারে সারা বিশ্বে মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়। শুধু তাই নয় , বিশ্বের 70 শতাংশ বাংলা ভাষাভাষী থাকে বাংলাদেশে। বাঙালি মানুষের এত বড় একটা সংখ্যা বাংলাদেশে বসবাসরত থাকা সত্বেও মাইক্রোসফট বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে আগে ভারতের উপ-ভাষা, বাংলা ভাষাকে স্থান দিলো। এর প্রধান কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের আইটি খাতের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের অনীহা ও অদায়িত্বশীলতার জন্য। অন্যদিকে বিশ্বের বড় বড় কম্পিউটার নির্মাতারা যেমন এপল, এইচপি, আইবিএম প্রভৃতি তাদের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেমে বাংলা ভাষাকে এড়িয়ে গেছে এই দেশে কপিরাইট আইনের ফলপ্রদ প্রয়োগ না থাকার কারনে। মাইক্রোসফটের এই সিদ্ধানত্দের কারনে বিশ্বে বাংলা ভাষার কোন সফটওয়্যার এর ভার্সন মানেই ভারতীয় ভার্সন হয়ে দাঁড়াবে। বাংলা ভাষার কোন সফটওয়্যার তখন আর মৌখিকভাবে বাংলাদেশী ভার্সনের সফটওয়্যার দাবি করতে পারবে না। এই অস্বসত্দিকর ব্যাপারটি যদি বাসত্দবে রূপ নেয় তবে বাংলাদেশীদের জন্য এর চেয়ে বড় লজ্জার বিষয় আর হতে পারে না!
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




