
গল্পটা বডের। পুরো নাম- নোবডি ওয়েন্স। এক অন্ধকার রাতে ‘দ্য ম্যান জ্যাক’ এর ছুরির নিষ্ঠুর শিকার হয় তার বাবা-মা আর পরিবারের বড় ছেলে।
মৃতদেহ গুলোকে ফেলে রেখে রক্তে ভেজা অস্ত্রটা নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে জ্যাক। পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যকে শেষ করার উদ্দেশ্যে। নিজের কাজে পুরোপুরি প্রফেশনাল সে। মায়াদয়ার কোন বালাই নেই- হোক সে দুধের শিশু কিংবা বৃদ্ধ। অন্ধকার ঘরটায় প্রবেশ করার পরে সে আবিস্কার করে কেউ নেই সেখানে। খেলনার পাহাড় জমে আছে কিন্তু যার জন্য ঘরে ঢোকা, সেই-ই নেই। শূন্য ঘর।
নিচতলায় হুটোপুটির শব্দে ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো শিশুটির। কট বেয়ে নিচে নামে সে। দোতলা থেকে নামার সিঁড়িটাও ভাঙে সে বুদ্ধিমত্তার সাথেই। বাসার দরজাটা খোলাই ছিলো, একটু দ্বিধার সাথেই হামাগুড়ি দিয়ে কুয়াশায় ঢাকা রাস্তায় নেমে পড়ে।
বড টলমল পায়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে উপস্থিত হয় শহরের পাহাড়ে অবস্থিত কবরস্থানের দোরগোড়ায়। সেখানে তাকে দেখতে পান মিস্টার ওয়েন্স। তাকে দেখা মাত্রই মিস্টার ওয়েন্স তার স্ত্রী মিসেস ওয়েন্সকে ডেকে আনেন। মিসেস ওয়েন্স এসে দেখতে পান শিশুটির ছোট আঙ্গুলগুলো পরম নির্ভরতায় ধরে আছে মিস্টার ওয়েন্সের স্বচ্ছ হাত। মিস্টার আর মিসেসের কোন সন্তান ছিলো না জীবিত থাকতে।
হ্যাঁ! এই মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ওয়েন্স কোন স্বাভাবিক মানুষ নন। তারা কবরস্থানে বাস করা মৃত আত্মা। সহজ ভাবে বললে- ভূত! তাদের সাথে কবরস্থানেই বাস করে তাদের মত আরো অনেকেই। যারা জীবিতদের সাথে লেনদেনের পাট চুকিয়েছে বহু আগেই।
শিশুটিকে দেখা মাত্র মিসেস ওয়েন্সের ভেতরে বাস করা মাতৃত্ববোধ জেগে উঠে। তিনি মৃত বাসিন্দাদের আকুতি জানান শিশুটিকে রেখে দেয়ার জন্য। এসময় শিশুটির সদ্য মৃত মার অবয়ব দেখা যায়- ‘আমার বাচ্চাকে বাঁচাও! দয়া করো! তাকে একজন খুন করতে আসছে!’ ধীরে ধীরে অবয়বটি কোথায় যেন মিলিয়ে যায় কেউ কিছু বলার আগেই। তর্ক জমে যায় কবরস্থানেই। জীবন্ত কোন শিশু কি করে মৃতদের সাথে থাকবে? মিসেস ওয়েন্সের দৃঢ়তার সামনে হার মানতে বাধ্য হয় সবাই। জীবিত থাকতে নিঃসন্তান ওয়েন্স দম্পতির পঞ্চাশ বছরের বিবাহিত জীবনে সন্তানের আগমন ঘটেনি। আজ ঘটল। কিন্তু তাও মৃতদের পৃথিবীতে প্রবেশের পরের জীবনে।
এদিকে জ্যাক তার শিকারের পিছু পিছু নিয়ে ততক্ষনে কবরস্থান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তার শিকারী কানে যেন ভেসে আসছে শিশুর আওয়াজ। দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে এদিক ওদিক খুঁজতে লাগলো সে।
কুয়াশা ঢাকা, অন্ধকার, নিশ্চুপ করবস্থান- যেন জায়গাটাই লুকিয়ে রেখেছে শিশুটিকে। ‘আপনাকে সাহায্য করতে পারি?’ মসৃণ কন্ঠে কে যেন জিজ্ঞেস করলো। হঠাত অন্ধকার থেকে উদয় হয় ঘন কালো রঙের পোশাক পড়া লম্বা এক ব্যক্তির। যেন অন্ধকারের রঙ মিশিয়ে বানানো কাপড়টা। ‘আমি একজনকে খুঁজছিলাম’- উত্তর দেয় জ্যাক। চট করে পকেটে ছুরিটা ঢুকিয়ে ফেলে সে। ‘এই রাতে? তাও কবরস্থানে?’ প্রশ্ন করে আগন্তুক। ‘সম্ভবত একটা বাচ্চা ছিলো, আমি পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছিলাম এমন সময় কান্না শুনতে পেলাম। গেট দিয়ে উঁকি দিতেই বাচ্চাটাকে দেখতে পেলাম। কি করবো বলুন?’
- আপনি সম্ভবত ভুল দেখেছেন। বিড়াল হতে পারে কিংবা নাইটবার্ড। শেয়াল হওয়াও বিচিত্র না। এদিকে প্রচুর আছে। ওরাই নানা রকম শব্দ করতে ওস্তাদ।
আগন্তুক জ্যাককে গেটের দিকে নিয়ে যায়। চাবি বের করে গেট খুলে সৌজন্যের সাথে বিদায় জানায়। বিফল হয়ে জ্যাক বাধ্য হয়েই বিদায় নেয়।
জ্যাক আড়াল হওয়া মাত্রই কালো অবয়ব ধারী শূন্যে ভেসে পাহাড়ের প্রান্তের দিকে ধাবমান হয়।
অবয়বধারীর নাম সাইলাস। বডের ভবিষ্যত অভিভাবক, পথপ্রদর্শক আর শিক্ষক। আর শিশুটির নাম রাখা হলো- নোবডি ওয়েন্স।
মৃতদের মাঝে স্থান পেল এক দুগ্ধপোষ্য শিশু আর গ্রেভইয়ার্ডটা হলো তার বিচরণক্ষেত্র; তার বাড়ি।
আর ম্যান জ্যাক? তার কাজে সে কখনো বিফল হয়নি। এবারও হবে না। যতসময়ই লাগুক, যেভাবেই হোক সেই শিশুটিকে খুঁজে বের করবেই। আর তা করলেই......
উপরের কাহিনীর স্রেফ বইয়ের প্রথম কয়েক পৃষ্ঠার। যা পাঠক হিসেবে আমাকে চুম্বকের মত টেনে ধরেছিলো। এরপর ধীরে ধীরে বয়স বাড়তে লাগলো বডের, শৈশব থেকে কৈশরে পা দেয় বড; আর এর মাঝেই ঘটে নানা বিচিত্র ঘটনা। সেই সাথে পায় সে কবরবাসীদের থেকে ক্ষমতা। কখনো দুষ্ট প্রেতাত্মার কবলে পড়ে কিংবা খুঁজে পায় স্কারলেট নামের মিষ্টি এক খেলার সাথী; আবার পড়ালেখা শেখার জন্য স্কুলে গিয়ে মিশতে বিড়ম্বনায় পড়ে স্বাভাবিক ছেলে-মেয়েদের সাথে।
কিন্তু......তার বিপদ এখনো কাটেনি। কি হবে বডের? কেন খুন হয়েছিলো তার বাবা-মা আর ভাই? কারা ছিলো এর পেছনে? সেও কি ম্যান জ্যাকের ছুরির শিকার হবে তার পরিবারের মতই? নাকি তাকে রক্ষা করে রাখবে তার সঙ্গীরা?
নিল গেইম্যানের অসাধারণ হাতের লেখনীর ছোঁয়ার প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছিল কোন অ্যানিমেশন মুভি দেখছি। প্রতিটা দৃশ্য চোখের সামনে ভাসছে। অসম্ভব লাইট হার্টেড একটা গল্প। মন ভালো করে দেয়ার মত। চিল্ড্রেন ফ্যান্টাসি নভেল হিসেবে লেখা হলেও বড়রাও উপভোগ করবেন কোন সন্দেহ ছাড়াই। আর বইয়ের পরিব্যপ্তিও ছোট, মাত্র ১৭২ পৃষ্ঠা। একবসাতেই শেষ করে ফেলা যায় তবে আমার মতে সময় নিয়ে পড়লে বরং বেশিক্ষন উপভোগ করা যায়। ইলাস্ট্রেশন গুলোর কোয়ালিটি বেশ খারাপ- প্রায় বাজে জেরক্স কপির মত, আর ছবিগুলোও ভুল পৃষ্ঠায় দেয়া। খুঁতখুঁতানি ছিলো এনিয়ে কিছুটা। নীলক্ষেত প্রিন্ট হলে যা হয় আরকি!
গেইম্যানের নর্স মিথলজি পড়ার পরেই তার লেখার উপর চোখ পড়ে। এখন টার্গেটে আছে কোরালাইন, অলরেডি কেনা হয়েছে। এছাড়া আমেরিকান গডস, ওশান অ্যাট দি এন্ড অফ দি লেন বাকি। সাথে আরো দুয়েকটা ভিন্ন বই টার্গেটে থাকায় দেরি হচ্ছে ধরতে।
হ্যাপি রিডিং!
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০১৭ দুপুর ১২:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


