আজ সকালে অফিসে যাবার আগে সোফায় বসে বাইরের শীতের হিম হয়ে যাওয়া, পত্রহীন প্রক্তি দেখছিলাম আর অপেক্ষা করছিলাম আমার হ্যাসবান্ডের জন্য--ও ছেলেকে স্কুলে নামাতে গেছে, ফিরে এলে একসাথে বের হব। এর মাঝে মেসেন্জারে বড় আপার একটা মেসেজ এল,-- একটা ছবি পাঠিয়েছে ও আমাকে..খুব উৎসাহ নিয়ে খুললাম--খুলেই মন হুহু করে উঠল, দুচোখ ভিজে উঠল কান্নায়! এ যে আমাদের বাবুর ছবিসহ এ লেভের এডমিশন কার্ড আর কিছু ওর ডায়রীর ছেড়া পাতা!
আজ থেকে ১৫ বছর আগে বাবু (বড়আপার বড় ছেলে) মাত্র ১৯ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে ওপারে চলে গেছে! আজ আপা এতদিন পর, ছোট ছেলের বিয়ে উপলক্ষে ঘর গোছাতে যেয়ে বাবুর অনেক কিছু খুজে পেয়েছে! ..আপা এবার আমাকে ভিডিও কল দিল, আর আমার অঝোর কান্না দেখে আপা বিব্রত হল---" আমাকে কেনতুমি বাবুর ছবি আর ওর ডায়রীর লেখা পাঠিয়েছ? আমি কিভাবে আজ সারাদিন পার করব?.." আমি কাঁদছি ! আপাও কাঁদছে..
বাবুকে মাত্র চল্লিশ দিনের বাচ্চা অবস্থায় আপা আমাদের কাছে রেখে হোস্টেলে ফিরে গিয়েছিল..আপা রাজশাহী মেডিকেলে পড়ত তখন। দুলাভাই ঢাকায় হসপিটালে কর্মরত, উনিও ডাক্তার, তবে জীবনের প্রথম দিকের স্ট্রাগলের দিকে তখন ওরা, তাই বাচ্চাকে আমাদের কাছে, মানে আমার আম্মা ওকে পালবে বছর দুয়েক, এমন কথা্ই হয়েছিলো।
বাবুকে পেয়ে আমরা কি খুশি তখন হয়েছিলাম, বলে বোঝাতে পারবনা এখানে! আমি আর আমার ছোটবোন তখন স্কুলে পড়ি, আমাদের কোন ভাই ছিলনা, বাবুকে পেয়ে আমরা একটা খেলনা ভাই পেলাম যেন, যদিও ও আমাদের ভাগনা ছিল!..স্কুল থেকে ফিরে আমরা ছুটে যেতাম বাবুকে কোলে নেবার জন্য, ওকে শিশিতে দুধ খাওয়ানো জন্য! ভাইহীন পরিবারে আপা আমাদের ভাইয়ের দ্বায়িত্ব নিতে গিয়ে একটা বিশাল স্যাক্রিফাইস করল! মাঝেমাঝে আপা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে চলে আসত বাড়িতে, একটু বাবুকে কোলে নেবার জন্য! তখন দুলাভাইও কাজ ফেলে চলে আসত....
তারপর সেই ভয়াবহ দিনগুলো আসল!--বাবুর প্রথম জন্মদিনের পর প্রথমবারে মত ঢাকায় গেল, কথা ছিলো মাস খানেক থেকে চলে আসবে, দুলাভাই ডাক্তার মানুষ ছিলেন বলে কিছু একটা সন্দেহ করেছিলেন বাবুর চেখের দিকে তাকিয়ে...দিন যেন যায়না! আমি আর ছোটবোন জানালার শিক ধরে বাইরে বাংলা ঘরের ওপারে, বড় রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকি,--- এই বুঝি কোন রিক্সা টুংটাং করে বাড়ির সামনে আসল, আর সেটা থেকে আপা, দুলাভাই বাবুকে কোলে করে নামল!..
২ সপ্তাহও যায়নি, বাবু চলে যাবার পরে---একদিন দেখলাম আব্বা আম্মা ওঘরে খুব কাঁদছে আর ফিসফিস করে কি যেন বলছে!
সব জানলাম, বাবু আর আসবেনা,-- ওর কি যেন একটা অসুখ হয়েছে, তার জন্য চিকিৎসা শুরু হবে। আমরা দুবোন হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম,-- অত অলপ বয়সে বিশাল একটা ধাক্কা পেয়ে বুকটা যেন ফেটে গেল, এর ভার নিতে পারছিলামনা!, বিশেষত আমি একেবারে অসুস্থ হয়ে গেলাম (আমি এমনিতেও ছোটবেলায় একটু রোগাভোগা ছিলাম), আমাদের সংসারের সুর কেটে গেল যেন একেবারে--আব্বা কেমন যেন হঠাৎ বুড়ো হয়ে গেলেন, আম্মা বিছানায় পড়ে গেলেন! ইস্ কি কস্ট! কি কস্টের সেই দিনগুলো!
বাবুর রেয়ার জেনেটিক রোগের তখন কোন ভাল চিকিৎসা ছিলোনা বাংলাদেশে, (থ্যালাসেমিয়া)..মাসে মাসে রক্ত দিতে হত ওকে। আমাদের বাবু রিয়াল ফাইটার ছিলো,-- এই ভয়াবহ অবস্থায় থেকেও ও লেভেল শেষ করেছিলো সাউথব্রীজ স্কুল থেকে, ভাল ক্রিকেট খেলত! মাসটারমাইনড থেকে এ লেভেল দেবার কিছুদিন আগে আর পারলনা, হেরে গেল....ফাঁকি দিয়ে চলে গেল আমাদের! আমি তখন ণিউ ইয়র্কে, ঘটনা দিনে সকালে ভীষন ভাবে আমার হাত কেটে গিয়েছিলো, রান্না ঘরে ছুরি দিয়ে সবজি কাটার সময় (ষেই সময় বাবুকে নিয়ে টানাটানি হাসপাতালে) ! শুধু মনে আছে, আমার হ্যাসবান্ড সারাদিন আমার কাছে লুকিয়ে রেখেছিলো ওর কথা,..পরে জানতে পেরে আমি কেমন যেন পাগল হয়ে গিয়েছিলাম..আমি নাকি শুধু ছুটে বাইরে বের হয়ে রাসতায় যেতে চাচ্ছিলাম আর একটু পর পর সেন্স হারাচ্ছিলাম, কেউ ধরে রাখতে পারছিলনা!....
সুদুর বিদেশে বসে আপনজনের মৃত্যু সংবাদের মত অকল্পনীয় কস্টের আর কিছু নেই, ..আমার বাবুর মত ১৯ বছরের কাউকে দেখলে আমি পাগল হয়ে যাই এখনো!..আল্লাহ তুমি আমাদের বাবুকে বেহেস্তের সর্বচ্চ শিখরে আসীন করো! আমীন!
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ২:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


