somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পতাকার যুদ্ধ অথবা গামছা ও কালিমা

১৪ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একটি দেশের পতাকা শুধু কাপড় নয়। এটা একটি চুক্তি—আমরা কে, এই প্রশ্নের সম্মিলিত উত্তর। বাংলাদেশের পতাকার রং লাল-সবুজ। লাল মানে রক্ত, সবুজ মানে মাটি। এই দুটি রঙের পেছনে একটি নির্দিষ্ট ইতিহাস আছে—ভাষার জন্য, মাটির জন্য, মানুষের জন্য মৃত্যুর ইতিহাস। যখন সেই পতাকার পাশে বা বিকল্পে অন্য একটি পতাকা ওঠে—তখন প্রশ্নটা কাপড়ের নয়, চুক্তির।

দেশে সাদাকালো জঙ্গী পতাকার মানে কী? প্রতীকের রাজনীতি নিয়ে অর্ওয়েল উনিশশো চুরাশীতে বলেন যে, ক্ষমতা দখলের আগে প্রতীক দখল করতে হয়।

ভাষা বদলাও, ইতিহাস বদলাও, পতাকা বদলাও—মানুষ নিজেই বদলে যাবে। ধর্মীয় প্রতীককে জাতীয় পরিসরে স্থাপন করা একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কৌশল। এটা ধর্মচর্চা নয়। ধর্মচর্চা ব্যক্তিগত বা সামাজিক—তার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতীকের দরকার নেই। যখন ধর্মীয় পতাকা রাষ্ট্রীয় পরিসরে ওঠে, তখন বার্তাটা স্পষ্ট—এই রাষ্ট্রের পরিচয় বদলাতে হবে।

জঙ্গিবাদ ও বিচারহীনতার চক্রের কারণে বাংলাদেশে একটি পরিচিত প্যাটার্ন আছে। জঙ্গি সংগঠনের সাথে সম্পর্কের অভিযোগে গ্রেফতার হয়, জামিন পায়, আবার গ্রেফতার হয়, আবার জামিন পায়। এই চক্রটি কোনো একটি সরকারের ব্যর্থতা নয়, এটা সরকারেরই রাষ্ট্রদ্রোহিতা—যেটা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্য একটি কাঠামোগত সমস্যা।

কেন বারবার জামিন হয়? কারণ প্রমাণের মান উঁচু রাখা হয় না, বিচার দীর্ঘায়িত করা হয়, এবং রাজনৈতিক সুবিধামতো মামলা এগোয় বা থামে।অর্ওয়েলের ভাষায়—আইন যখন রাজনীতির হাতিয়ার হয়, তখন সেটি আর আইন থাকে না। সেটা একটি মঞ্চ হয়ে যায়, যেখানে প্রয়োজনমতো নাটক হয়।

৫ আগস্টের পরের হিসাবে মেলাতে গিয়ে জনগণ দেখতে পাচ্ছে, যে মুহূর্তে রাজনৈতিক পট পটপরিবর্তন হয়, সেই মুহূর্তেই পুরনো হিসাব বদলে যায়। যাদের বিরুদ্ধে মামলা ছিল তারা মুক্ত হয়। যারা মুক্ত ছিল তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এই বদলটা বিচারের নয়, ক্ষমতার।
কিন্তু এখানে একটি বিপদ আছে যা সাধারণত আলোচনায় আসে না। যে সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, তারা রাজনৈতিক পরিবর্তনকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে। এটা বাংলাদেশের বিশেষত্ব নয়—এটা ইতিহাসের নিয়ম। আফগানিস্তানে ১৯৯২ সালে সোভিয়েত-সমর্থিত সরকারের পতনের পর যা হয়েছিল, ইরাকে ২০০৩ সালে যা হয়েছিল, সিরিয়ায় যা হয়েছে—প্রতিটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় শূন্যতার সুযোগে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো জায়গা নিয়েছে।

আমেরিকা দেখেও না দেখার ভান করে। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি দীর্ঘ ইতিহাসই হলো—আজকের মিত্র আগামীকালের শত্রু। আফগানিস্তানে মুজাহিদিনদের অস্ত্র দেওয়া হয়েছিল সোভিয়েতের বিরুদ্ধে। তারাই পরে তালেবান হয়েছে। ইরাকে সাদ্দামকে সমর্থন দেওয়া হয়েছিল ইরানের বিরুদ্ধে। পরে সাদ্দামকেই আমেরিকার সরাতে হয়েছে। এই মার্কিনীদের পল্টি খাওয়ার প্যাটার্নটা অজ্ঞতার নয়, কৌশলের। স্বল্পমেয়াদী স্বার্থ দীর্ঘমেয়াদী বিপদকে ঢেকে রাখে—যতক্ষণ না বিপদটা নিজেই দরজায় এসে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই হিসাবটা মেলানোর দিন চলে এসেছে।

ভারতের ভূমিকা বাংলাদেশে সবসময়ই একটি বাস্তব প্রশ্ন না হয়ে বিদ্বেষের প্রশ্নে পরিণত। ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী। তার নিরাপত্তা স্বার্থ সরাসরি বাংলাদেশের ভেতরের পরিস্থিতির সাথে জড়িত। কিন্তু প্রতিবেশীর নিরাপত্তা স্বার্থ এবং প্রতিবেশীর হস্তক্ষেপ—এই দুটো আলাদা জিনিস। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজের ভেতরের নিরাপত্তা সমস্যা নিজেই সমাধান করবে—এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু যখন রাষ্ট্র সেই সক্ষমতা হারায়, তখন শূন্যতা পূরণ করে হয় প্রতিবেশী, নয় আন্তর্জাতিক শক্তি। উভয়ই সার্বভৌমত্বের জন্য সমস্যা। অর্ওয়েলের ভাষায়—দুর্বল রাষ্ট্র স্বাধীন থাকতে পারে না। সে শুধু বেছে নিতে পারে কার অধীনে থাকবে। শেষকথা তাহলে, 'দুই শয়তানের মধ্যে কম' কে?

পতাকা বদলানো দিয়ে শুরু হয়। ইতিহাস বদলানো দিয়ে এগোয়। রাষ্ট্র বদলানো দিয়ে শেষ হয়। এই তিনটি ধাপের মাঝখানে থাকে একটি জিনিস—জনগণের মনোযোগের অভাব। যখন সাধারণ মানুষ দেখেও দেখে না, বুঝেও বোঝে না, তখন পরিবর্তনটা এতটাই ধীরে হয় যে, অনেকদিন পরে একদিন ঘুম থেকে উঠে মনে হয়—দেশটা আর আগের দেশ নেই।

ইরানে ১৯৭৯ সালে ঠিক এটাই হয়েছিল।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৪৩
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রিলিফ ওয়ার্ক - আবুল মনসুর আহমেদ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:০৮




রিলিফ ওয়ার্ক
- আবুল মনসুর আহমেদ


বন্যা ।
সারা দেশ ভাসিয়া গিয়াছে। গ্রামকে গ্রাম ধুধু করিতেছে। বিস্তীর্ণ জলরাশির কোথাও কোথাও ঘরের চাল ও বাশের ঝাড়ের ডগা জাগাইয়া লোকালয়ের অস্তিত্ব ঘোষণা করিতেছে। এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্ধের হাতি দেখা ও আধুনিক ব্লগারির এক করুণ রম্যকাব্য

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:২১


মানুষের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে একটি প্রাচীন উপকথা যুগে যুগে নতুন অর্থে ফিরে এসেছে অন্ধের হাতি দেখা। কয়েকজন অন্ধ মানুষ হাতির ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ স্পর্শ করে প্রত্যেকে নিজেকে সত্যের একমাত্র অধিকারী... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাঁদগাজীর বয়ানে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৩৭



গাজী সাহেব বলেছেন, এই ছবির একদম পেছনে যাকে দেখছেন, তিনি ৭১-এর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। একই পরিবারের আত্নীয়সহ আরও পাঁচজন ৭১-এর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। পরিবারের যিনি কোনোভাবে বেঁচে আছেন, তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসুন দেখে আসি, রাজাকার, লালবদর,ছাত্রদল ও শিবিরের উত্তরাধিকারীরা পাকিস্তানে কেমন আছে‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৮:০১



কেমন আছে পাকিস্তানে বসবাসরত ৪০ লক্ষ বাঙালী?

১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে দাড়িয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিচার করার হুঙ্কার দিলেন। পাকিস্তানে বসে তখন খুনি জুলফিকার আলী... ...বাকিটুকু পড়ুন

কি করে কি করি, কি যে করি !

লিখেছেন মেহবুবা, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:০৫




আজ বেশ ক'দিন হোল আমার ব্লগবাড়িতে জ্বীন ভূতের কারসাজি চলছে! আধা পৃষ্ঠা জুড়ে কয়েকটি পোষ্ট আসছে, সব আসছে না।নিজ ব্লগবাড়িতে কত কি আয়োজন থাকে ; যেমন মন্তব্য,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×