আমেরিকার সামারের দিনগুলো খুব মজার... আমার জন্য বিশেষ করে,-- কারন বাচচাদের স্কুল ছুটি থাকে বলে। আমরা প্রায় প্রতি বছর সামারেই বাংলাদেশে যেতাম, যেবার গুলোতে যেতামনা, সেবার চেস্টা করতাম আমেরিকাতেই ঘুরতে! ২০১৫ তে একবার ডালাস যেতে হয়েছিলো পারিবারিক কারনে, একজনকে হেল্প করতে। সেবার বাচ্চাদের (একজন ১৫, আরেকজন ১১ ছিল তখন--বাচ্চা বলাটা ঠিক না বোধহয়/ টিন এজার ঠিক আছে!) নিয়ে আমি আগে চলে গিয়েছিলাম ডালাসে, আর আমার বর পরে যোগদান করেছিলো। সেই আত্মিয়ের ঝামেলা মেটার পর বাকি ছুটির সময়টা কাজে লাগিয়েছিলাম বেড়াতে গিয়ে--আমার বহুদিনের শখ ছিলো American South-West ট্রিপ দেয়ার! তাই প্ল্যান করলাম ডালাস থেকে যতদুর যাওয়া যায়, দক্ষিন-পশ্চিম বরাবর..একেবারে নেভাদা পর্যন্ত!
একদিন খুব ভোরে আমরা চারজন একটা গাড়ি রেন্ট করে বের হয়ে গেলাম..একটানা ৯ ঘন্টা চালিয়ে টেক্সাস পেরিয়ে নিউ মেক্সিকোর সান্তা ফে শহরে পৌছালাম (মাঝে মাঝে খাবার আর তেলের জন্য বিরতি নিয়েছিলাম)। মুল শহর পেরিয়ে টেক্সাস রাজ্য ছাড়ানোর সময় শুধু খাঁ খাঁ শুন্যতা, সীমাহিন সমান প্রান্তর আর একাকী দাড়িয়ে থাকা উইন্ডমীল ছাড়া আর কিছু চোখে পড়লনা! তবুও খারাপ লাগেনি--আমরা চারজনই সাউথ-ওয়েস্টের এই বিরাণ, ধ ধু প্রান্তর খুবি পছন্দ করি...আসলে নিউ ইয়রকের কঠিন ঠান্ডা, বিষন্ন ওয়েদারে বিরক্ত সবাই! রাতে সান্তা ফের একটা হোটেলে থেকে সকালে নতুন শহরের রুপ দেখে আমরা অভিভুত! সান্তা ফের বাড়িঘর, দালান সবকিছু মাটির --এগুলো কে আ্যডোবি স্থাপনা (Adobe Architecture) বলে। অতিরিক্ত তাপ আর শুস্ক আবহওয়ার জন্য (দিনে প্রচন্ড গরম, রাতে কনকনে ঠান্ডা) এরকম বাড়িঘর বানানো হয়, যাতে এই মোটা দেয়াল গুলো দিনের বেলার প্রচুর তাপ শোষন করে ঠান্ডা রাখে আর, রাতের বেলায় তা বিকিরণ করে ঘর গরম করতে পারে। সানতা ফে তে প্রচুর আর্টিস্ট, কবি আর পর্যটকের আনাগোনা..কেমন উৎসব উৎসব ভাব সবসময়! খুবি ভাল লেগেছিলো আমার এই শহরে, আবারও যেতে ইচ্ছে করে!..

টেক্সাস থেকে নিউ মেক্সিকো যাওয়ার পথে ধ ধু প্রান্তর!

নীল পাহাড়ের কোল-ঘেষা রাঙামাটির মায়াবতী সান্তা ফে শহর!

অপূর্ব Adobe Architecture!
সেইদিন বিকেলেই আবার সান্তা ফে থেকে রওয়ানা দিলাম আ্যরিজোনার উদ্যেশে, আবারও ৯/১০ ঘন্টার জার্নী! গাড়ির রেডিও তে কান্ট্রি মিউজিক শুনতে শুনতে আর উঁচুনিচু পাহাড়ি রাস্তায়, অন্ধকারের আবছা আলোয় ভুতুড়ে পাহাড়-টিলা দেখতে, দেখতে রাত নটায় আ্যরিজোনার সেডোনা শহরে পৌছালাম। সেডোনার যে হোটেলে আমরা রাতে ছিলাম, সেটা অনেক উচু পাহাড়ী শহরে ছিলো। সেডোনা পৌছাতে, আর ওখানে পৌছে সেই রাতের দুটো ঘটনা জীবনেও ভুলবনা!.. প্রথমটা হচ্ছে, ঐ হোটেলে যেতে একটা পাহাড় বেয়ে নামতে হয়, এটাকে Switch Back Road বলে, ওটার প্রান্ত ঘেষে গাড়ি চালিয়ে নামতে যেয়ে আমি ভয়ে চিৎকার করছিলাম---মনে হচ্ছিল এখনই পাহাড় থেকে শত শত ফিট নিচে গাড়ি ছিটকে পরবে!
পরের ঘটনা হোটেলে পৌছানোর পর। ক্লান্ত স্রান্ত আমরা চারজন ক্ষুধায় অস্থির হয়ে রেস্টুরেন্টের উদ্যেশে বের হলাম! হোটেফাঁকা ল থেকে যখন বের হই, রাত সাড়ে নটা বাজে তখন। কেমন অদ্ভুত ফাঁকা শহর, কেউ কোথাও নেই--এই রাত সাড়ে নটাতেই সবাই ঘুমিয়ে পড়ল? হেটেলে নীচে, লাল মাটির মাঝে ছড়ানো ছিটানো ক্যাকটাস গাছের ঝোপ দেখতে দেখতে আমরা বড় রাস্তায় উঠে এলাম, --একটা দোকানও খোলা নেই, আবার হোটেলের রেস্তোরাও বন্ধ! বাচ্চারা খিদেয় খিটমিটে হয়ে উঠেছে! একটা খাবারের দোকান ঝাঁপি মাত্র বন্ধ করছে দেখে দৌড়ে গেলাম ওখানে, অনেক রিকোয়েস্ট করলাম আবার খুলে দেয়ার জন্য! কিন্তু দোকানী রাজী হচ্ছিলনা কিছুতেই, কি বিশ্রি ব্যবহার এদের! আমাদের সাথে রাগারাগী করছিলো এতরাতে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করছি দেখে! অনেক বোঝানোর পরে, আর আমরা সেই নিউ ইয়রক থেকে এসেছি বলে কি মনে করে আবার দোকান খুলে ভেতরে বসে অর্ডার নিয়ে খাবার বানিয়ে দিলো আর খাবার নিয়ে দ্রুত হেটেলে ফিরে যেতে বলল! আসলে ঘটনা কি জানেন? লোকটি খাবার বানাতে বানাতে সেটাই বলল আমাদের, আর যা শুনলাম, তা শুনে এক দৌড়ে হেটেলে যেয়ে দরজা লক করলাম!--- এই শহরে রাত সাড়ে আট টার পরে সব কিছু বন্ধ হয়ে যায় মেয়রের নির্দেশে,-- কারন পাহাড় বেয়ে বিষাক্ত সাপ আর ভালুক মেইন শহরের রাস্তায়, ঘরের আশেপাশে ঘেরাঘুরি করতে থাকে! অথচ কিছুক্ষন আগেই আমরা হেটেলের পাশের ঝোপঝাড়ে ঘুরছিলাম! যা হোক! একটা অভিগ্গতা বটে!..সকালে ঘুম ভেঙে সেডোনার অপূর্ব সৌন্দর্য দেখে গতরাতের সব আতংক ভুলে হা হয়ে গেলাম, ইস কি যে সুন্দর সেডোনা, তা কেউ নিজ চোখে না দেখলে বুঝবেনা!...নাস্তা খেয়ে, একটু ঘুরেফিরে রওনা দিলাম গ্র্যন্ড ক্যনিয়নের পথে!..সে গলপ আরেক দিন না হয় বলি!

সেই সুইচব্যাক রোড!

অপূর্ব সেডোনা, আ্যরিজোনা

সেডোনার রূপে আমি মুগ্ধ!
(সব ছবিগুলো গুগল মামার সহায়তায়)
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০১৯ রাত ১২:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


