বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজা মিয়া একজন চমক। জন্ম ভারতে। জন্মসূত্রে ভারতের নাগরিক। কিন্তু নিজ দেশে টিকতে পারলেন না। চলে এলেন পাকিস্তানের পবিত্র ভূমিতে। যোগ দিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। অতি ধুরন্ধর। তরতর করে পাক সেনাবাহিনীতে বেশ কয়েকটা প্রমোশন বাগিয়ে নিলেন। ১৯৭১ সাল। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। রাজা মিয়া পাকিস্তানে রয়ে গেলেন। তৎকালীন ৯ মাসে কয়েকবার পূর্ব পাকিস্তানে আসা-যাওয়া করলেন। কিন্তু মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিলেন না। আর বীরশ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা বাংলার দামাল সন্তান মতিউর রহমান পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একটি বিমান নিয়ে পালিয়ে আসতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সাথী অপর পাইলটকে কাবু করতে পারেননি। নিজে নিহত হলেন। বিমানটি বিধ্বস্ত হলো।
আর আমাদের কথিত রাজা মিয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যেসব বাঙালি কর্মকর্তা প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করেছেন, প্রচারণা চালিয়েছেন তাদের বিচারের জন্য Tribunal গঠন করলেন। রাজা মিয়া ছিলেন সেই বিচার কমিশনের চেয়ারম্যান। এটাকে বলে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। তার নিষ্ঠুর নির্যাতনে কত বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা জীবন দিলেন তার হিসাব আজও আমাদের জানা নেই। কোনো দিন হয়তো জানা যাবেও না, এমনি বিশ্বস্ত, পাকিস্তান সরকারের অনুগত এই রাজা মিয়া।
এতক্ষণ যার নাম বলছি রাজা মিয়া। তিনি হচ্ছেন আমাদের এক কালের স্বৈরশাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৮২ সালে এক নাটকীয় সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র আঁটেন এই রাজা মিয়া। তারপর তিনি আরো সচতুর অভিনয় করেন। তার ষড়যন্ত্রের জাল যাতে প্রকাশিত না হয় সে জন্য তিনি জেনারেল মঞ্জুরসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে হত্যা করেন। আর নিজে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি জাস্টিস আ: সাত্তারের সরকারকে উৎখাত করেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন। বাংলার মসনদ দখল করেন। আর বিএনপিকে ভেঙে এবং সুবিধাবাদী কিছু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে নিয়ে গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি। কঠিন স্টিমরোলার চালিয়ে দীর্ঘ নয় বছর বাংলাদেশকে শাসন করেন। ১৯৮৬ সালে প্রহসনের নির্বাচন করেন। গণতন্ত্রকর্মী ডা: মিলনকে হত্যা করেন। গণতন্ত্রের মানসপুত্র নূর হোসেনের বুক ঝাঁঝরা করেন। জনতার ওপর ট্রাক উঠিয়ে দেয়ার ঘটনা তার আমলেই ঘটে। ছাত্রসমাজের মধ্যে গু ামি করার জন্য গঠন করেন জাতীয় ছাত্রসমাজ। কিন্তু তার প্রতিষ্ঠিত ছাত্র পাণ্ডাদের গুণ্ডামি বেশি দিন টিকে নেই।
নিজে উপাধি নেন পল্লীবন্ধু। বেগম রওশন এরশাদকে বানান ফার্স্টলেডি। বাংলাদেশে তিনি এই পদ্ধতির প্রথম প্রবর্তক। কবিতা রচনার অভিনয় করেন। অনেক বিখ্যাত লেখককে দিয়ে কবিতা লিখিয়ে নিজের নামে প্রচলন করেন। অনেক সুখী পরিবারে ভাঙন ধরান। নিজের বউ থাকতেও পরকীয়ায় পারঙ্গম এই আশি বছরের বৃদ্ধ আমাদের রাজা মিয়া ওরফে মুহম্মদ এরশাদ।
তিনি আবার রাজনীতির মাঠ গরম করছেন। সম্প্রতি ভারত থেকে সবক নিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশের মানুষ আর যা-ই হোক ভারতের দালালি পছন্দ করে না। সম্প্রতি তিনি ১১০ জন নিজ দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে চমক দিয়েছেন। এসব ভুঁইফোড় রাজনৈতিকদের নেতাদের জনগণ চেনে। ভোটের সময় ভোটটি তারা উপযুক্ত জায়গায় দেন। তিনি অত্যন্ত আঞ্চলিকতাবাদী। প্রয়োজনে রংপুরের বিভাগকে নিয়ে আলাদা দেশ গড়তে কুণ্ঠিত হবেন না। ভারতের আনুকূল্য তো আছেই। তার চটকদার স্লোগানে জনগণ বিভ্রান্ত হবে না। তিনি কখন যে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন তা টেরও পাওয়া যাবে না। রাজনীতিতে পাক্কা খেলোয়াড় একজন বিখ্যাত সাংবাদিকের মতে, He is unpredictable, তিনি স্ববিরোধী বক্তব্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
জাতির দুর্ভাগ্য বলতেই হয়, বিএনপি তথা খালেদা জিয়া সব কিছু জেনেও তার বিচার করলেন না। স্বামী হত্যার বিচার হলে জনগণের সামনে তার আসল চেহারা উদঘাটিত হতো। সে দিন আসবে কি? জনগণের কাঠগড়ায় তাকে কি দাঁড় করানো হবে?
সূত্র: আলী আহমদ ওয়াসেকপুরী

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




