
আপনারা কি নাদেরকে চিনতেন?
মনে করে দেখুন তো...!
পুরোন ঢাকার আগামসি লেন,
একটা লাল দোতলা বাড়ি -
সামনের দেয়ালে পলেস্তরা পড়েনি যার।
একটা জানালা -
সবসময় কবাটহীন দাঁত বের করে ভেংচি কাটছে।
আম কাঠের দুই পাল্লার দরজা।
বাড়ির সামনে একটা আতা গাছ ছিল।
বড় বড় গোল আতা ঝুলে থাকত।
খুব মিষ্টি ছিল খেতে।
এই বাড়িটাই ছিল নাদেরের, মানে ওর বাবার।
নাদের আমার বন্ধু ছিল।
আপনার মনে নেই? কি আশ্চর্য...!
ওর বাড়িতেও তো আপনি গিয়েছেন।
দাবা খেলেছেন ওর বাবার সাথে, রিটায়ার্ড কেরানি আবুল হাসনাত।
নাদেরকেও আপনি দেখেছেন।
ভাল করে মনে করে দেখুন তো।
লম্বা, কালো মতন ছেলেটা।
ওর মা বলত শ্যামলা। আসলে কালোই ছিল।
সামনের দাঁতগুলো উঁচু, তাতে কালচে ছোপ ধরা।
খুব সিগারেট খেত ও। তাই এই দাগ।
নাদের দাড়ি রাখত। আবার কেটেও ফেলত।
শুধু গোঁফটার ঝুল ঠোঁটের কোণ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
আমরা বলতাম শিয়ালের লেজ।
এই ছেলেটাই নাদের।
আমার বন্ধু।
কি হলো? এখনও মনে পড়ছে না?
চেষ্টা করুন, চেষ্টা করুন। মনে পড়বেই।
নাদেরকে কিভাবে ভোলা যায়?
নাদের ছিল মুক্তিযোদ্ধা।
আরে...
ওই তো পুরান ঢাকার গেরিলা টিমটার লিডার ছিল।
ইত্তেফাক অফিসের সামনে একবার আর্মি ট্রাক উড়িয়ে দিল।
আরেকবার পানির পাম্পটা।
মনে নেই? আমিই তো আপনাকে জানিয়েছিলাম।
তারপরই না আপনি দেখা করলেন ওর সাথে।
ওর বাড়িতে। সেই দিনটা।
ধরা পড়ল নাদের। রাজাকারদের কাছে।
যেদিন নাদেরকে আর্মিরা গুলি করে মারল,
পুরো পুরান ঢাকা ছিল অদ্ভুত রকমের থমথমে।
নাদেরর লাশটা কেউ পায়নি।
কিন্তু শার্টটা আমি পেয়েছিলাম।
কেউ পাঠিয়েছিল ওর বাবার কাছে।
অশক্ত, প্রায়ান্ধ সেই রিটায়ার্ড কেরানির কাছে।
ঠিক পাঁচটা গুলির ফুটো।
দু'টো বাঁ দিকের বুক পকেটের ওপরে।
বাকিগুলো এলোমেলো, পেটের কাছটায়।
বারুদে পোডা কালচে গুলির গর্তগুলো।
আজও শার্টটা আমার কাছে আছে।
রক্তে লাল।
তাই নাদেরকে যখন কেউ চিনতে পারে না,
আমার মাথায় মনে হয়
পাঁচটা গুলি করেছে কেউ।
লাল একটা শার্ট দেখি চোখের সামনে।
পাঁচটা ফুটো তাতে।
আর দেখি
একটা কালো রঙের রাইফেল।
যাতে গুলি আছে পাঁচটা।
#মৌনতাড়না
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মে, ২০১৭ সকাল ১১:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



