somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গত ২৭ সেপ্টেম্বর প্রয়াণের পর অাজ ২৭ ডিসেম্বর, সৈয়দ হকের জন্মদিন

২৭ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ বিকাল ৩:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




'এই শীতসকালে একেবারে পেছন ফিরে তাকাতে বলছো?...শীতের মাস। এই শীতের ভেতরে কুড়িগ্রামের কথা মনে পড়ে। ঘন কুয়াশা, কী শীত কী শীত! হিমালয় তো খুব কাছে। আর বরফ পড়ে না বটে কিন্তু ভোরবেলাতে ঘাসের ওপর শিশির জমে কাচের মতো প্রায় স্বচ্ছ হয়ে যায় এবং সেই শিশির বোধ হয় কাচের মতো নিরেট কাঠিন্য থাকে। হাঁটলে পায়ের নিচে মর্মর মর্মর করে সেই জমাট শিশির ভেঙে যায়। সেটি মনে পড়ে। মনে পড়ে বাবার সঙ্গে বেরিয়ে ভোরবেলায় হাঁটতে হাঁটতে ধরলা নদীর পাড় পর্যন্ত যেতাম, ফুল কুড়োতাম, কচুর গুঁড়ি নিয়ে আসতাম, শিউলি ফুল নিয়ে আসতাম মায়ের জন্য। কেন? ওই শিউলির বোঁটা, মা ওগুলোকে শুকোবেন। শুকিয়ে পায়েসে যাবে, পোলাওতে যাবে, রং হবে। গরীবের ঘরে আর জাফরান কোথায়? ওই শিউলির বোঁটাই খাবারের রং। আমি কিন্তু একেবারেই নিন্মমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। খুব কষ্টের ভেতর দিয়ে দিন গেছে। বিশেষ করে আমার মনে পড়ে ১৯৪৩ সাল, পঞ্চাশের মন্বন্তর। ওই সময় আমার বয়স সাত সাড়ে সাত। সেই সময় একবেলা খাচ্ছি, লঙ্গরখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেখছি নিরন্ন অনাহারী শীর্ণ কঙ্কালসার মানুষ সারি দিয়ে বসেছে। এক খাবলা খিচুড়ি পড়ছে কলার পাতে। তাই কি গোগ্রাসে খাচ্ছে এবং তার ভেতর থেকে বাঁচিয়ে মুড়ে আবার রেখে দিচ্ছে যে পরের বেলা খাবে। এ বেলা না হয় আধাপেটাই খেলাম। আমি চিন্তা করি আমার বাবার না জানি কত কষ্ট হতো, আমার মায়ের বুক ভেঙে যেত যে সন্তানের মুখে দুবেলা দুটো ভাত গুঁজে দিতে পারছেন না। ছোট ছোট আলু হতো, বড়ির মতো— সেই আলুসেদ্ধ, ছোলাসেদ্ধ কোনোরকমে খাচ্ছি আরেক বেলা ফেনাভাত একটুখানি, তাও ভরপেট নয়।'_এক শীতসকালে, কথায় কথায় বলছিলেন সৈয়দ শামসুল হক, তাঁর গুলশানের বাসায় বসে। শীতের সাতাশ তারিখে তাঁর জন্মদিন। শীতের অাবার ২৭ তারিখ হয় কীভাবে? শীত তো ঋতু, মাস নয়। অাসলে শীত বলতে ডিসেম্বর, শীত বলতে সেকালের শীত। সেই শীত এখন অার পড়ে না। অাজকের মানুষ 'মন্বন্তর' শব্দটি ঠিক কী অর্থ করে, জানে কি?

অামি নিজেও জানি না, 'মন্বন্তর' দেখতে কেমন? মন্বন্তরের হাড্ডিসার মানুষের কঙ্কাল এঁকেছিলেন জয়নুল অাবেদিন। শিল্পী জয়নুল বা পরে উপাধি পাওয়া শিল্পাচার্য জয়নুল অাবেদিনকে লেখক সৈয়দ শামসুল হক কাছে পেয়েছিলেন, ভীষণ শ্রদ্ধা করেছেন তাঁকে। সৈয়দ হকে কাব্যনাটক 'ঈর্ষা'তে দেখলাম সৈয়দ হক কীভাবে জয়নুলকে অনুভব করেছেন। 'ঈর্ষা'র মধ্যে দেখলাম জয়নুল চরিত্রটি রচনা করেছেন সৈয়দ হক এমনভাবেই যে, সেখানে চিরকালের এক শিল্পীর পিপাসা, পিপাসা অপূর্ণ থাকার বাক্যময় অার্তনাদ ছড়িয়ে দিয়েছেন। লক্ষ করলাম, 'ঈর্ষা'তে সৈয়দ হক যখন জয়নুলকে অাঁকছেন মঞ্চে, চরিত্রের মাধ্যমে, তার মধ্যেও সমানুপাতিকভাবে দাঁড়িয়ে অাছেন হক নিজেও। গত ২৭ সেপ্টেম্বরে সৈয়ত হক অামাদের ছেড়ে চলে গেলেন। অামি 'প্রাঙ্গণে মোর' প্রযোজিত অনন্ত হীরা নির্দেশিত 'ঈর্ষা' দেখলাম হকের চলে যাওয়ার পর। অাহ, 'ঈর্ষা' নিয়ে সৈয়দ হকের সঙ্গে অামার কত কথা হতে পারত, যদি নাটকটা অামার অাগে দেখা থাকত! হকের ক্ষমতা অামি অামি অারেকবার দেখলাম।

সত্যি, হক ক্ষমতাবান। হক মনে মনে নিজের কাছে চেয়েছিলেন ১১৬ বছর। লালন পেয়েছিলেন ১১৬। হক তা পাননি। হক চলে গেলেন ৮২ তেই। হকের প্রস্থানের পর, অাজ, ২৭ ডিসেম্বর; প্রস্থানের পর প্রথম জন্মদিন। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের জন্মদিনে অাজ তিনি শারীরিকভাবে অনুপস্থিত অাছেন। গতকাল লেখকের জীবনসঙ্গিনী লেখক ও ডাক্তার অানোয়ারা সৈয়দ হকের সঙ্গে দূরালাপনে এসব কথা শেয়ার করছিলাম। হকের বিদায়ের পর অানোয়ারা সৈয়দ হক, অামাদের ভাবি এবং অামি তাকে যশোরের মানুষ বলে অানােয়ারা অাপা বলেই ডাকি। লেখালেখির ভেতর দিয়ে এলেও একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক অামাদের, তাই হক ভাইয়ের চলে যাওয়ায় পারিবারিক বেদনায় জড়িয়ে গেছি।

সৈয়দ হক এদেশের লেখকদের মধ্যে সম্ভবত প্রথম কম্পিউটার ব্যবহার করে লেখা লেখক। তাঁর ফোনেও থাকত অানসারিং মেসিন। ফোন করলে মেসিন বলত, 'দিস ইস সৈয়দ শামসুল হক স্পিকিং...'। একদিন কথায় কথায় সদা সর্বদা তারুণ্যে প্রবাহিত, হাতে ব্রেসলেট, পরনে জিন্স পরা সৈয়দ শামসুল হককে বললাম, ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলবেন না হক ভাই?

তিনি হাসলেন। বললাম, ল্যাপটপ-টিভি-মোবাইল মনিটর_এগুলোর রোল-প্লে কি লেখার জন্যে ক্ষতিকর হয়ে পড়ছে?' হক সোৎসাহে বলছিলেন, 'আমি জানি। এমন প্রশ্নের সঙ্গে আমি পরিচিত। লোকজন যাই বলুক না কেন, আমি মনে করি না যে সেক্ষেত্রে আমাদের বিচলিত হওয়ার কিছু আছে। প্রযুক্তির একটা বিপ্লব ঘটে গেছে। কোনো কিছু নতুন নতুন হলে যা হয় এক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে। বই বই-ই থাকবে, পড়ার অভ্যাস পড়ার অভ্যাসই থাকবে। এখনো তো বই পড়েই লেখাপড়া শিখতে হয় শিশুকাল থেকেই। এই যে কবিতার কথা বলো, অনেকে বলে যে কবিতা কি থাকবে? আরে, একটা বাচ্চাকে আমরা প্রথম কী শেখাই? কবিতা শেখাই। একজন অতিথি এলে বলি, বাবা একটা কবিতা বলো তো, মা একটা কবিতা তোলো তো। ফলে আমি তো দেখি যে ওখানে এখনো কবিতার কাজ রয়ে গেছে। এখনো যারা প্রেমে পড়ছেন বই কিনে প্রেমিকাকে কবিতা শোনাচ্ছেন, বই উপহার দিচ্ছেন। এই যে কবিতাও একটি কাজে লেগে গেছে। বই পড়া— বই পড়তে সবচেয়ে কম আয়োজনের দরকার হয়। এর জন্য ব্যাটারি লাগে না, ইলেকট্রিসিটি লাগে না। তুমি পড়ছো, ব্যাক নাই ফরোয়ার্ড নাই; ইচ্ছামতো তুমি পড়তে পাচ্ছো। এবং তুমি যে কথা বলছো সেই কথাগুলো কে কিভাবে একজন ব্যবহার করেছে এ একটা আলাদা আনন্দ, এটা একটা আলাদা মজা। এটি হাজার হাজার বছর টিকে আছে। তখন হয়তো আজকের মতো ছাপা কাগজে বই ছিল না। কিন্তু পাথরের ফলকে, পোড়ামাটির ফলকে, পশুর চামড়ায়, ধাতব পাতের ওপরে লিখেছি, তালপাতায় লিখেছি। এই যে লিখিত যে ভাবনাচিন্তাগুলো রেকর্ডেড থটস, দি রেকর্ডেড ইমাজিনেশন এটার বিকল্প আমার মনে হয় না যে টেলিভিশন বা ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মোবাইল ফোনের স্ক্রিন। এগুলো দিয়ে কি হয়? এগুলো দিয়ে হয় না। প্রযুক্তিতে মেতে ওঠে এখন হ্যাঁ যে ছেলেটি যে মেয়েটি, ত্রিশ বছর আগে বিশ বছর আগে একটা বই নিয়ে বসতো; সে হয়তো আজকে ল্যাপটপ খুলে দেখছে কিছু একটা করছে। সময়টা বই-য়ে না দিয়ে অন্য কিছুতে দিচ্ছে কিন্তু এটা কেটে যাবে। যেকোনো প্রযুক্তি বিপ্লবেই এটি হয়। প্রথম প্রথম খুব মেতে ওঠে, খুব মাতোয়ারা হয়ে যায়। এই যে নতুন নতুন বিয়ে করলে যেমন হয়— সারাক্ষণ তুমি আমি চলছি, তারপর যখন ওই জিনিসটা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে তখন ঘোর কেটে যায়।'

২০১১ বা ১২ সালে অামি যে প‌্যান্ট পরে হকের সামনে বসে কথা বলছিলাম, তাতে দুইপায়ের হাঁটুর ওপরের জায়গায় অারো দুটো পকেট। হক ভাই বললেন, 'ওরকম কার্গো প‌্যান্ট অামি পরেছি ৬৪ সালে। করাচি থেকে কেনা। ঢাকায় নতুন। বুঝেছ?'

কবিতা নিয়েই কথা অামার হতো বেশি। কিন্তু সৈয়দ হক যেহেতু সব্যসাচী লেখক, টোটাল অার্টই তার প্রাঙ্গণ। অামার সেটা ভাল্লাগে। অামার সিনেমা-চিত্রকলা-ভাস্কর্য-নাচ-গান পছন্দ। সৈয়দ হক এ-সবই করেছেন নিজে। কথায় কথায় কবিতা ঢুকে পড়ে। হক বললেন, কবিতাটা হচ্ছে একেবারে অন্তর্গত একটা স্বর। যেমন ধরো, আমার কবিতার ভেতর চার রকমের বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাবে। একটা হচ্ছে নস্টালজিয়া, আরেকটা স্মৃতিমেদুরতা। কাতরতা বলব না; আবার কিছু রচনা আছে নর-নারীর সম্পর্ক। সেটা প্রেম, দয়া, করুণা, স্নেহ, প্রেমিক-প্রেমিকা, সন্তান-জননী, বিরহ-বন্ধুত্ব, বিরহ-বিচ্ছেদ, মিলন-সম্ভোগ_ সমস্ত কিছুকেই আমি অনুভব করে তা প্রকাশ করতে চেয়েছি। আরেকটি বিষয় হচ্ছে দেশ। আমাদের যুদ্ধ, আমাদের সংগ্রাম। আমাদের ভাষা নিয়ে যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের ভেতর পাওয়া, দেখা। তারপরে বর্তমান যে বিপর্যয়গুলো দিয়ে এই ৪২ বছর পেরিয়ে আসছি, সেগুলোকে আমি ধরবার চেষ্টা করেছি কবিতায়। যখন আমি দেখি, যেমন রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা ছিনতাই করে স্বৈরশাসক এদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে বিকল এবং বিকৃত করতে চেষ্টা করেছে, তখন আমি একটা তির্যক কণ্ঠে উচ্চারণ করেছি_ 'ফিরে আসো বাংলাদেশ। কোথায় যাচ্ছ তুমি ধেই ধেই করে পাছার কাপড় তুলে নাচতে নাচতে।'

কথা প্রসঙ্গে, হকের কথা, একদিন বলছিলেন, 'দেখো, আমি কিন্তু প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছি। প্রতিদিন যখন নতুন করে চোখ মেলি, তখন মনে হয়, আমি এই প্রথম চোখ মেললাম। এই দৃষ্টি মানুষের দিকে, সময়ের দিকে, আমার নিজের দিকে, পরিবারের দিকে, আমার মানুষগুলোর দিকে, আমার দেশের দিকে, আমার ইতিহাসসহ সবকিছুর দিকে। আর লেখার কাজটা কিন্তু কোনো শৌখিন কাজ নয়; এটা এক ধরনের মজদুরি।'

অার্টের শাখা-প্রশাখায় অামরা বিস্তীর্ণ হতে চেয়েছি, হক বললেন, 'কিন্তু তারপরও বলবো, কবিতাই হচ্ছে ভাষার সর্বোত্তম সর্বোচ্চ এবং সবচেয়ে সাংকেতিক ব্যবহার। সেটি আমি যখন করি বা সেটি যখন কেউ খুব সফলভাবে করেন যিনি অন্য মাধ্যমে কাজ করছেন তিনিও মূলত কবি, প্রধানত একজন কবি। তার সেই কবিসত্তা থেকেই উৎসারিত হয় সবগুলো মাধ্যমের দিক।

'হয়তো তিনি হতে পারেন একজন ভাস্কর, তারপরও তিনি কবি?

হক বলছিলেন, 'হ্যাঁ, তারপরও। তবে ভাস্কর্য বা চিত্রকলার কথাই যদি বলি সেটা কিন্তু ভাষা থেকে একেবারেই ভিন্ন একটি মাধ্যম। কিভাবে? এটি আমরা দেখি, চোখে দেখি। আবার ভাস্কর্য দেখো ঘুরেফিরে দেখতে হয়। এটার কিন্তু একটা কোনো দৃষ্টিকোণ নেই, দৃষ্টিপথ নেই। আবার আঁকা ছবিতে তুমি একটি দ্বিমাত্রিক ছবির সামনে দাঁড়াচ্ছো এবং একবারে নিচ্ছো। একটা কবিতা তোমাকে প্রথম থেকে শেষঅব্দি পড়ে তবে ভেতরে নিতে হচ্ছে। কিন্তু ছবি, একবারেই আমার সামনে চলে আসছে, এক দেখাতেই। এবং তারপর আমি বিশেষভাবে দেখি। এবং সেইখানে হচ্ছে ওই সৃজনশিল্পী ওই চিত্রকরের বিশেষ শক্তির পরিচয় যে তিনি আমার চোখটাকে কিভাবে ভ্রমণ করাচ্ছেন সমগ্র ছবিটাতে। এটা কিন্তু আলাদা কাজ। আমি নিজে যে অবসরে ছবি আঁকি, আমার আপন আনন্দে ছবি আঁকি, সেখানে আমার ভেতরের কিছু রং আমার ভেতরের কিছু বিন্যাস মনের ভেতরে আসে।'

সত্যি, হকের প্রস্থানের পর, ঢাকায় অামি এরকম অারেকজনকে পাচ্ছি না, যার সঙ্গে টোটাল অার্ট নিয়ে মুখোমুখি হওয়া যায়। এইখানেই সৈয়দ হক অালাদা, ক্ষমতাবান সৃজনকার। অালাপের মধ্যে জগৎপ্রজ্ঞার ব্যাপ্তি যেমন অাসে, অাসে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাতাবরণও। খুব ভালো লাগত। হক ভাইয়ের প্রস্থানের পর প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও তাঁর প্রসঙ্গে কিছুটা সময় অামার যায়-ই। এবং হকের প্রয়াণের পর সেটা খুব মিস করি, করছি। অাজ জন্মদিনে তাঁকে অারো মিস করছি। এই মিসিং বোধটা অামার হয়তো সারাজীবনই থাকবে।

জন্মদিন প্রসঙ্গে অারেকটু স্মৃতিচারণায় যাই। হক ভাই একদিন বলছিলন, 'আমার বাবা ছিলেন মফস্বলের ডাক্তার। সাইকেলে চড়ে রোগী দেখতে যেতেন দূর-দূরান্তে। ১০ মাইল ২০ মাইল দূরে রোগী দেখতে চলে যেতেন। সারাদিন পরে আবার ফিরে আসতেন। আর আমার জন্মের কথা তো আগেও বলেছি। বাবা সেদিনও রোগী দেখতে বেরিয়েছেন। ফিরতে অনেক রাত হয়েছে। এদিকে অকালে প্রায় পৌনে আট মাসে আমার জন্ম। মায়ের ব্যথা উঠেছে। বাবা অনেক রাতে বাড়ি ফিরে দেখেন মা কাঁদছেন। তার প্রসব ব্যথা। বাবার হাতে শেষ রাতে আমার জন্ম হয় এবং সেই রাতটা ছিলো ২৭ রমজানের রাত। শবে কদরের রাত। সেই রাতে বাবার হাতে আমার জন্ম। এই দিক থেকে এটা আসলেই অন্যরকম। আর আমার ডাক নাম ছিলো বাদশাহ।'

বললাম, 'আপনি তো আসলে বাদশাহ-এর মতোই রাজত্ব করেছেন!'

সৈয়দ হক হা হা করে হেসে উঠলেন। বললেন, 'শোনো, এই নামটি রেখেছেন আমাদের পাশের বাড়িতে থাকতেন নজির হোসেন খন্দকার নামে একজন উকিল। তিনি মুসলিম লীগের একজন নেতা ছিলেন। মেম্বার অব পার্লমেন্টও হয়েছিলেন স্ত্রী। তাঁর স্ত্রী এসে আমায় প্রথম কোলে নেন এবং বলেন, 'এত বাদশাহ আপনার কোলে এসেছে।' তিনিই আমার নামটি রাখেন। সেই ভদ্রমহিলা আবার কবিতাও লিখতেন।'

নানাভাবেই তাকে পেয়েছি। অগ্রজে, বন্ধুত্বে পেয়েছি। রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বিস্তীর্ণ স্রোত সৈয়দ শামসুল হক। চোখ ছিল দাঁর দিগন্তে, বাংলার জনপদের দিকে। একদিন বললেন, 'হ্যাঁ, আমি ব্রহ্মপুত্রকে বলেছি_ তুমি মহর্ষি। তুমি আমাকে প্রণোদনা দাও। আমাকে পাল্টে দাও। তুমি আমাকে বলো আমার পিতামহ-পিতামহী, প্রপিতামহ-প্রপিতামহী বা তারও আগে যারা ছিলেন তারা কীভাবে জীবনযাপন করেছেন। আমার পিতামহীর হাতের ব্যঞ্জনের কথা আমাকে স্মরণ করিয়ে দাও। আমার পিতামহীর উচ্চারণের কথা আমাকে স্মরণ করিয়ে দাও। এবং এটা বলছি তখন, যখন দশ লক্ষ ধর্ষিতার আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ছেয়ে গেছে। যখন আমার যা কিছু অর্জন তাকে ফুটবলের মতো লাথি মেরে লোকে মাঠে মাঠে খেলছে। সে পরিস্থিতিতে আমি নতজানু হয়ে দাঁড়াচ্ছি ব্রহ্মপুত্রের কাছে। কবিতায় এই ব্রহ্মপুত্রকে আমার প্রশিক্ষক, আমার প্রেরণাদাতা বলেছি। আমার ইতিহাসের নির্দেশক হিসেবে কল্পনা করেছি। আবার এই দেশকে আমি ১৩ শত নদীর দেশ বলেছি। এটা এখন অনেকেই ব্যবহার করে। এটা আমার কোনো বাস্তবিক পরিসংখ্যান নয়; কাব্যিক পরিসংখ্যান। এমন নানাভাবে কাজ করে চলেছি। দেখা যাক কী হয়। এর ভেতর আবার স্মৃতিমেদুরতার কথাও বলেছি। পড়ে দেখো আমার 'বাল্যপ্রেম কথায়'। আবার 'পরানের গহীন ভেতর-এ'। আঞ্চলিক ভাষায় পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছি যে, মায়ের সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলতাম, সে ভাষা থেকে আমি কাব্যের স্বর আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছি। আবার 'বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালা'য় আমাদের সেই ৫০ এবং ৬০-এর দশকে আমার সমসাময়িকদের কারও উত্থান, কারও পতন, কারও ভাঙন, কারও ঠিক রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা এসব ধরবার চেষ্টা করেছি। এমন নানাভাবে কাজ করেছি।'

প্রয়াণের পর অাজ প্রথম জন্মদিনে হক ভাইয়ের একটি কথা দিয়েই ইতি টানছি এ লেখার। লেখকের অমরত্ব নিয়ে একদিন কথায় কথায় তিনি বললেন, ' আমার খেলা মহাকালের সঙ্গে, ব্যক্তির সঙ্গে নয়— তিনি যত বড়ই হোন। তিনি শেকসপিয়র হন কি কালিদাস হন কি রবীন্দ্রনাথ হন, বার্ল্টড ব্রেশট হন, কি তলস্তয় হন— আমার খেলা হচ্ছে মহাকালের সঙ্গে। সেখানে আমি এবং মহাকাল; আমরা একটা বিশাল সমুদ্রতীরে বসে গোধূলিলগ্নে— গোধূলি মানে ভোর কিংবা সন্ধ্যা দুটিই হতে পারে বাংলা ভাষায়— সেই রকম একটি আলোছায়ার ভেতরে আমরা বসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। দেখি মহাকাল আমাকে বিলীন বিলুপ্ত করতে পারে কি না...'

২৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, ঢাকা
















সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ বিকাল ৪:১৩
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×