somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মাসুক হেলালের 'মুখ ও মুখোশ' গ্রন্থাকারে প্রকাশিত

১২ ই মে, ২০১৭ ভোর ৪:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মাসুক হেলালের 'মুখ ও মুখোশ' গ্রন্থাকারে প্রকাশিত
টোকন ঠাকুর


গতশতকের অাশির দশক এমনকি নব্বুই দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত 'দৈনিক বাংলা' হাউস থেকে প্রকাশিত 'অানন্দ বিচিত্রা'ই ছিল দেশের প্রধানতম বিনোদন ম্যাগাজিন। অামরা পড়তাম, ঢাকার বাইরে বসে। 'অানন্দ বিচিত্রা' ছিল অার্ট কলেজ থেকে পাশ করা এবং ১৯৭১ সালের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাৎ চৌধুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক 'বিচিত্রা'র সহযোগী পাক্ষিক প্রকাশনা। শাবানা, ববিতা, সুচরিতা, রাইসুল ইসলাম অাসাদ, সুবর্ণা মুস্তাফা, হুমায়ুন অাহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, অাফজাল হোসেন...মূলত টেলিভিশন-সিনেমার লোকেদের সৃজনকর্ম-জীবনকাহিনী-গসিপিং ছবিসহ ছাপা হতো 'অানন্দ বিচিত্রা'র পাতায়। অামাদের বালকবেলার পুরোটা জুড়েই তো উন্মাতাল অাশির দশক, পাড়ার বড় ভাইদের জেনারেল এরশাদ বিরোধী অান্দোলন, গান, গল্প-কবিতা-অাবৃত্তি-পথ নাটক-মঞ্চ নাটক, ছবি অাঁকা, দেয়ালে দেয়ালে পোষ্টার-চিকা...অার এর মধেও রাজ্জাক-কবরী, অাল মনসুর, লুৎফুন নাহার লতা, অঞ্জু ঘোষ, হাশেম খান, রফিকুন নবী, কাইয়ূম চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ুন অাজাদ, সেলিম অাল দীন, অাবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, ফরহাদ মজহার, অাহমদ ছফা, এসএম সুলতান, বিড়ি-সিগারেট, শ্মশানঘাটে রাত্রিবেলায় একটা-দুইটা পুরিয়া, মাঝেমাঝে কম দামের পানি খাচ্ছিলাম এবং মফস্বলে বসেও ঢাকার দিকে নজর রাখছিলাম। অনেক কিছুর মতো চম্পা-শম্পা রেজার দিকেও বা বলা যায় বিনোদন ম্যাগাজিন বলতে 'অানন্দ বিচিত্রা'র দিকেও যে নজর রাখছিলাম, সেই কারণেই, সেই মিড-এইটটিজ মানে অামাদের মহান ইচড়েপাকা সোনালি বালকবেলা থেকেই অামরা, অামরা মানে এই অামি বা অামার বন্ধুরা, তাকে চিনি। তাকে বলতে সেই অার্টিস্টকে। অার্টিস্টের নাম মাসুক হেলাল। তখনকার তরুণ তারকাদের পোর্ট্রেট অাঁকতেন মাসুক হেলাল। হয়তো অাঁকলেন তরুণ অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদীর 'বর্তমান' (এই 'বর্তমান' বলতে অাশির দশক) বয়েসী মুখ এবং হুমায়ূন ফরিদীর যখন ষাট-পয়ষট্টি বছর বয়স হবে, তখনকার কল্পিত বৃদ্ধ ফরিদীর মুখ। মাসুক হেলালের অাঁকানো একই তারকার তরুণ ও কল্পিত বৃদ্ধ মুখ বা পোর্ট্রেট পাশাপাশি ছাপা হতো 'অানন্দ বিচিত্রা'র পাতায়। সেই সঙ্গে শিল্পীর লেখা কিছু একটা থাকত সেখানে, ছো্ট্ট গদ্য। অামরা পড়ে ভারি মজা পেতাম। তখন তো অার ব্যক্তিগত মাসুক হেলালকে চিনতাম না, মাসুক হেলালও একজন তারকা শিল্পী। তারপর সেই 'অানন্দ বিচিত্রা'যুগ পার হয়ে গেল। মিডনাইনটিজে তো পাক্ষিকটা দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রা'র সঙ্গে বন্ধই হয়ে গেল। কিন্তু মাসুক হেলালের অাঁকাঅাঁকি তো অার বন্ধ হবার নয়, বইয়ের প্রচ্ছদ করে যাচ্ছেন তিনি শতসহস্র,সিনেমায় শিল্প নির্দেশনা দিয়েছেন। অাঁকার মাধ্যেমে ছোট ছোট করে নিরীক্ষায় তার হাতে সক্রিয় অাছে।

পরবর্তীতে শেখ রেহানা সম্পাদিত সাপ্তাহিক বিচিত্রা'তেও তিনি কাজ করেছেন সাংবাদিক বেবী মওদুদের সঙ্গে। কিন্তু মাসুক হেলাল ঠিক তার 'অানন্দ বিচিত্রা'র সৃষ্টিশীল ভঙ্গিটা যেন ফিরে পাচ্ছিলেন না। বাংলা দৈনিক প্রথম অালো'তে এখন কাজ করছেন মাসুক হেলাল। অাবার দেখছি তিনি ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন, বাঁক নিচ্ছেন। কাগজটিতে সুন্দর সুন্দর অলঙ্করণের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন্ সময়ে দেশের প্রত্যন্তের কোনো সাধারণ মানুষের মুখ এঁকেছেন, সেই মানুষটার সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্প করেছেন, সেই গল্প টুকে নিয়ে লিখে তার অাঁকা মুখটা দৈনিক প্রথম অালোতে ছাপা হয়ে অাসছে দীর্ঘদিন ধরে। এরকম মুখের অাঁকানো প্রতিকৃতি ও গল্প প্রকাশিত হয়েছে তার অসংখ্য। ড্রইংবেইজড সেই অসংখ্য পোর্ট্রেটের গল্পগুলো বাছাই করে প্রকাশিত হয়েছে যার প্রচ্ছদে ছাপা অাছে 'বাছাই, মুখ ও মুখোশ' 'অাঁকা ও লেখা মাসুক হেলাল'। ড্রইং দিয়েই যে কীভাবে একটি মুখের ভাষা ধরা যায়, তা দক্ষ হাতে এঁকেছেন শিল্পী মাসুক হেলাল। খুবই সৃদৃশ্যমানের, ভালো কাগজ-ছাপা-বাঁধাই হয়েছে 'মুখ ও মুখোশ' গ্রন্থটির। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী অাফজাল হোসেন। বইটার একটা চমৎকার ভূমিকা লিখেছেন শিল্পী রফিকুন নবী। ফ্ল্যাপের ছোট্ট লেখাটি লিখেছেন শিল্পী ধ্রুব এষ। মাসুক হেলালও শিল্পীর বংশধর।

'মুখ ও মুখোশ' অাঁকা-লেখাগ্রন্থের কনটেইন্টও খুব মজার। যেমন, 'রমিজ রওশনের নাটুকে জীবন' 'সুরত অালীর চপ-বেগুনি' 'পথের মানুষ রেবেকা' 'রাশেদ রানার প্রেম' 'মসলা পেটেন মমতাজ নূরী', নাগরিক নাওয়ের মাঝি' 'পালাগানের শিল্পী শেফালি' পাখিওয়ালা ফিরোজ মিয়া' 'গেটলক বাসের চালক রকিব' 'শাখাশিল্পী নারায়ণচন্দ্র ভদ্র' 'রাহেলা বেগমের পইখ-পাখি' ...এই রকমের একশো ত্রিশটা অার্কিটাইপো মানুষের অাঁকানো মুখ ও তাদের থেকে কুড়িয়ে নেওয়া জীবন্ত গল্প। এতে উঠে এসেছে একদম সহজ-সরল মানুষের জীবনের ছাপচিত্র। নিঃসন্দেহে মাসুক হেলালের এই বাছাই 'মুখ ও মুখোশ' ব্যয়বহুল গ্রন্থটি প্রকাশ করে পারিজাত প্রকাশনী একটি ভালো প্রকাশনা উপহার দিল অামাদের। যে কোনো গ্রন্থপ্রেমিকই উৎসাহী হবেন বইটি হাতে পেতে, পড়তে, দেখতে। ভালো পোর্ট্রেট অাঁকাতে চাওয়া তরুণ অাঁকিয়েদের জন্যেও বইটি সংগ্রহযোগ্য বলে বিবেচিত হবে দেখামাত্রই। অামি অবশ্য মাসুক হেলালের কাছ থেকে 'মুখ ও মুকোশ'এর এক কপি উপহার পেয়েছি ব্যক্তিগত সম্পর্কের বুনিয়াদে। তাই বলে তো প্রকাশক এই বই প্রকাশ করেই লাটে উঠে যেতে পারে না, সেদিকটাও দেখা দরকার।

এই সুদৃশ সাইজের বইটির ভূমিকায় লেখক-শিল্পী মাসুক হেলাল জানাচ্ছেন, 'অামার মা চোখে ভালো দেখতেন না। অামার 'মুখ ও মুখোশ' লেখাটি পত্রিকায় বেরুলে অামার বউ মাকে পড়ে শোনাতেন। অনেক সময় 'মুখ ও মুখোশ'-এর পাত্রপাত্রীদের বাসায় ধরে নিয়ে অাসতাম। তাদের ছবি অাঁকতাম, ইন্টারভিউ নিতাম। অামার মা খুব যত্ন-অাত্মি করতেন। খাওয়াতেনও। অামার বউ টাকা-পয়সা দিতেন। 'মুখ ও মুখোশ' বেরুচ্ছে অধচ মা নেই, বউও গেছেন তার পিছু পিছু। বাবা গেছেন তা্রও অাগে। অামার দশ বছরের মেয়ে চর্যা সারাদিন একা বাসায়। রাতে বাসায় গিয়ে দেখি তার মা'র জন্যে কাঁদতে কাঁদতে সোফায় ঘুমিয়ে অাছে। তোমরা থাকলে অার চর্যার জীবনটা এরকম হতো না। তোমরা ভালো থেকো।'

বাছাই 'মুখ ও মুখোশ' এর মূল্য ৫০০ টাকা। কমিশন অাছে হয়তো, অামি ঠিক জানি না। এ জাতীয় প্রকাশনাতে কমিশন রাখাও মুশকিল। প্রোডাকশন মূল্য বেড়ে যায়। অার্ট-গ্লোসি পেপারে ছাপা হওয়া 'মুখ ও মুখোশ' গ্রন্থের জনক শিল্পী মাসুক হেলালকে ধন্যবাদ, এমন সুন্দর একটি কাজ পাঠকের সামনে উপস্থাপন করার জন্যে। পরিশ্রমী ও ব্যয়বহুল কাজ। ধন্যবাদ পারিজাত প্রকাশনীকে। এবং শেষ ধন্যবাদ দেব, যারা বইটি সংগ্রহ করে অানন্দ পাবেন, তাদের, পাঠকের, দর্শকের...
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই মে, ২০১৭ ভোর ৪:৫০
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দেয়ালের ছবি আর বই এর পাতায় আধিপত্য দেখে ! অথচ বন্দর আর কড়িডোরের অসম চুক্তিতে সব শিয়ালের এক রা॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৭:১২


দেশ বিক্রির পরীক্ষিত ঠিকাদার....



দেয়ালের ছবি দেখলেই ভারতীয় আধিপত্য, আর বন্দর বেচে দিলে নীরবতা কেন?

দেয়ালে একটা ছবি আঁকা দেখলেই যাদের মুখে ফেনা উঠে যায় - "বাংলাদেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কিন সেনা কর্মকর্তা কর্মকর্তার মেজর নিদাল্ল হাসানের মৃত্যুদণ্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



নিদাল হাসান (পুরো নাম: নিদাল মালিক হাসান) হলেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর একজন সাবেক মেজর এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (Psychiatrist)।

২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে সংগঠিত এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×