somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

মাধ্যমিক শিক্ষার জরুরী অবস্থা, চাই দ্রুত ব্যবস্থা

১৯ শে জুন, ২০১৪ সন্ধ্যা ৬:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
ড. মঞ্জুরে খোদা


কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও বাস্তবতার ভিত্তিতে একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। বাংলাদেশের ‘পলিসি ডকুমেন্টেও’ সেই বিষয়ের পরিষ্কার উল্লেখ আছে। নানা রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও সমীকরণের মধ্যেও শিক্ষা উন্নয়নের প্রচেষ্টা লক্ষনীয়। প্রাথমিক, মাধ্যমিক এমনকি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও এই ধারা দৃশ্যমান। একটি ব্যবস্থার উন্নয়ন ও বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন ধরণের অসঙ্গতি দেখতে পাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু তা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে বা অব্যবস্থাপনাটা নিয়মের পর্যায়ে চলে গেলে তখন উদ্দেশ্যের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। আর যে প্রশ্নটি এখন ঘুরেফিরে আবার আসছে সরকার, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি এসএসসি’র ফলাফল প্রকাশিত হলো। গড়ে পাশের হার শতকরা ৯১.৪। গ্রেডিং পদ্ধতি চালু হবার পর এবং বাংলাদেশের ইতিহাসেও পাশের এই হার সর্বোচ্চ। এতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের মাঝে উৎসাহ ও আনন্দের ভাব ছিল। কিন্তু সেই উচ্ছাস সহসাই মলিন হয়ে যায়। যখন প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা মূল্যায়ন নীতি-পদ্ধতি, প্রশাসন ও শিক্ষা বাণিজ্যের সাথে যুক্ত একটি সংঘবদ্ধ চক্রের অনৈতিক কারবারের বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সস্তা রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা অর্জনের এই বিবেচনাকে কোন ভাবই মেনে নেয়া ও নির্লিপ্ত থাকার সুযোগ নেই। একটি বৃহৎ পাবলিক পরীক্ষার এই অনৈতিক ও অযৌক্তিক সাফল্যকে কি বুনিয়াদি শিক্ষার বড় বিপর্যয় বললে ভুল হবে? সঙ্গতই প্রশ্ন ও সন্দেহ দেখা দিয়েছে পরীক্ষা পদ্ধতি, মূল্যায়ন, ও শিক্ষার মান নিয়ে। শিক্ষার মান উন্নয়ন কেন গুরুত্বপূর্ন? কারণ, শিক্ষার মান নিশ্চিত হবার সাথে এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের প্রশ্নটি জড়িত। আর লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সাথে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি ও এগিয়ে যাবার বিষয়টি যুক্ত। তার সাথে একটি সরকারের সাফল্য ও জাতির ভবিষ্যৎ অন্তর্হিত স্বার্থ সম্পৃক্ত।

বর্তমান গ্রেডিং পদ্ধতি চালু হবার পর মাধ্যমিক পর্যায়ের ‘অতি মেধাবীদের সাফল্যের’ পরিসংখ্যান ও ইতিহাস খুব অবাক করার মত! এই পদ্ধতি চালু হবার পর ২০০১ সালে এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছিল মাত্র ৭৬ জন। ১৩ বছরের ব্যবধানে ২০১৪ সালে একই পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছে ১ লক্ষ ৪২ হাজার ২৭৬ জন। তারমানে মাধ্যমিক পরীক্ষার এই নতুন পদ্ধতি শুরু হবার পর জিপিএ প্রাপ্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১৮৭২ গুণ! এটা কি শিক্ষার মান উন্নয়ন বৃদ্ধির কোন নমুনা, না অন্য কিছু? পাশের হার/সংখ্যা বাড়ার দুইটা প্রক্রিয়া আছে প্রথমত. ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার মান উন্নয়ন, মানে লেখাপড়ায় অধিক মনোযোগী হওয়া ভাল ফল করা, দ্বিতীয়ত. শিক্ষাখেত্রে ও পরীক্ষায় অনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়া। প্রথমটি রাতারাতি হবার কোন সুযোগ নেই। কারণ এর জন্য যে মানের ও পর্যায়ের আয়োজনের দরকার হয় তার সামান্যই হয়েছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষন, বেতন-ভাতা, শিক্ষাখাতে বরাদ্দ, শিক্ষার পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধার অপযাপ্ততা ইত্যাদি। এই বিষয়ে ইতোমধ্যে পত্রিকায় প্রকাশিত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন থেকে জানা যায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় এই জিপিএ প্রাপ্তদের করুণ অবস্থানের কথা যা খুবই হতাশাজনক। উত্তরপত্র মুল্যায়নের শিথীলতা ও কৌশলগত নির্দেশনার কথাও জানা যায়। শিক্ষার গুণগত মান না বাড়িয়ে কেবল ফলাফলের হার বৃদ্ধির জনপ্রিয় প্রক্রিয়া শিক্ষার উদ্দেশ্যকে প্রশ্ন বিদ্ধ করবে।
শিক্ষার অন্য চিত্রটি আরও বেদনাদায়ক। এবার পরীক্ষার্থী ছিল ১০ লক্ষ ৮৭ হাজার ৮৭০ জন, পাস করেছে ১০ লক্ষ ০৮ হাজার ১৭৪ জন। পাশের হার ৯১.৪ শতাংশ। কিন্তু আমরা যদি আরও একটু পিছনে তাকাই তাহলে দেখব অন্যচিত্র। প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিল প্রায় ২৯ লক্ষ শিশু। তারমানে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত আসতে পেরেছে ১০ লক্ষ ৮৭ হাজার ৮৭০ জন আর ঝড়ে পড়েছে ১৮ লক্ষ ১২ হাজার ১৩০ জন। প্রায় দ্বিগুণ শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়েছে। এটি শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় দূর্বলতা ও হতাশার দিক।

এই আলোচনা আমার কাছে বেশ বাহুল্য মনে হয়। তাহলে কি হবে? প্রথমে আমাদের নীতি নির্ধারকদের নীতিগত সিন্ধান্ত নিতে হবে শিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতিকে আমরা “শিক্ষার জরুরী অবস্থা” মনে করি কি’না? এই প্রশ্নে যদি আমরা নীতিগত সিন্ধান্ত নিতে পারি তাহলে “সমাধানের কর্মপদ্ধতি” তৈরী করা খুব কঠিন কাজ হবে না। আমাদের দেশে অনেক চিন্তাশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই কাজ করার জন্য যথেষ্ট মনে করি। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বিশ্বের বৃহত্তম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থানার কাজটি কিছু কিছু করে এগিয়ে যাচ্ছে। বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেবার মত বড় চ্যালেঞ্জ যদি সাফল্যের সাথে সম্পন্ন হতে পারে। তাহলে এই কাজটিও করা সম্ভব।
এই আলোচনায় আমি তিনটি বিষয়কে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে অগ্রসর/কার্যকর করার কথা উল্লেখ করছি;
এক. নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত শিক্ষার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহন করা যা সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত
দুই. শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে প্রশ্নপত্র তৈরী ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা। এক্ষেত্রে এই ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজ করা ও প্রযুক্তির সাহায্য নেয়া গুরুত্বপূর্ণ
তিন. শিক্ষাখেত্রে নৈরাজ্য, অব্যবস্থাপনা ও দূর্ণীতি দমন ও নিয়ন্ত্রনে অধিক কঠোর আইন প্রণয়ন ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করা
শিক্ষামন্ত্রীর উদ্যোগে গত ১১ জুন শিক্ষামন্ত্রনালয়ে শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবিদের সমন্বয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীরা উপস্থিতি হয়ে শিক্ষার দূর্বলতা ও মান উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং পরামর্শ দিয়েছেন। ড. আনিসুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁস রোধে আমরা একটা রূপরেখা দিয়েছি। প্রশ্ন প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে সরকারকে বলা হয়েছে। এ ছাড়া কঠোর শাস্তির বিধান রেখে যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছেন সবাই।’ শিক্ষামন্ত্রীও বলেছেন, তারা সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করবেন এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে আর যাতে কোনো পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস না হয়, তা নিশ্চিত করতে সবার সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।’ উনার কথায় বিশ্বাস হারাতে চাই না, অন্তত আন্তরিকতায়। সময়ের জন্য রেখে দেই, সেই প্রশ্নের জবাব। আমাদের কেবল রাখতে হবে অব্যহত চাপ। সে কারণে এখানে নতুন করে কোন মতামত ও পরামর্শ দেয়াকে বাড়তি মনে করি। কেবলি অনেকের সাথে নিজের উগ্বেগের বিষয়টি বলছি এই কারণে যে, যতটুকু অর্জন তা যেন কোন ভাবেই সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতায় ধ্বংস না হয়।
মঞ্জুরে খোদা টরিক, লেখক, গবেষক, ইনস্টিটিউট অব পলিসি সাইন্স, জাপান।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনাটা কোথায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১০


ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

[মানুষ এতো দুষ্ট কেন? পুরনো কথা ভিডিও সহ ফেসবুকে এভাবে না ছাড়লে হয় না। ]

“আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন"

২৫ হাজার টাকার মজুরি আন্দোলন আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে- ভাল্লাগে!

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭


আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×