somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাদের প্রাইমারির দাদুস্যারেরা

০২ রা জুলাই, ২০১৫ বিকাল ৫:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের ক্লাসে লিখিনা নামে এক মেয়ে ছিলো । দাদু স্যার বলেছিলেন , আমি তোর বাবা হলে নাম পাল্টে শিখিনা করে দিতাম । তুইতো শিখিসই না । লিখবি কি করে ? স্কুলে এসেই বা কি করবি !
দাদু স্যারের হাসিমুখের গালিগালি শুনতেই লিখিনা প্রতিদিন সবার আগে ফার্স্ট বেঞ্চে এসে বসে থাকতো । লিখিনাকে আমরা এখনো শিখিনা বলেই ডাকি ।

দাদু স্যার মারা গেছেন প্রায় দশ বছর আর লিখিনা এখন পুরোদস্তুর সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট । রাস্তাঘাটে লিখিনার সাথে দেখা হলে লিখিনার গাড়ির ড্রাইভার আমাদের লম্বা করে পা ঠুকে সালাম দেয় আর আমরা এখনো সেই কতদিনের পুরোনো স্মৃতি নিয়েই হাসাহাসি করি । কিন্তু শেষটায় এসে দাদুু স্যারের জন্য কষ্ট হয় । অতি বৃদ্ধ একজন মানুষ আমাদের জন্য কি না করে গেছেন !

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বল্পশিক্ষিত হয়েও দাদুস্যার আমাদের ভেতরে যে আনন্দে থাকার শিক্ষা দিয়ে গেছেন তার কিঞ্চিত নিয়েই লিখিনা এখন হাসিমুখে রাষ্ট্র চালায় , সংসার চালায় ।

একটু বড় হয়ে হায়ার প্রাইমারিতে ছিলো জাফর দেওয়ান । শহীদ স্যার তাকে নাম দিলেন , জাফর নেওয়ান । বললেন , তুই কাউকে জীবনে কিছু দিয়েছিস প্রমান করতে পারলে তোর নাম দেওয়ান থাকবে । নইলে আজ থেকে তুই নেওয়ান । জাফর নেওয়ান ।

জাফর এখন বিশাল ব্যাবসায়ী । শহরে শহরে মোটর পার্টসের বিজনেস ওর । নিতে নিতে ওর অনেক বেশিই হয়ে গিয়েছে । সম্প্রতি এলাকায় একটা মসজিদ করে দিয়েছে । নিজের নামের স্বার্থকতা তৈরী করেছে । শহীদ স্যার বেচে থাকলে খুশি হতেন ।

আমরা প্রাইমারি স্কুলের বন্ধুগুলো সবাই যার যার মতো যার যার জায়গায় ভালোভাবেই বেচে আছি শুধু অপমৃত্যু ঘটেছে ছোটবেলার সেই অল্পশিক্ষিত প্রাইমারি শিক্ষকদের । প্রাইমারি ডিঙ্গানোর কিছুদিন পরেই তাদের বদলে আসলেন রাশভারি ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া শিক্ষকেরা । হাইস্কুলের শিক্ষিত জ্ঞানী শিক্ষকদের পাল্লায় পড়ে স্কুলে যাওয়াই প্রায় বন্ধ হয়ে গেলো আমাদের । দেওয়ান ব্যাবসায় চলে গেলো । আর আমি খাবি খেতে থাকলাম ।

এর প্রায় চারবছর পরে একবার অভিভাবক সমাবেশে আমার মা সারা জিলাস্কুলের শিক্ষকদের সামনে বললেন , আমার ছেলে বিগত দশটি বছর দশটি স্কুলে একদিন স্কুল ফাকি দেয়নি । সেই ছেলে আজ কিভাবে টানা দুমাস ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে ? কার দোষ ? আমার না আমার ছেলের ?

ফলশ্রুতিতে ক্লাসটিচারের বকুনি শুনতে শুনতে ওই ক্লাস পার করতে হলো আমাকে ।

কলেজ জীবনে এসে আর ক্লাসের বালাই নেই । শিক্ষকদের নামও জানতাম না । বাংলা ক্লাস করেছিলাম দুইটা । প্রথম ক্লাসে অরিয়েন্টেশন ছিলো । ক্লাসের মাঝখানে ঢুকেই দেখি সুন্দরি মতো এক ম্যাডাম সবাইকে ফুল দিচ্ছেন । আর দ্বিতীয় দিন একটু দেরি করে ক্লাসে ঢুকায় সবার সামনে দাড় করিয়ে জিজ্ঞেস করলেন , নাম কি ? নাম বলার পর জিজ্ঞেস করলেন , ইন্টারের বইয়ের নাম জানো ? আমতা আমতা করে বললাম , উচ্চ মাধ্যমিক বাংলা । সবাই হো হো করে হেসে উঠলো । আমি লজ্জিত হয়ে এক কোনায় বসে পড়লাম । পরে শুনলাম , ক্লাসটা ইংলিশের ছিলো ।
বলাই বাহুল্য , ওই ক্লাসে তৃতীয় দিনের জন্য আমার আর ঢোকা হয়নি । আর বাংলা ক্লাস ! আমি জীবনেও করিনি ।

মেডিকেলে এসে ক্লাস এটেনডেন্সের ভয় দেখিয়ে সকাল সাতটায় ক্লাস করানোর ক্ষেত্রে কলেজ কর্তৃপক্ষ কিঞ্চিত সফল হলেন । টানা পাঁচবছর সমৃদ্ধ ঝাকুনি খেলাম । কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিদায়ক্ষনে এসে একটা আফসোসই থেকে গেলো জীবনে । গ্রাজুয়েশনের বাংলাদেশে কোথায় সেই দাদু স্যার , কোথায় সেই শহীদ স্যার !!

দেওয়ান ব্যাবসায় জড়িয়ে পড়ায় তাকে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডিতে পা রাখতে হয়নি । আর লিখিনা আর্মিতে যাওয়ার কারনে তাকেও আর গ্রাজুয়েশন করতে হয়নি । লিখিনা আর দেওয়ান এই ঢাকা শহরে গ্রাজুয়েশন করতে আসলে অধিকাংশই তো দেওয়ান আর লিখিনার আসল নামটাও জানতে পারতেন না !!!

ভাগগিস , ওরা আসেনি ! বাংলাদেশের শিক্ষকদের ওরা দাদু স্যার আর শহীদ স্যার বলেই জানুক । :)
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুলাই, ২০১৫ বিকাল ৫:১১
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রিয় কন্যা আমার- ৯৪

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:৪১



ফারাজা তাবাসসুম খান-
আজ বুধবার, ৮ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। ইংরেজি ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০২৬। বহু আগে একটা বই পড়েছিলাম- 'আদর্শ হিন্দু হোটেল'। প্রধান চরিত্রের নাম- হাজারি ঠাকুর। সে বাস্তববাদী, সহজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওমীলীগকে সম্পর্কে কি আপনার মনে এখন কোনো পজিটিভ চিন্তা উঁকি দেয়?

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৬


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি মূলত চারটি বিষয়ের উপর মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।
প্রথমত, মানুষ মনে করে এ দলটি ক্ষমতায় থাকলে স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়। এটা খুবই সত্য যে ১৯৭১ সালে আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিরোনামহীন কবিতা-০৭

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৪

তোমাকে নিয়ে কক্সবাজারে
সমুদ্রের গান শোনা,
অথবা বান্দরবানের কোনো পাহাড়ের চূড়ায় উঠে
মেঘের ভেলায় হারিয়ে যাওয়ার
কত যে ইচ্ছে—স্ব-যত্নে পুষে রেখেছিলাম
মনের গহীনতম কোণে!

কোনো এক ঈদের পড়ন্ত বিকেলে—
অকারণ কাঁপা আঙুলে
একটি খুদে বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলাম
তোমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

হারানো বিজ্ঞপ্তি

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩১



অত্যন্ত দুঃখ ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানানো যাচ্ছে যে, গত প্রায় দুই বছর যাবৎ বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান, বিচার ও বিবেচনা - এই পাঁচজনকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একসময় তাঁরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কিন মাটিতে ‘আত্মঘাতী ভুল’- নাকি বদলে যাচ্ছে হিসাব?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:২৫


মার্কিন মাটিতে ‘আত্মঘাতী ভুল’- নাকি বদলে যাচ্ছে হিসাব?

শেখ হাসিনা কি ফিরবেন?
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কখনো কখনো একটি বৈঠকের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে- কোন বৈঠকটি হলো, কোনটি হলো না এবং কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×