somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জলের গান

০৬ ই জুলাই, ২০১৫ রাত ৮:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রক্তিম আকাশটাকে সাক্ষী রেখে দুহাতের আঙুল চেপে ধরা পথগুলো শেষ না হতেই একদিন মৃত্তিকা বলেছিলো , এটাই কি তোমার মৌনপাহাড় !
আমি হেসে ফেলেছিলাম , আরে না ! এটা কি পাহাড় নাকি ! এটা ট্যাংকি টিলা । এখানে নৈঃশব্দ নেই । এখানে মৌনতা নেই । মৌনপাহাড়ের নিঃসঙ্গতা বুঝতে গেলে তোমাকে পাহাড়ে নয় , সমুদ্রে যেতে হবে ।

আজ অনেকদিন ধরে মৃত্তিকার সাথে কোন যোগাযোগ নেই । মৃত্তিকা নিশ্চুপ হয়ে গেছে । মৃত্তিকা হারিয়ে গেছে । আমার জীবনে মৃত্তিকাও আজ এক মৌনপাহাড় ।

আজও গভীর রাতে মাঝে মাঝে লাফ দিয়ে উঠি । ভো ভো শব্দে লঞ্চের হর্নগুলো ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে চলে যায় । পাশের বিশাল লেকটার জলের শব্দ একেবারে কানের উপর এসে আছড়ে পড়ে । একবার ঘুম ভেঙে গেলে আজকাল আমার আর চোখ বন্ধ হতে চায় না । নিঃশব্দে জেগে থাকি আর নিঃসঙ্গতাকে কামড় দিয়ে ধরি ।

অনেকদিন আগে মংলায় গিয়েছিলাম এক পিকনিকে । স্কুলের বন্ধুদের সাথে । এই বিষন্ন শব্দটার সাথে পরিচয়টা আমার সেদিন থেকেই । গভীর সমুদ্রের মাঝখানে জাহাজগুলোর একেকটা চিৎকার যেনো নিঃসঙ্গ মানুষের হাহাকারের চেয়েও গাঢ় ।
এরও প্রায় চার বছর পরে খুলনা জিলা স্কুল থেকে এস.এস.সি পরীক্ষা দিতে গিয়ে সিট পড়েছিলো উদয়ন স্কুলে । পরীক্ষার হল থেকেই শোনা যেতো জেলখানা ঘাটের অসংখ্য লঞ্চ আর ভীড় করে থাকা কুলিদের চিৎকার । খুব টানতো । কি জানি , হয়তো অগোছালো জীবনের টান আমাকে সারাটাজীবনই এভাবে টানবে ।

হলের জীবনের বয়সটা আজ পার হয়ে গেলো প্রায় পাঁচটি বছর । এখনো বাসা থেকে এসে বাবা জিজ্ঞেস করেন , আগের অভ্যাসটা এখনো গেলো না । মশারি টাঙ্গাওনা কেনো ?
আমাকে জবাব দিতে হয় , আমার মশারি নাইতো বাবা ।
বাবা আর কোনো কথা বলেননা । ছেলের ভবিষ্যত নিয়ে আরেকবার আশাহত হন ।

রুমে আমার জন্যে বরাদ্দ সম্পূর্ন জায়গাটা জুড়েই যেনো অবিশ্বাস্য এক অভদ্রতার বসবাস । সারাটা বিছানা ছড়িয়ে আর জড়িয়ে উথালপাথাল বইপত্র আর কাপড়চোপড়ের ছড়াছড়ি । আর সোজা উপর দিকে তাকালে দেখা যাবে মাকড়সার জালের মহোৎসব । সেই তুলনায় টেবিলটা বরং একটু ভদ্র । ওখানে ধুলোর আস্তর ছাড়া বিশেষ কোন বাহুল্য নাই ।

পাচঁ বছর আগে নিজের বাসায় থাকার সময় কিন্তু পরিস্থিতি আরেকটু অন্যরকম ছিলো । রুমে কোন বিছানাই ছিলো না । এখন তো তাও সেটা হয়েছে । মেঝের উপর জাস্ট একটা মাদুর বিছিয়ে কাটানো বছরগুলো থেকে আমি একটুখানি সরেই এসেছি । তখন চারপাশে ছড়ানো থাকতো বিবিধ রকমের বস্তু । একটা টেবিল ফ্যান ঘুরতে থাকতো একেবারে মাথার পাশেই । আর থাকতো একটা রেডিও । মোবাইল ফোনের কোন বালাই ছিলো না । পড়ার বই বাদে হাজার রকমের বইয়ের স্তুপ জমে গিয়েছিলো পুরো ঘরে । হাটার জায়গার বড্ড অভাব দেখা দিয়েছিলো ।

কিছুদিন পরে আত্মীয়স্বজনের নানারূপ কটুক্তির কারনে রুমে তাদের প্রবেশটাই নিষিদ্ধ ঘোষনা করে দিয়েছিলাম । আর মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ হবার সাথে সাথে আলো বাতাস চলাচলও নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিলো । একটা মাত্র ভেন্টিলেটরই ছিলো আমার আস্তানায় আলো ঢুকবার একমাত্র রাস্তা ।

মা প্রতিবেলায় দরজার সামনে এসে একবার নক করে বলতেন , ভাত নাও । একটু ফাঁকা করে ভেতরে ভাতটা নিয়েই আবারো দরজাটা বন্ধ হয়ে যেতো । এভাবে অনেকগুলো বছর আর অনেকগুলো শহরের মায়া মাড়িয়ে নিলাম । কিন্তু কেনো যেনো সেই পুরোনো জাহাজের ডাকটা আজও উপেক্ষা করে যেতে পারলাম না ।

প্রথমবার যখন ঢাকায় এসে সলিমুল্লাহ মেডিকেলে ভর্তি হয়েছিলাম , আবার সেই ভো ভো শব্দটার সাথে সখ্যতাটা নতুন করে জোড়া লেগে গেলো । ঘন্টার পর ঘন্টা বসে বসে কাটিয়ে দিতাম সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে । এতো চিৎকার আর চেচামেচিতে , এতো গন্ধ আর নোংরা পরিবেশেও কিছুই মনে হতো না । শুধু লঞ্চের ভো ভো শব্দটা মাথার ভেতরে গেথে যেতো । এতো শব্দের কোলাহলেও কেমন যেনো একটা নির্জনতার উপলব্ধি হতো ।

এইসব অদ্ভুত আয়োজন আর কবিতার টান ছয় মাসের মাথায় আমাকে পুরোন ঢাকার মায়া ছেড়ে রাস্তার মানুষ হয়ে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করেছিলো । কিছুদিন ঢাকার রাস্তায় এদিকওদিক ঘুরেফিরে শেষপর্যন্ত বাড়িতেই ফিরে গিয়েছিলাম । আবার একটা নতুন অধ্যায়ের শুরু হলো । কিন্তু কেনো যেনো সেদিনের সেই ব্যর্থতা আমাকে পরবর্তী জীবনে কখনো সামান্যও কাদাঁয়নি । আবার পরের সফলতাগুলোও আমাকে কেনো যেনো পুরোপুরি হাসাতে পারেনি । কারনটা আজ বুঝি । প্রতিটা রাত নিঝুম হলেই আমাকে আমার পুরাতন সেই নিঃসঙ্গতারা এসে হাতছানি দিয়েই গেছে । আর আজও যায় ।

বাড়িতে ফিরে এসে মেরিন একাডেমিতে যাওয়ার পাগলামি শুরু হলো । কোচিংও শুরু করলাম । সারা দেশের আত্মীয়স্বজন এসে আমার কানের কাছে এসে বসে পড়লো । কি হলো , কেনো হলো , ভালোইতো ছিলি । আবার কেনো পাগলামি !
সবাই মিলে পুরাই উড়াধুড়া রকমের বিরক্ত শুরু করে দিলো । মেরিন কোচিংয়ের মাসুম ভাই পর্যন্ত বললেন , তোমার মেরিনে ঢোকা সম্ভব না । চশমা দেখেই বাদ দিয়ে দিবে । বেটার তুমি ফিরে যাও । হতাশ হয়ে পড়লাম । আর কোথাও ফিরবার জায়গাও তো রাখি নাই । হয়তো জায়গা ছিলো কিন্তু ইচ্ছা হলো না । যে পথ রেখে এসেছি সেখানে আবার তাকানোটা অহেতুক পড়ে থাকা পায়ের চিহ্ন খুটে আনবার মতো ।

মানুষের বিরক্তিতেই পরেরবার আবার ফিরলাম । এবার ঢাকা মেডিকেলে । তবুও প্রথমদিকে সদরঘাট খুব টানতো । মাঝে মাঝে যেতামও । কিছুদিন যেতেই নিজেকে ধমকে দিলাম । খুব শক্তভাবে আটকে গেলো সদরঘাটের রাস্তাটা । বহু দিনের পুরাতন বন্ধু ফয়সাল কামাল রিপনের সাথে যোগাযোগটাও কমে গেলো । নিজেকে বুঝালাম কিছু পেতে গেলে কিছু ঝেড়ে ফেলো ।

এরপর অনেকগুলো দিন মাঝখানে চলে গেলো । ঢাকা মেডিকেলের জীবন প্রায় শেষ হবার পথে । আর রাঙ্গামাটিতে বাবার বদলি হবার মাধ্যমে আবার সেই বিশাল জলের রাশি , আবার সেই জাহাজের ভেপুর সাথে সাক্ষাত । বিশাল লেকের ধারে হাটতে হাটতে কখন যে নখের ভেতর কাদা আটকে যায় , আজকাল কেমন যেনো আর টের পাই না । আমার সমস্ত চোখের ভেতর এখন যেনো দিগন্তের হাতছানি , মাথার ভেতর নাচতে থাকে উড়বার নেশা ।

মাঝে মাঝে শুধু অনেক দুর থেকে আসা বড়ো বড়ো মাছ ধরা জলযানের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর লঞ্চগুলোর চিৎকার শুনে মনে হতে থাকে , অনেকতো হলো এবার বের হবার সময় এসেছে । নিঃসঙ্গতাকে আজীবনের সঙ্গী করবার সময় এসেছে । আর অগোছালো মানুষটার আরো অগোছালো হয়ে যাবার সময় চলে এসেছে ।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুলাই, ২০১৫ রাত ৮:০৯
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রিয় কন্যা আমার- ৯৪

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:৪১



ফারাজা তাবাসসুম খান-
আজ বুধবার, ৮ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। ইংরেজি ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০২৬। বহু আগে একটা বই পড়েছিলাম- 'আদর্শ হিন্দু হোটেল'। প্রধান চরিত্রের নাম- হাজারি ঠাকুর। সে বাস্তববাদী, সহজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওমীলীগকে সম্পর্কে কি আপনার মনে এখন কোনো পজিটিভ চিন্তা উঁকি দেয়?

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৬


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি মূলত চারটি বিষয়ের উপর মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।
প্রথমত, মানুষ মনে করে এ দলটি ক্ষমতায় থাকলে স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়। এটা খুবই সত্য যে ১৯৭১ সালে আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিরোনামহীন কবিতা-০৭

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৪

তোমাকে নিয়ে কক্সবাজারে
সমুদ্রের গান শোনা,
অথবা বান্দরবানের কোনো পাহাড়ের চূড়ায় উঠে
মেঘের ভেলায় হারিয়ে যাওয়ার
কত যে ইচ্ছে—স্ব-যত্নে পুষে রেখেছিলাম
মনের গহীনতম কোণে!

কোনো এক ঈদের পড়ন্ত বিকেলে—
অকারণ কাঁপা আঙুলে
একটি খুদে বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলাম
তোমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

হারানো বিজ্ঞপ্তি

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩১



অত্যন্ত দুঃখ ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানানো যাচ্ছে যে, গত প্রায় দুই বছর যাবৎ বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান, বিচার ও বিবেচনা - এই পাঁচজনকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একসময় তাঁরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কিন মাটিতে ‘আত্মঘাতী ভুল’- নাকি বদলে যাচ্ছে হিসাব?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:২৫


মার্কিন মাটিতে ‘আত্মঘাতী ভুল’- নাকি বদলে যাচ্ছে হিসাব?

শেখ হাসিনা কি ফিরবেন?
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কখনো কখনো একটি বৈঠকের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে- কোন বৈঠকটি হলো, কোনটি হলো না এবং কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×