আজকের বিচিত্র পেশার নায়ক মোহাম্মদ করিম, যুবক, বয়েস মনে হয় না ত্রিশ পার হয়েছে। দেখতে শুনতে বেশ সুদর্শন এবং দীপ্ত, যাকে এক নজরে হিরো বলা চলে, রাস্তার রাজা! করিমের সাথে আমার দেখা হয় রাস্তায় এবং প্রতিদিন একটা নিদিষ্ট জায়গাতেই ওর সাথে দেখা হয়ে থাকে। মানুষের ওজন এবং উচ্চতা মাপ ঝোক নিয়েই ওর কারবার। এবার নিশ্চয় আপনারা বুঝে গেছেন, আমাদের করিমের পেশা কি! না, এটাকে তার পূরোপুরি পেশা বলা চলে না, তবে গত তিন বছর ধরে এই কাজটা নিখুতভাবে করে যাচ্ছে, মাশাআল্লাহ আয় রোজগার বেশ ভাল, সেটা পরে বলছি!

আজ থেকে বছর পাঁচেক আগে নোয়াখালীর লক্ষীপুর থেকে এই শহরে উঠে এসেছিল করিম। কাজের সন্ধানে ঘুরে ফিরে একটা কাজ পেয়ে যায়, ডেলিভারীম্যান হিসাবে, বিরাট বড় কোম্পানীর মালামাল গোডাউন থেকে গাড়ীতে নিয়ে কতগুলো নিদিষ্ট পয়েন্টে ডেলিভারী দিয়ে আসা, টাকা কালেকশন অন্যজনের। কাজের সময় সকাল ৯ টা থেকে ২ টা পর্যন্ত, কখনো ১২টাতেই কাজ শেষ হয়ে যায়। এভাবে দিন চলছিল, কিন্তু বিকালের সময় আর একলা পাড়ি দিতে চায় না! কিছুটা সময় ঘুমিয়ে, এদিন ওদিক আড্ডা দিয়েও সময় পার করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। তার উপর বেতন যা পাওয়া যায় তা দিয়ে চলে না।
কিছু একটা করার বা সময় কাজে লাগানোর চিন্তা করিমকে পেয়ে বসে। এমন সময় মাথায় আইডিয়া খেলে যায়, রাস্তার ধারে ওজন ও উচ্চতা মাপার কাজ করলে কিছু টাকা আয় হবে হয়ত। এভাবে করিম সাড়ে সাত হাজার টাকা দিয়ে একটা মেশিন কিনে ফেলে। বিকাল থেকে রাস্তার ধারে মানুষের ওজন উচ্চতা মাপে। শুধু ওজন দুই টাকা, উচ্চতা ও ওজন পাঁচ টাকা। ব্যস, এভাবে চলছে করিমের ২য় পেশা।
আমি করিমের সাথে কথা বলে বেশ আনন্দিত হয়েছি। পরিস্কার শুদ্ধ বাংলা এবং বেশ ঘুচিয়ে কথা বলার ধরন আপনার মন ভাল করে দেবে। আমি আমার অতীতের অভিজ্ঞতা এবং লক্ষীপুরের অনেক বন্ধু পেয়েছি, লক্ষীপুরের ছেলেরা যখন বাংলা বলে সেটা বেশ শ্রুতি মধুর হয়। করিমের ক্ষেত্রেও তা হল, বেশ বুদ্ধি রাখে বলে মনে হল! তার এই ২য় পেশার ব্যাপারটা তার বুদ্ধিমাত্তার বহিঃপ্রকাশ বটেই।
যাই হোক, করিম আমাকে জানালো এভাবে প্রতিদিন সে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা রুজি করে, তবে প্রায় সব নোট গুলো হয় ২ টাকা এবং ৫ টাকার। রাতে বাসায় ফেরার সময় এই নোট গুলো পান দোকান থেকে বড় নোট করে নিয়ে ফিরেন। তবে বৃষ্টির দিনে আয় প্রায় হয় না বলেই চলে।
করিম আমাকে জানালো, এই পেশায় এসে তার সাফল্যের কথা। গত বছরে লক্ষ টাকা দিয়ে বাড়িতে ধানী জমি কিনেছে। নব্বই হাজার টাকা দিয়ে একটা ঘর দিয়েছে। অবশ্য বাবাই এই কাজ গুলো করে দিয়েছে, সে শুধু টাকা পাঠিয়েছে।
আমি করিমের ছবি তুলতে চাইলাম এবং বললাম, তার গল্পটা অনলাইনে শেয়ার করবো। করিম খুব হাসি মুখে জানালো, করবেন। তার এই পেশায় না আছে মিথ্যা, না আছে কোন চাতুরতা, না কোন প্রতারনা। আপনি রাস্তার ধারে হেটে যেতে আপনার উচ্চতা ও ওজন মাপতেই পারেন এবং এটা কার না ইচ্ছা হয়। করিম কাউকে জোর করেন না এমনকি অনেকে ওজন মেপে টাকাও দেয় না, তাতেও করিমের আফসোস নেই! তবে করিম তার এই যন্ত্রটাকে অত্যান্ত ভালবাসে, আজ পর্যন্ত নষ্ট হয় নাই এবং ভুল ওজন দেয় নাই! কাজ শেষে কাছের অফিসেই রেখে বাসায় ফিরে যান।
আমি করিমকে স্যালুট করি এবং তার আরো সাফল্য কামনা করি। আমি নিশ্চিত আমাদের করিম আরো আরো বড় হবে একদিন, তার টাকায় থাকবে শুধু পরিশ্রম ও ভালবাসার ঘ্রান। আমাদের দেশের আমজনতা আসলে এমনি, এমনি সহজ ও সরল।
বিচিত্র এই দেশ, বিচিত্র এই দেশের মানুষ, কত কি বিচিত্র পেশা! তবে সবই জীবিকার টানে!
বি দ্রঃ করিমের কাছে একটা উচ্চতানুশারে ওজনের চার্ট আছে, সেটা দেখে আমার মোটা শরীর কেঁপে উঠলো! আমার ওজন কমের পক্ষে ১০ কেজি কমাতে হবে!
বিচিত্র পেশাঃ ৬ (ইসলাম ভাইয়ের বনাজী শরবত)
http://www.somewhereinblog.net/blog/udraji/30002003

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


