আর না চেনারও কারণ নেই। কারণ গত বছরই এই শান্তশিষ্ট, নিরীগ গোছের আধপাগলা ছেলেটাই যে হুলস্থুল কারবার করে সবার চোখ কপালে উঠিয়ে ছেড়েছিল। সেই কারবারটা ওর মুখেই শুনুন।' আমি খেয়াল করলাম আমার এলাকার ছেলেদের মধ্যে অনেকেই মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। সেই সাথে রমরমা মাদক ব্যবসাও আস্তে আস্তে গ্রাস করছে যুব সমাজকে। কাজ শুরু করলাম। মাদকের বিরুদ্ধে আমার লড়াই শুরু হলো। বেছে নিলাম বাড়ির পাশের একটা পাচীল। সেখানেই আকঁতে লাগলাম মাদকবিরোধী লেখা ও ছবি। হুলুস্থুল পড়ে গেল। অবশ্য শেষ পর্যন্ত মাদকব্যবসায়িদের হাতে মারও খেলাম। কিন্তু সেই ফাঁকে কমে গেল মাদকের বিস্তার। একটু হলেও সচেতন হলো মানুষ।'
এখানেই তরুণের কীর্তি শেষ নয়। ওর প্রথম পরিচয় ও শিল্পী। এক ভাষ্কর। বাড়ির অন্ধকার ঘরের ভেতর বসেই ও জগৎটাকে দেখার চেষ্টা করে ওর শিল্পের মাধ্যমে। গড়ে তোলে একের পর এক ভাষ্কর্য। দেখলে মনে হবে যেন কোন বিখ্যাত পটুয়া দিনারত ব্যয় করেছেন এসব ভাষ্কর্য। তাই বলে যেন ভাববেন না তরুণ হয়ত প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পী। ও কেবল এসএসসি পাশ করেছে। তরুণের সাথে কথা হচ্ছিল ওর শোবার ঘরের খাটের ওপর বসে। অন্ধকার একটা ঘর। জিনিসপত্রও তেমন গোছানো নয়। তরুণ বলল, এ বছরই আমি রাজশাহী মডেল স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেছি। তবে রেজাল্ট ভালো হয় নি। সি গ্রেড পেয়েছি। এখন রাজশাহী আর্ট কলেজে পড়ছি। ফার্স্ট ইয়ারে।'
কাজের প্রসঙ্গ উঠতেই তরুণ বললো, আমাদের মোন্নাফের মোড়ে আগে থাকত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের কয়েকজন ছাত্র। এদের একজন ছিলেন রানা ভোমিক কচি। কচি ছিলেণ চারুকলার ভাষর্্কর্য বিভাগের ছাত্র। তার কাছেই আকাঁ আাঁকির হাতে খড়ি। এক সময় ভালো বেসে ফেলাম ভাষ্কর্য। আমি তখন কাশ থ্রিতে পড়ি। সেখান থেকেই শুরু। এখনো কাজ করে চলেছি।
চারভাইয়ের মধ্যে তরুণ তৃতীয়। বাবা জানে আলম রিকশার গ্যারেজের মালিক ছিলেন। এখন অসুস্থ্য কোন কাজ করেন। বড় দু'ভাইও কাজ করেন গ্যারেজে। ছোটভাইটা পড়ালেখা ছেড়ে এখন কিছুই করে না। তরুণের মা রেজিয়া বেগন রান্না করছিলেন আঙিনাহীন ঘরের দোরেই। তিনি বললেন, ছোটবেলা থেকেই তরুণের ভাষ্কর্য গড়ার শখ। অনেক কষ্ট হলেও আমরাও কখনও বাধা দিইনি ওর কাজে।
তরুণ জানালো, দেশের প্রখ্রাত ভাষ্কর নিতুন কুন্ডু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক আব্দুর রাজ্জাক স্যার ওর আইডিয়াল। এদের কাজ ওকে অনুপ্রাণিত করে। তরুণের কাজ মুলত ভাষ্কর্যের অফেরা ও জাল ধারার। সমাজের অবহেলিত মানুষই ওর অফেরার বিষয়। আর চারপাশের পরিবেশের মধ্যে লুকিয়ে থাকা নানা অসঙ্গতি, অঘটন, ঘটনা ও তুলে ধরে জালের মাধ্যমে। তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও কাজ রয়েছে তরুণের। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ স্মৃতি সংগ্রহ শালাতে ওর কাজ রাখা আছে।
তরুণ কাজ করার জন্য প্রায় এখানে সেখানে চলে যায়। বলল, 'কলেজে কাশ করার পর রাজশাহী স্টেশনে যাই। স্টেশনের প্লাটফরমে পড়ে থাকা মানুষগুলোর কর্মকান্ড দেখি। আর এ নিয়েই গড়ে তুলি ভাষ্কর্য। তবে কাজ করতে কষ্ট হয়।' কষ্টের কারণটা জানা গেল বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই। চারপাশের ইট-কাঠই জানিয়ে দিচ্ছে সংসারের দৈন্যদশা। তরুণ বলল, এখন আমি পড়াশোনার খরচ পাই মেজ ভাইয়ের কাছ থেকে। বাবাও মাঝে মধ্যে টাকা পয়সা দেন। কিন্তু তাতে তো সব কাজ হয় না। মাঝে মধ্যে নিজের কাজ বেচেও অর্থের সংস্থান করতে হয়। একটা আর্ট স্কুল খোলারও চেষ্টা করছে তরুণ। তবে এখনো কাজ শেষ হয় নি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগেও বেশ পরিচিত তরুণের। আগে প্রায়ই যেত। তবে এখন সময় না পেলেও সপ্তাহে অন্তত একদিন যায়। শিক-ছাত্রদের সাথে বসে কথা বলে, কাজ দেখে। মাঝে মধ্যে কাজও করে। তবে আত্মতৃপ্তি মেলে না। তরুণ শিল্পী হতে চায়। কিন্তু সামর্থ্যের বেড়াজালে বার বারই আটকা পড়ে ওর শিল্প সত্ত্বা। আর এজন্যই নিজের অবস্থার উন্নয়ন চায় তরুন। অনেক বড় ভাষ্কর হতে চায়। সুযোগ পেলেও তরুণই হয়ত হয়ে উঠবে আগামী দিনের নিতুন কুন্ডু বা ওঁরই মত কেউ।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০০৯ সকাল ১০:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




