বিশ্বজ্ঞান-বিশ্বশিা সমাজে ছড়িয়ে দেয়ার চিন্তা থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম। মুক্ত চিন্তা, তার চর্চা নিজের ভেতরে, সমাজের ভেতরে প্রবাহমান রাখার উদ্দেশ্য রার্থে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই আর সব শিাথর্ীদের মত আমরাও শিাজীবনের একটি নির্দিষ্ট স্তর পার করে , বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার এই মৌলিক প্রতিশ্রুতিতে আকৃষ্ট হয়েই এসেছি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমাদের চোখে স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিায় শিতি হয়ে মুক্ত চিন্তা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার বির্নিমাণ। এমন এক সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন আমরা দেখি যেখানে মানুষ থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন নয়, যে সমাজে মানুষ মানুষের জন্য।
কিন্তু গণযোগাযোগের শিাথর্ী হিসেবে চোখ-কান খোলা রাখতে গিয়েই যত বিপত্তি। বোধ হচ্ছে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে নয় , সম্ভবত ভূল করে হেরেমখানায় ঢুকে পড়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় নামের এই হেরেম খানায় আছে স্বায়ত্তশাসনের নামে আয়ত্তশাসন, আছে সান্ধ্য আইন, আছে রক্তচু প্রক্টরিয়াল বডি। সেই সাখে আছে দলপার্টি-সন্ত্রাস-দখলদারিত্ব-টেন্ডারবাজি-মৌলবাদ-আধিপত্য। আরও আমলা শিকদের নজরুল-রবীন্দ্র গ্রুপ, আছে ঘুষ-দুর্ণীতি-স্বজনপ্রীতি-দলীয়করণ-আত্মীয়করণ। আছে 544। আছে দমন পীড়ন নির্যাতন। আর আছে একের পর এক যৌন নিপীড়ন। আমাদের হাত-পা-চোখ-কান-মুখ শক্ত করে বাধা। মুখ খুলবি তো বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ অথবা ইচ্ছে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার? এটাই এই হেরেমের 'নায়কদের' সবচেয়ে বড় শক্তি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিাথর্ীরা যে হেরেমের বন্দী তা এতনে সবাই জেনে গেছেন। বিশেষ করে সমপ্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের একজন 'সম্মানিত' প্রফেসরের কীর্তি এবং তৎপরবতর্ী আন্দোলন। এই ঘটনার পরিপ্রেেিত সংবাদপত্রগুলোর সংবাদ থেকে জানা গেল, গত 2 এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক প্রফেসর নুরুল আমীন একই বিভাগের এক ছাত্রীকে জোরপূর্বক শারিরীক সম্পর্কের চেষ্টা করেন। পরবতর্ী ওই ছাত্রী বিভাগীয় সভাপতির কাছে এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দেন। পরে সভাপতি বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির জরুরী সভা ডেকে ওই শিকের বিরুদ্ধে শাস্তির জন্য সুপারিশ করেন। শাস্তি গুলো ছিল এই রকম- প্রফেসর নুরুল আমীন আগামি 10 বছর পরীা সংক্রান্ত কোন কাজে অংশ নিতে পারবেন না, চতুর্থ বর্ষের কোন কাশ তাকে দেয়া হবে না এবং জীবনে আর কখনও কোন ছাত্রী তার কাছে গবেষণা করবে না। বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির এই সিদ্ধান্তকে 'গাঁ বাঁচানো' অ্যাখ্যায়িত করে আন্দোলনে নামে শিাথর্ীরা। শিাথর্ীদের আন্দোলনের শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটিকে 7 কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দেয়ার জন্য বলা হলেও 15 কর্মদিবসেও তারা তা দেন নি। সংবাদপত্র মারফত আরো জানা গেছে, তদন্ত কমিটির কাছে 134জন শিাথর্ী প্রফেসর নুরুল আমীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন। এদের মধ্যে 90 টি অভিযোগই এসেছে ভুক্তভোগি ছাত্রীদের কাছ থেকে। সর্বশেষ শিাথর্ীদের ােভ ভয়াবহ আকার ধারন করে গত 6 মে। ওই দিন বিুব্ধ শিাথর্ীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে তৃতীয় বিজ্ঞান ভবনে 6 ঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে উপাচার্য 48 ঘন্টার ভেতর প্রফেসর নুরুল আমীনের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ করে বিচারের আশ্বাস দিলে শিাথর্ীরা অবরোধ তুলে নেয়।
উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিকের কেলেংকারী নিয়ে যখন ক্যাম্পাস বিুব্ধ ঠিক তখনই আরেক নুরুল আমীনের খোঁজ পাওয়া গেল সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে। অভিযোগ একই। ওই শিক অভিযোগকারী ছাত্রীকে 'একা একা' চেম্বারে দেখা করার জন্য বেশ কয়েকবার নির্দেশ দিয়েছেন। এখনো ওই শিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয় নি। যদি হয় তবে অবস্থাটা কি রকম দাড়াবে? আবার আন্দোলনে নামবে ছাত্র-ছাত্রীরা। আন্দোলন হবে, ভাংচুর হবে, শেষ পর্যন্ত আবারো বেকায়দায় পড়ে একটা তদন্ত কমিটি দেবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তারপর একদিন সবকিছু চুপচাপ হয়ে যাবে। এরকমই হয়। অন্তত পেছনের ইতিহাসটা তাই বলে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে সর্বমোট 1300টি তদন্ত কমিটি হয়েছে। এটা গত বছরের হিসেব। এ বছরের পরিসংখ্যান দিলে এই তালিকা আরো বড় হবে। মজার ব্যাপার হলো এর কোনটিরই রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। ঘটনা ঘটেছে, তদন্ত কমিটি হয়েছে তারপর এক সময় সব চুপচাপ। এবারো তার ব্যাতিক্রম হবে না হয়ত। এর প্রমান হলো উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের ঘটনায় 14 এপ্রিল তদন্ত কমিটি গঠিত হওয়ার পরেও কেন এখনো পর্যন্ত তাদের কাজই শেষ হলো না? 7 কর্মদিবস কতদিনে হয়? এই দীর্ঘসুত্রিতাই প্রমান করে আসলে সামগ্রীক ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
তবে মজার ব্যাপার হলো এবার সাধারণ শিাথর্ীদের আন্দোলনের কাছে সুবিধা করতে পারছে না দল-পার্টিওয়ালারা। সরকারী দলের ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী ছাত্রদল-শিবির কখনো আন্দোলনের বাইরে, সুবিধামত সযোগ বুঝে ভেতরে ঢুকে তা ভিন্নখাতে প্রবাহের চেষ্টা করে। এবার এসব প্রচেষ্টার কোনটাই কাজে আসে নি। অপরদিকে বিরোধী দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ সামগ্রিক ঘটনার মধ্যে দু'চারটি মিছিল করা ছাড়া বিবৃতির ভেতরই সীমাবদ্ধ থেকেছে। তবে কি চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ি টেবিলের নীচ দিয়ে যথাসময়ে হলুদ খাম তাদের হাতে পেঁৗছে গেছে? চোখে পাড়ার মত ব্যাপার হলো এই ইসু্যতে সবচেয়ে বেশী 'ফপ' মেরেছে প্রগতিশীল বলে খ্যাত বামিপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলো। ভর্তি পরীার ফরমের দাম 5টাকা 10 টাকা বাড়লে যারা বিশ্ববিদ্যালয় অচল করার হুমকি দেয়, ছাত্রীদের যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে 'প্রাণ বিসর্জনের' বাণী শোনায় এবার তারা এত চুপচাপ কেন? ছাত্রদের জন্য নিবেদিত প্রাণ বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতারা এতটা গতিহারা হলো কেন?
যে যাই বলুক আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিাথর্ীরা ওই দলপার্টি ছাড়াই কিছু করতে পারি- করার সমতাও আমাদের আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীতে এ ধরণের বহু নজির রয়েছে। ডাক্তারের অবহেলায় বুলবুল মারা গেলে আমরা লড়েছি; প্রফেসর ইউনুস, ড. তাহের হত্যার প্রতিবাদে, লড়েছি 30 অক্টোবর সহপাঠীদের নিরাপত্তার দাবিতে। কোন লড়াইয়েই আমাদের দলপার্টি-নেতাভাই লাগে নি। এবারো লাগবে না। অন্ধকারে পথ হাতড়াতে হাতড়াতে ঠিকই সঠিক পথ খুঁজে নেব। বিশ্ববিদ্যালয় নামের এই হেরেমখানার দেয়াল ভাঙবোই। #
লেখক: আরিফ রেজা খান, হাসনাত রাবি্ব, মাসুদ পারভেজ, সিরাজুল ইসলাম, মেহেরুল হাসান, সালাহউদ্দীন মুহম্মদ ও আনিসুজ্জামান উজ্জল, রাবির গণযোগাযোগ বিভাগের বিভিন্ন বর্ষের শিাথর্ীবৃন্দ।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই আগস্ট, ২০০৮ বিকাল ৩:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



