বাবার সাথে অনেক বিষয়ে খুব তর্ক হতো, আবার বাবার প্রসঙ্গ আসছে, হয়তো মৃত্যুবার্ষিকীর কাছাকাছি বলে, বাবা ফেরেশতা ছিলেন না, দোষগুনে ভরা মানুষ। বাবার লিবারেল অ্যাটিচুডকে প্রায়ই বাবার অক্ষমতা হিসেবে দেখতাম, হয়তো কিছুটা সত্যিও, পুরোটা হয়ত না। সিক্স সেভেন থাকতে একটা পুরোনো তর্কের বিষয় ছিল পিপড়া বা মৌমাছির সাফল্য, তাদের অধ্যবসায় ইত্যাদি। স্রেফ বাবার বিরোধিতা করতে হবে বলে পিপড়াদের বিপক্ষ নিতাম, যুতসই যুক্তি পাচ্ছিলাম না। অনেক খুজে একটা উদাহরন পেলাম, হয়তো বছরখানেক পরে, পিপড়া সভ্যতা তৈরী করতে পারে নি। বাবা এর পরে এই প্রসঙ্গে আর ঘাটিয়েছে বলে মনে হয় না, তবে আমার মাথায়ও প্রশ্নটা ছিল, এত পরিশ্রমি পিপড়াদের কোন সভ্যতা নেই কেন। সাফল্যের জন্য পরিশ্রমের বাইরে কি আছে। অথবা পিপড়ার মতো পরিশ্রম করাই কি সাফল্যের জন্য যথেষ্ট নয়?
আরেকজন পিতৃস্থানীয় ব্যাক্তিত্ব, বুয়েটের কম্পিউটার কৌশলের তৎকালীন প্রধান , তার সাথে অনেক জায়গায় ঘোরাঘুরির অভিজ্ঞতা ছিল। ব্যালান্সড টিম ওয়ার্ক নিয়ে আমার সাথে তার প্রায়ই মতের অমিল হতো। স্যারের আদর্শ টিম ছিল পাচ ব্যাটসম্যান, চারবোলার, এক অলরাউন্ডার আর এক উইকেটকিপারের ক্রিকেট টিমের মতো। খাতা কলমের এসব আদর্শ টিম যে বাস্তবে সবসময় বিজয়ী হয় না এটা ছিল তর্কের বিষয়বস্তু। রুপকথা আর রুপকের সাথে আদর্শ টিমের একটা গুরুত্বপুর্ন মিল আছে। তখন ঠিক কোথায় আমরা যাচ্ছিলাম মনে নেই, তবে উড়োযানের লম্বা জার্নিতে বসে বসে কয়েকটা প্রচলিত রুপ স্যারের জন্য বিকৃত করলাম।
যেমন চয়নিকার "লবনের মতো ভালোবাসা", তিন রাজকুমারীর ছোটটাকে রাজার খুব পছন্দ, তো রাজা জানতে চাইলেন তোমাদের মধ্যে কে আমাকে কেমন ভালোবাস, বড় রাজকুমারীরা সন্তোষজনক উত্তর দেয়ার পরে ছোটজন বলল, বাবা আমি তোমাকে লবনের মতো ভালবাসি। রাজা তো খুব দুঃখ পেলেন। ছোটকন্যা এবার নানা পদ তরকারী রেধে বাবাকে খেতে দিল, সবগুলোই লবন ছাড়া, রাজাতো কিছুই মুখে দিতে পারেন না। রাজা অবশেষে বুঝলেন লবনের মতো ভালোবাসার মর্ম। মুল গল্প এখানেই শেষ। আমার মতে এই রুপকে যে অংশটা উপেক্ষা করা হয়েছে তা হলো লবন যদি বেশী দেয়া হয় তাহলে কি হবে। তার মানে ছোটমেয়ের ভালোবাসা এমন যে বেশী হলে আর সহ্য করা যায় না। এমনকি কম হলে উপায় আছে, লবন বেশী হলে ফেলে দেয়া ছাড়া তো আর উপায় নেই। আরেকটা গল্প , এটাও বইয়ের "সুখী মানুষের গল্প"- গ্রামের দুষ্ট মোড়ল ভীষন অসুস্থ হলে ডাক্তার তাকে সুখী মানুষের জামা পড়ার উপদেশ দিলেন। খুজে পেতে এক সুখী কাঠুড়েকে পেলেও দেখা গেল তার কোন জামা নেই। ইত্যাদি। বুঝলাম টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না। কিন্তু এমন যদি হয় কাঠুড়ে একদিন কাঠ কাটতে গিয়ে ভীষন আহত হলো, ধরলাম ল্যাংড়া হয়ে গেল, আর কাঠ কাটতে পারে না, যেহেতু তার কোন সহায় সম্পত্তি নেই ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া তার কোন রাস্তা থাকল না, এখন দুঃখী অথচ ধনী মোড়ল যদি এটা আবিস্কার করে তাহলে এবার সে কি সিদ্ধান্ত নেবে। আসলে আরেকটা রুপক গল্প আছে এই গল্পের সরাসরি বিপরীত, ঈশপের পিপড়া ও ঘাসফড়িং-এর গল্প। যেখানে পিপড়াকে (অনেকটা মোড়লের মতো) অনুকরনীয় হিসেবে দেখানো হয়েছে।
রুপক, রুপকথা, খাতা-কলমের আদর্শ সবার সমস্যা হচ্ছে এরা আসলে অসম্পুর্ন। কারোটা সহজেই ধরা যায়, আর কারোটা ধরতে কসরত করতে হয়। এরা সমাধানের একটা অংশ বিস্তৃত করে, পুরোটা না। রাজকন্যা, রাজপুত্রের বিয়ের পর কি হলো, তাদের কোন দাম্পত্য কলহ হয় নি, অথবা রাজপুত্রের কোন পরকীয়া, রানীর প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। সময় তো আর থেমে ছিল না, গল্পকারের নটে গাছটি মুড়োলেও বাস্তবের প্রয়োজন তো ক্ষমাহীন। পিপড়া সভ্যতা তৈরী করে নি কারন, পিপড়া একটা নির্দিষ্ট অপরিবর্তনীয় জীবন বিধান নিয়ে বসে আছে, মিলিয়ন বছরেও তাদের নিয়ম কানুন তেমন বদলায় নি। আর মানুষের মধ্যে কাউকে কাউকে নিয়মে বাধা কঠিন, সৃষ্টিশীল এসব মানুষ সভ্যতা তৈরী করেছে। Romanticized স্বপ্নের সমস্যা হচ্ছে কাহিনীর মধ্যে তাদেরকে চমৎকার দেখায়, শত শত কিশোর তরুন ষাটের দশকে আমাদের দেশে কমিউনিজমের স্বপ্ন দেখে উদ্্বুদ্ধ হয়েছে, শোষনমুক্ত সমাজ গড়বে, সবই ভালো, উদ্দ্যেশ্য মহৎ সন্দেহ নেই। রুপকথার মতো এই স্বপ্নও অসম্পুর্ন, শুধু প্রশ্ন করে দেখুন, শোষনমুক্ত সমঅধিকারের সমাজ আর লঙ্গরখানা প্রতিষ্ঠার পর কি হবে, মানুষ কলকারখানায় অফিস আদালতে কাজ করবে, যে যার চরকায় তেল দেবে, আমরা সবাই রাজা, ছিমছাম গোছানো সমস্যাহীন দেশ, ঠিক যেন পিপড়ার কলোনী। মানুষকে নিয়মের ফাদে ফেলে পিপড়া বানানোর আদর্শের অভাব নেই। এখানেই দেখতে পাচ্ছি অনেক ব্লগার খিলাফতের রঙিন স্বপ্নে অভিভুত। স্বপ্ন দেখা ভালো, শুধু বাস্তবায়নের চেষ্টার আগে একটা প্রশ্ন করলে ভালো হয়, এই স্বপ্ন সম্পুর্ন তো, না কি পরস্পর বিরোধী মেটাফোরের মতো এটাও শুধু খাতা কলমে সত্যি।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মে, ২০০৬ সন্ধ্যা ৭:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


