somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মেটাফোরে এফোড় ওফোড়

২৮ শে মে, ২০০৬ সন্ধ্যা ৬:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রুপক, রুপকথা বরাবরই আমার ভালো লাগতো। কবে থেকে ভালো লাগে না বা লাগাতে পারি না মনে করতে পারছি না, অথবা এখনও কিছুটা ভালো লাগে বিশেষ করে সিনেমাতে দেখতে। কে যেন একবার জন্মদিনে ঈশপের গল্পগুচ্ছ উপহার দিয়েছিল, ছোট ছোট চিত্র সহ গল্প, পড়তে ভালোই লাগতো, শুধু শেষের উপদেশটা উপেক্ষা করতাম। রুপকথার ভালো দিক হচ্ছে শেষটা প্রায়ই মিলনান্তক, আমার ধারনা প্রায় সবক্ষেত্রেই কিছুটা রোমান্টিক, রাজকন্যা রাজপুত্রের মিলন হয়, রাক্ষস মারা যায়, তারপর তারা বিয়ে করে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকে, বোধহয় অনন্তকাল পর্যন্ত। নিজেকে রাজপুত্রের স্থানে কল্পনা করতে খুব ভালো লাগতো, যতদুর মনে হয় পড়ার সময় ওরকম কল্পনা করেই আগাতাম। নার্সারী থেকে শুরু করে মনে হয় অন্তত স্কুলজীবনের প্রায় শেষভাগ পর্যন্ত নায়কের চরিত্রে প্রায়ই নিজেকে বসিয়ে গল্প পড়তাম, এটা অবশ্য নতুন কিছু না, সবাই তাই করে, অন্তত যাদেরকে জিজ্ঞাসা করেছি। মেয়ে হলে হয়তো রাজকন্যার পার্ট নিতাম। Romanticized কল্পনা হয়তো শৈশব-কৈশোরের একটা গুরুত্বপুর্ন ড্রাইভিং ফোর্স, হয়তো কৈশোরের পরেও তাই। নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েও কল্পনাগুলো এরকম romanticized থাকতো, একসময় সব রাক্ষস মরে যাবে ... ওয়েল, এক্ষেত্রে সব সমস্যার সমাধান হবে, আমি বিজয়ী রাজপুত্রের বেশে লাখ টাকা বেতনের চাকরী নিয়ে ঘরে ফিরব, বাবা মায়ের স্বপ্ন পুরন করবো, রাজকন্যাও এসময় খুজে পাবো ইত্যাদি ইত্যাদি ... এসব কল্পনাকে দোষ দিতে চাই না, হয়তো ঠিকই আছে, স্বপ্ন না দেখলে সামনে যাবো কিভাবে, অথবা হয়তো ঠিক নেই ...।

বাবার সাথে অনেক বিষয়ে খুব তর্ক হতো, আবার বাবার প্রসঙ্গ আসছে, হয়তো মৃত্যুবার্ষিকীর কাছাকাছি বলে, বাবা ফেরেশতা ছিলেন না, দোষগুনে ভরা মানুষ। বাবার লিবারেল অ্যাটিচুডকে প্রায়ই বাবার অক্ষমতা হিসেবে দেখতাম, হয়তো কিছুটা সত্যিও, পুরোটা হয়ত না। সিক্স সেভেন থাকতে একটা পুরোনো তর্কের বিষয় ছিল পিপড়া বা মৌমাছির সাফল্য, তাদের অধ্যবসায় ইত্যাদি। স্রেফ বাবার বিরোধিতা করতে হবে বলে পিপড়াদের বিপক্ষ নিতাম, যুতসই যুক্তি পাচ্ছিলাম না। অনেক খুজে একটা উদাহরন পেলাম, হয়তো বছরখানেক পরে, পিপড়া সভ্যতা তৈরী করতে পারে নি। বাবা এর পরে এই প্রসঙ্গে আর ঘাটিয়েছে বলে মনে হয় না, তবে আমার মাথায়ও প্রশ্নটা ছিল, এত পরিশ্রমি পিপড়াদের কোন সভ্যতা নেই কেন। সাফল্যের জন্য পরিশ্রমের বাইরে কি আছে। অথবা পিপড়ার মতো পরিশ্রম করাই কি সাফল্যের জন্য যথেষ্ট নয়?

আরেকজন পিতৃস্থানীয় ব্যাক্তিত্ব, বুয়েটের কম্পিউটার কৌশলের তৎকালীন প্রধান , তার সাথে অনেক জায়গায় ঘোরাঘুরির অভিজ্ঞতা ছিল। ব্যালান্সড টিম ওয়ার্ক নিয়ে আমার সাথে তার প্রায়ই মতের অমিল হতো। স্যারের আদর্শ টিম ছিল পাচ ব্যাটসম্যান, চারবোলার, এক অলরাউন্ডার আর এক উইকেটকিপারের ক্রিকেট টিমের মতো। খাতা কলমের এসব আদর্শ টিম যে বাস্তবে সবসময় বিজয়ী হয় না এটা ছিল তর্কের বিষয়বস্তু। রুপকথা আর রুপকের সাথে আদর্শ টিমের একটা গুরুত্বপুর্ন মিল আছে। তখন ঠিক কোথায় আমরা যাচ্ছিলাম মনে নেই, তবে উড়োযানের লম্বা জার্নিতে বসে বসে কয়েকটা প্রচলিত রুপ স্যারের জন্য বিকৃত করলাম।

যেমন চয়নিকার "লবনের মতো ভালোবাসা", তিন রাজকুমারীর ছোটটাকে রাজার খুব পছন্দ, তো রাজা জানতে চাইলেন তোমাদের মধ্যে কে আমাকে কেমন ভালোবাস, বড় রাজকুমারীরা সন্তোষজনক উত্তর দেয়ার পরে ছোটজন বলল, বাবা আমি তোমাকে লবনের মতো ভালবাসি। রাজা তো খুব দুঃখ পেলেন। ছোটকন্যা এবার নানা পদ তরকারী রেধে বাবাকে খেতে দিল, সবগুলোই লবন ছাড়া, রাজাতো কিছুই মুখে দিতে পারেন না। রাজা অবশেষে বুঝলেন লবনের মতো ভালোবাসার মর্ম। মুল গল্প এখানেই শেষ। আমার মতে এই রুপকে যে অংশটা উপেক্ষা করা হয়েছে তা হলো লবন যদি বেশী দেয়া হয় তাহলে কি হবে। তার মানে ছোটমেয়ের ভালোবাসা এমন যে বেশী হলে আর সহ্য করা যায় না। এমনকি কম হলে উপায় আছে, লবন বেশী হলে ফেলে দেয়া ছাড়া তো আর উপায় নেই। আরেকটা গল্প , এটাও বইয়ের "সুখী মানুষের গল্প"- গ্রামের দুষ্ট মোড়ল ভীষন অসুস্থ হলে ডাক্তার তাকে সুখী মানুষের জামা পড়ার উপদেশ দিলেন। খুজে পেতে এক সুখী কাঠুড়েকে পেলেও দেখা গেল তার কোন জামা নেই। ইত্যাদি। বুঝলাম টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না। কিন্তু এমন যদি হয় কাঠুড়ে একদিন কাঠ কাটতে গিয়ে ভীষন আহত হলো, ধরলাম ল্যাংড়া হয়ে গেল, আর কাঠ কাটতে পারে না, যেহেতু তার কোন সহায় সম্পত্তি নেই ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া তার কোন রাস্তা থাকল না, এখন দুঃখী অথচ ধনী মোড়ল যদি এটা আবিস্কার করে তাহলে এবার সে কি সিদ্ধান্ত নেবে। আসলে আরেকটা রুপক গল্প আছে এই গল্পের সরাসরি বিপরীত, ঈশপের পিপড়া ও ঘাসফড়িং-এর গল্প। যেখানে পিপড়াকে (অনেকটা মোড়লের মতো) অনুকরনীয় হিসেবে দেখানো হয়েছে।

রুপক, রুপকথা, খাতা-কলমের আদর্শ সবার সমস্যা হচ্ছে এরা আসলে অসম্পুর্ন। কারোটা সহজেই ধরা যায়, আর কারোটা ধরতে কসরত করতে হয়। এরা সমাধানের একটা অংশ বিস্তৃত করে, পুরোটা না। রাজকন্যা, রাজপুত্রের বিয়ের পর কি হলো, তাদের কোন দাম্পত্য কলহ হয় নি, অথবা রাজপুত্রের কোন পরকীয়া, রানীর প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। সময় তো আর থেমে ছিল না, গল্পকারের নটে গাছটি মুড়োলেও বাস্তবের প্রয়োজন তো ক্ষমাহীন। পিপড়া সভ্যতা তৈরী করে নি কারন, পিপড়া একটা নির্দিষ্ট অপরিবর্তনীয় জীবন বিধান নিয়ে বসে আছে, মিলিয়ন বছরেও তাদের নিয়ম কানুন তেমন বদলায় নি। আর মানুষের মধ্যে কাউকে কাউকে নিয়মে বাধা কঠিন, সৃষ্টিশীল এসব মানুষ সভ্যতা তৈরী করেছে। Romanticized স্বপ্নের সমস্যা হচ্ছে কাহিনীর মধ্যে তাদেরকে চমৎকার দেখায়, শত শত কিশোর তরুন ষাটের দশকে আমাদের দেশে কমিউনিজমের স্বপ্ন দেখে উদ্্বুদ্ধ হয়েছে, শোষনমুক্ত সমাজ গড়বে, সবই ভালো, উদ্দ্যেশ্য মহৎ সন্দেহ নেই। রুপকথার মতো এই স্বপ্নও অসম্পুর্ন, শুধু প্রশ্ন করে দেখুন, শোষনমুক্ত সমঅধিকারের সমাজ আর লঙ্গরখানা প্রতিষ্ঠার পর কি হবে, মানুষ কলকারখানায় অফিস আদালতে কাজ করবে, যে যার চরকায় তেল দেবে, আমরা সবাই রাজা, ছিমছাম গোছানো সমস্যাহীন দেশ, ঠিক যেন পিপড়ার কলোনী। মানুষকে নিয়মের ফাদে ফেলে পিপড়া বানানোর আদর্শের অভাব নেই। এখানেই দেখতে পাচ্ছি অনেক ব্লগার খিলাফতের রঙিন স্বপ্নে অভিভুত। স্বপ্ন দেখা ভালো, শুধু বাস্তবায়নের চেষ্টার আগে একটা প্রশ্ন করলে ভালো হয়, এই স্বপ্ন সম্পুর্ন তো, না কি পরস্পর বিরোধী মেটাফোরের মতো এটাও শুধু খাতা কলমে সত্যি।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মে, ২০০৬ সন্ধ্যা ৭:১১
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আমায় তুমি বসন্ত দুপুর দিয়ো/বসন্তে ফুল ফুটবেই=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৪৬

তোমার কি ইচ্ছে হয় না, আমায় দাও একটি =আমায় তুমি বসন্ত দুপুর দিয়ো=
তোমার কি ইচ্ছে হয় না, আমায় দাও একটি বসন্ত দুপুর
ইচ্ছে হয় না আমায় নিয়ে পায়ে বাজাতে পাতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাতিয়ায় শাপলা কলিতে ভোট দেওয়ায় তিন সন্তানের জননীকে ধর্ষণ করে বিএনপির কুলাঙ্গাররা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:১০

এক আওয়ামী ব্লগার আমাকে প্রশ্ন করছে আপনি তো বিএনপি করেন তাহলে জামাতের পক্ষে পোস্ট দেন কেন। উত্তরা এই পোস্টের শিরোনামে আছে। আমার উত্তর হচ্ছে আমি জামাতও করি না।

আমার পরিবার,আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুইশো নয় আসন নিয়েও কেন অন্যদের বাসায় যেতে হচ্ছে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:০৯


নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় একধরনের উৎসবের আমেজ ছিল। স্ট্যাটাস, পোস্ট, কমেন্ট—সবখানে একই সুর। বিএনপি দুইশো নয়টা আসন পেয়েছে, জামায়াত মাত্র সাতাত্তর, দেশ এবার ঠিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামাতের নিশ্চিত ভূমিধ্বস পরাজয়ের কারন

লিখেছেন কিরকুট, ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৩৪

*** জামাত শিবিরের পচা মস্তিষ্কের কেউ এই পোষ্টে এসে ল্যাদাবেন না***


রাজনীতির ইতিহাসে কিছু পরাজয় থাকে তা কেবল নির্বাচনী ফলাফলের ভেতর সীমাবদ্ধ নয় সেগুলো হয়ে ওঠে নৈতিক রায়।

জামাতের সাম্প্রতিক নিশ্চিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির যারা আজ আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের কথা ভাবছেন...

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:১০


১. শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতারা বারবার বলেছেন, জিয়াউর রহমান নাকি পাকিস্তানের চর ছিলেন, তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন। এমনকি তাকে শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলেও বলতেন…
২. খালেদা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×