somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাটা ঠিক আসে না!

১৩ ই এপ্রিল, ২০১৫ ভোর ৪:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(১)
আমার না বাংলাটা ঠিকমতো আসে না

কতদিন ধরে বাংলা পড়া নেই, ভুলেই যাচ্চি ক্ষণ..

-কথাগুলো আক্ষেপ করে নয়, রীতিমত গর্ব করেই বলেন নব্য বাঙালীরা। আর কলকাতায় একবার তো এক দিদির কাছে এমন বলতেও শুনেছি- "আরে আরে আমার মেয়েটা তো বাংলা পারেই না, তবে যেমন হিন্দী, তেমনই ইংলিশ- একেবারে ফাটিয়ে দেয়! পড়ে তো ইংলিশ মিডিয়ামে...অক্সফোর্ড এডুকেশান বোর্ডের আন্ডারে হুম!"
মনে মনে কই, হায়রে বঙ্গ মাতার ইংগো সন্তান!

(২)
বিদ্যাপতি থেকে রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র থেকে হুমায়ুন আজাদ কিংবা কবি নজরুল থেকে তারাশঙ্কর -একে একে মহামানব সমৃদ্ধ করলেন বাংলাভাষাকে, ঋদ্ধ করলেন বঙ্গভূমি। বাংলা ভাষার রূপ রস ছন্দে গন্ধে তাঁরা তাঁদের সমস্ত চিন্তা চেতনা ঢেলে, ধ্যান জ্ঞান দিয়ে করলেন অপূর্ব সৃষ্টি। এলেন কত মহাকবি, সভাকবি , কবিয়াল, দিগ্বিজয়ী তর্করত্ন, তর্কালঙ্কার, কালজয়ী কথা সাহিত্যিক, নাট্যকার, সুরকার, গদ্যপদ্য রচয়ীতা, কিংবা বজ্রকণ্ঠী বক্তা- আরো এলেন কিছু অপূর্ব চলচিত্র নির্মাতা, সঙ্গীতজ্ঞ- সৃজনশীলতা দিয়ে জগৎজয় করলেন তাঁরা, এই ভাষাতেই। সারাবিশ্বে প্রায় দুই হাজার কথিত ভাষা আছে, তার মধ্যে মহত্মপূর্ণ অবস্থান করে নিয়েছে বাংলা।

(৩)
শুধু বাঙালী নয়, বাংলা ভাষা হয়েছে অনেক বিদেশীদেরও সাধনার ধন। এই বাংলাকে বুকে ধারণ করে যে অনেক অবাঙালীও তাঁদের সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতেছিলেন, তার সংখ্যাও কম নয়।
তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন এন্টনিও ফিরিঙ্গী। আসল নাম হেনসম্যান এন্টনি (Hensman Anthony). জাতিতে পর্তুগীজ, ধর্মে খ্রিস্টান। নিজেই প্রচুর কবিগান রচনা করেছেন, আর তখনকার বাঘা বাঘা কবিয়াল ভোলা ময়রা, রাম বসু, ঠাকুর সিংহ সকলকে হারিয়েও দিয়েছিলেন!
বাংলার প্রথম ব্যাকরণ রচনা করেছেন ন্যাথানিয়েল (Nathaniel Brassey Halhed). সেটা অবশ্য তাদের দরকারে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকার্যে বিশেষ দরকার ছিলো।

আর , কিছুদিন আগের কথা, একবার জনকণ্ঠ পত্রিকায় পড়ছিলাম সম্পাদক সমীপে কলামে, কে যেন লিখেছে এক পরিহাসের কথা। এক জাপানী গবেষক তাঁর জীবনের সমস্ত সাধনা দিয়ে তিনি বাংলা ভাষা নিয়ে অনেক মূল্যবান গবেষণা করেছিলেন, আর সেইসব তথ্য তিনি এক পেনড্রাইভে সংরক্ষণ করেছিলেন। ঢাকায় এক কফিশপে বসে আবিষ্কার করেন কোনো এক দূর্বোক সেটা পকেটমেরে দিয়েছে।
তাঁর সর্বশেষ একটাই আবেদন ছিলো যে যে নিয়েছে, সে যদি দামী পেনড্রাইভের বদলে একটা বিশটাকা দামের ডিস্কেও তথ্যগুলো স্টোর করে ফেরত দেয় কোনো ভাবে, তার বদলেও তিনি টাকা পুরষ্কার দেবেন।
ছি! কি লজ্জা! হায় বাঙালী!

(৪)
দিনাজপুরে আর.কে.মিশণ রোডে এক বিদেশীর সাথে কথা হয়েছিলো, নাম ফ্রান্সিস। পুরোটুকুই পরিষ্কার বাংলায় কথা বললেন মাঝে প্রায় কোনো ইংরেজীও মেশান নি, খুব ভালো লেগেছিলো। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে তিনি বাংলা শিখলেন কি করে, উত্তর এলো- "বাংলাকে ভালবেসে"!

এরকম আরো অনেকেই আছেন, আপনারা দেখেও থাকবেন হয়তো।

(৫)
বিদেশীরা যতটা বাংলাকে গ্রহণ করেছে, আমরা তার থেকেও অনেক বেশি হুমড়ি খেয়ে পড়ছি তাদের ভাষায়, বিশেষ করে ইংরেজীতে। আমাদের অবশ্য দায়ে পড়ে নিতেই হয়, তাছাড়া উপায় নেই। নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা জ্ঞান-বিজ্ঞান, যোগাযোগ, সবই অসম্ভব ইংরেজী ছাড়া। বৃটিশরা শাসণ করে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে ইংরেজী, ফিল্মের জগতও প্রায় শাসন করছে বলিউড, বাংলাদেশীরাও হিন্দি বলে! কি যে জাদু করেছে তারা!

(৬)
বুকের পাটা বাঙালী একবারই দেখিয়েছিলো, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে, আর তারপর? সব বোধহয় স্তিমিত! মায়ের ভাষার মধ্যে প্রায় যতটা পারছি ইংরেজী ঢোকাচ্ছি। অবস্থা এমন হয়েছে, যে শুদ্ধ বাংলায় বলা আর কারো পক্ষেই সম্ভব না, চাইলেও না। অজান্তেই বেরোবে। আর তার মধ্যে আমাদের ভাব নেওয়ার মানসিকতা তো আছেই, সেটা এ জীবনে ঘুচবে না।

ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছি আমরা, আবার এই ভাষাকেই এখন ঘৃণা করছি আমরাই, আমাদের লোকেরাই। মাতৃভাষাকে কি করে ভালবাসতে হয়, তা শিখতে হবে জাপানী-জার্মান, রাশান কিংবা চৈনিক-স্প্যানিশদের কাছে। তাদের ভাষা শিখলেই তারা অর্ধ বা পূর্ণ স্কলারশীপ দেয় পড়াশোনার জন্য। ফাটাফাটি ইংরেজী জেনেও মাতৃভাষা ছাড়া কথাই বলে না। আর আমরা? শাদা চামড়া দেখলেই হইছে! বাকিটা আর বললাম না!

(৭)
ঘটনাটা উল্টোও হতে পারতো-
সারাবিশ্বের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার, এবং স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল যৌথ উদ্যোগে- প্রধান যোগ্যতাঃ বাংলা একাডেমীর কোর্স কম্প্লিট করে বাংলায় দক্ষ হতে হবে। যার নম্বর বেশি, সে পাবে অগ্রাধিকার, হুম! 8|

কিংবা, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে দেখা যাচ্ছে লোকজন বাংলা বলতে না পারলেও বুঝতে পারে। কেউ কেউ বলতেও পারে! আরে! কি করে পারেন? হয়তো উত্তর দিলো যে তারা অনন্ত জলিলের চরম ভক্ত, মুভি ইউটিউবে রিলিজ পেলেই ডাউনলোড করে দেখে! ;)

মনে হয়, খুব বেশি বড় না স্বপ্নটা। বাঙালীর অনেক মেধা আছে, অনেক ভালো লেখক, সাহিত্যিক, চলচিত্র নির্মাতা আর সৃজনশীল মানুষ আছেন। যে যার জায়গা থেকেই করতে পারেন অনেক কিছু। লিখুন, পড়ুন, গবেষণা করুন, কাজ করুন, যেটা পারেন, সেটাই করুন। আপনার মেধাকে দেশের কাজে লাগিয়ে দেখুন, সারা বিশ্ব তখন বাংলায় আসবে তার জন্য, আমরা জায়গা দিতে পারবো না।
এই লেখাটি এতো বড় হয়েছে যে কারো পড়ার ধৈর্য্য হবার সম্ভাবনা নেই, তারপরও যে ক'জনের চোখে পড়ে, তারা একটু একটু করে বাংলায় অনুবাদ লিখেন, আর সাথে অন্যকেও উৎসাহিত করেন, একদিন স্বপ্ন সত্যি হবেই।
আনন্দের কথা হলো, এই কাজ কিন্তু অনেকে শুরু করেও দিয়েছেন, যাঁদের অনেককে আমি চিনিও! তাঁদেরকে প্রণাম!
জয় বাংলা!



****


৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×