somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চোখ [ সত্যকাহিনীর ছায়া অবলম্বনে]

১৪ ই মার্চ, ২০০৭ বিকাল ৪:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কেউ চুরি দেখে
কেউ চোখ
কেউ মায়া দেয়
কেউ শোক !

সীমাহীন অন্ধকার পেরিয়ে মাঝে মাঝেই ভাবি , এই বুঝি পেয়ে যাব কোন মেঘহীন সূর্যের আকাশ ।পাখা মেলে ওড়া যাবে, না হয় দুদিনই ! তবু........
আঁধারটুকু পেরোলেই দেখি আরও বেশি , আরও গভীর , আরও ঘন হয়ে ওঠে কুয়াশা । কারও মন পোড়ে , কারও চোখ । কারও আত্মাই হয় ছাই। সেই সব পুড়ে যাওয়া আত্ম কলহের ধোঁয়া দারুন প্রতিহিংসায় ঢেকে দেয় সবটুকু দর্শন !

মাঝেই মাঝেই হোঁচট খাই । আঁধারে চলতে গেলে এইটুকু ব্যথা তো মেনে নেওয়া চাই। তাই , বয়সের সাথে সাথে চিৎকার টুকু গিলে ফেলতে শিখে নিয়েছি।

কুৎসিতের সাথে বসবাস । অবাক হই না কাল কেউটের লোলুপ দৃষ্টির সামনে । লকলকে জিহবার বিষ বাতাস চেনা আছে । ভয় পাই না এখন আর ।মৃতের থাকে না মরণের ভয়, সাধ থাকলেও থাকতে পারে!

5 বছর বয়সে যেদিন হলাম ধর্ষনের শিকার , সেদিন মা ছিলো পাশের রুমেই । দরজা ছিলো খোলা । করিডোরে কারও কারও পায়ের শব্দ , এমন কি অস্পষ্ট , অসহায় আমার গোঙানি ছাপিয়ে পাওয়া যাচ্ছিলো না, তা বলা যাবে না। মাত্র 5 ইঞ্চি দেওয়ালের এপার আর ওপার । মা হেসে হেসে কথা বললেন তার সমস্ত সমস্যা নিয়ে । সমাধানের জন্য পেলেন পরামর্শ । জানলেনও না। যার হাতে দেখভালের জন্য রেখে গেছেন তাঁর প্রাণপ্রিয় কন্যাটিকে , সেই রক্ষকের হাতেই ধীরে ধীরে খুন হয়ে যাচ্ছে তাঁর ছোট্ট ফুলকুঁড়ি, জন্মানোর অনেক ......অনেক আগেই।

জীবন যাদের শুরুর আগেই শেষ হয়ে যায় , তাদের আসলে জীবনের প্রতি আর কোন মায়া থাকে না। আমারও ছিলো না। কি হয়েছে , তা তো বুঝিনি , শুধু জানতাম, যা হয়েছে , সেটা হওয়ার কথা ছিলো না। কোথায় যেন ভীষন একটা কষ্ট শুধু সর্বক্ষন গিলে খেতে লাগলো । ধর্ষক বড় চতুর ছিলো । এমন কোন প্রমান রাখেনি , যাতে তাকে ধরা পড়তে হয় । তাই অপ্রমানিত , অব্যক্ত রয়ে গেল সব কষ্ট । শুধু মা মরে গেল । মানে আমার কাছে । আমি আমার সবটুকু সত্ত্বা দিয়ে তাকে ডাকার পরেও কেন সে বাঁচালো না আমাকে? সেইদিন থেকে তাই মা-ই আমার সবচেয়ে বড় শত্রু । আর আল্লাহ । সেও তো পারতো বাঁচাতে , পারতো না? আচ্ছা , 5 বছরে কি নামায পড়া ফরয? নামায পড়লে, বাঁচাতো আমাকে , এই তোমাদের আল্লাহ? কুরআন কি বলে? কি বলে তোমাদের মুমিন?


শৈশব বলে তো কিছু রইলো না আর। বাবার আদরে আদরে কোন মতে বেঁচে .........নাহ ........কেমন যেন চলে ফিরে বেড়ানো লাশ হয়ে রয়ে গেলাম। খালি জ্বর হয় । খেলি না।কথা বলি না। মানুষ দেখলেই লুকিয়ে পড়ি টেবিল কি খাটের নিচে । খাইনা , শুকিয়ে কাঠি হয়ে গেলাম মাত্র 1 মাসে। রাতের বেলা চিৎকার করে কানতে কানতে উঠে বসা নিত্যকার ব্যাপার হয়ে গেল। দুনিয়ার সব কটা ডাক্তার মিলেও বের করতে পারলো না , কি অসুখ বাসা বেধেছে এই ছোট্ট শরীরটায়। দোষ যেহেতু কোন ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার উপরে দেওয়া গেল না, দোষ সব এসে পড়লো আমার ঘাড়ে । আমিই খারাপ , আমিই "প্রবলেম চাইলড"।

উঠতে বসতে শুরু হলো বকাবকি । খাওনা কেন। কাঁদো কেন সারাক্ষন । তোমার এই ঘ্যান ঘ্যান , প্যান প্যান বন্ধ হবে কবে? একটা 6 , 7 কি 8 বছরের আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিলো না, যে কষ্টে দিনরাত আমি জ্বলে , পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছি ---সেটা আমারই দোষ? কি করে? অতএব , এবার শুরু হলো "ভালো মেয়ে " হওয়ার সংগ্রাম ।

আমূল বদলে দেওয়া হলো নিজেকে । যদি কেউ ভালো নম্বর পেলে প্রশংসা করে , ভাবি ফার্স্ট হলে বুঝি ভালোবাসবে । যদি কেউ গান গাইলে বলে , বাহ ! আমি দিনরাত এক করে ফেলি গলা সে ধে । হায় রে , বোকা মেয়ে ! সবই বদলে গেল। কথা বলা, হাটা চলা, নাওয়া -খাওয়া --- সবটাই মানুষের মন যোগানোর জন্য । বাবাকে খুশি করা চাই । বাবা বলেছে সফল আর ভালো মানুষ হতে হবে ।

এত সব করে দিন বদলে গেল। সকালে হাসতে হাসতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে , বিশ্বজয় করে বিকেলে বাড়ি ফেরা । শুধু বদলানো না রাত । নির্ঘুম রাত। কষ্টের রাত । কান্নার রাত । সন্ধ্যা পেরুলেই আতংকে হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যেতে চাইতো । কারন, ততদিনে জানি , সবাই ঘুমিয়ে পড়লেই বেরিয়ে আসবে , "আসল আমি "। আহত , ভাঙা আর একা ।

সারাটা রাত বালিশে মুখ গুঁজে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে , আর কান্না লুকাতে লুকাতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়তাম। একে কি ঘুম বলে? এই রকম আধো চেতন, আধো অবচেতনে কেটে যেত বাকি রাতটুকু । সকালে আবার সেই " সব ঠিক আছে, আমি ভালো আছি "--- অভিনয় শুরু !

অনেক বছরের চর্চায় এক সময় এই অভিনয় এতই নিখুঁত হয়ে উঠলো , সময় সময় আমারই মনে হতে লাগলো আমি বুঝি সত্যই ভালো আছি । ইস , আয়নায় দাঁড়ানো মেয়েটাকে তো চেনাই যায় না! কি দারুন দেখতে , কি সফল !!!

এই আরোপিত সত্যের ভিতরটুকু যে কত ফাঁপা , তা টের পেতাম মরে যাওয়ার ইচ্ছা হলে । সে আমার সারাক্ষনের ভাবনাই তো ছিলো ! 13 বছরে প্রথম আত্মহত্যা করবো বলে ঠিক করি । সেবার ফেরত এসেছিলাম, কারন মনে হয়েছিলো, দুনিয়াটা কি শুধুই নোংরা ? সবাই স্বার্থপর? নিঠুর? কেউ নেই কোমল , আশ্রয়দাত্রী , মমতাময়ী ? কেউ নেই একটু আদর করে , ভালোবেসে কাছে টানার ? আমার কষ্ট টুকু ভুলিয়ে দেবার? দেখি না , আরেকটু খুঁজে!

16 বছর যেদিন পূর্ণ হলো , সেদিন খুব ধুমধাম করেই পালিত হলো আমার জন্মদিন। অথচ কেউ জানলো না, তার 48 ঘন্টা আগে থেকে আমি পরিকল্পনা করছি , কোথায় , কি ভাবে মেরে ফেলবো নিজেকে । উঁহু, ব্যাপারটা দেখতে যেন হয় দুর্ঘটনা । নইলে আব্বু তো...........

ব্যালকনিটা খুব সুবিধা জনক । বেশ নিচু । যে কেউ একটু বেখেয়াল হলে পড়ে যেতেই পারে ! রেলিং এর উপর উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ভাবি , আর একটা স্টেপ-------নিলেই সব শেষ । শান্তি , শান্তি আর শান্তি । 11 বছর হয়ে গেল, আমি ঘুমাই না । এই বার ঘুমাবো ।কিন্তু , আব্বু? আর ছোট ভাইটা? আচ্ছা , আমি এভাবে মরে গেলে বাবাও যদি হার্ট এট্যাক করে! পুরো পরিবারটাই তো ভেঙে তছনছ হয়ে যাবে। বড় গরীব আমরা । আব্বু না থাকলে কে দেখবে ভাইকে ? অন্য সবাইকে? নাহ ! এতটা স্বার্থপর তো হওয়া যায় না! তাইলে ?

পিছিয়ে দিলাম আমার চলে যাওয়া । বাবা-মার থাকার জায়গা করা চাই । বুড়ো বয়সে চিকিৎসার টাকা চাই । চলাচলের জন্য গাড়ি ও তো চাই একটা ! ভাইটার উপার্জনক্ষম হওয়া চাই। বোনটার বিয়ে দেওয়া চাই । ঠিক আছে--সব করে দেব। তারপর ...............তারপর বিদায় নেব!

যেই ভাবা , সেই কাজ! অমানুষিক পরিশ্রম করলাম । ডিগ্রি হলো । উপার্জন হলো । বাড়ি হলো । গাড়ি হলো । বোনের বিয়েও হলো । ভাইটা , এই তো , গেল বছর চাকরী পেল । একটা মেয়েকে ভালোবাসে । বিয়েও করে ফেলবে । সব ঠিক ঠাক।

আমার দায়িত্ব শেষ , বুঝলেন ডাক্তার ইমন । আমার দায়িত্ব শেষ ।

আমার পরিকল্পনা বদলানোর চেষ্টা যে করিনি তা না। আমি জানি আপনি আমাকে কি বলবেন, কি প্রশ্ন করবেন । আমি চেষ্টা করেছি । বিশ্বাস করুন, চেষ্টা করেছি ।

মানুষকে চেনার চেষ্টা , বোঝার চেষ্টা , ভালো লাগার চেষ্টা , ভালোবাসার চেষ্টা । ঐ চেষ্টাটাই হয়েছে কাল !

মেয়ে হিসেবে এমনিতেই ইনটুইশন ক্ষমতাটা বেশিই । তার উপর মানুষ নিয়ে এত গবেষনা করার ফল হলো , আমি ভন্ডামি বড় দ্্রুত বুঝে ফেলি । যে মানুষই মিথ্যা বলুক না কেন, ধরা পড়ে যায় আমার কাছে । মানুষের চরিত্র সম্পর্কে কোন রঙিন চশমা 5 বছরেই হারিয়েছিলাম তো , তাই আমার চোখ বড় তীব্র । নোংরা মানুষ দেখতে দেখতে আমি সমস্ত ভালো লাগা হারিয়েছি । হারিয়েছি সব বিশ্বাস । মানুষ আর আমার কাছে "সৃষ্টির সেরা জীব নয় , ইমন, সৃষ্টির সেরা ভন্ডামি।"

আমি তো বদলে ফেলেছি নিজেকে । স্বাভাবিক জীবনের আশে । স্বপ্ন ভরা বুকে কত পথই তো হেঁটে দেখলাম। "মিথ্যে , কপট সংসারের আশায়" , ভালোবাসার আশায় কত হৃদয়ের কাছে ছুটে ছুটে গেলাম। শুধু একটু সততার খোঁজে । এক জোড়া মায়াময় চোখের খোঁজে । এেকটা ভরসার হাতের অন্বেষনে ! কই ? আমার এই চোখ আজ বড় ক্লান্ত ।

সবই বদলে দিলাম। শুধু এই চোখ দুটোকে যদি বদলে দিতে পারতাম! যদি মিথ্যে করেই দেখতে পারতাম ---বেঁচে থাকা মানে সুন্দর !

সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ৯:৩৯
৬৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আমার মন খারাপ, ফুল দিয়ো=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১২ ই মে, ২০২৬ দুপুর ২:৫৮



অকারণে মন ভালো না আজ
তুমি কোথায়?
এসো এক গুচ্ছ রঙ্গন নিয়ে
বাঁধো আমায় ভালোবাসার সুতায়।

অকারণে ভালো লাগে না কিছু;
তুমি কই গেলে?
রক্ত রঙ ফুল নিয়ে এসো;
উড়ো এসে মন আকাশে - প্রেমের ডানা মেলে।

কী... ...বাকিটুকু পড়ুন

সূর্যমুখী ফুলের মত দেখি তোমায় দূরে থেকে....

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ১২ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৫


সূর্যমুখী
অন্যান্য ও আঞ্চলিক নাম : রাধাপদ্ম, সুরজমুখী (হিন্দি)
সংস্কৃত নাম : আদিত্যভক্তা, সূর্যকান্তি, সূর্যকান্তিপুষ্প
Common Name : Sunflower, Common sunflower
Scientific Name : Helianthus annuus

সূর্যমুখী একটি বর্ষজীবী ফুলগাছ। সূর্যমুখীকে শুধু ফুলগাছ বলাটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাত যত গভীর হয় প্রভাত তত নিকটে আসে

লিখেছেন আরোগ্য, ১২ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:২১

গতবছর এই মে মাসের ১৭ তারিখেই আমার চোখের প্রশান্তি, আমার কর্মের স্পৃহা, আমার জননী এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী ও আমাদের কাছ থেকে মহান রব্বের ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে পাড়ি জমান। আব্বু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইচ্ছে করে

লিখেছেন বাকপ্রবাস, ১২ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৮

ইচ্ছে করে ডিগবাজি খাই,
তিড়িং বিড়িং লাফাই।
কুমারী দীঘির কোমল জলে
ইচ্ছে মতো ঝাপাই।

রাস্তার মোড়ে সানগ্লাস পরে
সূর্যের দিকে তাকাই,
সেকান্দর স্টোর স্প্রাইট কিনে
দুই-তিনেক ঝাঁকাই।

ঝালমুড়িতে লঙ্কা ডাবল,
চোখ কচলানো ঝাঁঝে,
ছাদের কোণে যাহাই ঘটুক,
বিকেল চারটা বাজে।

ওসবে আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মায়া বড় কঠিন বিষয় !

লিখেছেন মেহবুবা, ১২ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪০


মায়া এক কঠিন বিষয় ! অনেক চেষ্টা করে জয়তুন গাছ সংগ্রহ করে ছাদে লালন পালন করেছি ক'বছর।
বেশ ঝাকড়া,সতেজ,অসংখ্য পাতায় শাখা প্রশাখা আড়াল করা কেমন আদুরে গাছ !... ...বাকিটুকু পড়ুন

×