somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উর্মি-শর্মি , মুনকার-নাকীর জানি কই থাকে?(শেষ পর্ব- উৎসর্গ সাব্বির)

২২ শে মার্চ, ২০০৭ রাত ৮:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

[সত্য এই ঘটনা তুলে ধরতে কিছু শব্দ এসেছে যা আমি ব্যবহার করি না।ক্ষমাপ্রার্থী কেউ যদি বিব্রত হয়ে থাকেন।]

: "কুত্তার বাচচা , নাই মানে? নিয়ার ডেথ পেশেন্ট কি হাইটা বাইরে গেলো না উইড়া? ইউ মাদার ফাকার , আই উইল মেক দা হেড ফাক উইথ ইউ এ্যান্ড দেন ইউ উইল নো । টাকার লাইগা তোরা তো বউরেও মা..........তেও বেইচা দিবি । উর্মি কই ? "

বর্নার চিৎকারে চারিদিকে ঘোর অমঙ্গল নামে। চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারী মারমুখী হয়ে ওঠে । যদিও প্রচুর টাকা খেয়েছে আমাদের কাছ থেকে , তবু গালাগালি , তাও ওয়ার্ড ভর্তি লোক জনের সামনে । বাবুল ফুঁসতে থাকে লেজে পা পড়া সাপের মত ।কিছু করতে পারে না , কারন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল রিপোর্টার ,কে জানে কোন পত্রিকার , সাংবাদিক বন্ধু টন্ধু নিয়ে ওয়ার্ডেই ছিলো । চারিদিক থেকে ইন্টার্নী ডাক্তার , নার্সরা হই হই ছুটে আসে।

আমি ছাড়া বর্নাকে কেউ সামলাইতে পারে না। কিন্তু আজকে আমার ওর দিকে তাকাতেও ইচ্ছা করে না । মরলে মরুক, আমার কি- টাইপের একটা নির্লিপ্ততা চেপে বসে থাকে বুকে ।

উর্মি নেই ! নাস্তা খেয়ে খোঁজ নিতে এসে দেখি বেডে নাই । তার পর ওয়ার্ড , বারান্দা , সব তোলপাড় করেও আমরা পাই না ওকে । ছুটে দোতলায় যাই আমি । বিশ্বাস হয় না নার্সদের কথা । শর্মি , উর্মির ছোট্ট বোনটা মারা গ্যাছে । মাত্র ৩০ না ৪০ % বার্ন নিয়ে মারা যায় কি করে? সারারাত যমে আর উর্মিতে টানাটানি করেছে । আমরা ৩ জন মিলে বাঁচিয়ে তুলেছি ওকে । শর্মির তো সেই রকম কিছু লাগতো না। শুধু স্যালাইন ইনফিউশনের কাজটা করলেই ...........বার্ন ম্যানেজমেনেটের একটা সহজ সূত্র আছে । এত কেজি ওজনের এত বয়সের বাচচার এত % বার্ন থাকলে , এত ঘন্টায় এত মিলি স্যালাইন ঢুকবে । এই সূত্র সব ডাক্তার আর নার্সের মুখস্থ । পাশাপাশি শুধু একটু " ইউরিন আউটপুট মানে শরীর থেকে কত পানি বেরিয়ে গেল" এই মাপটা রেখে "যোগ-বিয়োগের ব্যালেন্সটা" করে নিতে হবে । ব্যস , এই তো ।কি এমন কঠিন কাজ!

এই কাজটাই যেই পোস্ট গ্রাজুয়েশনের স্টুডেন্ট ডাক্তারকে দেওয়া হয়েছিলো , সে করেনি ।ওয়ার্ডের বেডে শুইয়ে , স্যালাইনের একটা চ্যানেল চালু করে দিয়ে , নার্সদের উপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে উনি বাড়ি চলে গেছেন ঘুমাতে । রাত ভর সিনিয়ার কোন ডাক্তার না থাকলে , হাসপাতালের নার্সরা কে কেমন দায়িত্ব পালন করে , আপনারা যদি কেউ রাত্রিযাপন করে থাকেন ইমার্জেন্সী ওয়ার্ডে , তা হলে জানবেন। আল্লাহ ও ধনিকের । হাড় হাভাতে গরীবের "ফুটা পয়সা দামেরও না" মেয়ে শর্মিকে তাই কেউ বাঁচায়নি । না তার ডাক্তার , না নার্স , না আল্লাহ ।

যে অমানবিক, নিষ্ঠুর , স্বার্থপর শহর আর হাসপাতালে শর্মির মৃত্যু হয়েছে , সেখানে উর্মিকে আর এক মুহূর্ত রাখতে চায়নি তার গ্রাম্য সহজ সরল বাবা মা। তাঁরা জেনে গেছেন , এই শহর ,এই চাকচিক্য ভরা সর্বগ্রাসী ইট কাঠের রাক্ষুসে ক্ষুধায় পড়ে তাকলে উর্মিও বাঁচবে না। আর তাছাড়া , এখানে কে তাকে দেখে রাখবে ? কে চালাবে চিকিৎসার খরচ? শর্মিকে নিয়ে কবর দেওয়ার জন্য কে যাবে আর কে রয়ে যাবে পিছনে দ্বিতীয় একটি দীর্ঘায়িত , খরুচে অবহেলার পরিণতির জন্য ? যে ডাক্তাররা এক রাত ঘুম বিসর্জন দিতে চায় না , একটি শিশুর প্রাণ বাঁচানোর জন্য , তাদের হাতে নিরাপদ নয় কোন প্রান্তিক মায়ের বুকের ধন। তাই তাঁরা শর্মির লাশ কাঁধে নিয়ে , আপাদমস্তক পুড়ে যাওয়া উর্মিকে বুকে জড়িয়ে চলে গেছেন এই হাসপাতালের চত্বর ছেড়ে । কর্মচারীরা কেউ তাঁদের ঠিকানা রাখে নাই , রাখে নাই ধরে উর্মির পোড়া দেহ , রাখে নাই খোঁজ - কি প্রকারে এই হত দরিদ্র পরিবারটি পৌঁছাবে বহুদুর ছোট্ট তাদের গ্রামে । তবে টিপ সই নিতে ভোলেনি সেই ছাড়পত্রে , যেখানে মুখ ব্যাদান করে কয়েকটি শব্দ জানান দেয় , উর্মির মত "আল্লাহর মাল" আল্লায় নিলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমেই দায়ী থাকিবেন না । উর্মিকে তাহার অবিবেচক পরিবার সম্পূর্ণ নিজ দায়িত্বে বুঝিয়া পাইয়া , লইয়া যাইতেছে ।

বর্নার উন্মত্ত গালাগালি বন্ধ করা যায় না। ইন্টার্ন'স রুমে ওর অক্ষম চিৎকারও আমাকে সরব করতে পারে না। আমাকে কে কে , কি কি যেন বোঝাতে চেষ্টা করে ।

" আমাদের কিছু করার ছিলো না ।"
" এই সব অশিক্ষিত বাপ মা রে কি বোঝানো যায়?"
"একটা বাচচা মরছে বলে হাসপাতালটাই অপয়া হয়ে গেল? রাবিশ!"
"অন্য বাচচাটা ও তো মরবে , স্রেফ চিকিৎসা না পেয়ে , আরে বাবা , এই সব কেস কি বাড়িতে ম্যানেজ করা যায় !"

আমি শুধু একবার জিগেস করি , "ছাড়পত্র দেওয়ার আগে কনসার্ন্ড ডাক্তারের সাইন লাগে । আমারে ডাকেন নাই কেন? আমি তো ক্যান্টিনেই ছিলাম !"
"আহা, ইমন বোঝার চেষ্টা করো । দে ডিড নট ওয়ান্ট টু ওয়েট । ওদের নাকি লঞ্চ ছেড়ে দিবে । আমাদের কিছু করার ছিলো না।"
"একটা মাত্র বাচচা মরেছে বলে মন খারাপ? আরে এই রকম কত মরবে। এই সব ফালতু ইমোশন ভুলে যাও।" - সকালের রাউন্ডে এসে জ্ঞান দিয়ে গেলেন ডিপার্টমেন্ট হেড !

আমি সব বুঝতে পারি । আমি খুব তুখোড় ছাত্রী বরাবরই । আমি খুব মন দিয়ে ক্লাস করি , সব কটা বই মন দিয়ে পড়ি , প্র্যাকটিকাল ক্লাস গুলাতে মন দিয়ে সব দেখি আর মনে রাখি । তাই আমার সব মনে পড়ে যায় । আমি সব আমার কল্পনার চোখে দেখতে পাই। কি ভাবে উর্মি নামের একটা মাত্র ৭ বছরের মেয়েদেহ একটু একটু করে পঁচে যাবে । পোড়া জায়গা গুলোতে থাকবে গলিত , বিবমিষা জাগানো মাংস । একটু একটু করে সে গুলো আলগা হয়ে যাবে হাড় থেকে । প্রতিটা উন্মুক্ত নার্ভ এর ছড়ানো ছিটানো মাথা গুলো অকল্পনীয় , অসহ্য ব্যাথায় উর্মিকে প্রতি মুহূর্তে বাধ্য করবে দ্রুত মৃত্যু কামনা করতে। ওর সারা গা পোড়া , কোথাও কোন চামড়া নেই। শরীর থেকে একটু একটু করে বেরিয়ে যাবে দেহরস । উর্মি পিপাসায় কাতর হবে । পানি চাইবে । পুড়ে যাওয়া ফুসফুস আর কন্ঠনালী থেকে সেই করুন আকুতির সাথে গমকে গমকে বেরিয়ে আসবে রক্ত । একটি ফোটা পানিও ওর ঝলসে যাওয়া জিহবায় এসিডের মত মনে হবে। ও মরবে । তবে ধীরে ধীরে , একটু একটু করে , হাবিয়া দোজখের পাপিষ্ঠার মত ।

পাপীই তো । বাংলাদেশের মত দেশে অত গরীব হওয়াটাই সবচেয়ে বড় পাপ।

আমি আমার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে বার বার একটাই দোয়া করি উর্মির জন্য , আমার হারিয়ে যাওয়া পোড়া মেয়েটার জন্য , যার বিয়ের নাক ফুল আমার কানে লতায় ফাঁসির বৃত্ত হয়ে ঝুলে থাকে , আমি ওই মেয়েটার জন্যই দোয়া করি ----- আল্লাহ , মৃত্যু যেন হয় দ্রুততম। এক্ষনি । এই মুহূর্তে । ওকে আর একটা সেকেন্ড ও কষ্ট দিও না।
----------------------------------------------
২০০৩ সালের ঐদিন বর্না আর আমি সিদ্ধান্ত নেই ডাক্তারী ছেড়ে দেব। আমাদের উর্মি-শর্মিরা হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে না। তার আগেই মরে যায়। জন্মানোর মুহূর্তটাই আসলে ওদের জন্য মৃত্যু সমন। ওরা বাংলাদেশের সেরা হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলেও মরে যায় । কি হবে প্রেসক্রিপসন লিখে ? দারিদ্রের কোন ওষুধ বেরিয়েছে ? অথবা অবহেলা নিরোধক কোন সিরাপ? ভালোবাসা নামক কোন ম্যাজিক পোশন? তাহলে আর কাগজ লিখে কি হবে ।ওটা করার জন্য হাজার হাজার ডাক্তার আছে । বর্না আর আমি ইট কাঠের চত্বর ত্যাগ করে বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে , হাট-মাঠ-ঘাটে ঘুরি ফিরি পাবলিক হেলথের নামে । যদি কোথাও , কোন শান্ত জংলায় পেয়ে যাই কোন দিন , আমার হরিনী চোখের উর্মি আর তুলতুলে শর্মিকে !
---------------------------------------------
!@@!582972 !@@!582973 !@@!582974 !@@!582975 !@@!582976
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ৯:৪৩
৪২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সামু একটি ছোট নৌকা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:২৫



একটা ছোট নৌকা, পাল তুলে, পাড়ি দিচ্ছে -
অন্তহীন তারার রাস্তা পেরিয়ে।
পেরোচ্ছে গ্রহ, ধূমকেতু, ছুটন্ত আগুনের টুকরো,
দূরে কোথাও ধাক্কা লাগে, তারপর শব্দটা মিলিয়ে যায়।
ধীরে, খুব ধীরে এগোয় নৌকা;
তবু এগোয়।

নৌকায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোর্টাল – ২ গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৭


তখন বেশ ঠান্ডা পড়ে গেছে। সেপ্টেম্বরের রাত।
বরফ পড়া শুরু হয়নি। মন্ট্রিয়লের রাস্তা জনাকীর্ণ। বাড়ি থেকে বের হলে কো-দ্যেনিশ রাস্তার শেষ প্রান্তে একটা লাইব্রেরি আছে। তার পরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে ১০ টি বছর পার করলাম

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:০২



ব্লগে ১০ বছর পার করে দিলাম। কত সময় কেটে গেছে এখানে, কত পরিচিত মুখ রয়ে গেছে এখানে। তবুও ভালোবাসার বন্ধন যেন শেষ না হয়।

যে কবিতাটা দিয়ে ব্লগিং শুরু করেছিলাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিন্নাহকে জানতে হলে পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস জানতে হবে। পর্ব-১

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৩



পাকিস্তান সৃষ্টির বছরখানেক আগে ১৯৪৬ সালে বোম্বে শহরের দুই নামকরা পার্সি ডাক্তার বুঝতে পেরেছিলেন যে ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ এবং আইনজীবী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আয়ু আর বেশিদিন নেই। ডা.... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ ডিসেম্বর ১০-১৬: বিশ্ব বাংলাদেশকে নিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ছিল

লিখেছেন কলাবাগান১, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:১১


লিখা টির ইতিহাস ভিত্তিক ইনফো এআই থেকে সংগৃহীত

আমরা সবাই জানি যে ১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বর বিকেলে পাকিস্হান হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পন করে মিত্রবাহিনীর কাছে। কিন্তু আমরা অনেকেই হয়তো জানি না,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×