somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রক্তে লেখা ইতিহাস - দুই একটা কথা -২

০২ রা নভেম্বর, ২০০৭ দুপুর ২:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস। পাক-ভারতের মাঝে সবে মাত্র যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় তাসখন্দে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মধ্যে শান্তি প্রস্তাবের আলোচনা চলছে। এমনি এক উত্তেজনাকর সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন ছাত্র আর যশোরের এম এম কলেজের কয়েক জন ছাত্র তাদের পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী স্বাধীন পূর্ব বাংলার মুক্তি সনদ চূড়ান্ত করার জন্য মিলিত হলো এক গোপন সম্মেলনে। সম্মেলন স্থল নির্ধারিত হয়েছিল পল্লী বাংলার এক অজানা অচেনা গ্রাম। যশোর জেলার মনিরাম্পুর থানার কপোতাক্ষ নদীর তীরঘেষা ঝাঁপা গ্রাম। গ্রামের পশ্চিমে কপোতাক্ষের তীর ছুঁয়ে হাট। হাটের বিপরীত দিকটাতে বিস্তীর্ণ ধান আর পাটের ক্ষেত।

বিস্তীর্ণ এই পাটের একটা ক্ষেতে চললো দুদিন ব্যাপী গোপন সম্মেলন। সম্মেলনে উপস্থিত হতে পেরেছিলাম আমি , দাউদ, আব্দুল খালেক (মনি), সাখাওয়াত হোসেন, ফজলুর রহমান, শরিফুল ইসলাম। এই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য যশোর কলেজের নির্দিষ্ট কয়েক জনকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। যার একটা চিঠি ধরা পড়ে গেল যশোর ডি বি পুলিশের সেন্সরশীপ প্রসেসে। এই সূত্র ধরে মদিউদ্দিন , ফসিয়ার রহমান আর কামরুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই গ্রেপ্তারের সংবাদ পেয়ে দ্রুত "মুক্তি সনদ" অনুমোদন ও গ্রহন করে সম্মেলন শেষ করে দেওয়া হয় এবং বাকীরা যে যার মত গা ঢাকা দিতে বাধ্য হই।

আমি আর দাউদ চলে এলাম ঢাকায় বন্ধু শামসুর রহমানের আস্তানায়। সে তখন সোশাল ওয়েলফেয়ারে চাকরী করে। থাকতো পুরানো ঢাকার ২৯ খাজা দেওয়ান লেনের এক মেসে। মেসটা নিরাপদ মনে না হওয়ায় আমরা আমলিগোলায় আরেকটা মেসে চলে গেলাম। আমাদের সবার বিরুদ্ধে ডিপিআর এ কেস দেওয়া হয়েছিল যার অর্থ ছিল বিনা বিচারে আটক এবং জেল। আমি এবং দাউদ আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় একদিন তোহা সাহেবের পুরনো ঢাকার বাসায় সাক্ষাত করলাম। খুব বেশি কথা হলো না।তবে তোহা সাহেবের কমুনিজমের দর্শনের চেয়ে আমাদের কাছে যে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার প্রশ্ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা বেশ স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরা হয়েছিল।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ডিস্প্যারিটি শব্দটা ছিল একটি বহুল উচচারিত শব্দ। বিশেষ করে ইত্তেফাক পত্রিকায় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ডিস্প্যারিটি বা বৈষম্যগুলো তুলে ধরা হতো। চাকরী, ব্যবসা, বাণিজ্য, অর্থনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রের বৈষম্য পূর্ব পাকিস্তানের যুব সমাজকে দারুন ভাবে নাড়া দিতো। কিন্তু আমরা এটাকে বৈষম্য বলে মেনে নিতে রাজি ছিলাম না। আমরা এটাকে বলতাম পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন ও শোষন , যার একমাত্র সমাধান হলো পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা!

আমাদের সূচনা বলা যায় ১৯৬০ সাল হতে। যশোর এম এম কলেজের পুরোনো হোস্টেল। এর পাচিলের পশ্চিম পাশের রাস্তার অপর দিকে নাভারন মেসে থাকতো দাউদ, শাহজাহান, রশিদ, মহিউদ্দিন, ফসিয়ার প্রমুখ। যশোর কলেজের কিছু ছাত্র। এই মেসে চলতো আলোচনা। আলোচনায় অংশগ্রহনকারী আমরা সবাই পূর্ব বাংলার স্বাধীনতাপন্থী ছিলাম।

আত্মগোপন থাকা অবস্থাতেই বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লুকিয়ে থেকে আমরা তখন সংগঠনের কাজ করে যাচ্ছিলাম। ইতমধ্যে ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষনা করেছেন। এই সময়ে একদিন যশোরের আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাড. মোশাররফ হোসেন গোপনে খবর পাঠালেন যে, আমাকে এবং দাউদকে বঙ্গবন্ধু ডেকে পাঠিয়েছেন।

ঢাকায় দেখা করার জন্য নির্দিষ্ট দিন ক্ষণে আমরা পুরনো পল্টনের আওয়ামী লীগ অফিসে উপস্থিত হলাম। বঙ্গবন্ধু তার ভীষন ব্যস্ততার মাঝেও আমাদের আলাদা করে পাশের কামরায় নিয়ে গিয়ে কথা বললেন !

ঃ " তোমাদের কর্মসূচী ফাঁস হলো কি করে? "
আমরা ডি বি পুলিশের সেন্সরশীপের কথা বললাম। বঙ্গবন্ধু আরও সতর্ক হওয়ার উপদেশ দিলেন।

আমরা এক পর্যায়ে ৬ দফার সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন তুললাম !
বঙ্গবন্ধুঃ ৬ দফা টফা কিছু না। সব আসলে এক দফা । [ ১৯৬৬ সাল]
আমিঃ ১ দফা অর্জনের জন্য যে সংগঠন দরকার তার ব্যবস্থা কোথায় ?

তিনি বিস্তারিত কিছু বললেন না। শুধু বললেন ............... [ পরবর্তী কোন পর্বে প্রকাশিতব্য]

এই ছোট্ট ঘটনাটার বর্ননা এখানেই শেষ ।
লক্ষনীয় বিষয় ২ টি।

১। আমাদের মত ছাত্রদের সংগঠিত একটা বিষয় যা কোন বড় আকারের রাজনৈতিক বিষয় ছিল না, ছোট হয়েও বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টি এড়ায়নি । তিনি আমাদের মত নাম গোত্রহীন ছাত্রকে ডেকে জানতে চেয়েছেন এবং শুনতে চেয়েছেন স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা।

২। ৬ দফার আসল উদ্দেশ্য ছিলো স্বাধীনতা অর্জন তা তিনি আমাদের সামনে উচচারন করতে এতটুকু দ্বিধা বোধ করেননি।

বাংলা এবং বাঙালি জাতির মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য তাঁর নিঃশঙ্ক চিত্তে যে এতটুকু পরিমান সংশয় ছিল না, এটা তারই প্রমাণ।


[আমরা যেন সত্য ইতিহাসকে চিনতে শিখি, বুঝতে শিখি, জানতে আগ্রহ হারিয়ে না ফেলি। লেখাটি গ্রুপ ক্যাপ্টেন ফজলুল হক ,স্বাধীনতা যুদ্ধে ৮ নং সেক্টর ( যশোর,কুষ্টিয়া সম্পূর্ণ এবং খুলনা , ফরিদপুরের কিছু অংশ) এর একজন মুক্তিযোদ্ধার নিজ জবানীতে বর্নিত।
জনস্বার্থে পুনঃপোস্ট । এই ইতিহাসের টুকরো টুকরো বর্ননা চলতে থাকবে । ]
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ১২:৫৫
২৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পূর্বপুরুষের অপরাধের দায় বর্তমান জেনারেশনকে দেওয়া অন্যায়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা জুন, ২০২৬ রাত ১০:৪৩

"দোস্ত, ওরা আমাকে এক পাকিস্তানীর সাথে বন্ধুত্ব করতে বলছে যে কিনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উলাটা-পাল্টা কথা বলেছে। আমি সেই বক্তব্যের প্রতিবাদ করে রুম থেকে বের হয়ে এসেছি।" রাতেরবেলা দেখা হলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ ও আত্মহত্যা (তথ্য এআই দ্বারা যাচাইকৃত)

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ০৩ রা জুন, ২০২৬ রাত ১২:১৯

গত ১ বছরে বাংলাদেশে আত্মহত্যার সংখ্যা প্রায় ১৫,০০০ জনের মতো। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৪০–৪১ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় সামান্য বেশি।

বাংলাদেশে আত্মহত্যার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান (২০২৫–২০২৬):
**মোট আত্মহত্যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভবিষ্যত স্বপ্ন।

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা জুন, ২০২৬ রাত ১২:৪৭

পাঁচ বছর আগে এই গানটা লিখেছিলাম। আজ গানে 'পরিবর্তন' করলাম।
ঝগড়া করতে চাওয়া সব মানুষদের উৎসর্গ করছি। ;)



ভবিষ্যত সম্পূর্ণ একটা স্বপ্ন
যেখানে তুমি আমি বাধাহীন
আজকের দিনটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনে কিছু করা বলতে আসলে "প্রচুরস" টাকা কামানো বলে!

লিখেছেন ঋণাত্মক শূণ্য, ০৩ রা জুন, ২০২৬ ভোর ৫:৫৯

স্কুলে যখন ছিলাম, তখন "প্রচুরস" শব্দটা আমরাই তৈরী করি। প্রচুর দিয়েও যখন যথেষ্ট বোঝানো যায় না, তখন "প্রচুরস" ব্যবহার করা হয়, প্রচুরের প্লুরাল আর কি।



আমার আব্বার বইয়ের দোকান ছিলো।... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পতনের অপেক্ষায়...

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০৩ রা জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৪০


(ছবিটার পুওর কোয়ালিটির জন্য দুঃখিত। নিজের তোলা এর চেয়ে ভালো কোন ছবি পেলে পরে এটা রিপ্লেস করে দিব)

আমরা এখন...
পাকাফল হয়ে হয়ে ঝুলে আছি,
ভূমিপানে নতমুখে,
পতনের অপেক্ষায়....... ...বাকিটুকু পড়ুন

×