সন্ত্রাস দমন আর বিশ্বশান্তির ব্যাপারী আমেরিকা ফিলিস্তিনি নারী-শিশু হত্যার জন্য সেখানে যুদ্ধোপকরণ পাঠাচ্ছে। ইসরাইলী কসাই নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সারাবিশ্বের মানুষ প্রতিবাদ করছে। বাংলাদেশেও কমবেশি সেটা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে মাদ্রাসা ছাত্র-শিক্ষক, আলেম-ওলামাদের সমন্বয়ে গঠিত হেফাজতে ইসলাম ‘খামোশ’ হয়ে রয়েছে। ১৩ দফা দাবি নিয়ে দেশ কাঁপানো হেফাজত নেতা সর্বজন শ্রদ্ধেয় আল্লামা আহমদ শফী কী ঘুমিয়ে রয়েছেন? গাজার মুসলিম নারী শিশুদের কান্নায় কী তার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় না? ফিলিস্তিনে ইহুদিদের মুসলিম নিধনের প্রতিবাদ করার দায় কী হেফাজতের ওপর বর্তায় না? নবীজির শিক্ষা কী বলে? নাকি এনজিওর টাকা বন্ধ হওয়ার ভয়ে বাংলাদেশের নারী নেত্রী তথাকথিত মানবাধিকার সংগঠনগুলো যেমন গাজায় গণহত্যার প্রতিবাদ করছে না; তেমনি কোনো শক্তির ভয়ে এবং আর্থিক লাভালাভের জন্য হেফাজত গাজায় মুসলিম নিধনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে না? মতিঝিল শাপলা চত্বরে লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ করা হেফাজতের ‘গাজা ইস্যুতে রহস্যজনক নীরবতা’ নিয়ে সর্বত্রই আলোচনা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে হেফাজত কী সত্যিই ইসলাম পন্থী সংগঠন না সুবিধাবাদী সংগঠন?
ইসরাইলী বর্বর আগ্রাসন ও নিষ্ঠুর হামলায় ফিলিস্তিনের গাজা এখন এক বিধ্বস্ত জনপদ। গত ০৮ জুলাই থেকে ইসরাইলী হামলায় নিহত হয়েছে প্রায় ১৪শ’ নিরপরাধ মানুষ আর আহত হয়েছে কয়েক হাজার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা। আমেরিকা সেখানে আরো যুদ্ধাপকরণ পাঠাচ্ছে মুসলিম নারী শিশু হত্যার জন্য। ইহুদি আর্মি জাতিসংঘ পরিচালিত স্কুলে হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাটিকে জানিয়ে দিয়েছে ইসরাইল থোরাই কেয়ার করে জাতিসংঘকে। ইহুদিদের হামলা থেকে নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ কেউই রেহাই পায়নি। ইসরাইলী বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ফিলিস্তিনের ছোট ছোট শিশুরা যেভাবে মারা গেছে তার ছবি দেখে কোন মানুষ স্থির থাকতে পারে না। চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। গাজার মানুষগুলোর এমন মর্মান্তিক দুর্দশায় আজ আমরা গভীরভাবে শোকাহত এবং মর্মাহত। বাংলাদেশের নেতানেত্রীরা ফিলিস্তিনের মাহমুদ আব্বাস আর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নেতাদের মতো মাথা বিক্রী করেননি কারো কাছে। সে জন্য শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়াসহ সর্বস্তরের মানুষ গাজায় ইহুদি হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদ করেছেন। খুনের নেশা নেতানিয়াহুকে পেয়ে বসেছে। তার আরো রক্ত চাই। বিশ্বের প্রভাবশালী মিডিয়াগুলো ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় গণহত্যার লোমহর্ষক চিত্র সেভাবে প্রচার হচ্ছে না। এ অবস্থায় আমরা গাজায় ইহুদি হত্যাযজ্ঞ বন্ধে প্রতিবাদের ঝড় তুলে বিশ্বকে নাড়া দিতে পারি না? বিশ্ব বিবেককে চাপেটাঘাত করতে পারি না? ঢাকায় দলমত নির্বিশেষে ১০ লাখ লোকের সমাবেশ করে বিশ্বকে জাগিয়ে তুলতে পারি না? টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত মানববন্ধন, মানবপ্রাচীর তৈরি করে বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিতে পারি না? অবশ্যই পারি। বাংলাদেশের মানুষ পারে না এমন কিছু নেই। সুকান্ত ভট্টচার্য লিখেছেন ‘বিশ্ব অবাক তাকিয়ে রয়/ জ্বলেপুরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়’। বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবপতাকা তৈরি করে গ্রীনিজ বুকে নাম লিখিয়েছে। লাখো লাখো লোক এক সঙ্গে জাতীয় সংগীত গেয়ে ইতিহাস গড়েছে। এমনকি ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার সময় জার্মানির বৃহৎ পতাকা তৈরি করে গ্রামের এক কৃষক হৈচৈ ফেলে দিয়েছে। যে জাতি মানব পতাকা তৈরি করে গিনেস বুকে নাম ওঠায়, যে দেশ জাতীয় সংগীত গেয়ে ইতিহাস রচনা করে, সে জাতি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তর মুসলিম দেশ হিসেবে গাজায় ইসরাইলী হত্যাযজ্ঞ বন্ধের প্রতিবাদে ১০ লাখ লোকের সমাবেশ করতে পারবে না কেন? রাজনৈতিক এবং বিভিন্ন ইস্যুতে মতভেদ থাকলেও গাজায় ইসরাইলীদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সবাই একমত। বামপন্থী, ডানপন্থী, মধ্যপন্থী সব দল, সামাজিক সংগঠন, সরকারি-বিরোধী দল এবং মাঠের বিরোধীদল সবাই ইসরাইলী আর্মিও হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে সোচ্চার। সকল দল প্রতিবাদ করছে, বিবৃতি দিয়েছে, বিশ্বের প্রভাবশালী নেতাদের প্রতি এ হত্যাকা- বন্ধের দাবি জানিয়েছে। কাজেই গাজায় ইসরাইলী হত্যাযজ্ঞ বন্ধের প্রতিবাদে ঢাকায় সমাবেশ করার উদ্যোগ নেয়া হলে কারো (প্রশাসন) বাধা দেয়ার কথা নয়। এটা কোনো সরকার পরিবর্তনের কর্মসূচি হবে না; তাই সরকার বাধা দেবে না। দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ টিভি পর্দায় গাজার রক্তাক্ত শিশু ও গর্ভবতী নারীদের লাশের চিত্র দেখে চোখের পানি ফেলছে। কাজেই বড় কোনো কর্মসূচি দেয়া হলে সবলেই বিবেকের তাড়নায় সমবেত হয়ে প্রতিবাদ জানাবে। আর শুক্রবার বায়তুল মোকাররম মসজিদের ৫/৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় যেসব মসজিদ রয়েছে তাকে জুম্মার নামাজ আদায় করেন প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ মুসল্লি। সমাবেশের আয়োজন করলে তারাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাবেশে যোগ দেবেন। ফলে মানবপতাকা তৈরি ও জাতীয় সংগীত গাওয়ার আয়োজনে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে গাজার বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সমাবেশের আয়োজকদের তেমন অর্থ খরচ করতে হবে না। আর অর্থ লাগলেও সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে। নিকট অতীত সে অভিজ্ঞতা হয়েছে। শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে লাখ লাখ মানুষ উপস্থিত হয়েছিল। ঢাকার আশপাশের জেলা কুমিল্লা, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ থেকে লাখ লাখ মানুষ স্বতঃর্স্ফূতভাবে পায়ে হেটে শাপলা চত্বরে এসেছিল। এমনকি সিলেট, সুনামগঞ্জ থেকে পায়ে হেটে রওয়ানা দিয়েছিল আলেম ওলামা, মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক ও তৌহিদী জনতা শাপলা চত্বরের সমাবেশে যোদ দিতে। সে সময় পুলিশি বাধা, ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলা উপেক্ষা এবং প্রতিহত করে মানুষ ঢাকায় মুখে এসেছে। রাস্তায় রাস্তায় সাধারণ মানুষ, গৃহিনীরা তাদের খাবার দিয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান শাপলা চত্বরের সমাবেশে অংশ নেয়া মানুষের জন্য তরমুজ, কলা, ক্ষিরা, বাঙ্গি, মুড়ি মুরকী, বিস্কুট, চিড়ামুড়ি দিয়েছে। ইসরাইলী হামলার প্রতিবাদে ঢাকায় কোনো বড় সমাবেশের ডাক দিলে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




