somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বড়গল্প: পুলিশ ও তিন ক্রিমিনাল এবং এক নুপূর ।

১৫ ই নভেম্বর, ২০১৪ দুপুর ২:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

-স্যার, পুলিশ শালারপুত আইছে, কর্মচারী ছদরুল গালের একপাশে হাত রেখে কাঁপতে কাঁপতে বলছে । তাকে দেখে মনে হচ্ছে চড়টা ভালোই খাঁসা ছিল ।

-বিকালে আসতে বল, আমি এখন বিজি, মোবারক সাহেব পেপার পড়তে পড়তে বলল ।
মোবারক সাহেব ভালিয়াডী এলাকার একজন এমপি এবং কথিত গডফাদার । জনগন উনাকে যোগ্য মনে না করলেও কিভাবে যেন সেই জনগনের ভোটেই তিনি জয়ী হন ।কিছুটা ভৌতিক বটে !

-স্যার ওরে সিরিয়াস মনে হচ্ছে, ছদরুল বললো ।
মোবারক সাহেব চশমার ফাঁক দিয়ে ছদরুলের দিকে তাকাতে বুঝতে পারে ‘হি ইজ সিরিয়াস’ ।

-যা, আসতে বল ।
এমনেই আছি নানা গেড়াকলের ভেতর, আবার এইসব বাইনছতগুলাও জ্বালানোর জন্যই মনে হয় পুলিশে চাকরী নিচে,মোবারক সাহেব বিড়বিড় করে বলতে থাকেন ।
এসেই স্যালুট দিয়ে দাড়ায় পুলিশ যদিও মনে মনে কইস্সা লাথি দেয় ।

-বসো, বলে মন্ত্রীসাহেব পেপারটা গোছ করে টেবিলের উপর রাখেন ।

-স্যার কেমন আছেন ?

-তোমাগো জ্বালায় কি ভালো থাকতে পারি !এখন আবার কি ঝামেলা নিয়ে আসছো ?

-তেমন কিছু না স্যার, আপনি নাকি আপনার পিএস রফিকুল সাহেবের মেয়েকে জোর করে… ।
মন্ত্রীসাহেব হাতের ইশারায় পুলিশকে থামিয়ে দিয়ে উত্তেজিত গলায় বলতে থাকে,

-শুয়োরের বাচ্চার এত্তবড় সাহস আমার নামে কেইস করে ! ওর মেয়ের তো শত জনমের সৌভাগ্য যে আমি ওরে… ।
তিনি একটু ঠান্ডা হয়ে কপাল চুলকাতে চুলকাতে আবার বলেন,

-আচ্ছা বাদ দাও, রফিকুলরে আসতে বইলো আমরা মিটমাট করে ফেলমো ।

-ও বলেছে আর আসবেনা ।

-বাইনচত শালা, যাও ওরে ধইরা নিয়া আসো, মন্ত্রীসাহেব খেকিয়ে উঠেন।

-স্যার এইটা এখন তো আর সম্ভব না, বোঝেনই তো নারী নির্যাতন মামলা, অলরেড়ী অনেকক্ষানি আগায়া গেছে ।

-তো ! তুমি কি বলবার চাও? আমারে এরেষ্ট করবা ? নাও এরেষ্ট কইরা লইয়া যাও । মন্ত্রীসাহেব তাচ্ছিলের সুরে বলেন ।

-না স্যার, ছি ছি এইগুলা কি বলেন ।

-তাইলে তুমি কি কইবার চাও ?

-স্যার বোঝেনই তো ঝামেলার কাম, হাত কছলাইতে কছলাইতে পুলিশ বলে ।

-এত কাহিনী কর ক্যান, সিধা সিধা কইবার পারো না । কত লাগবো ?

-স্যার আপনার খুশী ।

-ছদরুল বান্ডিল দুইডা নিয়া আয় তো । শোন পুলিশ, এই নিয়ে আর যেন কোন ঝামেলা না অয় ।

-স্যার আরেকটা বান্ডিল হইলে একটু ভালো অইতো, বুঝেনই তো আজকালকার দিন, ম্যালা খরচ ।পুলিশ কাচুমাচু করে বলে।

-ঠিক আছে দিলাম, তয় মামলা ফিনিশ চাই ।

-সেই নিয়ে আপনারে চিন্তা করতে হবে না স্যার ।আমি সব মিটমাট করে ফেলমু । আমি তাহলে উঠি এখন স্যার।

-হুম, আচ্ছা তোমার এই নামটা কি আসল ?

-কোনটা স্যার ?

-এই যে তোমার নেমল্যাট লেখা ‘পুলিশ খন্দকার’
পুলিশ খন্দকার ভালিয়াডী থানার এ এস পি ।বলা যায়, যেমন এমপি তেমন এ এস পি । অনেক কেইস সে হাওয়া করে দিয়েছে খাঁছকাটা কাগজের বদৌলতে ।

-জি স্যার, আমার বা্বা পুরা গেরাম খাওয়াইয়া এই নাম রাখছে ।

-হুম তোমার বাবা অনেক ট্যালেন্ট , তোমারে দেখলেই বোঝা যায় তোমার বাবা একদম পারফেক্ট নাম রেখেছেন তোমার ।

-কেন স্যার ?

-এই যে খেঁক শিয়ালের মত খাব দিয়ে থাক সুযোগের আসায় ।

-স্যার কি যে বলেন না, এই বলে পুলিশ অট্ট হাসি দিয়ে বের হয়ে যায় ।

আফজাল খন্দকার একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা ।তার সফলতা বলতে সর্বসাকুল্যে ৮৩৩২ টাকার সরকারী চাকরি করেও সরাজীবন ঘুষ না খেয়ে থাকা ।আর এর প্রভাব পড়েছে তাঁর পরিবারে তাই এখনো সমাজে তার পরিবার নিম্ন মধ্যবিত্তদের কাতারেই পড়েন ।তাঁর সম্পদ বলতে আছে এক বউ আর দুই ছেলে পুলিশ খন্দকার এবং মেজবাহ খন্দকার ।যদিও বড় ছেলে পুলিশকে এখন আর সম্পদ মনে করেন না তাকে এখন তিনি পাপ মনে করেন । আফজাল সাহেব পুলিশদের খুব ঘৃনা করেন কিন্তু তিনি তাঁর বড় ছেলের নাম পুলিশ খন্দকার রেখেছেন একটি মহৎ উদ্দেশ্যে ।তিনি চাইতেন ছেলে বড় হয়ে একজন সৎ এবং সাহসী পুলিশ অফিসার হবে এবং পুলিশের মান ফিরিয়ে আনবে । এই কারনে ছেলের নাম পুলিশ রেখেছেন যেন তার নামের বদৌলতে পুলিশ আসল মর্যাদায় ফিরে আসতে পারে ।তার ছেলেও ঠিক সেই পথের জন্যই বড় হতে লাগলো । বিসিএস পরিক্ষায় মেধার পরিচয় দিয়ে পুলিশে চাকরি পায় । এর আগ পর্যন্ত ছেলে ঠিকই ছিল কিন্তু পুলিশে জয়েন করার পর তার আসতে আসতে খোলস পাল্টাতে থাকে ।আর এই খোলস পাল্টাতে পাল্টাতে সে এখন টাকার মূল্যে বিক্রিত পরিপূর্ন মাল । ছোট বড় সকল কেইসই ডাকা পড়ে অযু হাতের বান্ডিলে ।
আফজাল সাহেবের কড়া নিষেধ বাসায় যাতে এইসব বান্ডিল না ডুকে বা পরিবারের কোন খরচেও যাতে এসব গু ব্যবহৃত না হয় ।প্রয়োজনে তিনি ভিক্ষা করে সংসার চালাবেন । তাই বড় ছেলে পুলিশ এখন বাসায় আসলেও তেমন কারো সাথে কথা হয় না । সে বাসায় আসে শুধু ঘুমানোর জন্য । তার ছোট ভাই এখনো পড়াশোনা করে ।একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সেকেন্ড ইয়ারে আছে । মেজবাহ তার মত এত ট্যালেন্ট নয় তাই সরকারী কোথাও চান্স পায়নি । বাবা এখন ছোট ছেলের খরচ চালাতে খুব হিমশিম খাচ্ছেন প্রতিমাসে ধারদেনা লেগেই থাকে । পুলিশ তার মাকে বলে আমার বেতন তো আর ঘুষের টাকা নয় এইখান থেকেই টাকা নাও । কিন্তু বাবা রাজী হয় না উনি বলেন ঘুষের কারনে এই বেতনের টাকাও গু হয়ে যায় ।

আজ রাতে পুলিশ তার বাসায় ফেরে রাত ৩টায় । সাধারনত সে বেশী রাত হলে বাসায় ফেরে না থানায় থেকে যায় কিন্তু আজ বাসায় চলে এসেছে । অনেকক্ষন কলিং বেল দেওয়ার পর মা ঘুমের ঘোরে এসে দরজা খুলে । পুলিশকে দেখে মা তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে । সে এক পাশ দিয়ে ডুকে তার রুমে চলে যায় ।সে রাতে একটা ক্রসফায়ার অপারেশন করেছে তিন কুখ্যাত সন্ত্রাসীকে কতল করেছে । আর এই অপারেশনটা টাকার বিনিময়ে মন্ত্রীসাহেবের প্রস্তাব ছিল কারন এরা মন্ত্রী সাহেবের কুকীর্তির ধারক ।তাদের জেল শিফট এর নাটক সাজিয়ে মাঝ পথে নিয়ে ক্রসফায়ার নিশ্চিত করা হয় । পুলিশ এই পর্যন্ত অনেক কুখ্যাত সন্ত্রাসীকেই খুব মজা করেই ক্রসফায়ার করেছে কিন্তু এই ক্রসফায়ারে সে খুব অশান্তিতে আছে ।তার খুব মন খারাপ হচ্ছে আজ নিজেকেই এখন কুখ্যাত খুনী মনে হচ্ছে ।

সকালে বাবার চিৎকারে ঘুম ভাঙ্গে পুলিশের । সে ড্রয়িং রুমে এসে দেখে বাবা টিভি দেখে খুশিতে চিৎকার করছে ।

-কি হয়েছে বাবা এমন চিৎকার করছো কেন?

-টিভিতে দেখছিস না মোক্কা ডাকাইতের রহস্যজনক লাশ পাওয়া গেছে ।

-মোক্কা ডাকাইত কে ?

-যার পাঁ চাটস এমপি মোবারক ।

পুলিশ অবাক হয় এইরকম একটা ঘটনা ঘটেছে অথচ তাকে কেউ ফোন করেনি । সে দৌড়ে তার রুমে গিয়ে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখে অনেকবার কল করা হয়েছে তাকে কিন্তু সে টের পাই নি । দ্রুত রেডী হয়ে বের হয় সে । ঘটনাস্থলে গিয়ে এস পি এর একটা ঝাড়ি খায় লেইট করার কারনে । তারপর দ্রত কাজে লেগে যায় । মন্ত্রীর লাশটি উদ্ধার করা হয় পতিতালয় ভবনের একটি রুম থেকে ।নুপূর নামের এক পতিতা বলেন, স্যার রাত সাড়ে ১২টার সময় গাড়ী করে এখানে আসেন ।তাকে দেখে মনে হয়েছিল তিনি মদ্যপ ছিলেন । আমার চুল ধরে টেনে নিয়ে যান রুমে । আমাকে খাটে ছুটে ফেলে পকেট থেকে একটা প্যাকেট বের করেন । তারপর ঔষধ জাতীয় কী যেন ইনজেকশানের মাধ্যমে শরীরে পুষ করেন। আমার কাছে মনে হল হয়তো কোন উত্তেজক ঔষধ হবে ।এরপর কিছুক্ষন ছটপট করে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়েন ।মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে থাকে । আমি চিৎকার করলে অন্যরা এসে এই অবস্থা দেখে আপনাদের ফোন দেয় । ডাক্তাররা টেষ্ট করে দেখেন মন্ত্রী সাহেবের অতি উত্তেজক ড্রাগস পুষ এর কারনে হার্টফেইল হয় ।

একমাস পর :
পুলিশ আজ সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আসে । বহুদিন হয় সে একসাথে বসে সবার সাথে খাবার খায় নি । আজ সবার সাথে খেতে বসেছে সে । তার কাছে কেমন যেন অসস্থিকর লাগছে । তার বাবা তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে তার মাকে বলছে,

-দেখছো রাহেলা পাপ বাপেরেও ছাড়ে না ।দেখছো কিভাবে মোক্কা ডাকাইত বাহিনী ধ্বংস হয়েছে গত ছয় মাসের মধ্যে । একজন মরলো নিজের অস্ত্র প্লান্টে বিষ্পোরন হয়ে, আরও দুইজন মরলো বাড়িতে আগুন লেগে, মোক্কা মরলো পতিতালয়ে হার্টফেইলে এরপর তিনজন মরলো ক্রসফায়ারে । বুচ্ছ এইগুলা হচ্ছে আল্লাহর গজব । যার কেউ নাই তার আল্লাহ আছে এই কথা বলে আড় চোখে ছেলের দিকে তাকায় ।পুলিশ কিছু বলছেনা মাথা নিচু করে খেয়েই যাচ্ছে ।

পরদিন সন্ধ্যায় পুলিশ বারান্দায় গ্রীল ধরে দাড়িয়ে আছে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে । আকাশে যেন ধোঁয়া উড়ছে কোন তারা দেখা যাচ্ছে না ।তার হাতে ছোট একটা চিরকুট ওই তিনজনের একজন ক্রসফায়ারের আগে তার হাতে গুঁজে দেয় । চিরকুটটায় লেখা-

''আমরা জানতাম তুমি আমাদের মেরে ফেলবে কিন্তু আমরা তোমার কাজগুলো করেছি কারন মোবারক আমাদের সাথে প্রতারনা করেছে । আমরা যে বাচ্চাগুলোকে পুড়িয়ে মারার অপরাধে হাজতে এসেছি সে বাচ্চাগুলোকে আমরা শুধুই কিডন্যাপ করেছি । তাদেরকে মেরে ফেলার কোন প্ল্যান ছিল না । মুক্তিপন ফেলে ছেড়ে দিব এইরকম কথা ছিল । কিন্তু ওরা তাদের নির্মমভাবে হত্যা করে ওখানে স্বয়ং আমাদের উস্তাদ মোবারক ডিজেলে প্রথম ম্যাচের কাঠি নিক্ষেপ করেন । এই বাচ্চাগুলো ছিল শহরের স্বনামধন্য ব্যাক্তিদের । এদেরকে মেরে শহরে একটা ত্রাস সৃষ্টি করা ছিল মোবারকের উদ্দেশ্য । ততক্ষনে তো আপনারা জেনে গিয়েছিলেন আমরা কিডন্যাপার । আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মোবারক আমাদেরকে আপনাদের হাতে ধরিয়ে দেয় । মূলত এর প্রতিশোধের জন্যই আপনাকে সাহায্য করা । আজ আপনার হাতে ক্রসফায়ারে মরলেও আমরা খুশী কারন আপনি আমাদের পরিবারকে দেখাশোনা করেছেন । পরিবারের সাথে শেষ কথায় জানতে পারি বড় অংকের টাকা দিয়ে আপনি তাদের ডিপোজিট খুলে দিয়েছেন ভালো ভাবে জীবন চলার জন্য । আমরা অন্ধকারে ছিলাম এতদিন এখন আপনার ক্রসফায়ারে আমরা আলোতে ফিরবো ।আপনি ভালো থাকবেন । আল্লাহ হাফেজ।''

পুলিশ চিরকুটটা ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে পুড়ে ফেলে । ছাইগুলো ফু দিয়ে উড়িয়ে দেয় । সে এখন ভাবে সে এই একবছরে কি করেছে ।

মোক্কা ডাকাত টাকার পাওয়ারে ক্ষমতায় আসে দুই বছর হয় । সে আসার পর থেকে পুরো শহরে হত্যা রাহাজানি, ধর্ষন, খুন, নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে যায় । পুরো শহর অন্ধকার হয়ে যায় তাদের অপরাধে । আমাদের মত পুলিশদের তারা খেলনার পুতুল মনে করতো । অপরাধ করার পর আমাদের মুখের উপর টাকা ছিটিয়ে দিয়ে বলতো সব যেন ওকে থাকে ।আমরা উজবুক এর মত দাড়িয়ে থাকতাম ।

আমি চাইতাম একটা চান্স তাদেরকে কাবু করার জন্য । আর সেই চান্সটা পেয়ে গেলাম কিডন্যাপ করা বাচ্চাগুলোর করুন মৃত্যুর সাথে । মোবারক সাহেব তখন খুব চাপে পড়ে যান ।তখন তিনি বুঝতে পারেন তিনি অনেক বড় ভুল করেছেন বাচ্চাগুলোকে মেরে । আর পতনের জন্য এই একটা ভুলই যথেষ্ট ছিল । পরে তিনি কুল কিনারা না পেয়ে কিডন্যাপে জড়িত থাকা তার এই তিন সহযোগীকে পুলিশে ধরিয়ে দেন নিজেকে নির্দোষ রাখতে । এইখানে তিনি আরেকটা বড় ভুল করেন কারন তিনি ভুলে গেছেন এদেরকে রিমান্ডে নিলে যে সব তথ্য বের হয়ে যাবে ।

এই তিন ক্রিমিনালেরই সুন্দর পরিবার আছে ।তাদের অপরাধের উপার্জনে বেশ ভালোই চলছে তাদের পরিবার ।কিন্তু পুলিশের হাতে তারা পাকড়াও হওয়ার পর পরিবারের অবস্থা বেহাল হওয়া শুরু করে । একদিকে আর্থিক সংকট আরেকদিকে পরিবারের কর্তার কৃতকর্মের প্রভাব ।পরিবারগুলো দিশেহারা হয়ে পড়ে ।

‘তিন ক্রিমিনালের’ জন্য ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়।আর এই ৫ দিনেই আসল প্লানটা করি । আমি তাদের মধ্যে মোবারক সাহেবের প্রতি একটা তীব্র ক্ষোভ দেখতে পাই আর এই ক্ষোভকেই কাজে লাগাই ।আমি তাদের সাথে চুক্তি করি আর তারা আমার কাছে আকুতি করে তাদের পরিবারকে একটু দেখে রাখতে ।আমি তাদের আকুতি রক্ষা করার আশ্বাস দেই ।৫ দিনের রিমান্ডে কিছু হয়নি বলে তাদের জন্য আরও ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করি । আর এর ফলাফল প্রসেস হতে মিনিমাম ১ মাস সময় তো লাগবেই । আর এই একমাসেই সব গুছিয়ে ফেলার চিন্তা আমার ।এইদিকে কিঞ্চিত দুর্বল মোবারক সাহেব থেকে ছোট বড় সকল অপরাধের উচিল্লায় ঘুষ খাওয়া শুরু করে দেই । সে অপরাধ করাও বন্ধ করতোনা কারন কুত্তার লেজতো আর সোজা হয় না ।তবে সে এর পরে কোন খুনের ঘটনা ঘটায়নি কিন্তু অন্য ক্রাইমগুলো বন্ধ ছিল না । আর তার থেকে নেওয়া এই টাকাগুলো ভিকটিম অভাবীদের বিতরন করে দিতাম ।

লকাপের তিন ক্রিমিনাল যেহেতো মোবারকের সব কর্মকান্ডের উৎস জানতো সে অনুযায়ী প্রথম হামলা করি অস্ত্র চোরাকারবারী শশী ঠাকুরের অস্ত্র তৈরীর প্লান্টে তারপর মাদক কিং’স হাবু আর সাবুর বাড়িতে । এই কাজগুলো করাই ‘তিন ক্রিমিনাল’ দিয়ে । এই দুটি কাজ শেষ করি দুই রাতে ।এই দুইরাতের জন্য প্রায় প্রতিদিনই অন্য কর্মকর্তাদের ছুটি দিয়ে আমি একাই থানায় থেকে যেতাম আর নাইটগার্ড থাকতো সেও গভীর রাতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে যেত । তখন তিন ক্রিমিনাল নিয়ে আমি বের হয়ে পড়ি থানার দরজায় তালা মেরে । নাইটগার্ড বসে বসে ঝিমাচ্ছে । তাকে পাশ কাটিয়ে চারজন বেরিয়ে পড়ি অজানা শংকায় । কাজে নামার আগে তিন ক্রিমিনালের তথ্য অনুযায়ী আমি মাদক কিং’স আর অস্ত্র চোরাকারবারীর অবস্থান নিশ্চিত করি ।শেষ পর্যন্ত দুটো কাজই সফল হয় ওই বাচ্চাগুলোর মতই পুড়ে মৃত্যু হয় তাদের । দুর্ঘটনার কারন দেখিয়ে খবরের কাগজে খবর ছাপা ছাড়া এই নিয়ে আর কোন কিছু হয়নি ।

এখন বাকি শুধু মোবারক । সে তার পার্টনারদের মৃত্যুর কারনে এমনিতেই আঁধমরা হয়ে গেছে তাই তো কর্মচারী ছদরুলরে কইস্সা চড় দিয়েছিলাম কারন এই ছদরুলও একসময় আমাদের মুখে টাকা ছুড়ে মারতো ।মোবারককেও ইচ্ছা করলে এইরকম পোড়ানোর কোন দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মারতে পারতাম কিন্তু তার সাথে পতিতা নুপূরের একটা সম্পর্ক ছিল ।নুপূর অবশ্য তার আসল নাম নয় তার আসল নাম ছিল লিপি । অনেক আগে মোবারক এবং তার সাংগোপাংগোদের হাতে সে গনধর্ষনের শিকার হয় । এরপর পরিবার এবং সমাজ থেকে লাঞ্ছিত হয়ে কোন উপায় না খোঁজে পেয়ে এই লাইনে নামে সে । সে এই লাইনে নামার আগে আমার থানায় এসেছিল কিন্তু তাকে কোন বিচার এনে দিতে পারিনি । সে থানায় থুথু দিয়ে চলে যায় । তাই মোবারকের জন্য এইরকম দুর্ঘটনার মৃত্যু নয় । তার হতে হবে অতি লজ্জাসকর মৃত্যু যাতে তার কথা মনে পড়লে জাতি তার অতি লজ্জাসকর মৃত্যুকাহিনী স্মরন করে ।

মোবারক আসলে তার তিন সহযোগীকে ক্রসফায়ার করে মারার কথা আমাকে বলেনি । সে তখনো এই তিন সহচরকে ছাড়ানোর ফন্দি ফিকিরে ব্যাস্ত ।কিন্তু আমি রিস্ক নিলাম না । তিন ক্রিমিনালকে আমি মিথ্যা বলি যে তাদেরকে ক্রসফায়ারে ফেলার প্ল্যান করেছে মোবারক এবং আমাকে মোটা অংকের টাকাও অফার করছে ।এইটা বুঝিয়ে আমি তাদের সাথে রিভার্স প্ল্যান বানাই ।তাদের একজনের বাড়ী থেকে তাদের নিজেদেরই ব্যাক্তিগত একটি মোবাইল নিয়ে আসছিলাম ।এখন আমার মোবাইলে রেকর্ডিং চালো করলে বলবি যে তোরা থানা থেকে পালিয়ে গেছিস এখন অমুক জায়গায় আছিস । এই কথা বললেই মোবারক তোদের সাথে দেখা করতে আসবে কারন মোবারক তো জানে না যে তার ক্রসফায়ারের প্ল্যানের কথা তোদের আমি বলে দিয়েছি ।সে ভাববে ক্রসফায়ার থেকে পালিয়েছিস এবং তোদের নিয়ে সে অন্য কোন প্লান করতে চাইবে । এইদিকে নুপূরও তৈরী ড্রাগস নিয়ে । আজ রাতে আর তিন ক্রিমিনালকে সঙ্গী হিসেবে ব্যবহার করলাম না কারন আজকে রাত ১টায় আমার তত্বাবধায়নে তাদের হাজত শিফট হবে আর ক্রসফায়ারের প্লানটাও আমি রেড়ী করে ফেলেছি ।

ঠিক সাড়ে ১১টায় তাদের কথাগুলো আমার মোবাইলে রেকর্ড করা শেষ করি । তারা প্ল্যান অনুযায়ীই শিখিয়ে দেওয়া কথাগুলো বলল কিন্তু শেষে তারা আগ বাড়িয়ে একটা বাড়তি কথা বলে ফেলে তা হল, ‘উস্তাদ আসার সময় কড়া দুইড়া বোতল নিয়ে আইসেন অনেকদিন হয় খাই না। অবশ্য এই কথায় আমার উপকারই হয় ।আমি এদের হাজতে রেখে বের হয়ে পড়ি আর তাদেরকে আজ রাতে পালানোর প্ল্যানটা বলে যাই ।তাদের মোবাইলটিও আমার সঙ্গে নিয়ে যাই । জায়গামত গিয়ে তাদের মোবাইলটা দিয়ে মোবারককে ফোন দেই । মোবারক ফোন ধরেই বলে কিরে খইল্ল্যা ফোন দিছোছ ক্যামতে ? তোরা কি হাজত পালাইছছ নাকি? আমি প্রথমে একটু বিকৃত গলায় কথা বলে রেকর্ডিং এর কথাগুলো জায়গা মত ছেড়ে দেই ।
মোবারককে বলা জায়গায় আমি আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকি ।

প্রায় আধাঘন্টা পর মোবারক মদের বোতলে চুমুক দিতে দিতে জায়গামত এসে গাড়ী থামায় । গাড়ী থেকে বের হয়ে ঢুলতে ঢুলতে এদিক ওদিক ওদের খুঁজতে থাকে । আমি পেঁছন থেকে বস্তার মুখ তার মাথা দিয়ে ডুকিয়ে অনেক দস্তাদস্তি করে ওরে বস্তার ভেতর তাকে বেঁধে ফেলি । এরপর ওর গাড়ীর পেছনের মালের বাক্স খুলে বস্তাটা ভেতরে ডুকায়ে দেই । তার গাড়ী নিয়ে পতিতালয় ভবনের কাছে পৌঁছাই ।তখন চারদিকেই জনমানবহীন শুনশান নিরবতা ।

নুপূর জায়গামত দাঁড়িয়ে থাকে । আমরা বস্তা নিয়ে ওর রুমে চলে যাই ।বস্তা খুলে দেখি মোবারক মদের প্রভাবে অলরেড়ী টাল হয়ে গেছে ।তাড়াতাড়ি ওর হাতের কনুইয়ের ভাঁজে ইনজেকশন পুষ করে ওর হাতের আঙ্গুলে ইনজেকশনটা আটকায়ে দেই সাথে নুপূরের কিছু চুলও ছিড়ে মোবারকের হাতের মুঠোয় লাগিয়ে দেই । এরপর সব কনফার্ম হয়ে আমি আস্তে আস্তে ওর রুম থেকে বের হয়ে যাচ্ছি। তখন আবার লিপিকে কিছু বলবো বলে পেঁছনে ফিরে ওর দিকে তাকাই ।ওকে দেখে একটুও মনে হচ্ছে না ও ভীত, ওর চোখে মুখে শুধুই ক্রোধ খেলা করছে ।আমার তাকিয়ে থাকা দেখে মেয়েটা কেঁদেই দিল । চেয়েছিলাম বলতে ‘লিপি তুমি ফিরে এসো’ কিন্তু বলতে পারলাম না কারন ফিরে আসার জবাবের সঠিক উত্তর অনেক আগেই তার জীবন থেকে মুছে গেছে ।আমি আর কিছু না বলে বেরিয়ে পড়ি ।মোবারকের গাড়িটা পতিতালয়ের গেইটের সামনে এনে রেখে দেই । এগুলো করতে করতে ১টা বেজে যায় ।

দ্রুত থানায় গিয়ে তিন ক্রিমিনালের ক্রসফায়ারের প্রস্তুতি নিই ।তাদেরকে বলে দেই তোদের হ্যান্ডকাপ আলতো করে লাগানো থাকবে ওমুক জায়গায় পৌঁছানো মাত্রই গাড়ী থেকে পালিয়ে যাবি পেঁছনে একটুও তাকাবি না । তারা আমার কথায় সায় দিল ।আর খলিলের ব্যবহৃত মোবাইলটা খলিল এর পকেটে দিয়ে দেই ।মোবারককে যেই জায়গায় বস্তাবন্দি করি সেই জায়গাতেই তিন ক্রিমিনালকে পালানোর কথা বলি ।অবশেষে তারা পালানোর চেষ্টায় ক্রসফায়ারে পতিত হয় পত্রিকা আর নিউজ চ্যানেলগুলো ঠিক সেইরকম ঘটনাই বর্ননা করে ।

আর যদি কোন ইনভেস্টিগেশন টিম মোবারকের আসল মৃত্যু রহস্য উদঘাটন করতে যায় তাহলে তারা দেখবে মোবারকের মোবাইলে লাষ্ট কল ছিল তার সহযোগী খলিলের ।আর যে জায়গায় খলিলদের ক্রসফায়ার হয় ঠিক সেই জায়গা থেকেই মোবারকের মোবাইলে খলিলের ফোন আসে । এদিকে পালানো আসামী পাকড়াও করতে পুলিশ আক্রমন চালালেই হয়তো মোবারক গাড়ী নিয়ে দ্রুত এই পতিতালয়ে ঢুকে পড়ে তারা এইরকম ভাববে ।সতরাং আরেকটি দুর্ঘটনা । কেইস ইজ ক্লোজ ।এখন মোবারকের আসল মৃত্যুর রহস্য শুধু আমি আর ওই পতিতা জানে ।

-কিরে, আজকে ঘুষের ডিউটিতে যাস নাই ।বাবার কথায় হুঁশ ফিরে সে বাবার দিকে তাকায় ।

-না বাবা, আমি রিজাইন করেছি ।

-কেন ? তোর উস্তাদ মারা গেছে বলে?

-না বাবা, ওরা আমাকে রাঙ্গামাটি ট্রান্সফার করেছে তাই ছেড়ে দিয়েছি ।

-ক্যান ওখানে গেলে গু খেতে পারবি না এই জন্য ? বাবা তাচ্ছিল্য নিয়ে বলে ।
আমি বাবার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আবার বারান্দা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে থাকি ।
বাবা আর কিছু বললো না ।বাবা চলে যাওয়ার মুহূর্তে-

-বাবা, শুনো!

-কি ?

-তোমার ছেলে কখনো ঘুষ খাইনি আর ওদের মৃত্যুও কোন দূর্ঘটনা ছিল না, এই বলে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকি । বাবাও আমার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষন ।তারপর আস্তে আস্তে আমার দিকে আসতে থাকে । এসেই কইস্সা একটা চড় আমার বাম গালে বসিয়ে দেয় আর চেঁচিয়ে বলে,

-তুই একটা খুনী ।এই বলে বাবা চলে যেতে থাকে ।
জানিনা বাবা কি বুঝেছে আর কেনইবা আমাকে চড়টা দিল । আমি বাবার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকি আর মনে মনে জপতে থাকি, বাবা আমি তোমার কল্পিত পুলিশ অফিসার কখনোই হতে পারবোনা কারন….


বিঃ দঃ : এই গল্পের স্থান, কাল, পাত্র, চরিত্র সম্পূর্ন লেখকের কল্পিত মস্তিস্কের বহিঃপ্রকাশ । সুতরাং কাকতালীয়ভাবে কারো সাথে মিলে গেলে লেখক দায়ী নয় ।








সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই নভেম্বর, ২০১৪ রাত ১:১৪
১৮টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গাজীপুর থেকে কক্সবাজার: চার বাইকে ছয় সহকর্মীর ১৪ ঘণ্টার নাইট রাইড অ্যাডভেঞ্চার

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:০২


আমি শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, থাকি সাভার এলাকায়। ভ্রমণের নেশা আর মোটরসাইকেলের প্রতি ভালোবাসা আমার দীর্ঘদিনের। আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করব গাজীপুর থেকে কক্সবাজার হয়ে টেকনাফ ও শাহপরীর দ্বীপের দিকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

Personal Cancer Vaccine: আশার আলো দেখাচ্ছে

লিখেছেন কলাবাগান১, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৩২


আপনি কি কখনও চিন্তা করে দেখেছেন যে ক্যান্সার টিউমারকে কেন শরীর এর রোগ প্রতিরোগ করা ইমিউন সেল (যেমন টি সেল) একেবারে ধ্বংস করতে পারে না!!! যেখানে টি সেল... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের শাহেদ জামাল- ১০০

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৮



মাঝে মাঝে খুব অবিশ্বাস্য ব্যাপার সহজ ভাবে ঘটে যায়।
এই যে আমি শাহেদ। শাহেদ জামাল। রমিজ উদ্দীনের ছেলে। আমাকে একটা ঘরে বন্ধী করে রাখা হয়েছে। ছোট ঘর। ঘরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিশুর নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে বড়

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:০২



শিশুর নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে বড়

গতকাল এক বাবার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। অভিযোগ, তাঁর মেয়েকে একটি মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল যৌন নিপীড়ন করেছেন। বাবার প্রতিক্রিয়া সঠিক ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশটাতো এখন রাজাকারদের....

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৮




একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বাদী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী (৮৭)। মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রস্তুতি চলার সময় জামাতের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×