ভোর হতে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়াটা পবনের কাছে নতুন নয় । এও নতুন নয় রাত গভীর করে ঘুমানো । তার অবাক লাগে এই ভেবে যে সে যত গভীর রাতেই ঘুমাক না কেন ভোর হওয়ার সাথে সাথে তার ঘুম ভাঙ্গবেই ।শুধু ঘুম ভাঙ্গাতেই তার শরীর শান্ত হয় না বিছানায় থাকার ইচ্ছেটাও উবে যায় ।এই জন্য পবন তাকে সূর্যের সাথে মেলায় । সূর্যও তো ভোরে উঠে । কিন্তু রাতে ঘুমানোটা তো চাঁদের সাথে সাদৃশ্য ।এই চন্দ্র এবং সূর্যের সংমিশ্রিত মিলটা পবনের মনে কিঞ্চিৎ মন ভালোলাগানীয় অনুভূতি দেয় ।বৃদ্ধ বয়সেও এইসব ছেলেমি চিন্তা ভাবনা তার গেল না । আর যাবেইবা কি করে তার বৌয়ের মত এমন ললনা ঘরে থাকলে যে কারোরই পবনের মত অবস্থা হবে ।আর বুড়ো পবনের এখনো ভোর হতে উঠে যাওয়াটা এই বৃদ্ধ ললনারই দাওয়াই ।
বুড়ো পবন ফ্রেশ হয়ে আজও বারান্দায় অপেক্ষা করছে । তার প্রেয়সী কিছুক্ষন পর গরম মেজাজের ধোঁয়া উঠা দুই কাপ কফি নিয়ে আসবে । একটা তার জন্য আরেকটা নিজের জন্য । দুজন বসে বসে কফি পান করবে আর গল্প করবে বলা যায় এই পর্ব ভোরের ঘোর কাটার একটা ঔষধ ।তবে সে যাই হোক সকালের এই সামান্য মুহূর্তটুকু তাদের দুজনকেই অসামান্য শ্রান্তি এনে দেয় । সেই বিয়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত তাদের এই ধারাবাহিক কীর্তি চলে আসছে ।যৌবনে এইটাকে রুমান্টিকতা বলে সংজ্ঞায়িত করা গেলেও এখন এটা নিতান্তই ভীমরতির পর্যায়ে চলে গেছে ।তবে বুড়ো পবনের মতে ‘রোমাঞ্চ কখনো মরে না’ ।তাদের বিয়েটাও ছিল দীর্ঘ প্রেম কাহিনীর সফল সংস্করণ । বিয়ের আগে তারা তিন বছর এগারো মাস ঊনিশ দিন সোয়া চার ঘন্টা প্রেম করেছিল । সেই হিসেবও তারা কড়ায় গন্ডায় রেখে দিয়েছে ।আর রখারই তো কথা তাদের জামানায় যেখানে প্রেম ছিল অনেক দুর্ভেদ্য দুর্লভ বস্তু সেখানে তারা এত সময় প্রেম করে ফেলেছে ! এই যুগেতো প্রেম হচ্ছে মোবাইলে ফ্লেক্সি করার মত ব্যলেন্স শেষতো নতুন করে ফ্লেক্সি । এখন তো কতক্ষন প্রেম করেছে সে হিসেব না করে কয়টার সাথে প্রেম করলো সে হিসেব করে ।
বুড়ো পবন বারান্দার গ্রিল দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আছে । সামনে একটা জারুল গাছ আছে । গাছটা যে কবে থেকে এইখানে দাঁড়িয়ে আছে তা বলা মুশকিল ।ঢাকার এই অনুর্বর মাটিতে সে কিভাবে বেঁচে আছে তাও প্রশ্নবিদ্ধ । জারুল গাছের মূল্য তেমন একটা নাই বলে কেউ কেটে নিয়ে যাওয়ারও ধান্দা করে না ।সেই সুবাদে পাখিবিহীন ঢাকা শহরে কিছু পাখি দেখার সৌভাগ্য হয় বটে ! ভোরে বারান্দায় আসলে গাছটায় দেখা যায় কিছু পাখি ঘুম থেকে উঠে হাই তুলছে আর কিচির মিচির করছে । ভালোই লাগে । আর গাছটাও পাখিদের জন্য খুবই নিরাপদ । তাই আমাদের মতই গাছটায় কিছু পাখি পরিবার ভাড়া নিয়ে থাকে ।ডান পাশের ডালটায় সুন্দর একটা চড়ুই দম্পতি থাকে ।তাদের ছোট ছোট দুটো বাচ্চাও আছে । ওদের বাসাটা আমাদের বাসা থেকে খুবই নিকটে । বলা যায় আমাদের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী ।তারাও আমাদের বাসায় উঁকিঝুঁকি মারে আমরাও তাদের বাসায় উঁকিঝুঁকি মারি ! আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে প্রাইভেসি বলতে তেমন কিছুই নেই ।ভোরে আমাদের দুজনের কফি পান করা দেখে তারাও আমাদের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে মনে হয় যেন আমাদের মত তারাও কফি পান করতে করতে গল্প করছে ।ওরা কফি হিসেবে কি পান করে তাতো আর জানা নেই ।কিছুক্ষন পর বাচ্চা দুটো ঘুম থেকে উঠে কিচির মিচির শুরু করে ।বাচ্চা দুটোর ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে আলতো আদর করে চড়ুই দম্পতি উড়াল দেয় খাবারের খোঁজে ।তারা এমন একটা ভাব করে উড়াল দেয় যেন তারা আমাদেরকে বলে গেছে ‘ভাইয়া-ভাবী আমাদের বাচ্চা দুটোকে আপনাদের কাছে রেখে গেলাম একটু দেখে রাইখেন তো ! এইভাবেই বাচ্চা দুটোকে বড় হয়ে যেতে দেখেছি । তারাও উড়তে শিখলো । হঠাৎ একদিন দেখি তাদের বাসা খালি । কেউ নেই । মনটা খারাপ হয়ে গেলো। বারান্দার ফ্লোরে দেখি কিছু খড়কুটো পড়ে আছে হয়তো এইভাবেই তারা বিদায় নেয় । তারা আর ফেরেনি হয়তো কোথাও নতুন বাসা নিয়েছে ।এখানেও কোন নতুন চড়ুই পরিবার উঠেনি ।তাদের শূণ্যতা এই ভোরকেও কিঞ্চিৎ পানসে করে দিয়েছে ।খালি পড়ে থাকা চড়ুই প্রতিবেশীর বাসাটায় তাকাতেই মনটা খারাপ হয়ে যায় ।
বুড়ো পবনের হঠাৎ খেয়াল হলো কি ব্যপার প্রেয়সীর আসতে এত দেরী হচ্ছে কেন? এদিকে তো ভোরটা কেটে সকাল হয়ে যাচ্ছে !আজকাল বুড়ো প্রেয়সী ধীরগতি হয়ে গেছে । রান্না ঘরে গিয়ে একটু দেখবো নাকি ? নাহ্ কখনো তো এইরকম গিয়ে দেখা লাগেনি । সে যাই হোক গিয়ে একটু দেখেই আসি না হয় ।হঠাৎ পেঁছন থেকে কোমরটা হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে ঘাঁড়ে আলতো কোরে চুমো খাবো । তারপর মিনমিন করে জিজ্ঞেস করবো ‘জান আমার কফিটাকি হয়েছে নাকি আজকে তোমাকেই কফি হিসেবে পান করবো তুমিও তো হট কম না’ !ছেছেছে যাহ্ এইসব কি ভাবছি ? সেই বয়স কি আর এখন আছে ? তাছাড়া ঘরে ছেলে, ছেলেবৌ, নাতি নাতনীর অভয়ারণ্য । তারা যদি দেখে ফেলে ? একবারতো ধরাই খেয়ে গিয়েছিলাম নাতির হাতে ! প্রেয়সীর লোম চিকচিকে গাল দেখে সইতে না পেরে যেইমাত্র চুমুটা বসিয়ে দিলাম পিচ্চি নাতি এসে হাজির ।ঘটনাটা পুরো ঘর জেনে গেল । নাতি সবার কাছে প্রচার করলো দাদুভাইও দেখি আমার মত দাদুকে চুমো দে ! সবাই শুনে তো হো হো করে হাসতে হাসতে পারলে গড়াগড়ি খায় । সেই যে কি লজ্জা পেয়েছিলাম উহ্ ! এই প্রাইভেসির ভয়েই প্রেয়সীকে আগের মত কাছে টেনে আদরও করতে পারি না । না থাক রান্না ঘরে আর যাবো না । তাকে পেঁছন থেকে দেখে যদি আবার জড়িয়ে ধরে চুমো খাওয়ার লোভ জাগে !দিনকে দিন ওকে কাছে পাওয়াটা রিস্ক হয়ে যাচ্ছে !
বুড়ো পবন এইসব ভাবতে ভাবতে বাহিরের রাস্তায় দেখে অফিসিয়াল সাজগোজের এক দম্পতি রিকসায় উঠছে । লোকটা তার প্রিয়াকে হাত ধরে উঠাচ্ছে ।এইরকম আমরাও ভোরের কফি পর্ব শেষে একসাথে রিকসা করে অফিসে যেতাম । অবশ্য রিকসা চড়ার অভ্যাসটা হয়েছিল বিয়ের আগে প্রেম করার সময় । তখন দুজন কৌটরবন্দী রিকসায় ঘুরতে বেশ লাগতো । কত যে রিকসায় ঘুরেছি পুরো ঢাকাশহর চসে ফেলেছি । ওইসময় তো ঢাকা শহর এখনকার মত কর্মব্যস্ত ছিল না । রাস্তাগুলো অনেক ফাঁকা থাকতো । সকল রাস্তায়ই রিকসা চলাচল ছিল ।তাই ঘুরতেও খুব ভালো লাগতো ।তখন থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি বিয়ের পরও আমরা দুজন একসাথে রিকসায় চড়ে অফিসে যাবো । করেছিও তাই । ওর অফিসটা দূরে থাকা স্বত্তেও ওকে অফিস পর্যন্ত পৌঁছে তারপর আমি আমার অফিসে ব্যাক করতাম ।আবার অফিস থেকে ফেরার সময়ও রিকসা নিয়ে তাকে পিক করে দুজন একসাথে খুনসুটি করতে করতে বাসায় ফিরতাম ।এখনতো দুজন অবসরে এসেছি অনেক দিন হয় ।তাই রিকসায় আর তেমন একটা ঘোরা হয় না ।তবে রিকসায় ঘোরাটা অনেক মিস করি তাই মাঝে মাঝে বুড়ো প্রেয়সীকে নিয়েই রিকসায় বেরিয়ে পড়ি ।ও আচ্ছা রিকসায় ঘোরা নিয়ে বেশ মজার একটা ঘটনা মনে পড়েছে । আমরা একদিন অফিসে যাচ্ছি তো রিকসা খুব ঝাঁকি দিচ্ছে । প্রেয়সী হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করে বসে, ‘ আচ্ছা জান ! আমরা যখন প্রেম করতাম তখন তো দেখতাম রিকসা যতটা না ঝাঁকি দিত তুমি তার চেয়ে বেশী আমার গায়ের সাথে ধাক্কা খেতে অথচ এখন রিকসা এত ঝাঁকি দিচ্ছে অথচ তুমি আমার গায়ের সাথে তেমন ধাক্কা খাচ্ছ না ঘটনা কি’ !উত্তরে বললাম, আরে ঘটনা কিচ্ছু না তখনতো বিয়ের আগে ছিল এখনতো বিয়ের পর । সে বলল, ‘ ছি! জান তোমার মন এত নোংরা ছিল ? অথচ আমি ভাবতাম তুমি আসলেই ঝাঁকির কারনেই আমার সাথে ধাক্কা খাচ্ছো’ ।ওইদিন আমার যে সেই কি হাসি পেয়েছিল ! ওর ওই মুখ কালো করা ভ্রু কুছকানো চেহারা এখনো আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে !
প্রেয়সী এখনো আসছে না কেন ? নাহ এখন গিয়ে একটু দেখতেই হয় কোন সমস্যা হলো কিনা আবার ।
-এই কই গেলে তুমি…. জান ! একি ! রান্না ঘরে তো নেই । কোথায় গেলো! বকুল… এই বকুল…. তুমি কোথায় ? এইবার খুব চিৎকার করেই ডাকতে লাগলো ।
-আব্বা, আব্বা তোমার কি হয়েছে ? বড় ছেলে রুম থেকে বেরিয়ে আসে ।
-আরে তোর আম্মা কোথায় গেছে ? কোথাও দেখছি না যে ।বকুল…. এই বকুল তুমি কোথায় ? বুড়ো পবনকে খুব অস্থির দেখাচ্ছে । শরীর ঘামতে শুরু করছে ।
- লিপি ! এই লিপি…. তাড়াতাড়ি আসো আব্বা আজকেও…
বুড়ো পবনকে বিছানায় শুয়ে দেওয়া হয়েছে ।গায়ে বাতাস করা হচ্ছে ।মাথায় পানি ঢালার ব্যবস্থা করা হচ্ছে । তার প্রেয়সী বকুল গত হয়েছেন প্রায় একমাস হয়েছে । এরপর থেকে প্রতিদিনই তিনি এইসব পাগলামো করে যাচ্ছেন ।প্রতিবারই মাথা ঘুরে পড়ে যান ।অচেতন হয়ে যান । আজকেও তাই হয়েছে ।
…না, আজকেও তিনি মৃত্যুবরন করেননি তবে তিনি একটু দ্বিধায় ভোগেন, আসলে কার মৃত্যু হয়েছে ‘তার প্রেয়সীর নাকি তার’ ?...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

