somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

কলমের কালি শেষ
অন্ধকারের মাঝে একটু আলো.. আলোর অনুসরণ ।nnhttps://www.facebook.com/profile.php?id=100004783727702 ।

মৃত্যুবাণী ।( গল্প )

১২ ই অক্টোবর, ২০১৫ রাত ২:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১।

সেদিন ঠিক সন্ধ্যায় কিরানের দেহটিকে আঁধারের অনেকগুলো হাত টেনে নিয়ে যাচ্ছে । সে তখনো পুরোপুরি মৃত ছিল না । যতটুকু মৃত থাকলে তার দেহটি টেনে নেয়া সে অনুভব করতে পারে ঠিক ততটুকুই ছিল । শুধু ঠোঁট দুটো নড়ছে- আমায় আরেকটু সময় দাও… আমায় আরেকটু সময় দাও……

ঘটনার শুরু বিশ বছর আগে । তখন অল্প কিছু সময়ের জন্য কিরানের মন খারাপ হয়েছিল । উড়ন্ত যৌবনের যখন শুরু তখন নিজের মৃত্যুর আগাম সংবাদ শুনতে কারইবা ভাল লাগে । কিরান তখন সম্পূর্ণ মাতালে সুন্দরী ললনাদের সাথে ক্লাবে কাম-পিয়াসী নৃত্যে বাঁধনহারা ছিল । হঠাৎ তার মোবাইলে একটা ম্যাসেজ আসে । ক্লাবের এই পরিবেশে ম্যাসেজের আওয়াজ টের পাওয়াটা অসম্ভব । কিন্তু কিরান ম্যাসেজ আসাটা টের পায় । কারণ ম্যাসেজটা ফাইনাল্লি মোবাইলে প্রেরিত হওয়ার সাথে সাথে তার শরীর এমনভাবে কেঁপে উঠে যে এই ঘোরের মধ্যেও সে একটুর জন্য থমকে দাঁড়ায় । মোবাইলটা পকেট থেকে বের করে সে ম্যাসেজ চেক করছে...
- কিরান !! কাম অন বেইবি, আই ওয়ান্না ডান্স উইথ ইউ, প্লিজ টেক মি হোউউম… (মাতাল কন্ঠি একটি মেয়ের আবেদন) ।
কিরান ম্যাসেজটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে । তারপর হাত দিয়ে চোখ মুছে সে আবার আগের জায়গায় ফিরে যায় । সে ভাবছে মাতাল মস্তিষ্কের বিভ্রম । লেট নাইটে ক্লাব ঘর থেকে যখন সে গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামলো তখন রাস্তার দু’পাশ জুড়ে খুব আলো দেখতে পেল । পথের কিনারে কিনারে অদভুত কিছু ছায়া হাতে হাতে প্লে কার্ড নিয়ে দঁড়িয়ে আছে । যেন তাকে সংবর্ধনা দিচ্ছে । প্লে কার্ডে আঁকা ক্রস চিহ্ন । কিরান বাসা পর্যন্ত পুরো রাস্তায় এসব দেখতে দেখতে এসেছে । গ্যারেজে কোনভাবে গাড়িটা পার্ক করে তার ঘরে চলে গেল । গাড়ি থেকে চাবিটাও খুলতে ভুলে গেছে । তার শরীরে খুব অবসাদ লাগছে । সে ঘুমিয়ে পড়লো ।

সকালে সে যখন ঘুম থেকে ওঠে তার খুব ভালো লাগা অনুভব হয় । সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সকালের ঠান্ডা হাওয়া গায়ে মাখাচ্ছে । তখন তার মনে পড়লো রাতের ম্যাসেজটার কথা । সে মোবাইলটা নিয়ে চেক করে দেখে ওরকম কোন ম্যাসেজ নেই । লাস্ট ম্যাসেজ সিমিনের, এর আগেরটা রিঙ্কির, এর আগেরটা শিমুর… কিন্তু আননোন কোন ম্যাসেজ নেই । কিরানের তখন আরও ভালো লাগতে থাকে। সে ভাবে রাতের পিনিকটা খারাপ ছিলো না ! অসাধারণ ফিলিংস, মৃত্যুর ঘোরে থাকা । বন্ধুদের জানানোর জন্য সে খুব উদগ্রীব হয়ে ওঠে । সে তার বন্ধুদের সাথে খুব উৎফুল্ল ভাব নিয়ে শেয়ার করলো। তার বন্ধুরাও খুব আগ্রহ নিয়ে শুনে এবং তারাও এরকম ফিলিংস পেতে চায় । তাই হঠাৎ তারা সিদ্ধান্ত নেয় আজ রাতে আরেকটা পার্টির আয়োজন করবে ।তবে আজকের পার্টিতে আরেকটা এক্সট্রা জিনিস থাকবে।সেটা হলো গাঞ্জা । আজকাল মদটদ দিয়ে ভাল নেশা উঠে না তাই একটু কড়া চাই । সবাই খুব উচ্ছ্বসিত কিরানের অদ্ভুত ফিলিংসটা পাওয়ার জন্য । কিন্তু খেয়ালী মনোভাবে এমন ফিলিংস আসে না । তাদের অভিজ্ঞ বন্ধু কিরান এ বিষয়ে সতর্ক করে দিলো ।

গাঞ্জার জন্য যোগাযোগ করতে হবে গোপন মামার সাথে । গোপন মামার রহস্য হচ্ছে সকল প্রকার গোপনীয় কাজের সহজ সমাধান তার কাছে পাওয়া যায় । তাই যারা গোপন কাজের খদ্দের তারাই শুধু তাকে এই নামে ডাকে । কিন্তু অন্য সবাই জানে রইসুল মামা নামে । রইসুল মামা নামের লোকটিকে দেখে কেউ বুঝবে না তিনিই গোপন মামা । সাদাসিদা একজন মানুষ, মুখে সবসময় মিষ্টি কথা লেগে থাকে, পান সুপারীতে মুখ লাল করে রাখে। বেনারসি বস্তির দক্ষিণ- পূর্ব কোণে তার একটা ছোট্ট চায়ের দোকান আছে । তার দোকানে সবসময় ভিড় লেগে থাকে । কারণ তার বাকির খাতা বেশ লম্বা । অর্থ কষ্টে অনেকে তার সান্নিধ্য পায় । রইসুল মামা এতো উদার হওয়ার কারণ হচ্ছে গোপন মামাকে ঢাকনা দেয়া ।

- ওই গোপন মামারে তো ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না । তুই একটু ফোন দিয়ে দেখ তো রিন্টু । কিরান বললো ।

- দাঁড়া দেখছি । হ্যাঁ রিং হচ্ছে, ধর কথা বল ।

- হ্যালো মাম্মা কেমন আছো ? ব্যবসা কেমন চলছে ? মাম্মা পোটলা… টু টু ।

- কিরে রিন্টু মামা তো ফোন কাইটা দিলো । কিরান একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে বললো, চল মামার দোকানেই যাই ।

পথের মধ্যেই গোপন মামার সাথে তাদের দেখা হয়ে গেল । কিন্তু সে জানালো সে আর এসব গোপন কাজে নাই । সবকিছু ছেড়ে দিয়েছে এমন কী দোকানে সিগারেটও বিক্রি করে না । এই কথা জানিয়েই গোপন মামা হাঁটা দিলো । কিরান আর রিন্টু গোপন মামার পথের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো । কিন্তু তাই বলে কী তাদের গাঞ্জা টানা হবে না ? তারা শেষ পর্যন্ত অনেক খুঁজে গাঞ্জা জোগাড় করলো । রাতে রিন্টুদের বাসার ছাদে রাতুল, রিন্টু ,রাহাত এবং কিরান আবারও পার্টির আসর বসালো । রাত যত গভীর হচ্ছে তাদের নেশা তত তীব্র হচ্ছে । কিন্তু নেশা বাড়লেও কারো কিরানের পাওয়া সেই নেশা আসছে না । কিরানও ট্রাই করছে । এভাবে নেশা উঠাতে উঠাতে তারা ছাদেই লুটিয়ে গেল ।

সকালের সূর্যের তীব্র আলোয় ঘুম ভাঙলো কিরানের । সে গা মুড়ি দিয়ে ওঠে অন্য সবার অবস্তা দেখছে । সে দেখে রিন্টু ছাদে নেই । পাশের রাস্তা থেকে মানুষজনের হট্টগোলের আওয়াজ আসছে । কিরান নিচে তাকিয়ে দেখে রাস্তার কিনার ঘেঁষে বেশ কিছু মানুষ দঁড়িয়ে আছে ।

- এই রাতুল, রাহাত তাড়াতাড়ি ওঠ ! রিন্টু তো রাতে ছাদ থেকে পড়ে গেছে বোধয় !! কিরান দিশেহারার মত ডাকতে থাকে ।
কিরান খুব তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায় । তার পেঁছনে রাহাত আর রাতুলও নামে । তারা ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখে রিন্টু ড্রেনের মধ্যে কাত হয়ে আছে । রিন্টু আস্তে আস্তে চোখ মেলে দেখে অনেক মানুষ তার দিকে তাকিয়ে আছে । সে চমকে উঠে বসে যায় । সে আস্তে আস্তে উঠে ভিড় থেকে বের হয়ে তাড়াতাড়ি বাসার দিকে ঢুকে যায় । তার পেঁছন পেঁছন রাহাত, রাতুল, কিরানও যায় ।

-কিরে রিন্টু তোর কী হয়েছে ? তুই ড্রেনে গেলি কীভাবে ? কিরান হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে রাহাত রাতুলের সাথে ।

- দোস্ত আমি তো তোর ফিলিংসটা পেয়েছিলাম । রিন্টু বলে ।

- বলিস কী !! তাই নাকি ! কিরান খুব এক্সাইটেট হয়ে জিজ্ঞেস করে । কিন্তু ড্রেনে কীভাবে গেলে ?

- আরে বলিস না, রাতে হঠাৎ আমার শরীর কেঁপে ওঠে । আমি চোখ মেলে দেখি সিঁড়ির দিক থেকে খুব আলো আসছে । আমি উঠে সিঁড়ির দিকে আসি । দেখি কিছু ছায়া হাতে প্লে কার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । প্লে কার্ডে ক্রস আঁকা । আমি নামতে থাকি আর এইসব দেখতে থাকি । এরপর আর কিছু মনে নাই । কীভাবে আমি ড্রেনের মধ্যে গেলাম তাও মনে নেই ।

-পার্ফেক্ট ম্যান । রিন্টুর গায়ে বাহবা দিয়ে বললো কিরান । রাহাত, রাতুলের মন খারাপ হলো তারা সেই ফিলিংসটা পাইনি ।

কিরানের মোবাইলে একটা কল আসলো । কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে রইসুল মামার দোকানের পোলাটা বললো, রইসুল মামা আজ ভোরে মারা গেছে । কিরান ফোনটা নামিয়ে বললো,

- রইসুল মামা আজকে সকালে মারা গেছে ।

- কস কী কিরান !! অবাক হয়ে বলে রাহাত, রাতুল, রিন্টু। গতকালই না তার সাথে দেখা হলো ! তারা বুঝতে পারে রইসুল মামা গোপন কাজ ছেড়ে দিয়েছিল কেন । রিনটু যেন একটু খুশি হলো, ওই শালা মারা গেছে ভালোই হইছে , শালায় আমাগোরে গাঞ্জা দেই নাই । কিরান বলে, এ থাক রিন্টু, মরা মানুষকে গালি দিতে নাই ।

২।

কিরান চোখ বুজে বেশ মোটা গদির চেয়ারে হেলান দিয়ে আছে । বংশ পরমপরায় পাওয়া ব্যবসায়ের গতি টানার সম্পূর্ণ দায়বার এখন তার হাতে । ব্যবসায়ের দড়ি তার হাতে আসার পর থেকে ব্যবসায়ের উন্নতি চরম শিখরে উঠেছে । তবে কিরানের বাবা এতে মোটেও খুশি নয় । কারণ তার বাবা কখনো চাননি হালাল টাকায় গড়া ব্যবসায়ের সাথে হারামের অংশ যোগ হোক । কিন্তু কিরান তা করে যাচ্ছে অবলীলায় ।সে আঁড়ালে বিভিন্ন অবৈধ ধান্ধায় জড়িত । আজকেও তেমনি একটা ডিল করেছে যা তার অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে । চায়নিজ একটা কম্পানীর সাথে সাতশ বিশ কোটি টাকার নথি সাইন হয়েছে । কিরান তাদেরকে ঔষধ তৈরির একটা নকল ইনগ্রিডিয়েন্ট দেবে । যার বাজার মূল্য প্রতি মিলি ৭৫ পায়সা আর কিরান তা দেবে মাত্র ১০ পয়সায় । তারা আলরেডি অর্ধেক এডভান্স করে দিয়েছে । আর তাদের বানানো ঔষধটা কিরানই আমদানি করবে । সে তা দেশের বাজারে ছেড়ে দেবে । কিরান খুব ভাল করেই জানে ঔষধটা স্বাস্থ্যের জন্য খুব ক্ষতিকর । কিন্তু এতে তার কী আসে যায় । এর আগেও সে অনেক অবৈধ বিজনেস করেছে । তাই তার কাছে এগুলোই বৈধ হয়ে গেছে । হান্ড্রেটে ফিফটি পার্সেন্ট প্রফিট থাকবে । তার চাই টাকা । তার চাই ব্যবসায়ের আরও শাখা-প্রশাখা । তাই সে বেশ আয়েশি হেলান দিয়ে আছে ।

হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠায় কিরানের তন্দ্রা ভাঙ্গে ।বন্ধু রিন্টুর বাসা থেকে ফোন এসেছে । তার বাসা থেকে খবর আসে সে আজ বিকালে মারা গেছে । হঠাৎ বুকে পেইন ওঠে । তখন ডাক্তারের কাছে নিতে নিতে পথেই মারা যায় । খবরটা শুনে কিরানের মনটা খুব খারাপ হয়ে যায় । তার বিশ্বাস হচ্ছে না । গতকালই তো তারা একটা নৈশ পার্টিতে একসাথে ছিল । ছোটবেলার বন্ধু ছিল রিন্টু । তার সাথে কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে । এভাবে রিন্টুর হঠাৎ চলে যাওয়াটা কিরান মেনে নিতে পারছে না । রিন্টুর জন্য আফসুস হয় কিরানের, বেচারা বুঝি আর ধরতে পারলো না । এখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে । কিরানের হাতে কিছু কাজ থাকলেও সেগুলো রেখে সে বের হবে । রিন্টুর বাসায় যাবে । পরিবারকে সান্তনা দেয়ার কাজটা তাকেই করতে হবে । সে গাড়ির চাবিটা নিয়ে অফিস থেকে বের হয়ে যায় । সে নিজেই ড্রাইভ করে ।গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো । কিন্তু চৌরাস্তায় এসে জ্যামে গাড়ি আটকা পড়লো । সে মনে মনে রিন্টুর কথা ভাবছে । আচ্ছা রিন্টু তো নিশ্চয় তার মৃত্যুর কথা আগেই জেনেছিল । কিন্তু সে তো আমাকে বলতো । মানুষ তার মৃত্যুর কথা অন্তত পক্ষে একদিন আগে জানে, এর বেশি আগেও জানে, তবে একদিন হচ্ছে সর্বনিম্ন । সে অনুযায়ী সেও অন্তত একদিন আগেই জেনেছিল । কিন্তু আমাকে বলেনি কেন ? সে তো তার ফ্যামেলিকেও জানাতে পারতো । কিন্তু তারা তো বললো হঠাৎ মারা গেছে । তবে কী সে জানেনি ? নাহ, এমন তো হওয়ার কথা নয় । তখন কিরানের হঠাৎ বিশ বছর আগের কথা মনে পড়ে । তখন তারা দুজন দুষ্টমীর ছলে হলেও সেই আগাম মৃত্যুর হিসেব মিলিয়ে রেখেছিল । তাদের মৃত্যুর ব্যবধান ছিলো দু’ঘন্টা আগে পরে । কিরান সালটা মনে করার চেষ্টা করে । এবং সে পায় সালটা এই বছরই । শুধু দিন আর সময়টা মনে করতে পারে না । তার হাত পা সব ঠান্ডা হতে শুরু করে, সে কাঁপতে থাকে । ফোনটা হাতে নিয়ে সে ফোন দিতে চাচ্ছে রিন্টুর বাসায় । সে জানতে চায় রিন্টু কয়টায় মারা গিয়েছিল । তার হাত কাঁপাকাঁপিতে ফোনটা গাড়িতে পড়ে যায় । সে আবার হাতে নিয়ে নাম্বার টিপে ফোন দেয় । এই কড়া এসির গাড়িতেও সে খুব ঘামছে । ফোন দিয়ে জানতে পারে রিন্টু বিকাল প্রায় সোয়া পাঁচটার দিকে মারা যায় । আর এখন বাজে পোনে সাতটা । তার হাতে সময় আছে আর মাত্র আধাঘন্টা । সে এখন কী করবে বুঝতে পারছে না । সে জানতো না বিশ বছর আগের মাতাল ঘোরে জেনে যাওয়া মৃত্যুটাই সত্য ছিল ।

কিরান এখন বিশাল জ্যামের মাঝখানে গাড়ি নিয়ে বসে আছে । ব্যাক টার্ন নেয়ারও কোন জায়গা নেই । গাড়ির দরজাটাও সামান্য খুলতে পারছে । এই সামান্য ফাঁকা দিয়ে কোনমতে শরীর চেপে বের হয় সে । বের হয়েই পাগলের মতো উল্টো দিকে দৌঁড়াতে থাকে। কারণ স্বর্গীয় উদ্যান সেদিকে । সে ভেবেছিল যেহেতো মৃত্যুর খবর অন্তত একদিন আগে জানবে সেহেতো সে খুব আয়েশেই স্বর্গীয় উদ্যানে পৌঁছে যেতে পারবে । সে আর এমন দূর কী ! আর স্বর্গীয় উদ্যানে পৌঁছাতে পারলে ডিরেক্ট স্বর্গে চলে যেতে পারবে । কিন্তু এমন একটা দূর্ঘটনা ঘটবে কিরান তা ভাবেনি । কিরান ছুটছে লাগামহীন । বয়স হয়েছে তাই একটু পর পর হাঁপিয়ে উঠছে । তারপরও সে দৌঁড়াচ্ছে । কারণ তাকে সেখানে অবশ্যই পৌঁছাতে হবে । তার অতীত জীবনের সকল কার্জকলাপ ভেসে উঠছে চোখের সামনে । সে জানে এ সব পাপের কোন ক্ষমা নেই । স্বর্গীয় উদ্যান না ধরতে পারলে তাকে পরকালে নরকে জ্বলতে হবে । তার আশেপাশে অনেক গুলো কালো ফানুস উড়ছে । সময়টা তীব্র বিস্বাদময় লাগছে তার কাছে । একটা সময় সে আবিষ্কার করে তার আশেপাশে আরও অনেকে দৌঁড়াচ্ছে । তারাও স্বর্গীয় উদ্যানে যাচ্ছে । সে একটু সাহস পায় ।সে আরও লম্বা পা ফেলে এগিয়ে যায় । একটু পর সে স্বর্গীয় উদ্যান নিজ চোখে দেখতে পায় । এই তো আর কিছু পথ । সে খুশিতে ফেটে পড়ে ।

কিরান আগে কখনো স্বর্গীয় উদ্যান দেখেনি । কারণ এই উদ্যান শুধু মৃত্যু পথযাত্রিরাই দেখতে পায় । আর সে এখন এই পথে। স্বর্গীয় উদ্যানের হাজার হাজার দরজা দূর থেকে কিরান দেখতে পায়, আলোয় জ্বলজ্বল করছে । হঠাৎ দেখে তার দুই পাশ থেকে কিছু পরিচিত লোক তার সাথে বাড়ি খেয়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে । সে দৌড়াচ্ছে আর তারাও সেই তালে তালে বাড়ি খাচ্ছে আর হাসছে আর মিলিয়ে যাচ্ছে । বিদঘুটে হাসি । কিরান তাদের মুখ খুব ভালো করে চেনে । এরা তার জীবনের বিভিন্ন সময়ের সুখসঙ্গী। তাদের সাথে কিরানের খুব সখ্যতা ছিল ।এমনকি মৃত রিন্টুও তাদের সাথে আছে । কিন্তু সে ভাবছে তার সাথে এরা এমন করছে কেন ? তারাও কী মৃত্যুর খবর পেয়েছে ? নাহ, তা হওয়ার কথা নয় । তাহলে তো তারাও আমার সাথে দৌঁড়াতো । কিরান খেয়াল করলো সে স্বর্গীয় উদ্যানের বেশ নিকটে চলে এসেছে । কিন্তু কাছাকাছি এসে সে আবিস্কার করলো স্বর্গীয় উদ্যানে ঢোকার জন্য তার কোন দরজা নেই । আশে পাশে তাকিয়ে দেখছে সবার দরজা আছে শুধু তারটা নেই । সে পাগলের মত কাছে গিয়ে খুঁজতে থাকে । হাত দিয়ে হাঁতড়াতে থাকে কিন্তু তার সামনে শুধু একটা আয়না ভাসছে । সেটা দিয়ে সে ভেতরের অপরূপ আয়োজনে সাজানো স্বর্গ দেখছে । সেখানে সবাই চিরন্তনী সুখ লাভ করছে । কিরান পাগলের মত হয়ে যায় ।সে আয়নাটা ভাঙ্গতে চাচ্ছে । খুব ছুটিছুটি করছে কিন্তু লাভ হচ্ছে না । তার আশেপাশে থাকা সবাই ঢুকে গেছে । স্বর্গীয় উদ্যানটাও আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে । হঠাৎ কিরানের অনুভব হতে লাগলো তার দরজাটা তার পেঁছনেই দাঁড়িয়ে আছে । তাকে টেনে ঢোকানোর চেষ্টা করছে । সে পেঁছন ফিরে তাকায় । সে খুব খুশি হয়ে যায় । দরজাটা তার ঠিক পেঁছনেই ।

কিরান দরজার দিকে আগাতে থাকে কিন্তু দরজাটা পেঁছনে চলে যায় । দরজাটার আশেপাশে সে দেখতে পায় অনেকগুলো হাত । সে হাতগুলো দরজাটাকে তার দিক থেকে দূরে টেনে রাখছে । একটু পরে দরজার চারপাশ থেকে তার সেই পরিচিত, খুব পরিচিত মুখগুলো বের হয় । তার সকল মৃত এবং জীবিত অপকর্মের সঙ্গীরা। তারা দরজাটাকে কিরানের দিকে যেতে দিচ্ছে না । তারা খিলখিল করে বিদঘুটে হাসি দিচ্ছে । কিরান দরজাটাকে ধরার চেষ্টা করতে করতে একটা পর্যায়ে পড়ে যায় । সে আর চেষ্টা করে না । সে তার ঘড়ির দিকে তাকায় । দেখে আর মাত্র দুই মিনিট আছে । সে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলে । সে অনুভব করতে থাকে অন্ধকারের অনেকগুলো কালো হাত তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে । সে আকুতি করতে থাকে, আমাকে আরেকটু সময় দাও... আমায় আরেকটু সময় দাও... আমি প্রায়শ্চিত্ত করবো... আমি প্রায়শ্চিত্ত করবো...

কিন্তু সে কার কাছে আকুতি করছে তা স্পষ্ট নয় ।


[গল্পের থিম চমৎকার রিভিও রাইটার প্রিয় ''আধখানা চাঁদ'' থেকে ধার করা। জানি না কতটুকু ভাল হয়েছে ।তবুও এই গল্প তার জন্য উৎসর্গ করলাম ।]
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই অক্টোবর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:৪৩
১৫টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশ হতো হায়দ্রাবাদ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫

।।হায়দারাবাদের নিজাম।।


১৯৪৭ সাল ভারতবর্ষের মুসলমানরা যখন নির্যাতনের শিকার অনেকগুলো গণহত্যা হয়েছিল দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে বা তারও আগে এই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাজনীতি শুরু করেছিল কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে তিনি কংগ্রেসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বৃষ্টির ডায়েরি: অধ্যায় শূন্য

লিখেছেন চারাগাছ, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৬




বৃষ্টির ডায়েরি: অধ্যায় শূন্য


​আজকের বৃষ্টিটার কোনো ছন্দ নেই। কোনো ব্যাকরণ নেই। স্রেফ আকাশ ভাঙা জল, যা এই শহরের বুকে সশব্দে আছড়ে পড়ছে। মানুষজন তাড়াহুড়ো করে ছাতা মেলছে, আশ্রয়ের খোঁজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মারা গেলো

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৩



বাংলাদেশে ডাক্তারদের অবহেলায় কি পরিমাণ প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছে তা কল্পনাতীত। এবং আমাদের দেশের ডাক্তার এই অপরাধে নূন্যতম অনুশোচনা বোধ করে না।

ডাক্তারদের অবহেলার কারণে দেশের পাঠ্য বই ইংরেজি... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাজনীতিতে ফেরার টিকিট কি এবার ক্রেমলিনে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:১০


বিশ্বজুড়ে থরথর কম্পন শুরু হয়ে গেছে। মার্কিন মুল্লুক থেকে মহাখালী, সবাই আজ বাকরুদ্ধ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বিস্ফোরণ ঘটেছে। বিশ্বস্ত সূত্রে, অর্থাৎ ভারতীয় কয়েকটি বেনামী ফেসবুক পেজ এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার সোভিয়েত শৈশব

লিখেছেন চারাগাছ, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১





বাংলা ব্লগের জগতে সহব্লগাররা যারা আমাকে অনেকদিন ধরে চেনেন, তারা জানেন—আমার একটা রাশিয়ান শৈশব ছিল।
শুনতে একটু অদ্ভুত লাগে, তাই না?

রাশিয়ায় আমি কোনোদিন যাইনি।

তবু আমার একটা রাশিয়ান শৈশব ছিল।

আমার সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×