somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গৃহকর্মীদের নির্যাতন বন্ধ করতে পারে ।

২০ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ১০:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গোপালগঞ্জের বড়ফা গ্রামের দশ বছরের মেয়ে লিয়া সংসারে অভাবের তাড়নায় মায়ের কোল ছেড়ে গৃহকর্মীর কাজে আসে ঢাকায় তাদের ই গ্রামের এক প্রভাব শালী ডাক্তারে মেয়ের বাসায় । কিন্তু সেখানে তাকে সামান্য গুঁড়ো দুধ চুরি করে খাওয়ার অপবাদ দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে গরম খুন্তির ছেকা দিয়ে ঝলসে দেয়ে হয় শরীরের বিভিন্ন অংশ সেই সাথে রুটি বানানোর বেলন দিয়ে পিটিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছে তার চারটি দাঁত । বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের পেস বোলার শাহাদাত হোসেন ও তার স্ত্রী জেসমিন জাহান নিত্য এখন শ্রী ঘরে অভিযোগ মাহফুজা আক্তার হ্যাপি নামের এগারো বছর বয়সী শিশু গৃহকর্মীকে অমানবিক নির্যাতন । গৃহকর্মী হারিয়ে গেছে মর্মে ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫ বিকেলে মিরপুর থানায় জিডি(সাধারণ ডায়েরি) করেছিলেন ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেন। এরপর ওই গৃহকর্মীকে উদ্ধার করলে পুলিশের কাছে সে শাহাদাতের বিপক্ষে শারিরীক নির্যাতনের অভিযোগ করে এবং পুলিশী তদন্তে ও শিশুটির শারীরিক নির্যাতনের প্রমান মিলে। এর পর বিভিন্ন নাটকীয়তা শেষে আদালতে আত্মসমর্পন করে শ্রী ঘরে যেতে হয় ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেন ও তার স্ত্রী জেসমিন জাহান নিত্যকে ।প্রতিদিন ই প্রত্রিকার পাতায় খবর হয়ে আসে কোন না কোন লিয়া বা হ্যাপির নির্যাতনের কাহিনী যারা শারীরিক , মানসিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে গৃহকর্ত্রী বা কর্তার দ্বারা । এ নিয়ে মামলা হচ্ছে কিন্তু যাঁরা গৃহকর্মী তাঁরা সবচেয়ে দরিদ্র আর যাঁরা গৃহকর্মী রাখেন অর্থাৎ গৃহ কর্তা বা কত্রী তাঁরা কম-বেশি সম্পদশালী, ক্ষমতাবান৷ মামলা করলেও সেই মামলা চালানোর মতো আর্থিক ক্ষমতা থাকে না নির্যাতিত বা নিহতের পরিবারের৷ তাই তাঁরা শেষ পর্যন্ত সমঝোতা করেন বা মামলা চালাতে না পেরে আইনের ফাঁকে বেরিয়ে ও আসছে । আইন গত ভাবে শাস্তি হউক আর নাই হউক কিন্তু সামাজিক ভাবে নির্যাতনকারীরা যে হেয় ও প্রতিপন্ন হচ্ছেন এটাই বোধ করি সবচেয়ে বড় শাস্তি কারণ যারা এসকল গৃহ কর্মীদের নির্যাতনের ঘটনায় আসামির কাঠগড়ায় দাড়াচ্ছেন তাদের সকলেই সমাজের শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত নাগরিক । আমাদের দেশে কম বেশী প্রায় বিশ লক্ষ গৃহকর্মী গৃহস্থালির কাজের সাথে সম্পৃক্ত যার সিংহ ভাগ ই নারী ও শিশু ।আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব মতে, ২০১৩ সালে অন্তত ১০০ জন গৃহকর্মী বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন৷ এদের মধ্যে ৩৮ জন শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন৷ যাদের মধ্যে আবার ২০ জনের বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে৷শারীরিক নির্যাতনের পর মৃত্যু হয়েছে ১৫ জনের৷ অন্যান্য নির্যাতনে মৃত্যু হয়েছে ৩২ জনের৷ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তিনজন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে আরো তিনজনকে৷ এছাড়া আত্মহত্যা করেছেন আটজন এবং গর্ভপাতকালে মুত্যু হয় একজনের৷ পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের শেষ চার মাসে ১০৭ জন গৃহকর্মী আত্মহত্যা করেছেন৷বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজের তথ্য মতে, ২০১৪ সাল থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত সারা দেশে ৫৪ গৃহকর্মী খুন হয় এর অধিকাংশই ধর্ষণের পর। গৃহকর্মে নিয়োজিত মেয়ে শিশুর ওপর ধর্ষণসহ নানা নির্যাতন দিন দিন বাড়ছে। গৃহকর্মে নিয়োজিত প্রায় ৯২ শতাংশই শিশু। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার এক জরিপে বলা হয়, যেসব শিশু শ্রমিক গৃহস্হালীর কাজে রয়েছে তাদের ৫৭ শতাংশ শুধু খাদ্যের বিনিময়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। আর ডোমেস্টিক ওয়াকার্স রাইটস নেটওয়ার্ক-এর হিসাব অনুযায়ী ২০০১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই ৫৬৭ জন গৃহকর্মীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে৷ গৃহ কর্মীদের নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কোন নির্দিষ্ট তথ্যভান্ডার না থাকায় এ সকলের জরিপে বিভিন্ন তথ্যগত অসামনযস্য থাকতে পারে তবে বাংলাদেশে গৃহ কর্মী নির্যাতন যে ভয়াবহ রুপ ধারন করেছে এটা স্পষ্ট ।মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র ২০১২ সালে সরকারের কাছে গৃহকর্মীদের জন্য " ডোমেস্টিক ওয়ার্কার রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড প্রেটেকশন অ্যাক্ট " নামে একটি আইনের খসড়া প্রস্তাব করে৷ দেশের সর্বোচ্চ আদালত একটি সুরক্ষা আইন করার নির্দেশ ও দিয়েছে৷ কিন্তু এখনো সরকার সেই আইন করতে পারে নি ৷ একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা মানবাধিকার ও শিশু অধিকারের কথা বলি কিন্তু বাস্তবে কতটুকু এর প্রয়োগ হচ্ছে তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। আমাদের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী হতঃ দরিদ্র যাদের দিন কাটে অর্ধাহার বা অনাহরে । তাই ক্ষুধায় জর্জরিত বাবা-মা একটু ভালো খাবার, একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার আশায় তাদের আদরের সন্তানকে তুলে দেন কোন এক ধনী পরিবারে ।আর সেই ছোট্ট শিশু টি সুর্যোদয় থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হাড় ভাংগা প্ররিশ্রম মাধ্যমে সম্পর্ন করছে গৃহস্হালীর সমস্ত কাজ কর্ম অথচ সমাজের ঐ সকল মানুষ নামধারী পাষান্ডরা সামান্য ভুলের জন্য ছোট্ট এ শিশু টিকে অমানবিক নির্যাতন করতে একটু ও দ্বিধা বোধ করে না । আমরা কি একবারও ভাবতে পারি না নিজের সন্তানটিকে যে আদর ভালোবাসা দিয়ে বড় করছি, সেই আদর ভালোবাসা পাবার অধিকার আমার গৃহকর্মী শিশুটির ও রয়েছে। গৃহকর্মী আমাদের পরিবারের ই একটি অংশ। তাদেরকে ছোট করে না দেখে আমাদের উচিত একজন মানুষ হিসেবে দেখা, তাদের কাজের স্বীকৃতি দেয়া।এ ছাড়াও গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের বিরুদ্ধে সমাজের সবাইকে সচেতন হতে হবে। আমাদের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। তাদের প্রতি আমাদের সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।আর তাই শুধু আইন করেই গৃহকর্মীদের প্রতি নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব নয় তার জন্য প্রয়োজন আমাদের মানবিক মননশীলতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি । আর সেই মানবিক মননশীলতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গৃহকর্মীদের নির্যাতনের হার আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে অনেকাংশে কমইয়ে আনতে পারে ।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ১০:০৮
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাঞ্জাবিস্তান

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৪০

পাকিস্তা/নের পাঞ্জাবিরা হলো পাকি/স্তানের বাকি সব জাতিসত্তার মানুষদের জন্য অভিশাপ। এদের জাত্যভিমানের কারনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগন স্বাধীনতার ডাক দিতে বাধ্য হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের প্রদেশগুলো যেরকম অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহর ছবি প্রশ্ন জাগে, আমরা কোন দেশে বাস করি?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৯

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহর ছবি প্রশ্ন জাগে, আমরা কোন দেশে বাস করি?
যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, যে বাংলাদেশ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয়েছে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু... ...বাকিটুকু পড়ুন

এগারটি বছর পার হয়ে গেল…. কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে একাদশতম বর্ষপূর্তি পোস্ট

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৪১



পূর্বের বর্ষপূর্তি পোস্টের লিঙ্কঃ দশম বর্ষপূর্তি পোস্ট

সামহোয়্যরইনব্লগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখ রাত ১১টা ২৬ মিনিটে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম কবিতা, বক্ষমাঝে থাকবে তুমি। বলা যায় খুব দ্রুতই, মাত্র তৃতীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুঃখ খচিত পতাকা আমার

লিখেছেন এম ডি মুসা, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র প্রাঙ্গণে
আজ হঠাৎ কার ছায়া নামে?
কার দুঃসাহসী কালো হাত
ইতিহাসের বুকের ওপর আঁকে পরাধীনতার নাম?

যে নাম একদিন ভাষার কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল,
যে শাসন একাত্তরে ছড়িয়েছিল মৃত্যুর অন্ধকার
আজ কেন তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ হতো হায়দ্রাবাদ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫

।।হায়দারাবাদের নিজাম।।


১৯৪৭ সাল ভারতবর্ষের মুসলমানরা যখন নির্যাতনের শিকার অনেকগুলো গণহত্যা হয়েছিল দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে বা তারও আগে এই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাজনীতি শুরু করেছিল কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে তিনি কংগ্রেসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×