somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সীমান্তে লাশের মিছিল

১৫ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত আজ দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি, মানবাধিকার, নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কৌশলের এক জটিল প্রতীকে পরিণত হয়েছে। প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্ত বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম স্থলসীমান্ত, যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ অংশই প্রায় ২,২০০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত। এই সীমান্তের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি এর রাজনৈতিক তাৎপর্যও বহুমাত্রিক। নদী, চরাঞ্চল, কৃষিজমি, জনপদ এবং ঐতিহাসিকভাবে পরস্পর নির্ভরশীল মানুষের জীবনযাত্রাকে বিভক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকা কাঁটাতারের বেড়া এখন আর কেবল একটি নিরাপত্তা অবকাঠামো নয়; এটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদ, সীমান্ত রাজনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কের এক শক্তিশালী প্রতীক। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের পর সীমান্ত নিরাপত্তা ও অনুপ্রবেশের প্রশ্নকে এমনভাবে রাজনৈতিক ভাষ্যে রূপ দেওয়া হয়েছে, যা কেবল নির্বাচনী রাজনীতিকে প্রভাবিত করেনি, বরং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি ( বিজেপি) দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তকে “জাতীয় নিরাপত্তার প্রথম প্রতিরক্ষা রেখা” হিসেবে তুলে ধরে আসছে। তাদের রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে “অনুপ্রবেশ”, “জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন” এবং “সীমান্ত সুরক্ষা”। বিজেপির নেতারা প্রায়ই দাবি করেন যে, বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্য হুমকি। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে এই ইস্যুকে ঘিরে যে রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, যা বিজেপির নির্বাচনী কৌশলের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ব্যবহাী করেছে । ফলে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকে তারা কেবল প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়, বরং “জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার প্রকল্প” হিসেবে প্রচার করেছে।

এই রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)। বিজেপি এই দুই উদ্যোগকে “অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্তকরণ” ও “ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার সংখ্যালঘুদের আশ্রয়” হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও সমালোচকরা মনে করেন, এটি মূলত সীমান্ত রাজনীতিকে ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজনের মাধ্যমে আরও উসকে দেওয়ার কৌশল। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো উত্তর ২৪ পরগনা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও কোচবিহারে বিজেপি সীমান্ত নিরাপত্তা ইস্যুকে ব্যবহার করে জাতীয়তাবাদী আবেগ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। তাদের বক্তব্যে প্রায়ই এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল যে, রাজ্যের তৎকালীন শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস ভোটব্যাংকের স্বার্থে সীমান্তকে “ শিথিল ” করে রেখেছে।

ভারতের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কাঁটাতারের বেড়ার ইতিহাস মূলত ১৯৮০ এর দশকের শেষভাগে শুরু হলেও তা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয় ২০০১ সালের পর। ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সীমান্তের প্রায় ৩,২০০ কিলোমিটার এলাকায় ইতোমধ্যে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট অংশে নদী, জলাভূমি ও আইনি জটিলতার কারণে নির্মাণকাজ ধীরগতিতে চলছে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন অনুযায়ী শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজ দূরে স্থায়ী কাঠামো নির্মাণের নিয়ম থাকলেও বাস্তবে বহু স্থানে এই নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় এমন উদাহরণ দেখা গেছে, যেখানে কাঁটাতারের কারণে স্থানীয় কৃষকদের জমি কার্যত সীমান্তের ওপারে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে কৃষকদের নিজেদের জমিতে যেতে বিএসএফের গেট খোলার অপেক্ষায় থাকতে হয়। এটি সীমান্তবাসীর জন্য কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং এক ধরনের দৈনন্দিন অপমান ও অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী বিএসএফ এই সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রধান দায়িত্বে রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, বিএসএফ সীমান্তে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী সীমান্তে পরিণত হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা 'অধিকার' এর তথ্যানুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর বিএসএফ এর হাতে
অন্তত ১,৯৮৭ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। কখনও গবাদি পশু পাচার, কখনও অবৈধ অনুপ্রবেশ, আবার কখনও সন্দেহের ভিত্তিতে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর ২০১১ সালে প্রকাশিত তাদের আলোচিত প্রতিবেদন "ট্রিগার হ্যাপি" তে সংস্থাটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোকে "বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড" হিসেবে অভিহিত করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, অধিকাংশ ঘটনায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিরা সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ছিলেন এবং তাদের শরীরের পেছনে বা পিঠে গুলি করা হয়েছিল (যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে তারা আক্রমণ নয়, বরং পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন)। ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ-এর বিতর্কিত "শুট অন সাইট" বা দেখা মাত্র গুলি নীতির তীব্র সমালোচনা করে সংস্থাটি একে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে সীমান্ত অতিক্রম করা অপরাধ হতে পারে, কিন্তু তা মৃত্যুদণ্ডযোগ্য নয়। ফলে সীমান্তে “দেখামাত্র গুলি” নীতির অভিযোগ ভারতকে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার মুখে ফেলেছে।

২০১১ সালে কিশোরী ফেলানী খাতুনের মৃত্যুর ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলন্ত ফেলানির মৃতদেহের ছবি বিশ্ব গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে ভারতীয় সীমান্ত নীতির নৃশংসতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন ওঠে। এই ঘটনা কেবল একটি মানবিক ট্র্যাজেডি ছিল না এটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিদ্যমান ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং মানবাধিকারের সংকটকে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত করে। যদিও পরবর্তীতে ভারত সীমান্ত হত্যাকাণ্ড কমানোর প্রতিশ্রুতি দেয়, বাস্তবে নিহতের সংখ্যা কখনও পুরোপুরি শূন্যে নামেনি। বিজেপির সীমান্ত রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিএসএফের ক্ষমতা বৃদ্ধি। ২০২১ সালে ভারত সরকার সীমান্তবর্তী এলাকায় বিএসএফের তল্লাশি ও গ্রেপ্তারি ক্ষমতা সীমান্ত থেকে ১৫ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে এটিকে “ফেডারেল কাঠামোর ওপর হস্তক্ষেপ” বলে আখ্যা দেয়। কিন্তু বিজেপি একে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কেবল নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ নয় এটি সীমান্ত অঞ্চলে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করারও একটি কৌশল। কারণ সীমান্ত রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি এবং প্রভাব বাড়ানো বিজেপির জন্য রাজনৈতিকভাবে লাভজনক।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভারতের সীমান্ত নীতি মূলত “ডিফেন্সিভ রিয়েলিজম” বা রক্ষণাত্মক বাস্তববাদের প্রতিফলন। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে সীমান্তে কঠোর নজরদারি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদ, চোরাচালান, জঙ্গি কার্যক্রম এবং অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধের জন্য অপরিহার্য। বিশেষ করে আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের আশঙ্কা ভারতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই নিরাপত্তা আখ্যান অনেক সময় অতিরঞ্জিত এবং রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত। প্রখ্যাত মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ স্টিভেন পি. কোহেন বহু আগেই উল্লেখ করেছিলেন যে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের সময় “ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ ” ইস্যু প্রায়ই রাজনৈতিকভাবে উত্থাপিত হয়।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তকে প্রায়ই ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সীমান্তের সঙ্গে তুলনা করে। তবে এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র হিসেবে দাবি কে আসছে যাদের মধ্যে বাণিজ্য, জ্বালানি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তবুও সীমান্তে এমন কঠোর সামরিকীকরণ দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সংকট সৃষ্টি করছে। কাঁটাতারের বেড়া কেবল শারীরিক বাধা নয় এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল, যা দুই দেশের সীমান্তবর্তী জনগণের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরাও সীমান্ত নীতির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। কিন্তু সীমান্তে অতিরিক্ত কড়াকড়ির কারণে বৈধ বাণিজ্যের পাশাপাশি চোরাচালানও সমান্তরালভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গবাদি পশু, মাদক, স্বর্ণ, সার এবং ভোগ্যপণ্যের অবৈধ বাণিজ্য সীমান্ত অঞ্চলে একটি বড় অর্থনৈতিক চক্র তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যখন বৈধ চলাচল ও ব্যবসা জটিল হয়ে পড়ে, তখন অবৈধ নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে কাঁটাতারের বেড়া অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে সীমান্ত অর্থনীতিকে আরও অস্বচ্ছ করেছে।
পরিবেশগত ভূ-রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও এই সীমান্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা এবং ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ জলবায়ুজনিত কারণে বাস্তুচ্যুত হতে পারে। ভারতীয় কৌশলবিদদের একটি অংশ এই সম্ভাব্য জনগোষ্ঠীকে ভবিষ্যতের “ক্লাইমেট মাইগ্রেশন” হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে সীমান্তে স্মার্ট ফেন্সিং, ড্রোন নজরদারি এবং ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে অনেক বিশ্লেষক ভবিষ্যতের জলবায়ু উদ্বাস্তু ঠেকানোর প্রস্তুতি হিসেবেও দেখছেন। বর্তমানে ভারত সীমান্তে “কমপ্রিহেনসিভ ইন্টিগ্রেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম” বা সিআইবিএমএস চালু করেছে। এর আওতায় সেন্সর, থার্মাল ক্যামেরা, লেজার ওয়াল এবং ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে সীমান্তকে “স্মার্ট বর্ডার” এ রূপান্তরের চেষ্টা চলছে। ভারত দাবি করছে, এই প্রযুক্তি মানবিক ক্ষয়ক্ষতি কমাবে এবং গুলিবর্ষণের প্রয়োজন কমিয়ে আনবে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি সীমান্তকে একটি স্থায়ী সামরিক অঞ্চলে পরিণত করছে, যেখানে সাধারণ মানুষের গোপনীয়তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো সীমান্তবাসীর মানবিক সংকট। সীমান্তবর্তী বহু পরিবার ঐতিহাসিকভাবে আত্মীয়তা, কৃষিকাজ এবং স্থানীয় বাণিজ্যের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। কাঁটাতারের কারণে এই সম্পর্কগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় মানুষকে নিজেদের জমিতে যেতে বা আত্মীয়ের বাড়ি যেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। রাতের বেলায় চলাচলে বিধিনিষেধ, তল্লাশি এবং গুলির আতঙ্ক সীমান্তবাসীর জীবনকে অনিশ্চয়তায় ভরিয়ে তুলেছে। সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী শিশুদের শিক্ষাজীবন, নারীদের নিরাপত্তা এবং কৃষকদের জীবিকাও সরাসরি এই কঠোর সীমান্ত নীতির প্রভাব বহন করছে।
১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি এবং ২০১৫ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। ছিটমহল বিনিময় এবং সীমান্ত নির্ধারণের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বহু সমস্যার সমাধান হয়। কিন্তু সীমান্ত হত্যা, কাঁটাতারের সম্প্রসারণ এবং রাজনৈতিক বক্তব্যে “অনুপ্রবেশকারী” ইস্যুর পুনরাবৃত্তি সেই অর্জনকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিশেষ করে ভারতের পশ্চিম বঙ্গের নির্বাচনী সময় বিজেপি নেতাদের কিছু মন্তব্য বাংলাদেশে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। “উইপোকা” বা “অনুপ্রবেশকারী” জাতীয় শব্দচয়ন কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, ট্রানজিট, সমুদ্রবন্দর এবং আঞ্চলিক সংযোগে যে সহযোগিতা গড়ে উঠেছে, তা সমগ্র অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সীমান্ত যদি ক্রমাগত সামরিকীকৃত হয় এবং মানবিক সংকটের প্রতীকে পরিণত হয়, তবে সেই সহযোগিতার ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে। সীমান্তকে কেবল নিরাপত্তার চশমা দিয়ে দেখলে দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সীমান্ত সমস্যার টেকসই সমাধান কাঁটাতারের উচ্চতা বাড়ানো নয় বরং সীমান্তকে উন্নয়ন ও সহযোগিতার অঞ্চলে রূপান্তর করা। সীমান্ত হাট, বৈধ বাণিজ্য, যৌথ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং সীমান্তবাসীর জন্য কর্মসংস্থান বাড়ানো গেলে চোরাচালান ও অবৈধ চলাচল স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। একই সঙ্গে বিএসএফ এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ( বিজিবি) এর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, মানবাধিকার প্রশিক্ষণ এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা প্রয়োজন। সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য দুই দেশকেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে। একটি সভ্য ও মানবিক সীমান্তের ধারণা হলো এমন একটি সীমান্ত, যেখানে নিরাপত্তা থাকবে, কিন্তু মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে না; রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা পাবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবন আতঙ্কে বিপর্যস্ত হবে না ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত আজ সেই ভারসাম্যের কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কাঁটাতারের বেড়া হয়তো একটি রাষ্ট্রকে নিরাপত্তার অনুভূতি দিতে পারে, কিন্তু যদি সেই নিরাপত্তা মানুষের জীবন, আস্থা এবং প্রতিবেশী সম্পর্কের বিনিময়ে অর্জিত হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীল ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন এমন একটি সীমান্ত নীতি, যা নিরাপত্তার পাশাপাশি মানবিকতা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে সমান গুরুত্ব দেয়। যতদিন সীমান্তে রক্তপাত, আতঙ্ক এবং অবিশ্বাসের রাজনীতি চলবে, ততদিন এই কাঁটাতারের প্রাচীর কেবল দুই দেশের ভূখণ্ড নয়, দুই দেশের মানুষের মনকেও বিভক্ত করে রাখবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:২২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ডেঙ্গু আবার ধেয়ে আসছে তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি সমন্বিত কার্যক্রম রূপকল্প

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই মে, ২০২৬ সকাল ১০:৪১


লেখাটির উপক্রমনিকা
মাস কয়েক আগে সামুর পাতায় ব্লগার কলা বাগান ১ এর একটি গুরুত্বপুর্ণ লেখা প্রকাশিত হয়েছে । লেখাটিতে থাকা মুল কথাগুলি ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

বৃষ্টি বিলাস - ০১

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ১৪ ই মে, ২০২৬ দুপুর ২:০৪



তখন কলেজে পড়ি, তেজগাঁও কলেজ। আমরা বলতাম গোয়াল ঘর। সেই হিসেবে আমাকে গোয়াল ঘরের প্রাণী বলা চলে।

তো একদিন গোয়াল ঘরে যাওয়ার জন্য বাসা (উত্তর বাড্ডা) থেকে বেরিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কালো পাথর

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৪ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪



এক সুন্দর সকালে হিমু রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো।
হঠাত সে ফুটপাতে এক টুকরো পাথরের সাথে উষ্ঠা খায়। উষ্ঠা খেয়ে হিমু মাটিতে পরে যায়। পাথরের পাশে এক ভিক্ষুক ভিক্ষা করছিলো। পাথর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ আসার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই মে, ২০২৬ রাত ১:২৫


সোশ্যাল মিডিয়ায় দুটো স্ট্যাটাস পড়লাম। দুজনই বিএনপি সমর্থক।
প্রথমজন লিখেছেন, গতকালকের গরম খবর ছিল আওয়ামী লীগরে ঝুলায় মারছে বিএনপি বা জামায়াত শিবির। তারপরে প্রথম আলো নিউজ করলো পদ্মার পাড়ে কৃষকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

পদ্মা ব্যারেজঃ সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৫ ই মে, ২০২৬ সকাল ৮:৩০

পদ্মা ব্যারেজঃ সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত....

অনেকেই “ব্যারেজ” এবং “ব্রিজ”কে একই ধরনের স্থাপনা মনে করেন। বাস্তবে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়। তাই প্রথমেই ব্রীজ এবং ব্যারেজের পার্থক্য-

ব্রিজ (Bridge) কী?
ব্রিজ বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×