১৯৪৭ সালের দেশভাগের ইতিহাসে জুনাগড় রাজ্যের পাকিস্তানে যোগদানের বিষয়টি একটি অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল এবং দীর্ঘস্থায়ী আইনি ও ভূ-রাজনৈতিক অধ্যায়। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হওয়া ১৯৪৭ সালের ভারতীয় স্বাধীনতা আইন এবং লর্ড মাউন্টব্যাটেনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, উপমহাদেশে বিদ্যমান ৫৬৫টি আধা-স্বাধীন দেশীয় রাজ্যের যেকোনো একটি ডোমিনিয়নে (ভারত বা পাকিস্তান) যোগ দেওয়ার কিংবা সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকার পূর্ণ আইনি অধিকার ছিল। এই আইনি কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই জুনাগড়ের তৎকালীন নবাব তৃতীয় মুহাম্মদ মহাবত খানজি ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পাকিস্তানের সাথে যোগদানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। এর ঠিক এক মাস পর, ১৫ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান সরকার এই অন্তর্ভুক্তিপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ ও স্বাক্ষর করে, যা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে একটি সম্পূর্ণ বৈধ চুক্তি হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল। কারণ, তৎকালীন আইনি কাঠামোতে ভৌগোলিক সংলগ্নতার চেয়ে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের সার্বভৌম শাসকের সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়েছিল।
ঐতিহাসিক ও কৌশলগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, নবাবের এই সিদ্ধান্ত একক কোনো পদক্ষেপ ছিল না। জুনাগড়ের স্টেট কাউন্সিল, যা হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ছিল, দীর্ঘ আলোচনার পর এই সিদ্ধান্তের সপক্ষে পারস্পরিক ঐকমত্য তৈরি করে। যোগদানের পর জুনাগড়ের স্টেট হাউসে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং রাষ্ট্রীয় নথিপত্রে জুনাগড়কে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার যে যুক্তি ভারত উপস্থাপন করেছিল, তার বিপরীতে পাকিস্তান ও জুনাগড় প্রশাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের আন্তর্জাতিক উদাহরণটি সামনে আনে। মূল ভূখণ্ডের সাথে সরাসরি স্থল সংযোগ না থাকা সত্ত্বেও আলাস্কা যেমন সমুদ্রপথে আমেরিকার অংশ, ঠিক তেমনি করাচি বন্দর থেকে জুনাগড়ের ভেরাবল বন্দরের দূরত্ব ছিল মাত্র ৩৪০ নটিক্যাল মাইল। এই সামুদ্রিক সীমাকে একটি কার্যকর ও আইনি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
তবে এই আইনি প্রক্রিয়ার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক সংকট। জুনাগড়ের প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি জনসংখ্যা ছিল অমুসলিম এবং রাজ্যটি চারপাশ থেকে ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। এছাড়া জুনাগড়ের নিজস্ব কিছু সামন্ত রাজ্য বা ভাসাল স্টেট, যেমন বাবরিয়াবাদ ও মাংরোল, জুনাগড়ের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ভারতের সাথে যোগদানের ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং রাজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ভিপি মেনন জুনাগড়ের এই পদক্ষেপকে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য চরম হুমকি হিসেবে দেখেন। ভারত সরকারের দাবি ছিল, মাউন্টব্যাটেন নীতি অনুযায়ী দেশীয় রাজ্যগুলোর অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তব ভৌগোলিক সংলগ্নতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এই মতভেদের জেরে ভারত জুনাগড়ের চারপাশে কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ করে। ফলে রাজ্যে খাদ্যসামগ্রী, জ্বালানি, কয়লা ও জরুরি ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দেয়, যা সরবরাহ লাইনকে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলে এবং প্রজাসাধারণের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটায়।
পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে ভারতের পরোক্ষ সহযোগিতায় ১৯৪৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বোম্বাইতে (বর্তমান মুম্বাই) নবাবের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে 'আরজি হুকুমত' বা একটি অস্থায়ী সমান্তরাল সরকার গঠিত হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর ভাইপো সামলদাস গান্ধী। এই অস্থায়ী সরকারের সশস্ত্র কর্মীরা জুনাগড়ের সীমান্ত এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা দখল করতে শুরু করে। তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা এবং নিরাপত্তার অভাবে অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে নবাব মহাবত খানজি তাঁর পরিবার ও মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে করাচিতে চলে যান। তিনি যাওয়ার সময় রাজ্যের শাসনভার অর্পণ করে যান শাহ নওয়াজ ভুট্টোর ওপর, যিনি ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিতা। দেওয়ান শাহ নওয়াজ ভুট্টো চারপাশের অবরোধ, আসন্ন মানবিক বিপর্যয় এবং আরজি হুকুমতের আগ্রাসনের মুখে চরম এক সংকটের মুখোমুখি হন। অবশেষে, কোনো উপায় না দেখে এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাত এড়াতে ১৯৪৭ সালের ৮ নভেম্বর তিনি ভারত সরকারের আঞ্চলিক কমিশনার এন. এম. বুচের কাছে জুনাগড়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব সাময়িকভাবে গ্রহণ করার একটি আনুষ্ঠানিক অনুরোধপত্র পাঠান। এর পরদিনই, অর্থাৎ ৯ নভেম্বর ১৯৪৭ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী জুনাগড় রাজ্যে প্রবেশ করে এবং সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় নেয়, যাকে পাকিস্তান আজ পর্যন্ত তাদের ভূখণ্ডের ওপর প্রথম আন্তর্জাতিক আগ্রাসন ও আইন লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করে।
পরবর্তীকালে, নিজেদের অবস্থানকে আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্য করতে ১৯৪৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকার জুনাগড়ে একটি গণভোটের আয়োজন করে। ভারতীয় প্রশাসনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে অনুষ্ঠিত এই গণভোটে ভারতের পক্ষে ২,০১,৪৫৭টি ভোট এবং পাকিস্তানের পক্ষে মাত্র ৯১টি ভোট পড়ে বলে ঘোষণা করা হয়। তবে পাকিস্তান সরকার এবং জুনাগড়ের নবাব পরিবার শুরু থেকেই এই গণভোটকে সম্পূর্ণ জালিয়াতি ও একতরফা বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। পাকিস্তানের প্রথম ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান তখন স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, একবার বৈধভাবে অন্তর্ভুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হওয়ার পর কোনো দেশের সামরিক উপস্থিতির ছায়ায় গণভোট আয়োজন করা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদের পরিপন্থী। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতে, "যুক্ত-ভারত " বা অখণ্ড ভারতের ধারণাটি ছিল একটি রাজনৈতিক প্রতারণা। জুনাগড় ও কাশ্মীরের ঘটনার মধ্য দিয়ে ভারতের এই দ্বৈত নীতি বিশ্ব দরবারে উন্মোচিত হয়। জুনাগড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনসংখ্যার অজুহাতে ভারত সামরিক হস্তক্ষেপ করে, অথচ ঠিক একই সময়ে কাশ্মীরে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও সেখানকার হিন্দু মহারাজা হরি সিং এর স্বাক্ষরকে আইনি ভিত্তি ধরে ভারত সেখানে সৈন্য পাঠায়। অনেক আধুনিক ঐতিহাসিক মনে করেন, জিন্নাহ জুনাগড়ের সংযুক্তিকে মেনে নিয়েছিলেন মূলত একটি কৌশলগত লিভার বা হাতিয়ার হিসেবে, যাতে পরবর্তীতে কাশ্মীরের বিষয়ে ভারতের অবস্থানের দ্বিচারিতাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রমাণ করা যায়।
বর্তমানে জুনাগড়ের এই ঐতিহাসিক মামলাটি কাশ্মীর সংকট এবং হায়দ্রাবাদের সংকটের মতোই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে " ভারত-পাকিস্তান প্রশ্ন " শিরোনামে তালিকাভুক্ত রয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী আইনি লড়াইয়ে এক নতুন মোড় আসে ২০২০ সালের আগস্ট মাসে, যখন পাকিস্তান সরকার তাদের একটি নতুন আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করে। এই মানচিত্রে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে জুনাগড়, মানবদর এবং স্যার ক্রিক অঞ্চলকে তাদের সার্বভৌম ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের দাবিকে পুনরায় আন্তর্জাতিক মহলে পুনরুজ্জীবিত করেছে। জুনাগড়ের খেতাবধারী শেষ নবাব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর খানজি ২০২৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পাকিস্তানে অবস্থান করে " জুনাগড় স্টেট লিবারেশন মুভমেন্ট " এর মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে এই আইনি ও ঐতিহাসিক অধিকারের পক্ষে জোরালো জনমত গঠনের চেষ্টা করে গেছেন। ঐতিহাসিক ও সমকালীন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৪৭ সালের জুনাগড় ট্র্যাজেডি কেবল একটি ভূখণ্ডের হাতবদলের গল্প নয়, বরং এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রধান শক্তির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক আইনের নিজস্ব সুবিধা অনুযায়ী ব্যাখ্যা এবং ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের এক জটিল সমীকরণ, যা আজ আট দশক পরেও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক গভীর ক্ষত ও অমীমাংসিত ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

