somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শান্ত পাহাড়কে বারবার অশান্ত করছে কারা?

২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রায়ই ঠুনকো অজুহাতে অশান্ত হয়। কখনো পাহাড়ের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে একে অপরের ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়ে এখানকার পরিবেশ উত্তপ্ত করে, আবার কখনো দেশি-বিদেশি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর মদদে নানা তথাকথিত রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে পাহাড়কে অস্থিতিশীল করে তোলা হয়। অতি সম্প্রতি রাঙামাটির সাজেকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) এর সশস্ত্র সদস্যদের সেই এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া, সাধারণ স্থানীয় অধিবাসীদের ওপর যেকোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর হুমকি-দামকি বন্ধ করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক স্থানীয়দের বাড়িঘরে তল্লাশি অভিযান না চালানোর দাবিতে " সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি " ও " সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশ " ’ যৌথভাবে সড়ক অবরোধের ডাক দেয়। এতে সাজেকে ঘুরতে আসা কয়েক হাজার পর্যটক আটকা পড়লে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে তাদের নিরাপে বের করে আনার চেষ্টা করে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তথাকথিত অবরোধকারীদের বাকবিতণ্ডা ও ধাওয়াধাওয়ির সৃষ্টি হয়। এর পরপরই সেনাবাহিনী ও একটি সশস্ত্র আঞ্চলিক দলের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এই সংঘর্ষ ও হামলার জন্য পার্বত্য শান্তিচুক্তি-বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টকে (ইউপিডিএফ) দায়ী করা হলেও ইউপিডিএফ এই অভিযোগ অস্বীকার করে। এই সংঘর্ষের গভীরতর কারণ লুকিয়ে আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠী পিসিজেএসএস (সন্তু লারমা দল) এবং ইউপিডিএফ এর দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্তি নতুন কিছু নয়। ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, জাতিগত বৈচিত্র্য, ভূমি ও বসতিসংক্রান্ত বিরোধ এবং বহিঃশক্তির কৌশলগত প্রভাব এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে দীর্ঘদিন ধরেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক জটিল অধ্যায়। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, খিয়াংসহ প্রায় ১১টি প্রধান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসতির পাশাপাশি রয়েছে সমতল থেকে আসা বাঙালি জনগোষ্ঠী। স্বাধীনতার পর থেকেই এখানকার রাজনৈতিক কাঠামোতে বিভাজন ও অবিশ্বাস প্রবল হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল এস. এস. উবানের তত্ত্বাবধানে স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার্স ফোর্স (এসএফএফ) এবং মুজিব বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ দল পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চলে অভিযান চালায়। এর অন্যতম প্রধান কৌশলগত উদ্দেশ্য ছিল ভারতবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী বা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বন্ধ করা। ভারত সরকারের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ ছিল যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে মিজো ও নাগার মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তান সামরিক কর্তৃপক্ষের সাহায্য-সহযোগিতা পেয়ে ভারতের সেভেন সিস্টার রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। একই সময়ে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেন এবং পাকিস্তানের পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন ও জনমত গঠনে ভূমিকা পালন করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি পাকিস্তানে চলে যান এবং পরবর্তীতে সেখানে মন্ত্রী ও সামাজিক প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও তৎকালীন জটিল পরিস্থিতি পার্বত্য অঞ্চলের রাজনীতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসএফএফ ও মুজিব বাহিনীর এই যৌথ অভিযানগুলোর সময় স্থানীয় পর্যায়ে সামরিক সংঘাত, গোলাগুলি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। রাঙামাটি সহ পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন দুর্গম স্থানে সংঘটিত এসব সশস্ত্র অভিযানে সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট একাধিক পক্ষের প্রাণহানি ঘটেছিল, যা মুক্তিযুদ্ধের শেষভাগে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণের একটি করুণ ঐতিহাসিক দিককে উন্মোচিত করে।

পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা উপজাতি ও বাঙালিদের মধ্যকার জাতীয়তার দ্বন্দ্ব স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনাতেই তৈরি হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে সব নাগরিককে এককভাবে " বাঙালি " হিসেবে ঘোষণা করা হলে পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো তাদের জুম্ম পরিচয় হারানোর আশঙ্কায় চরম অসন্তুষ্ট হয়। সেই অসন্তোষের জেরে এবং ভারতের মদদে ১৯৭৩ সালে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে গঠিত হয় " পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি " (পিসিজেএসএস)। পরবর্তীতে তারা তাদের সামরিক শাখা " শান্তিবাহিনী " গড়ে তোলে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান " বাঙালি " জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে " বাংলাদেশি " জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন করেন। ভূখণ্ড ভিত্তিক এই ধারণার ফলে পাহাড়ি জনগণ জাতিগত পরিচয় বজায় রেখেও নাগরিক হিসেবে " বাংলাদেশি " পরিচয়ের সুযোগ পান। তবে এটি তাদের স্বায়ত্তশাসন ও সাংস্কৃতিক অধিকারের মূল দাবি পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি। পাহাড়ে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল বহুমুখী। শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র তৎপরতা মোকাবিলা ও সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে তিনি সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করেন। এ ছাড়া ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য আনতেই তিনি সমতলের হাজার হাজার বাঙালি পরিবারকে পাহাড়ে পুনর্বাসিত করেন। এই পদক্ষেপের ফলে পাহাড়ের জনসংখ্যার বিন্যাসে বড় পরিবর্তন আসে, যা দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন করে ভূমিসংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। অন্যদিকে রাস্তাঘাট নির্মাণ ও " পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড " গঠনের মাধ্যমে তিনি পাহাড়ে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ ত্বরান্বিত করেন। সার্বিকভাবে " বাংলাদেশি " পরিচয় ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও জনসংখ্যা পুনর্বাসন নীতি পাহাড়ের জাতিগত ও ভূমি সংক্রান্ত সংকটকে পরবর্তীতে আরও জটিল করে তোলে। এরপর ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে পাহাড়ি বিদ্রোহ দমনে শান্তি আলোচনা শুরু করে। অবশেষে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমার মধ্যে শান্তি চুক্তি চূড়ান্তভাবে স্বাক্ষরিত হয়।

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও সরকারের মধ্যে হওয়া শান্তি চুক্তি অনেক পাহাড়ি জনগণ প্রত্যাখ্যান করেন। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে গঠিত হয় " ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট " (ইউপিডিএফ)। এরপর পিসিজেএসএস ও ইউপিডিএফ উভয় সংগঠনই বিভক্ত হয়ে একাধিক উপদলে রূপ নেয়। এ ছাড়া ২০২১ সালে নাথান বমের নেতৃত্বে বম আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তরুণদের নিয়ে গড়ে উঠেছে " কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট " বা কেএনএফ। পাশাপাশি মারমা সম্প্রদায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে চাকমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে " মারমা ন্যাশনালিস্ট পার্টি "। এই পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনগুলো প্রায়ই নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংঘাতে লিপ্ত হয়ে পাহাড়কে অশান্ত করে তোলে যার পেছনে দেশী ও আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর পরোক্ষ মদদ আছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এবং বাংলাদেশের একটি দুর্গম স্পর্শকাতর এলাকা হওয়ায় এটি ভারতের প্রভাব বিস্তারের বিশেষ সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে দেখা গেছে যে, বরাবরই পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত রাখতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সক্রিয় রয়েছে। ১৯৭৩ সালের পর থেকে ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের আগ পর্যন্ত পিসিজেএসএসের শান্তিবাহিনী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে বিশেষ শরণার্থীশিবিরে আশ্রয়, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্রশস্ত্র পেয়েছিল বলে যথেষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে ২০১৮ সালে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত পরিচিত দুই অধ্যাপক, গবেষক ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ জন ব্রেইথওয়েট ও বিনা ডি কোস্তার " ক্যাসকেডস অব ভায়োলেন্স: ওয়ার, ক্রাইম অ্যান্ড পিসবিল্ডিং অ্যাক্রস সাউথ এশিয়া " গ্রন্থের বাংলাদেশের সংঘাতবিষয়ক অধ্যায়টি এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যায়টিতে পিসিজেএসএসের নেতাদের সঙ্গে পরিচালিত সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পিসিজেএসএসের প্রতিষ্ঠাতা নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ভারতে আশ্রয় নেন এবং ত্রিপুরায় পিসিজেএসএসের উপস্থিতি ভারতের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বিবেচনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। লেখকদের বর্ণনায়, ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং বা ‘র’ এর পক্ষ থেকে লারমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল বলে সাক্ষাৎকারদাতারা জানিয়েছেন। বইটিতে আরও বলা হয়েছে, ভারত শান্তিবাহিনীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছিল এবং সীমান্তের ওপারে তাদের অবস্থান ও প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দিয়েছিল। লেখকদের বিশ্লেষণে, এই সহায়তার পেছনে বাংলাদেশের ওপর ভারতের কৌশলগত প্রভাব বজায় রাখার হিসাব কাজ করেছে।

বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠান " বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ "(বিআইআইএসএস) এর গবেষক নূর আহমেদের " দ্য রিকারেন্স অব সিকিউরিটি চ্যালেঞ্জেস ইন চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস (সিএইচটি): এক্সপ্লোরিং রুট কজেস " শীর্ষক প্রবন্ধটি ২০২৫ সালে বিআইআইএসএস জার্নাল এর ৪৬তম খণ্ডের প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটি মাঠপর্যায়ের গবেষণা, প্রশাসনিক তথ্য এবং স্থানীয় নেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা সংকট বিশ্লেষণ করেছে। এতে ভারতের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও শান্তিবাহিনীর প্রতি বহুমাত্রিক সহায়তার প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে। একই সঙ্গে গবেষণায় সংঘাতের পুনরাবৃত্তির পেছনে শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন ঘাটতি, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির সীমাবদ্ধতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, ভূমি বিরোধ ও জাতিগত বিভাজনের মতো অভ্যন্তরীণ কারণ গুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই গবেষণায় পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিরতাকে কেবল বিদেশি হস্তক্ষেপ দিয়ে ব্যাখ্যা না করে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের পারস্পরিক সম্পর্কের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ২০২৬ সালে " পাকিস্তান হরাইজন " এ প্রকাশিত ড. মনজুর আহমদ নাজিরের " ইউজ অব টেররিজম অ্যাজ এ টুল অব ফরেন পলিসি: কেস স্টাডি অব ইন্ডিয়ান সাপোর্ট টু চাকমা ইনসারজেন্সি ইন বাংলাদেশ " শীর্ষক প্রবন্ধটি আরও বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিরতার পেছনে সরাসরি ভারতের সম্পৃক্ততার প্রশ্ন তুলেছে। লেখক ১৯৭৫ সাল থেকে চাকমা বিদ্রোহ ও শান্তিবাহিনীর প্রতি ভারতের সম্ভাব্য সহায়তা এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা " র "এর ভূমিকা, আশ্রয়, প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও কূটনৈতিক সমর্থনের অভিযোগ বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মূল যুক্তি হলো, ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। অতএব বিভিন্ন প্রতিবেদনে স্পষ্ট যে, ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা শান্তিবাহিনী সহ পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গোষ্ঠী গুলিকে সামরিক সহায়তা প্রদান করতে শুরু করে। ভারতের লক্ষ্য ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত রেখে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী দমনে সহযোগিতা নিশ্চিত করা।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ, বিশেষ করে চাকমা ও ত্রিপুরারা, ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও জাতিগত ভাবে ঘনিষ্ঠ। এই নৈকট্যকে কাজে লাগিয়ে ভারত পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের পক্ষে মানবিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের কথা বলে প্রভাব বিস্তার করে এবং পাহাড়ের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে অশান্ত করে তোলে। এতে বিশেষ করে চাকমা নেতৃত্বের প্রাধান্য নিয়ে মারমা ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ বিদ্যমান। বাংলাদেশে বাঙালি ও পাহাড়িদের সহাবস্থান ও একটি অনিবার্য বাস্তবতা। তবে এই সহাবস্থান কখনো মসৃণ হয়নি। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত খুললেও তা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা সহাবস্থানের সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আলোচিত হয়েছে যে, চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রিতা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের অবৈধ অর্থের একটি অংশ পাহাড়ে অশান্তি তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়টি পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের মতে ভারত- বাংলাদেশের সম্পর্কের এই শীতলতার সুযোগে বাংলাদেশে কূটনৈতিক ও ভৌগোলিক চাপ তৈরি করতে ভারতের বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামকে ব্যবহার করার আশঙ্কা নতুন করে তৈরি হয়েছে, যা অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হয়।

পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি কেবল পাহাড়ি ও বাঙালির সম্পর্ক, ভূমিবিরোধ কিংবা সরকারের সঙ্গে কোনো একটি রাজনৈতিক সংগঠনের বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, সীমান্তের নিরাপত্তা, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণ। পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে এসব প্রশ্নের কোনোটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংঘাতের ইতিহাসে ভারতের ভূমিকা নিয়ে যে তথ্য ও গবেষণা রয়েছে, তা নতুন করে পর্যালোচনা করা এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদেশি কোনো পক্ষের সহায়তা পাচ্ছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি।

সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৫
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্লগের ওসমান হাদী সৈয়দ মশিউর রহমানের ব্যান

লিখেছেন এল গ্যাস্ত্রিকো ডি প্রবলেমো, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৫০

এ আমি কী দেখলাম! ব্লগের প্রতিবাদী মুখ, ভারতের যম, ওসমান হাদীর মুখপাত্র, একাত্তরকা গণ্ডগোলের ব্যাপারে সচেতন মুখ সৈয়দ মশিউর রহমানের ব্লগটি স্থগিত অথবা বাতিল করা হয়েছে। দেশে যখন সামান্য চুমু... ...বাকিটুকু পড়ুন

জেফরি আর্চারের A Prisoner of Birth....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:০০




জেফরি আর্চারের A Prisoner of Birth....

জেফরি আর্চারের A Prisoner of Birth মূলত এমন এক উপন্যাস, যেখানে বন্ধুত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা, শ্রেণিবৈষম্য, বিচারব্যবস্থা, প্রতিশোধ এবং বুদ্ধিমত্তার লড়াই একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। উপন্যাসটির... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসার মোল্লা হুজুর থেকে আপনার সন্তানকে নিরাপদ রাখুন

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:০৭

গতকাল রাতে একটা বাচ্চার পা**র ছবি দেখেছিলাম ফেইসবুকে, অনেকেই শেয়ার করেছেন। পা কেটে হাসপাতালে আসার পর ডাক্তার সাপোজিটরি দিতে গিয়ে দেখে গর্তের মতো হয়ে গেছে। মাদ্রাসার হুজুরে বিকৃত কাজ করতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপি’কে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল বলার কোনো কারণ নাই!!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৩



জাতীয় সন্মাননা কি কোনো গোপন বিষয় । একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা’কে গার্ড অফ অনার দিতে এত অনীহা কেনো বর্তমান সরকারের ‼️

আজ বারবার আমার গোআ’র কুপুত্রের একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাসিনা-বিভ্রাট: এটা ট্রল নয়, কূটনৈতিক সতর্কসংকেত

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৮


হাসিনা-বিভ্রাট: এটা ট্রল নয়, কূটনৈতিক সতর্কসংকেত

জাপানের এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের একটি পোস্ট নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে হাসাহাসি চলছে। আমার মনে হয়, হাসির আড়ালে আসল প্রশ্নটা চাপা পড়ে যাচ্ছে।

ঘটনাটা কী
প্রধানমন্ত্রী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×