শিরোনামটাই আসলে এই লেখার প্রথম বাক্য।
এই খবর শোনার পর প্রথম যে কথাটি অনেকের মনে উঁকি দিয়েছে তা হল, বিএনপি যেমন একুশে টেলিভিশন বন্ধ করেছিল, ঠিক তেমনি ওয়ানকেও বন্ধ করা হল। কিন্তু একুশে আর চ্যানেল ওয়ানের বন্ধ করবার ঘটনা দুটি এক ভাবা ঠিক হবে না।
কেন হবে না?
একুশে টেলিভিশনের লাইসেন্সের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট নালিশ জানানো হয়েছিল চ্যানেলটি বন্ধের বহু আগেই। কে নালিশ দিয়েছে, ঠিক কোন তারিখে দিয়েছে তা বলতে পারব না। তবে মাস আর সালটা খেয়াল আছে, সম্ভবত ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বরে। তখনও এই নালিশ দেয়ার ব্যাপারটিকে বিএনপিপন্থী আইনজীবিদের একটা আওয়াজ দেয়া হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছিল।
ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি একটা একশো দিনের কর্মসূচি দিয়েছিল। সেখানে অনেক অবশ্যকরণীয়র কথা লেখা ছিল, যেগুলো সব ঠিকঠাক করা হয়েছিল বা হয়নি। কিন্তু যে কাজটি সেখানে লেখা ছিল না কিন্তু একদম ঠিক ভাবে সম্পন্ন করা হয়েছিল, তা হচ্ছে একুশে টিভির পেছনে লাগা। সরকারের পক্ষ থেকেই এবার চ্যানেলটির লাইসেন্সের বৈধতা এবং টেরিস্ট্রিয়াল ব্রডকাস্টিং রাইট প্রদানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়। সোজা ভাষায়, একুশে টিভির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। নিচের আদালতে এই মামলার দৌড়াদৌড়ির খুটিনাটি খেয়াল নাই, তবে হাই কোর্ট ২০০২ সালের ২৩শে এপ্রিল একুশে টিভির লাইসেন্সকে অবৈধ ঘোষণা করল।
এই মামলায় ইটিভির পক্ষে লড়ছিলেন কামাল হোসেন, রোকনউদ্দীন মাহমুদ, আমিরুল ইসলাম, মাহবুবে আলমের মত আওয়ামীপন্থী ল'ইয়াররা। তারা মামলাটিকে সুপ্রীম কোর্ট পর্যন্ত দৌড় করালেন। সুপ্রীম কোর্ট, অর্থাৎ সর্বোচ্চ আদালতও ইটিভির লাইসেন্সকে বৈধ হিসেবে ভাবতে অপারগ হলেন, এবং একই বছরের ১২ই আগস্ট তারিখে ইটিভির লাইসেন্সকে আরেক দফা বাতিল ঘোষণা করলেন। এবার শুধু বাতিল ঘোষণাতে ব্যাপারটা থামল না, যাকে তাকে টেরিস্ট্রিয়াল ব্রডকাস্টিং রাইট দেয়ার ব্যাপারে সরকারকেও সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হল।
যাই হোক, আদালতের, যাকে বলে, পেইনফুললি লং প্রসেসের পর ইটিভির লাইসেন্স বাতিলই হল, এবং ইটিভি বন্ধ হল।
ইটিভির বন্ধ করা নিয়ে যত বিশাল লেখা লিখলাম, চ্যানেল ওয়ানের বন্ধ করা নিয়ে এর পাঁচ ভাগের এক ভাগও লেখা যাবে না। কারণ ঘটনাটা কেন যেন পুরোপুরি একটা ক্ষমতার প্রদর্শন হিসেবে মানুষের কাছে উপস্থাপিত হয়েছে। ইটিভি বন্ধ করার জন্যও বিএনপি হয়তোবা ক্ষমতার কামান নিয়ে বসে ছিল, কিন্তু তা দাঁগার প্রয়োজন পড়েনি। লাইসেন্স করার সময় মালিকদের ও অনুকূল সরকারের খামখেয়ালীর কারণে সেটিকে বন্ধ করা গিয়েছে অনেক সহজেই। এ কারণেই চ্যানেল ওয়ান আর ইটিভির বন্ধ করার ঘটনা এক রকম নয়। মানে, আসলে একই রকম, কিন্তু, যাকে বলে, দুটার অ্যাপ্রোচ এক হল না।
সরকার অবশ্য একটা কারণ দেখিয়েছে। যন্ত্রপাতি কেনায় অনিয়ম নাকি করা হয়েছে। সেজন্যে কি একটা আস্ত চ্যানেল বন্ধ করে দেয়া যায়? চ্যানেলটির কর্মী সংখ্যা ৪০০র বেশী। এদের মালিক যন্ত্রপাতির ব্যাবহার নিয়ে কী এমন তুঘলকি করতে পারেন যার ফলে পুরো চ্যানেলটিই বন্ধ করে দেয়া যায়? সামরিক যন্ত্রপাতি আনিয়ে বঙ্গভবন-গণভবন-সুধাসদন উড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করছিলেন কি?
আর একুশে টিভি বন্ধ করার পরিণতিটা একটু দেখি। বিএনপি একুশে টিভি বন্ধ করল ঠিকই, কিন্তু সেই একুশের তখনকার রিপোর্টাররা আজ বিভিন্ন চ্যানেলে গিয়ে শীর্ষ আসন গুলো দখল করে আছেন, আর প্রতি মুহুর্তে মিডিয়াতে বিএনপির জন্য প্রতিকূল একটা ফ্লো তৈরি করার চেষ্টায় আন্তরিক আছেন। ঐ আলিফ লায়লার এক চিমা দেবকে মারলে দশ চিমা দেবের আবির্ভাবের মত। উপকার হয়েছে সামান্যই, অপকার হয়েছে আরও অনেক অনেক বেশী।
তো, চ্যানেল ওয়ান তো বন্ধ হল, এখন কি হবে? অনেকেই বলছেন নেক্সট টার্গেট বাংলা ভিশন আর দিগন্ত। ইসলামিক টেলিভিশনকে হয়তোবা কিছু বলবে না, কারণ বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক মিডিয়া তার ভূমিকা অনেকটাই সাতে নাই পাঁচে নাই মাওলানা সাহেবের মত, নিজের কাজ নিয়ে মশগুল আছে। কিন্তু বাংলা ভিশন আর দিগন্তর উপর খাঁড়া আসতেই পারে।
কিছু কিছু বিজ্ঞ দুর্জন অবশ্য যমুনা টিভির নাইট-রেইড-এর সাথে চ্যানেল ওয়ানের ঘটনাটাকে মেলাতে চেয়েছেন। এবং দুটা ঘটনা মিলিয়ে একটা ঘোট পাকিয়ে অন্তরালে মোজাম্মেল বাবুর একটি ছবি ফুটিয়ে তোলার কথা বলছেন। যমুনা টিভিতে হামলার সময়ই অবশ্য মোজাম্মেল বাবুর নামটা এসেছিল। বাকশাল আমলের বুয়েট জাসদ-ছাত্রলীগের এই নেতা এখন বিশিষ্ট আওয়ামী চিন্তাবিদ। সরকারী রাজনীতিতে অরাজনৈতিক যেই কয়েকজনের এখন খুব ক্ষমতার কথা শোনা যায়, তার মধ্যে তিনি একজন। তার একটি চ্যানেল অবশ্য শীঘ্রই বাজারে আসার কথা আছে, নাম হচ্ছে একাত্তর টেলিভিশন। এখন, সেটাকে জাতে ওঠাবার জন্য আগে থেকেই চ্যানেল জগতে একটা গ্যাপ ক্রিয়েট করার চেষ্টা হচ্ছে কিনা, মোজাম্মেল বাবুকে জড়িত করার চিন্তাভাবনার মূলে আসলে আছে ঐ আশংকাটাই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


