‘এই এতিমখানায় একজনও এতিম থাহেনা, সরকারের টেহা ফাও তুলতাছে।’ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার ধরখার ইউনিয়নের রাণীখার আল-আমিন গাউছিয়া এতিমখানা সম্পর্কে এমন মন্তব্য করলেন ওই গ্রামেরই শাহআলম নামের একজন বাসিন্দা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ এমদাদুল বারী তার গ্রামের বাড়ি আখাউড়া উপজেলার ধরখার ইউনিয়নের রাণীখারে প্রতিষ্ঠিত এই এতিমখানার নামে বছরে প্রায় ৮৪ হাজার টাকা আত্মসাত করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সমাজসেবা অধিদপ্তর এ এতিমখানায় প্রতিমাসে সাত হাজার টাকা করে বরাদ্দ দিচ্ছে। কিন্তু এতিমখানাটির বাস্তব চিত্র উল্টো। এতিমের নামে বরাদ্দকৃত পুরো টাকাটাই পকেটস্থ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরেজমিন পরিদর্শন করেও এর সত্যতা মিলেছে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, দো-চালা টিনশেড একটি পাকা ঘরের বারন্দায় ‘আল-আমিন গাউছিয়া এতিমখানা’ নামের সাইনবোর্ড ঝুলানো। ভেতরের তিনটি কক্ষে মাদ্রাসার কয়েকজন আবাসিক ছাত্র থাকেন। তারা প্রত্যেকেই স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান। অন্যের বাড়িতে ছাত্র পড়ানোর বিনিময়ে তাদের খাবারের সংস্থান হয়। কিন্তু কাগজে-কলমে তাদেরকে এতিম দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করছেন।
জানা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ এমদাদুল বারী তার গ্রামের বাড়ি আখাউড়া উপজেলার রাণীখারে ১৯৮৪ সালে এ এতিমখানাটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকেই তিনি এর পরিচালনা কমিটির সভাপতি।
আখাউড়া উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৪ সালের ১ জানুয়ারি এতিমখানাটি চালু হয়। প্রতিবছর এতিমখানাটিতে ৮৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ২০ মার্চ সোনালী ব্যাংকের আখাউড়া শাখার ১৩৭০ হিসাব নম্বরের বিপরীতে ৪২ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
সমাজসেবা কার্যালয়ের জরিপ ফরমের তথ্যানুযায়ি, গত ২০১১-২০১২ অর্থবছরে এতিমখানাটিতে তিনজন শিক্ষক কর্মরত থাকার কথা বলা হয়েছে। সেখানে ১০ জন এতিম ও পাঁচজন দু:স্থ থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। তাদেরকে লেখাপড়ার পাশাপাশি নিয়মিত বাঁশ-বেত ও সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়। জরিপ ফরমে নিবাসীদের বিছানা ও পোষাক, রান্নার সামগ্রী, ব্যবহারের আসবাব, ডাইনিংয়ের আসবাব এবং অফিসে ব্যবহারের আসবাব ‘পর্যাপ্ত’ দেখানো হয়েছে। তাছাড়া এতিমখানাটিতে জনৈক মনির হোসেনকে সহকারি শিক্ষক, আহম্মদ আলীকে আরবী শিক্ষক ও মোছেনা আক্তারকে গণিতের শিক্ষক হিসেবে কাগজপত্রে দেখানো হয়েছে।
অনুসন্ধ্যানে জানা যায়, প্রকৃতপক্ষে মনির হোসেন এতিমখানার পার্শ্ববর্তী রাণীখার সৈয়দ এমদাদুল বারী গাউছিয়া আলিম মাদ্রাসায় শরীরচর্চা শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। আরবী শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করা আহম্মদ আলী ওই মাদ্রাসার নৈশপ্রহরী। আর গণিতের শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ থাকা মোছেনা আক্তারের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
গত মঙ্গলবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, দো-চালা টিনশেড পাকা ঘরটির তিনটি কক্ষই তালাবদ্ধ। পাশে থাকা ফটকবিহীন টিনের তৈরি ছোট রান্নাঘরটিতে চুলা’র অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তাছাড়া সেখানে শিক্ষক এবং এতিমের দেখাও মেলেনি।
এতিমখানার সম্পাদক ও মাদ্রসার অধ্যক্ষ শেখ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘কাগজপত্রে সাতজন এতিমের নাম আছে। বর্তমানে কোনো এতিম নাই। বিগত সময়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষক দল এসে আমাদেরকে এতিম সংগ্রহ করার কথা বলে যায়। কিন্তু এখন এতিম পাওয়া যায় না। তবে আমরা এতিম আনার চেষ্টা করছি। আপনারা কিছুদিন সময় দিলে ভালো হয়।’
এতিমখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক সৈয়দ এমদাদুল বারী বলেন, ‘এতিমখানাটি দেখাশুনা করছেন মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল তাজুল ইসলাম। হয়তো কিছু ভুল ত্রুটি থাকতে পারে। এবারের ঈদের আগে বাড়ি গিয়ে এসবের খোঁজ নেব।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা (নিবন্ধন) জোয়ারদার মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, ‘আপনারা যা দেখে এসেছেন আমাদের তদন্তেও এমন চিত্র এসেছে। কিছুদিনের মধ্যেই এ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে অধিদপ্তরে পাঠানো হবে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালকের দায়িত্বে থাকা সমাজসেবা কর্মকর্তা শারমিন রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমার জানামতে এখানে কোনো এতিম থাকেনা। যাদের এতিম দেখানো হয়, তাদের সবারই মা-বাবা আছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি হওয়ার পর এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



