ক্লাস এইটের এক সিনিয়র রুমে এসে অতি আনন্দিত কন্ঠে বলে গেল
- "ক্লাস সেভেন সব দোতলায় ফল ইন। জাহিদ রেজা ভাইএর হুকুম "
সবার গলা শুকিয়ে কাঠ।লাস্টবেড এর দুইটা ঘুমাইতেসিল।ঐ দুইটারে ধাক্কায়া তোলা হল।
"ওঠ ওঠ,জাহিদ রেজা ভাই ডাকসে।"
ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো ওরা দুইজন।ঘুমের ঘোর তখনো কাটেনি।তবে জাহিদ রেজা ভাইএর নাম কানে ঢোকার পর দুনিয়াবী লাইনে আসতে বেশিক্ষন টাইম লাগলোনা।সবাই প্রপার ড্রেসে(তখন দুপুর বেলা।সবার স্লীপিং ড্রেস পরা) পড়ি মড়ি করে দোতলায় জাহিদ রেজা ভাইএর রুমের সামনে করিডোর এ এক সারিতে দাঁড়িয়ে গেলাম।অন্যদের কেমন লাগতেসিল জানিনা। বুকের মধ্যে তখন পুজার ঢাক বাজতেসে।আমার হৃদপিন্ড যে এতটা সবল তা' আগে কখনো এমন করে টের পাইনি।
অবশেষে তিনি করিডোরে পা ফেললেন।শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের একেবারে সাক্ষাৎ উত্তরসুরী।কেউ না আসার কারণ জিজ্ঞেস করার পর আদনান কাহিনী খুলে বললো।সব শুনে সারির একেবারে প্রথম থেকে কে কি কারণে আসেনি তা' জিজ্ঞেস করা আরম্ভ করলো।আমার টার্ণ আসতে যতদুর মনে পড়ে টয়লেটে থাকার অজুহাত দেখিয়েছিলাম।এক সময় সবার বলা শেষ হল।এক জোড়া চোখ সারির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কয়েক বার টহল দিল। সবার মুখ নিচু।কারন দেখাতে গিয়ে একেক জন যে ডাহা মিথ্যা বললাম এতক্ষণ সেটা আমাদের চেয়ে উনিই বোধহয় আরো ভালো বুঝতে পেরেছিলেন।আমাদেরই বা কী দোষ।ক্যাডেট লাইফে মিথ্যা বলার ফার্স্ট ওয়ার্ম আপ ম্যাচ। ব্যাটে বলে ঠিক মত হচ্ছিলনা।সব বুঝতে পেরে অল রাউন্ডার জাহিদ রেজা ভাইও তেমন কিছু বললেন না।তাই সেদিন অল্পের উপর দিয়ে বেঁচে গেলাম।বাঁচবার আগে অবশ্য সবাইকে নিজ নিজ স্লীপিং শার্ট এর সবগুলা বোতাম ব্লেড দিয়ে কেটে সেখানেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেলাই করতে হয়েছিল। আদনানের জন্য জাহিদ রেজা ভাইএর শার্টটা বোনাস হিসেবে ছিল। যে ব্লেড দিয়ে সেলাই কাটা হয়েছিল সেটাও আমারই কোন এক ক্লাস মেটকে দৌড়ে রুম থেকে আনতে হয়েছিল।আর সুঁই সুতার সাপ্লাই যে জাহিদ রেজা ভাই করেন নি সেটা বোধহয় না বললেও চলে।
কয়েকদিন পরেই ঘটলো আরেকটা ঘটনা।হৃদপিন্ডটা এবারো লাফালো।তবে ভয়ে নয়।কেন্দ্রীয় চরিত্রে সেই পুরোনো জাহিদ রেজা ভাই।সাথে জুটলো নতুন এক নায়িকা।
গেমস টাইম শেষে অবসন্ন এক বিকেল। জুনিয়র ক্লাস বলে সিনিয়রদের দশ মিনিট আগেই গেমস আওয়ার শেষ হয়। অন্যান্য দিনের মত এদিনও নাক মুখ খিঁচিয়ে দৌড়ে এসে গোসল করার জন্য একটা বাথরুম ধরলাম।অতঃপর দুই মিনিটে ম্যাগী নুডলস তৈরির রেকর্ড ভেঙ্গে দেড় মিনিটে গোসল শেষ করলাম।কারণ সিনিয়ররা হাউসে এসে পড়লে দেড় সেকেন্ডের জন্যও বাথরুম খালি পাওয়া যাবেনা।গোসল শেষে মাগরিব এর নামাজে যাবার জন্য তৈরি হয়ে প্রেয়ার ড্রেসে হাউস গার্ডেনের পাশের রাস্তাটা ধরে হাঁটছি।বাগানে চোখ পড়তেই দেখি পারভীন ম্যাডাম।ম্যাডাম সম্পর্কে আমি কিছু না বলে বরং আমাদের ইংরেজীর চিরতরুন হান্নান স্যার কি বলেছিলেন সেটা বলি।কোন এক হাউস এসেম্বলিতে ম্যাডাম সম্পর্কে বলতে গিয়ে হান্নান স্যার তার স্বভাবসুলভ ইংরেজী ঢংএর বাংলায় বলেছিলেন-
"সেদিন দূর থেকে ফজলুল হক হাউসের বাগানে চোখ পড়তেই দেখি লাল রঙের এক অপরুপ সুন্দর ফুল সবগুলো পাঁপড়ি মেলে ফুটে আছে।সবটুকু সৌন্দর্য উপভোগের আশায় আরেকটু এগিয়ে আসলাম। কিন্তু কাছে আসতেই দেখি... একী!...বাগানে দাঁড়িয়ে এ যে মিসেস ফরিদা পারভীন!!!"
ম্যাডাম নিজে সেই এসেম্বলিতে উপস্থিত ছিলেন।লজ্জা রাঙা সেই মুখের দিকে তাকিয়ে প্রথম বারের মত স্যারের একটা কথার সাথে এক মত হয়েছিলাম।স্যার মোটেও ভুল বলেননি!!
(কানে কানে একটা কথা বলে রাখি।ম্যাডাম কেন জানি আমাকে বিশেষ স্নেহ করতেন।সেই গর্বে এখনো আমার মাটিতে পা পড়েনা। কলেজের ফ্রেন্ডরা একত্রিত হলে একটু খানি সুযোগ পেলে এখনো আমি সে কথা বলে বেড়াই।)
সেই পারভীন ম্যাডামকে বাগানে দেখতে পেয়ে পিচঢালা ঐ পথটারে যেন আরো একটু বেশি ভালোবেসে ফেলি । এত বিশাল একটা রাস্তা থাকতে শুধু বাগানের পাশের রাস্তাটুকুতেই পায়চারি করছিলাম।কিছুক্ষনের মধ্যেই আবিস্কার করলাম আজ সিনিয়র জুনিয়র অনেকের বুকেই পথের জন্য ভালোবাসা একটু যেন বেশি বেশিই জমে উঠেছে। ক্রমশঃ পায়ের আওয়াজ আরো কয়েকটা বেড়ে যায়।কে জানতো যে শুধু পথই নয়,মাঝে মাঝে পথের পাশে ফুটে থাকা বুনো ফুলও পথিকের সৃষ্টি করে!!
ততক্ষণে সিনিয়র গেমস আওয়ারও শেষ। ঘামঝড়ানো খেলাধুলা শেষে সবাই একে একে যার যার হাউসে ফিরছে। ফিরছেন জাহিদ রেজা ভাইও।তার রুমটা ছিল বাগান বরাবর দোতলার এক ফাইভ সীটার রুম। অন্যান্য দিনের মত না গিয়ে হাউসে ঢোকার প্রথম দরজা এড়িয়ে আজ কেন যেন তিনি বাগানের পাশের পথের দিকেই হাঁটা দিলেন! পারভীন ম্যাডামকে দেখলেই তার চোখে কেমন দুষ্টুমি খেলা করতো সেটা আমরা কম বেশি সবাই জানতাম। তাই উৎসুক চোখে সবাই তাকে ফলো করছি।
এরপর না জানি কি হয়..
(পরের পর্বে শেষ)
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ৯:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



