somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রত্যক্ষ : ন্যায়্দর্শন ও পাশ্চাত্য দার্শনিকদের চোখে

১৪ ই জুলাই, ২০১৬ রাত ৯:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


প্রত্যক্ষবাদীরা বলেন যে প্রত্যক্ষই একমাত্র জ্ঞানের উত্স | কথাটা আংশিক সত্যি যদি প্রত্যক্ষ মানে চোখে দেখা বাইরের রূপ হয় | ন্যায় দর্শন প্রত্যক্ষের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন সেটা যদি গ্রহণ করা যায় তাহলে প্রত্যক্ষ জ্ঞানের একমাত্র উত্সই হয় | কি সেই সংজ্ঞা ? ন্যায় দর্শনের প্রথম অধ্যায়ের প্রথম আহ্নিকের চতুর্থ সুত্রে বলা আছে :

“ ইন্দ্রিয়ার্থসন্নিকর্ষত্পন্নং জ্ঞানমব্যাপদেশ্যমব্যভিচারী ব্যাবসায়াত্মকং প্রত্যক্ষম |”

শ্লোকটা যদি সন্ধিবিচ্ছেদ করা যায় তাহলে দাঁড়ায় :

ইন্দ্রিয়-অর্থ-সন্নিকর্ষ-উত্পন্ন জ্ঞান-অব্যপদেশ-অব্যাভিচারী ব্যবসায়-আত্ম প্রত্যক্ষ |

অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের সাথে তার অর্থ বা বিষয়বস্তুর সংযোগের ফলে উত্পন্ন যে জ্ঞান অব্যাভিচারী এবং অব্যপদেশ এবং কার্যকরী বা ব্যাবসায়াত্মক, তাকেই প্রত্যক্ষ বলে |

তাহলে প্রত্যক্ষের কয়েকটা বৈশিষ্ট্য হলো :

১] ইন্দ্রিয় ও তার বিষয়বস্তুর সংযোগে জ্ঞান উত্পন্ন হবে |

২] সেই জ্ঞান অব্যাভিচারী হবে | অর্থাৎ তা কখনো থাকবে কখনো থাকবে না : এমন হবে না |

৩] সেই জ্ঞান অব্যপদেশ হবে | অর্থাৎ অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত তিনকালে সত্য হবে |

৪] সেই জ্ঞানের বাস্তব কার্যকারিতা বা ব্যবসায় থাকবে |

তার মানে দেখুন ন্যায় দর্শনে প্রত্যক্ষের ব্যাপ্তি কি বিরাট | পাশ্চাত্য প্রত্যক্ষবাদিদের সাথে নৈয়ায়িকদের এখানেই তফাৎ যে পাশ্চাত্য প্রত্যক্ষবাদিরা শুধু প্রথম শর্তটাকে মানে আর নৈয়ায়িকরা চারটি শর্তই মানে | তাহলে প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মধ্যে কে ঠিক ?

ইন্দ্রিয় ও তার বিষয়ের সংযোগে যে জ্ঞান উত্পন্ন হয় তা কেবলি বাইরের রূপ | তা ব্যভিচারী এবং তিনকালে সত্য নাও হতে পারে | সুতরাং সেটাকে প্রত্যক্ষ বলা যায় না | ওই জ্ঞান ভাসা ভাসা এবং ওর কোনো বাস্তব কার্যকারিতা থাকতেই পারে না | উপরন্তু যে জ্ঞান ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য , অপরিবর্তনশীল এবং তিনকালে সত্য, সেইরকম জ্ঞানেরই বাস্তব কার্যকারিতা আছে | অতএব প্রাচ্যের ন্যায় দর্শনই ঠিক | লক, বেন্থাম ইত্যাদি প্রত্যক্ষবাদিরা ভুল |

ন্যায় দর্শনের এই প্রত্যক্ষ কেবল ধ্যানে হতে পারে | বস্তুর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপের মধ্যে যে অংশটি চিরন্তন সেটিকে নির্বাচন করতে গেলে ওই রূপের পরিবর্তনশীল অংশগুলিকে বাদ দিতে হবে | যেমন একটা উদাহরণ দেয়া যাক | একজন নৈয়ায়িক একটি ঘটকে কেমন প্রত্যক্ষ করবে ? ঘটের রূপ, তার ঘটাকার, তার রং, তার কারুকার্য : সবই পরিবর্তনশীল | পৃথিবীতে বহু ঘট দেখা যায় তাদের আকার, বর্ণ ও কারুকার্য আলাদা | ঘটার কার্যও বহু রকম | সুতরাং এইগুলি কোনভাবেই চিরন্তন হতে পারে না | তবে ঘটার উপাদান মাটি পৃথিবীর সর্বত্র এক | পৃথিবীর তামাম ঘট , সে যেমনি দেখতে হোক না কেন , মাটি ছাড়া অন্য কোনভাবে তৈরী না | তিনকালেও এর ব্যভিচার সম্ভব নয় | সুতরাং নৈয়ায়িকদের দৃষ্টিতে ঘট মানে মাটি |

কিন্তু একজন আধুনিক পাশ্চাত্য প্রত্যক্ষ বাদীর মতে ঘট হলো তার বিভিন্ন রূপ , বর্ণ , কারুকাজ, এবং উপাদান | কিন্তু এতে সমস্যা কোথায় ? সমস্যা হলো যদি আমরা সার্বজনীন চিরন্তন বিষয়কে না জানি তাহলে আমাদের জ্ঞান সার্বজনীন হবে না | আমরা সর্বত্র পূজা পাব না | যেমন পাশ্চাত্য প্রত্যক্ষ বাদী দার্শনিকরা পাননি |

এবার দেখা যাক নৈয়ায়িকদের ঘটজ্ঞানের বাস্তব কার্যকারিতা কি ? যদি ঘটার উপাদান মাটির ব্যাপারে বিশদে জানা যায় তাহলে উত্তম ঘট পৃথিবীর সর্বস্থানেই প্রস্তুত করা সম্ভব | ঘটের আকার, বর্ণ, কারুকাজ এবং কাজ এই মাটির চরিত্রের উপরই নির্ভর করে | সুতরাং এটা ভীষনই ব্যবহারিক |

গ্রিক দার্শনিকদের জ্ঞানের সাথে মিলে যাচ্ছে | তাঁরাও বলেছিলেন যে জ্ঞান পরিবর্তনশীল হবে না , অপরিবর্তনীয় হবে | প্লেটো ও অ্যারিস্টট্ল এই কথাই তাদের বইতে বলেছিলেন | তবে তার মানে এই নয় যে গ্রিকরা ভারত থেকে দর্শন শিখেছিলেন বা ভারতীয়রা গ্রিকদের থেকে শিখেছিলেন | সর্বত্র এক মানবজাতি বাস করে | তাদের বুদ্ধিও একইরকম | সুতরাং তারা যেখানে যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন তারা একই রকম দার্শনিক বিচারে অভ্যস্ত ছিল |

পরে গ্রিক দার্শনিকদের সাথে পাশ্চাত্য প্রত্যক্ষবাদিদের বিচ্ছেদ ঘটে | গ্রিক দর্শনের শুধু নামাবলিটুকু গায়ে চাপিয়ে পাশ্চাত্য প্রত্যক্ষবাদিরা নিজেদের অপরিনত দর্শন চর্চা শুরু করে | এখানে তাই পাশ্চাত্য প্রত্যক্ষবাদী বলতে গ্রিক দার্শনিকদের বুঝবে না |

নিচে আধুনিক পাশ্চাত্য প্রত্যক্ষ বাদের বিবরণ সংক্ষেপে দেব :

প্রত্যক্ষবাদ-এর বিবর্তনকে ছয় ভাগে ভাগ করে বলছি | গোড়ার দিক, নবজাগরণ, ব্রিটিশ প্রত্যক্ষবাদ, ফেনোমেনা বাদ, যুক্তিবাদী প্রত্যক্ষবাদ (লজিকাল পজিটিভিসম বা ইমপিরিসিস্ম), ব্যবহারিকবাদ [প্রাগমাটিজম] | গোড়ার দিকে প্রত্যক্ষবাদ বলছিল যে মানুষের মন হলো সাদা কাগজের মত [ট্যাবুলা রাসা ] যার ওপরে অভিজ্ঞতা ছাপ ফেলে যায় | ইউরোপ আর আরবের বিজ্ঞানীরা সবাই এই মতে বিশ্বাসী ছিল | ইতালির নবজাগরণের সময় এই ধারণা পাল্টে হলো তুমি যা দেখবে তার সাথে যদি অথরিটির মতের অমিল হয় তাহলে তুমি অথরিটির কথা অগ্রাহ্য করবে | লেওনার্দ দা ভিঞ্চি থেকে মাকিয়াভেলি সবাই এই মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন | ইংরেজ প্রত্যক্ষবাদিদের মধ্যে লক বলেছেন মানুষের মন টাবুলা রাসা ও তাতে অভিজ্ঞতা ছাপ ফেলে | বিশপ বার্কলে বলেছেন সকল জ্ঞানই মানসিক অনুভুতি মাত্র | হিউম বলেছেন যে জ্ঞান দুই রকম নিশ্চিত আর অনিশ্চিত |

ফেনমেনাবাদিদের মতে সকল বাহ্যিক জ্ঞানই মানসিক অনুভুতি | অনেকটা হিউমের কাছাকাছি যায় | মিলের প্রত্যক্ষবাদ হলো জ্ঞান আসে প্রত্যক্ষভিত্তিক অনুমান থেকে | যুক্তিবাদী প্রত্যক্ষবাদ হলো প্রত্যক্ষ জ্ঞান আর গাণিতিক যুক্তির মিশ্রণ | প্রাগমাটিস্ম হলো জ্ঞানের প্রত্যক্ষ কার্যকারিতার পরীক্ষা | এই হলো সংক্ষেপে পাশ্চাত্য প্রত্যক্ষবাদ |

সব মিলিয়ে মনে হবে যেন জ্ঞানসমুদ্রে ভাসছি কিন্তু আসলে একই কথা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বলা হচ্ছে | হিউম ছাড়া কেউই নিশ্চিত জ্ঞান আর অনিশ্চিত জ্ঞানের মধ্যে ফারাক করেন নি | এটাই দেখার মত বিষয় | নৈয়ায়িকরা নিশ্চিত জ্ঞান প্রত্যক্ষকেই প্রত্যক্ষ বলেন | অনিশ্চিত জ্ঞানকে জ্ঞানই বলেন না | শুধু হিউম এদের খুব কাছে গিয়েছিলেন |

যেহেতু পাশ্চাত্য দার্শনিকেরা চিরন্তন তত্বকে প্রত্যক্ষ না করে কেবল পরিবর্তনশীল বিষয়গুলির অনুশীলন করে , তাই পাশ্চাত্যের জ্ঞান ভাসা ভাসা , গভীর নয় | নৈয়ায়িকদের জ্ঞানই গভীর যেহেতু তারা চিরন্তন তত্বকে প্রত্যক্ষ করেছে |
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জুলাই, ২০১৬ রাত ৯:০৪
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের এই সুযোগ কি আরেকবার আসবে? বা তারাই-কি এটা হাত ছাড়া করবে???

লিখেছেন লিংকন বাবু০০৭, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০

ইরানী নেতা খামেনি শহীদ হওয়ার পরে ইরান কি বলেছিল মনে আছে???

ইরান কইছিলো, ইরানের এই অবস্থার জন্য যারা দায়ী সেই বেবাক দেশকে রাস্তায় এনে দাঁড় করানো হবে।
প্যান্ট খুলে ছেড়ে দিবে-(এটা আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোন কিছুর অস্তীত্ব বিহীন মহাশূন্যে অস্তিত্বের প্রক্রিয়া কি ছিল?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৭



কোন কিছুর অস্তীত্ব বিহীন মহাশূন্যে অস্তিত্বের প্রক্রিয়া হলো উদ্ভব। কারণ সৃষ্টি বা তৈরী কারক না থাকা। তাতে কী উদ্ভব হবে এটা অনিদৃষ্ট। কারণ এটা নিদৃষ্ট করার কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মক্কা থেকে বদর: মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ভূরাজনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৫


মুসলিম বিশ্বে ঐক্যের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। অন্তত চুক্তিগুলোর নাম শুনলে তেমনটাই মনে হয়। মক্কা ও বদর। মুসলিম ইতিহাসের দুটি পরিচিত নাম। নাম শুনে মনে হতে পারে, বহুদিনের বিভেদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মোন্মাদদের কল্পিত বাস্তবতা: "দি ম্যাট্রিক্স" এবং নীল বড়ি

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৭


বাংলাদেশ ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গিদের কবলে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধম্যের কল্যানে এই ধর্মোন্মাদনা দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, কদিন আগে সাতক্ষীরায় একদল ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গি ওয়াহিদুজ্জামান শামীম... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা ব্রয়লার মুরগী খাবেন সবাই সমকামী হয়ে যাবেন

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩


ওয়াজ শোনেন অথচ মুফতি কাজী ইব্রাহিম হুজুরকে চেনেন না, এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কমই আছেন। হুজুরের আরেকটি বড় পরিচয় হলো, তিনি করোনার ওষুধ স্বপ্নে পেয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন। হুজুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×