
কান্টের ক্রিটিকাল ফিলোসফি-র বাংলা অনুবাদ বড় অদ্ভুত | সেটা কখনো হয় পর্যালোচনামূলক দর্শন , কখনো হয় সবিচার দর্শন | কিন্তু পর্যালোচনা বা বিচার কোনটাই কান্ট করেননি | উনি যেটা করেছেন সেটা হলো সমালোচনা | ইংরাজিতে ক্রিটিকাল কথাটার মানেই হলো সমালোচনামূলক | তা যদি না হয় তাহলে ক্রিটিক শব্দের অর্থ সমালোচক হবে না আর ক্রিটিসিসম শব্দের অর্থ সমালোচনা হবে না | এইসব বাংলা অনুবাদকারীরা অদ্ভুত মুর্খতা আর অজ্ঞতার পরিচয় দেয় | এদেরই জন্য আমি ইংরাজি বেশি পছন্দ করি |
কান্ট যে সমালোচনা করেছিলেন সেটা ছিল প্রকৃতির সমস্ত বস্তুর সমালোচনা | ওনার নিয়ম হলো যদি কোনো একটা বস্তু বা ঘটনা ওনার সমালোচনার পরও টিকে থাকে তবেই উনি তাকে সত্যি বলে মেনে নেবেন | এই ধরনের বিচারের সুবিধা হলো যে এটা একপেশে নয় | এটা একপেশে হতে পারে না | এই ধরনের বিচারই সত্যের সম্মুখীন করে দেয় মানুষকে | আজকে আমাদের এই ধরনের সমালোচনামূলক দর্শনের খুবই দরকার |
কিভাবে এই দর্শন কাজ করে ? এর উত্তরে আমি কান্টের ক্রিটিক অফ পিওর রিসন বা বিশুদ্ধ যুক্তির সমালোচক বলে যে লেখাটা আছে সেটার সাহায্য নিতে চাই | এই লেখায় কান্ট বিশুদ্ধ যুক্তির সমালোচনা করেছেন | বিশুদ্ধ যুক্তিকে সত্য জ্ঞানের উত্স বলে দাবি করা হয় |উনি বলেছেন যে আমাদের সমস্ত যুক্তিই ইন্দ্রিযজাত জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল | কিন্তু আমরা সেটুকুই জানি যা আমাদের ইন্দ্রিয় আমাদের জানায় | ইন্দ্রিয়ের ক্ষমতার বাইরে যে জ্ঞান রয়েছে সেটা সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানি না | সুতরাং বিশুদ্ধ যুক্তি যথার্থ জ্ঞান দেয় না | এর সাথে আরো একটা সমালোচনা হলো যে ইন্দ্রিয় প্রতারিত হয় | চোখ কান নাক ভুল জ্ঞান দেয় | ম্যাজিক বা মরিচিকাই তার প্রমান | এর দ্বারাই বুঝা যায় এইসব ইন্দ্রিযজাত জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে যে বিশুদ্ধ যুক্তি কাজ করে সেটা কতদূর মিথ্যা জ্ঞান দেয় | তাই কান্ট বলেছেন যে আমরা কখনই জগত কাকে বলে তা জানি না | এই লেখায় বিশুদ্ধ যুক্তি কান্টের সমালোচনার দ্বারা খর্ব হলেও একেবারে বিনষ্ট হয় নি |
এই সমালোচনা দ্বারা এটাই প্রমান হয়েছে যে বিশুদ্ধ যুক্তি পুরোপুরি সত্য জ্ঞান দিতে পারে না | কিন্তু অর্ধসত্য জ্ঞান দিতে পারে | এটা একেবারে ফেলনাও নয় আবার একেবারে সেরাও নয় | মাঝামাঝি | কিভাবে এই দর্শন আমরা ব্যবহার করতে পারি ?
আমাদের প্রতিটা বস্তুকে পরীক্ষা করতে হবে | দেখতে হবে যে ওই বস্তুর স্বরূপ সম্বন্ধে যা বলা হচ্ছে তার ব্যতিক্রম বা ব্যভিচার কিছু আছে কিনা | যদি থাকে তাহলে সেটাই সমালোচনা | এতে করে বস্তুর আসল রূপটি প্রকাশ পায় | যেমন বিশুদ্ধ যুক্তির মূলেই গন্ডগোল | যার গোড়াতেই গলদ সেটা কিভাবে আমাদের সত্যজ্ঞান দেবে ? এইভাবে আমাদের সমালোচনা করতে হবে | আজকের দিনে এই দর্শনের কি প্রয়োজন ?
ভীষণ প্রয়োজন | আজকের দিনে যদি আমরা চারপাশ থেকে নানারকম বিজ্ঞাপনে আচ্ছন্ন হয়ে আছি | এই বিশ্বায়নের যুগে নানারকম আজব দাবি আমাদের প্রতিমুহুর্তে আচ্ছন্ন করে রাখছে | এইসব আজগুবি দাবিকে যাচাই করা খুব প্রয়োজন, না হলে ঠকে যেতে হবে প্রতি পদে | সুতরাং সমালোচনা করতে হবে | খুঁজে দেখতে হবে যা দাবি করা হচ্ছে তার উল্টো কোনো কিছু আছে কি না | যদি থাকে তাহলে নির্ভয়ে সেটাকে গ্রহণ করতে হবে |
আমাদের প্রাচীন ন্যায়্দর্শনও এইরকম সমালোচনামূলক ছিল | নৈয়ায়িক তর্কযুদ্ধতে দুই পক্ষ একে অপরের সমালোচনা করত | যে সমালোচনা করতে পারত না, সেই পক্ষ হেরে যেত |শঙ্করাচার্য-এর সাথে বৌদ্ধদের তর্কযুদ্ধ হয়েছিল | সেখানে শঙ্করের অদ্বৈত মতের সমালোচনা করতে না পারায় বৌদ্ধরা পরাজিত হয় | সুতরাং কান্টের সমালোচনামূলক দর্শন ভারতে অজ্ঞাত ছিল না |
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০১৬ রাত ৮:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



