somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্পঃ ইরিনা

২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছত্রিশ নম্বর বাস থেকে নেমে চৌরাস্তা থেকে কিছুক্ষণ হেঁটে এগুলে আমাদের বাসাটা। শুμবার ছাড়া প্রতিদিনই বাস ধরতে সকালে স্ট্যান্ডে দাঁড়াতে হয় এবং বিকেলে ঠিক একই জায়গায় ভীর ঠেলে নামতে হয়। আজ বাস থেকে নামার সময় এক মেয়েকে দেখলাম। অবিকল ইরিনার মতো। সেই ডাগড় ডাগড় চোখ, ঠিক যেন চোখ দুটো একটা কিছু খুঁজছে। ইরিনা কি তবে ফিরে এল? না। ওর কপালে একটা কাটা দাগ ছিল। ছোটবেলায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলাম। এই মেয়ের কপালে
দাগ কোথায় ?
আমি যখন টেইনে পড়ি, তখন ও হাসিমাখা মুখ করে সেভেনের ক্লাসে ঢুকতো। যখন ছুটি হতো, রাস্তা দিয়ে আসার সময় বলতো,
“ভাইয়া, আমার ব্যাগটা নে না।”
“তোর ব্যাগ আমি নেব কেন?”
“নে না, ভাইয়া! খুব ভারী। কষ্ট লাগছে। তুই তো বড়।”
শেষ পর্যন্ত নিতেই হতো।
কি করতো না মেয়েটা? সারাদিন লাফালাফি, ঝাপাঝাপি, হৈ হুলোর! আবার বাবা ঘরে ফিরলে নিজে থেকেই ঠান্ডা একগাস শরবত বানিয়ে আনতো। মাঝেমাঝে আমার বইগুলো নেড়েচেড়ে বলতো, ওরে বাবা! কি কঠিন পড়া তোর। কিভাবে পড়িস রে?”
প্রায়ই আমরা ঘুরতে যেতাম। সাথে বাবার ‘ক্যানন’ ক্যামেরা থাকে। অনেক ছবি তুলি। ইরিনা ছবি তোলার সময় দাঁত বের করে হাসি দিত। ঘরে ওর যত ছবি আছে, সব ছবিতেই দাঁত বের করা। আনন্দের সঙ্গা ওর হাসিভরা মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যেত।
এক বিকেলে স্কুল থেকে ফিরছি। ও হঠাৎ থেমে পড়ল। হয়তো ব্যাগ নিতে বলবে।
বললাম, “কি? ব্যাগ নেব?”
“হুম।”
ক্ষানিকক্ষন পর আবার ও থমকে দাঁড়ালো। “কিরে কি হলো?”
বললো, “জ্বর জ্বর লাগছে। পিঠটাও ব্যাথা করছে।” কপােেল হাত দিয়ে দেখলাম সত্যিই শরীর গরম। বাড়িতে আসার পর সত্যিই খুব জ্বর এল। কিন্তু জ্বর ভাল হয়ে গেল দ্ইু দিনেই। এর পর থেকে মাঝেমাঝেই জ্বর আসতো। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার পর একটা জিনিস নজরে পড়লো সবার। ওর ওজন অনেক কমে গেছে। দিন দিন ওর শরীর খারাপের দিকে যেতে লাগলো। নিজের যদি একটি বাগান থাকে এবং সেই বাগানের সব ফুল যদি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে শুরূ করে তা সহ্য করা সহজ নয়। প্রতিটি মুহূর্তে মনে হতে থাকে পানি দিয়ে, সার দিয়ে, যতড়ব দিয়ে আবার বাগানটা সাজিয়ে তুলি। আমিও চাইতাম, ইরিনা ভাল হয়ে যাক। আবার আগের মতো।
একদিন বাবা বললো, “ডাক্তাররা ভাবছে ইরিনার সিরিয়াস কিছু হয়েছে। কিছু টেস্ট করতে বলেছে।” টেস্ট হলো। আমরা সবাই জানলাম, কিন্তু এক ইরিনাই জানলো না যে, তার লিভার ক্যান্সার।
মা নীরবে কাঁদেন। বাবাও চুপচাপ। আমি কি করবো কিছুই বুঝলাম না। সবাইকে চুপচাপ দেখে একদিন ইরিনা বললো, “মা, আমার অসুখটা কি?”
“কিছু না তো। কি একটা ভাইরাসের জন্য মাঝেমাঝে তোর শরীর খারাপ করে।”
“ও।”
একদিন জানলাম, ইরিনার অবস্থা খুব খারাপ। একদম শেষ পর্যায়ে। বড় জোড় ছয়মাস। ইরিনাও বুঝে গেল, ওর খারাপ একটা অসুখ হয়েছে। বাবা বাইরে থেকে ইরিনার পছন্দের সব খাবার নিয়ে আসে। ইরিনা মায়ের কাছে গিয়ে বললো, “মা আমার মাথায় হাত রেখে বলো আমার কি হয়েছে?” মা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো ওর দিকে।
বাবা বড় বড় ডাক্তারদের সাথে কথা বললো। ইন্ডিয়াতে নিয়ে গেলে কিছু হবে কি না- এসব। ডাক্তাররা বললেন: চান্স নেই। লিভার ট্রান্সপ্যান্ট করার কথা উঠলো। কেমোর কথা উঠলো। ঠিক এই সময়ই ইরিনা সব জেনে ফেললো।
ইরিনা দিনে দিনে নিশ্চুপ হয়ে গেল। হাসি মিলিয়ে গেল সন্ধ্যার দিগন্ত রেখার মতো। বাবা মা সাহস দেয়। কিছু হবে না। দেখিস; আতড়বীয় স্বজন ফোন করে খবর নেয়। মাঝেমাঝে ইরিনা আমার কাছে আসে। আগের মতো বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখে। হঠাৎ ছুটে চলে যায় ঘর থেকে। তাকিয়ে দেখি, ওর চোখে পানি।
গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে শুরন করলো ও। বারান্দায় জানালার রডে মাথা রেখে রাতের আকাশ দেখতো। বাবা এসে মাথায় হাত রেখে বলতো, “কি রে মা, ঘুমোবি না?”
ও বলতো; “থাকি না বাবা জেগে। আর কয়েকটা দিনই তো জেগে থাকবো।”
বাবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ থেকে চশমাটা খুলে হাতে নেয়।
সমুদ্র দেখার শখ ছিল ওর। একদিন সবাই কক্সবাজার গেলাম। ইরিনা সমুদ্রে নেমে বললো, “ভাইয়া দ্যাখ, কত মজ্!া ঢেউগুলো কেমন মিলিয়ে যায়! আমিও এমনি মিলিয়ে যাব তাই না?” বলে হাসতে থাকে। “ভাইয়া জানিস? ক্লাসে আমাকে সবাই কি বলতো?”
“কি?”
“ ‘ইরিনা’ থেকে ‘ইরি’। ‘ইরি’ জাতের ধান।” ইরিনা আবার হাসে। আমি চেয়ে দেখি।
ঢাকায় ফিরে ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা শুরূ হলো। কেমোর ব্যবস্থা। দিন বাড়তে থাকলো। ঘরের কোণায় যে ছোট্ট মাকরশা ছিল সেটাও বড় হতে শুরূ করলো।
একদিন সকালে পাবনা থেকে ব্ড় মামা চলে এল। রাজশাহী থেকে ছোট খালা। মুন্সিগঞ্জ থেকে দুই কাকা। একে একে সবাই। কেবল আমরা কয়েকজন চলে যেতে থাকলাম কাঁধে একটা খাটিয়া নিয়ে। উদ্দেশ্য....................... থাক, কোথায় গেলাম মনে করতে ই‛ছা করছে না।
হঠাৎ দেখি, বাসায় চলে এসেছি। শার্ট ঘামে ভেজা। খুব গরম আজ। মা ডিম আনতে বলেছিল। ভুলেই গিয়েছিলাম। এখন আবার চারতলার নিচে যেতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১:১৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×