শিক্ষা, ব্যবসা ; এক সাথে চলে না।
শিক্ষা কোন সুযোগ নয় ; শিক্ষা আমার অধিকার।
উপরের এই স্লোগান দুটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় যে ক্যাম্পাসে, তা হল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় । মাত্র ১১ একর জমির উপর অবস্হিত অনাবসিক এই প্রতিষ্ঠানটিই উচ্চ শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের “মডেল বিশ্ববিদ্যালয়”। আর তাই এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাই শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরূদ্ধে সর্বাধিক স্লোগান উচ্চারণ করে আসছে।
বিগত বিএনপি জোট সরকার এর সময় তৎকালীন “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ” কে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হলেও মূলত এটি পাবলিক এর আদলে একটি প্রাইভটে বিশ্ববিদ্যালয়। হ্যঁ, এটি আসলেই যে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় তা এখানকার শিক্ষার্থীদের শিক্ষাব্যায় এর দিকে লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়। এবং এই শিক্ষাব্যায় দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। উদাহরণসরূপ, ২০০৫-২০০৬ সেশনে অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচে “B” ইউনিটে ভর্তি ফি ছিল ৯৮৫০ টাকা আর এখন ২০১১-২০১২ সেশনে এসে একই ইউনিটে ভর্তি ফি ১৪৪০০ টাকা। কিন্তু এর চেয়েও ভয়ঙ্কর যে তথ্যটি তা হল, বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ২৭/৪ ধারায় বলা আছে , “বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প বাস্তবায়িত হইবার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের পৌনঃপুনিক ব্যয় যোগানে সরকার কর্তৃক প্রদেয় অর্থ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাইবে এবং পঞ্চম বত্সর হইতে উক্ত ব্যয়ের শতভাগ অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয় ও উত্স হইতে বহন করিতে হইবে ।” উল্লেখ্য এই প্রকল্পের মেয়াদ পাঁচ বছর। এখন প্রশ্ন হল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয়ের উৎস কি !! এর কি কোন ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান আছে , যা থেকে এর আয় করা সম্ভব। বস্তুত বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের একমাত্র উৎস শিক্ষার্থীদের প্রদেয় অর্থ। অর্থাৎ ২৭/৪ ধারা বলবত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প বাস্তবায়িত হবার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমগ্র ব্যায়ভার শিক্ষার্থীরাই বহন করতে হবে । আর তাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদে বারবার মাঠে নেমেছে এবং সর্বশেষ গত বছরের ২৫ আগষ্ট শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সামনে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী সড়ক অবরোধ করে এবং আন্দোলনের ধারাবহিকতায় এক পর্যায়ে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা দেন এবং অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় সরকারি বরাদ্দ দেওয়ার আশ্বাস দেন ।।
এখন দেখার বিষয় হচ্ছে , প্রধান মন্ত্রীর ঐ ঘোষনার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আদতে কি পেলো :
প্রথমত লক্ষনীয়, ঐ ঘোষনার পরপর ই ক্যান্টিনে খাওয়ার দাম আরেক দফা বড়ল । বলে রাখা ভাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের রেষ্টুরেন্ট গুলোর তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যান্টিনে খাওয়ার দাম বেশি এবং মান অপেক্ষাকৃত নিম্ন।
দ্বিতিয়ত, সম্মান প্রথম বর্ষে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির ফি’র সাথে বর্ধিত ৫০০০ টাকা নেয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষা “উন্নয়ন ফি” র নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এই টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ২৭/৩ ধারায় বলা আছে “বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের লক্ষ্যে প্রণীত প্রকল্প ব্যয়ের অন্যুন ১৬% অর্থ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল হইতে যোগান দেওয়া হইবে এবং অবশিষ্ট অর্থ সরকার কর্তৃক প্রদেয় হইবে ।” বলা বাহুল ২০০৯-১০ সেশনেই এই প্রকল্পের মেয়াদ উত্তীর্ন হয়েছে। আর তাই উন্নয়ন ফি’র নামে ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে আর কোন ফি নেয়া যৌক্তিকতা নেই। অন্যদিকে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী সুস্পষ্ট ভাবে ঘোষনা দিয়েছেন “অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় সরকারি বরাদ্দ পাবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।”
তবে এত কিছুর মধ্যে সবচেয়ে দু:খজনক বিষয় হচ্ছে , প্রধান মন্ত্রীর ঐ ঘোষনার পর জাতীয় সংসদের দুই দুইটি অধিবেষন বসলেও এর একটিতেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনটি সংশোধোনের বিল উত্থাপিত হয় নি। যদিও সংসদে মাত্র ৪ মিনিটেই ৪০০ বছরের ঢাকা সিটি ২ ভাগ করা হয়েছে।
এখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, “প্রধান মন্ত্রীর ঐ আশ্বাস কেবল মাত্র আন্দোলন দমনের একটি কৌশল মাত্র??”
কিন্তু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কি দমে গেছে ?? না । তারা এখনো এই বাণ্যিজ্যিক শিক্ষার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। গত ২ জানুয়ারী , উন্নয়ন ফি’র নামে ৫ যে ০০০ টাকা ধার্য করা হয় তা প্রত্যাহার এর দাবিতে আন্দোলন শুরু করে প্রগতিশীল ছাত্রজোট। এবং এ সময় জোটের নেতা কর্মীরা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের ক্যাডারদের দ্বারা ২ দফা হামলার শিকার হন। এসময় বেশ কয়েকজন নারী কর্মীও লাঞ্ছিত হন। কর্তৃপক্ষ এই হামলায় দায়ীদের বরুদ্ধে কোন ব্যবস্হা তো নেয় ই নি উল্টো পরদিন , আন্দোলনকারীদের ব্যাংক অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে কতিপয় শিক্ষক ও প্রশাসনের কর্তাব্যাক্তিরা আন্দোলনের ব্যানার ছিনিয়ে নিতে এলে সেখানে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে । এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জোটের কর্মীদের বিরুদ্ধে শিক্ষক লাঞ্ছনার মিথ্যা অভিযোগ আনে। এবং পরদিন ক্যাম্পাসে মানব বন্ধন কর্মসূচির ঘোষনা দেয়। কিন্তু পরদিন সাধারণ শিক্ষার্থীরা জোটের ডাকা ব্যাংক অবরোধ কর্মসূচির প্রতি সংহতি জানায় এবং একজোটে আন্দোলন করার ঘোষনা দেয় ।
সর্বশেষ : জবির শিক্ষার্থীরা মনে করে , ২৭/৪ ধারা যতদিন বহাল থাকবে ততদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার বিণিজ্যিকীকরণ বন্ধ হবে না। এবং এভাবে শিক্ষাব্যায় বাড়তে বাড়তে তা দরীদ্র-মধ্যবিত্তের নাগালের বাহিরে চলে যাবে। আর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশই দরিদ্র-মধ্যবিত্তের সন্তান।
জাহিদুল ইসলাম সজিব
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ইংরেজি
৩য় বর্ষ, ২য় সেমি
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ৩:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


