নৌ মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা বিআইডব্লিউটিএ’র বিভিন্ন পদে নিয়োগ পরীক্ষার নামে প্রহসনের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। ছয় শতাধিক শূন্য পদে নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জনকারী দু-একজন ছাড়া অন্যদের চাকরি হয়নি। চাকরি হয়েছে মন্ত্রী, হুইপ, সরকারদলীয় এমপি, সচিব, সরকারি কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন নেতাদের তদবিরের প্রার্থীদের। এসব নাম তালিকাভুক্ত করতে গিয়ে প্রার্থীদের প্রত্যেককে গুনতে হয়েছে পদভেদে ৩ থেকে ১৫ লাখ টাকা। প্রাপ্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অর্থ পুলের মেধাতালিকায় শীর্ষে অবস্থানকারী প্রথম ২০ জনের ১৮ জনই চাকরি পাননি। অথচ একই তালিকার ৩০০ নম্বর সিরিয়ালের পরে অবস্থানকারী প্রার্থীরা চাকরি পেয়েছেন। সহকারী বা কোষাধ্যক্ষ পদে শীর্ষে অবস্থানকারী কোনো প্রার্থীর চাকরি হয়নি। অথচ মন্ত্রীর সুপারিশে শুধু পাস নম্বর পাওয়া প্রার্থীদের চাকরি হয়েছে। একইভাবে অন্যান্য ক্যাটাগরির সব নিয়োগে একই ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়োগে মানা হয়নি জেলা ও মুক্তিযোদ্ধা কোটা।
এ নিয়োগকে কেন্দ্র করে নৌ মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কোটি কোটি টাকার নিয়োগবাণিজ্য করেছেন বলে বিস্তর অভিযোগ পাওয়া গেছে। পছন্দের প্রার্থীদের চাকরির যোগ্য করে দিতে মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়িয়ে দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এসব কর্মকর্তা। এতে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জনকারী যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীরা বঞ্চিত হয়েছেন। এতে চাকরিবঞ্চিতদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এদের কেউ কেউ আইনের আশ্রয় নেয়ার চিন্তা করছেন বলে জানিয়েছেন। এদিকে দলীয় ও তদবিরের প্রার্থীদের চাকরি দেয়ায় শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা। তাদের মতে, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত এসব কর্মকর্তা ও কর্মচারী দিয়ে প্রশাসনিক কাজ চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। এমনকি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নৌ মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ নিয়োগবাণিজ্যের বেশ কিছু প্রমাণপত্র আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। এতে দেখা যায়, নৌমন্ত্রী শাজাহান খান নিজেই বিআইডব্লিউটিএ’র নিম্নমান সহকারী/সময় রক্ষক/সহকারী কোষাধ্যক্ষ পদে ১২ জন ও সহকারী/কোষাধ্যক্ষ পদে ১০ জনের নামের তালিকা দিয়েছেন। নৌ মন্ত্রণালয় থেকে বিআইডব্লিউটিএতে পাঠানো এ তালিকায় মন্ত্রীর একান্ত সচিব মো. সোহরাব হোসেন শেখের স্বাক্ষর ও সিল রয়েছে। এ দুই তালিকা থেকে মাদারীপুরের উজ্জল পোদ্দার (রোল ০৯৮), রিয়াজ উদ্দিন রকিব (৪২) ও পান্না বিশ্বাস (৫৭৩), গোপালগঞ্জের ফরিদ আহম্মেদ (৬৩৮), কিশোরগঞ্জের নাজমুল হাসান (১০০), ঢাকা মিরপুরের জসিম উদ্দিন পাঠান (২৪৭), ঝালকাঠীর মো. সেলিম গাজী (১০৮), বগুড়ার মোসাম্মত্ শিখা খাতুন (১৪৩), ঢাকার সৈয়দ মারুফ হোসেন (২০৭), মো. মুরাদ হোসেনের (২৪) ও বরিশালের সাহারা খাতুন (৫২২) চাকরি পেয়েছেন। এছাড়া মন্ত্রীর তালিকায় রয়েছে বরিশালের আসমা বেগম, সিরাজগঞ্জের মো. ইব্রাহিম হোসেন, কুমিল্লার তিলোত্তমা সরকার, রাজবাড়ীর অসীম কুমার কুন্ডু, মোসা. ইশরাত জাহান, ঢাকার মো. সাকলাইন হোসেন, মো. পারভেজ বাদল ও মো. মিজানুর রহমান, সিরাজগঞ্জের মো. জুয়েল করিম, নওগাঁর মোছা. জাকিয়া আহমেদ ও আকলিমা খাতুনের নাম। নিয়োগের জন্য তালিকা দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। তিনি বলেছেন, ‘সুপারিশসহ নামের তালিকা দেয়া অন্যায় বা অপরাধ নয়। আমার কাছে অনেকে অনুরোধ নিয়ে আসে। আমি পিএস সোহরাবের কাছে পাঠাই। সে-ই নাম তালিকাভুক্ত করে।’
এ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুল মান্নান হাওলাদার নিজেও লিখিতভাবে সুপারিশ করেছেন। তিনি বিআইডব্লিউটিএ’র সহকারী কোষাধ্যক্ষ পদে কিশোরগঞ্জের খালিকুজ্জামান (রোল ৭২০), নিম্নমান সহকারী/মুদ্রাক্ষরিক পদে নরসিংদীর মো. আল আমিন (২৭১), বি. বাড়িয়ার মো. শহিদুর রহমান খানসহ (৫১৭) কয়েকজনের তালিকা দিয়েছেন। তার সুপারিশের বেশিরভাগের চাকরি হয়েছে। অপর এক তালিকায় দেখা গেছে, নিম্নমান সহকারী/মুদ্রাক্ষরিক পদে বগুড়ার মোছা. শিখা খাতুনের জন্য সুপারিশ করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, পাবনার মো. ফরিদুল ইসলামের জন্য সুপারিশ করেছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকার, সিরাজগঞ্জের মো. ইব্রাহিম হোসেনের জন্য পানিসম্পদমন্ত্রী রায় রমেশ চন্দ্র সেন, রাজশাহীর মোসা. ইসরাত জাহানের জন্য সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা ও জিনাতুন নেছা, কিশোরগঞ্জের মো. ফজলে রাব্বীর জন্য সংসদ সদস্য ডা. এম এ মান্নান, ঝালকাঠীর মো. সেলিম গাজী ও বরিশালের মো. রমিজুল হক রমিজের জন্য আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু এমপি, পটুয়াখালীর আসমা বেগমের জন্য নৌমন্ত্রলায় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের হুইপ লিটন চৌধুরী এমপি, পাবনার মো. আনিসুর রহমানের জন্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ ও বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান শামছুদ্দোহা খন্দকার, পাবনার সুমন কুমার পালের জন্য বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান শামছুদ্দোহা খন্দকার, কুমিল্লার মাহফুজুর রহমানের জন্য বিআইডব্লিউটিএ’র সদস্য (অর্থ) মতিয়র রহমান সুপারিশ করেছেন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের শম্পা আক্তার, টাঙ্গাইলের জাহাঙ্গীর আলম ও চট্টগ্রামের মো. হারুন অর রশিদের জন্য বিআইডব্লিউটিএ’র অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন সুপারিশ করেছে। এই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিআইডব্লিউটিএ’র সচিব মো. মাহবুবুল আলম। পোষ্য কোটায় নারায়ণগঞ্জের সায়মা আক্তার, জামালপুরের আসাদুজ্জামান নুর, জামালপুরের সাথী আক্তার, ঢাকার ফরিদা ইয়াসমিন, গাইবান্ধার মো. মোশাররফ হোসেন, পাবনার মো. রাশেদ আলম, কুমিল্লার মো. আরিফুল ইসলাম মজুমদার, চাঁদপুরের শরিফুল ইসলাম, বি.বাড়িয়ার মো. ওয়াসিমুল ইসলাম, ফেনীর মোহাম্মদ একরাম ও চাঁদপুরের কাওছার আলমের জন্য বিআইডব্লিউটিএ’র এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের নেতারা সুপারিশ করেছেন। এ ইউনিয়নের সভাপতি মো. আবদুর রাজ্জাক। একইভাবে অন্যান্য পদের জন্য অনেক সুপারিশ এসেছে। এসব সুপারিশের কপি সংরক্ষণ করছে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ।
নিয়োগের এসব নথিপত্র গণমাধ্যমের কাছে চলে আসায় বিআইডব্লিউটিএ’র সচিব মো. মাহবুবুল আলমের ওপর চটেছেন চেয়ারম্যান শামছুদ্দোহা খন্দকার। বক্তব্য জানার জন্য তার রুমে যাওয়া হলে তিনি এ প্রতিবেদকের সামনেই উচ্চৈঃস্বরে সচিবকে উদ্দেশ করে বলেন, নিয়োগের গোপন কাগজপত্র সাংবাদিকের কাছে কীভাবে গেল। এ প্রতিবেদক সব কাগজপত্র পেয়ে গেছে। আপনি তার ফাইল খুলে দেখুন, সব কাগজপত্র রয়েছে। এ সময় তিনি সচিবকে উদ্দেশ করে গালমন্দও করেন।
নৌ মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, বিআইডব্লিউটিএ’র বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৬৩০টি শূন্য পদে নিয়োগের জন্য নৌ মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন দেয়া হয়। ওই সময় বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান ছিলেন আবদুল মালেক মিয়া। তিনিই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেন। শূন্যপদে নিয়োগের জন্য মিরপুরের বাঙলা কলেজে লিখিত পরীক্ষা নেয়া হয়। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার কারণ দেখিয়ে নৌ মন্ত্রণালয় গত ২০১১ সালের ৪ অক্টোবর এক চিঠি দিয়ে এসব নিয়োগ স্থগিতের নির্দেশ দেয়। উপ-সচিব মো. শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় নিয়োগ স্থগিত করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। একই বছরের অক্টোবরে আবদুল মালেক মিয়ার স্থলে পুলিশ কর্মকর্তা শামছুদ্দোহা খন্দকারকে প্রেষণে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়। এর কিছুদিন পর গত ২০ নভেম্বর নিয়োগের ওপর দেয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নৌ মন্ত্রণালয়। এর পরই নিয়োগের মূল প্রক্রিয়া শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষা নেয়া হলেও বেশিরভাগ পদে তদবির ও ঘুষের বিনিময়ে চাকরি হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগদলীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে। এতে বাদ পড়েছেন পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জনকারী মেধাবী প্রার্থীরা।
উপেক্ষিত মেধাবীরা : বিআইডব্লিউটিএ’র বিভিন্ন পদে জনবল নিয়োগে উপেক্ষিত মেধাবীরা। লিখিত পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জন করলেও তাদের ভাগ্যে চাকরি নামের সোনার হরিণ জোটেনি। এ জায়গায় নিয়োগ পেয়েছেন মন্ত্রী, এমপি, হুইপ, নৌ সচিব, বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান, সদস্য (অর্থ) ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পছন্দের প্রার্থীরা। লিখিত পরীক্ষায় ভালো নম্বর না পেলেও এসব প্রার্থীর মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর যোগ করে চাকরি দেয়া হয়েছে। তবে দু-একজনের চাকরি মেধায় হয়েছে। এদের সংখ্যা সামান্য। সরকারি বাংলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. দিলার হাফিজ স্বাক্ষরিত লিখিত পরীক্ষার টেবুলেশন শিট, মন্ত্রী-এমপিদের সুপারিশের নথিপত্র ও বিআইডব্লিউটিএ নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, লিখিত পরীক্ষায় শুধু পাস নম্বর ৪৫-৫০ পেয়েই অনেকের চাকরি হয়েছে। অপরদিকে ৭৫ বা এর চেয়ে বেশি নম্বর পাওয়া প্রার্থীদের অনেকেই চাকরি পাননি। নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অর্থ পুলের নিম্নমান সহকারী পদে লিখিত পরীক্ষায় ৭০-৭৮ নম্বর পেয়েছেন এমন প্রার্থীর সংখ্যা ১৯ জন; এদের মধ্যে মাত্র দুইজন চাকরি পেয়েছেন। ৬০-৬৯ নম্বর পেয়েছেন এমন প্রার্থীর সংখ্যা ৮৪ জন; এদের মধ্যে দু-তিনজন চাকরি পেয়েছেন, বাকিদের চাকরি হয়নি। অপরদিকে লিখিত পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ৩০১ নম্বরে থাকা বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগের কর্মকর্তা (দুর্নীতির কারণে বর্তমানে ওএসডি) নিজাম উদ্দিন পাঠানের ভাই জসিম উদ্দিন পাঠান (রোল ২৪৭) লিখিত পরীক্ষায় ৪৭ নম্বর পেয়ে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি কর্মস্থলেও যোগ দিয়েছেন। তার জন্য সুপারিশ করেছেন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান শামছুদ্দোহা খন্দকারের সুপারিশে নিয়োগ পেয়েছেন মেধাতালিকায় ৩০৫ নম্বরে থাকা পাবনার আনিছুর রহমান (রোল ৫১৫, লিখিত পরীক্ষায় নম্বর ৪৭)। বিআইডব্লিউটিএ’র সদস্য (অর্থ) মতিয়ার রহমানের (যিনি নিয়োগ কমিটির প্রধান) সুপারিশে নিয়োগ পেয়েছেন মেধাতালিকায় ১১৩ নম্বরে থাকা কুমিল্লার মাহফুজুর রহমান (রোল ৫৩২, নম্বর ৫৯)। একইভাবে নৌমন্ত্রীর সুপারিশে মেধাতালিকায় ২৭৩ নম্বরে থাকা ঝালকাঠীর মো. সেলিম গাজী (রোল ১০৮, নম্বর ৪৯), মেধাতালিকায় ২৯৯ নম্বর সিরিয়ালে থাকা বগুড়ার মোছা. শিখা খাতুনসহ (রোল ১৪৩, নম্বর ৪৭) আরও কয়েকজন নিয়োগ পেয়েছেন। বিআইডব্লিউটিএ’র সহকারী/কোষাধ্যক্ষ পদে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া প্রার্থীদের চাকরি হয়নি। এ পদে লিখিত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ৭০-৭৯ নম্বর পেয়েছেন এমন প্রার্থীর সংখ্যা ২১ জন ও ৬৫-৭০ নম্বর পেয়েছেন ২৪ জন। এ ৪৫ জন প্রার্থীর কারও চাকরি হয়নি। অথচ লিখিত পরীক্ষায় ৬০ নম্বর পাওয়া কিশোরগঞ্জের মো. খালেকুজ্জামানের চাকরি হয়েছে। এ প্রার্থীর জন্য নৌ সচিব মো. আবদুল মান্নান হাওলাদার লিখিতভাবে সুপারিশ করেছেন। এ পদে নৌমন্ত্রীর সুপারিশে নিয়োগ পেয়েছেন লিখিত পরীক্ষায় ৪৫ নম্বর পাওয়া মাদারীপুরের রাজৈর থানার মো. মুরাদ হোসেন, ৪৯ নম্বর পাওয়া বরিশালের উজিরপুর থানার সাহারা খাতুনসহ অনেকে। সাধারণ পুলের নিয়োগের ক্ষেত্রে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। অর্থ পুলের বিভিন্ন পদে নিয়োগে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম পাওয়া গেছে। বেশিরভাগ নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক বিআইডব্লিউটিএ’র সদস্য (অর্থ) মতিয়র রহমান। তার বিরুদ্ধেও রয়েছে অনেক অভিযোগ। নিয়োগ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মতিয়র রহমান অপ্রাসঙ্গিক নানা প্রশ্নের মাধ্যমে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালান। তিনি বলেন, আপনি তো সবকিছু পেয়েই গেছেন। তাহলে আমাকে জিজ্ঞেস করে কী লাভ। নিয়োগে অনিয়ম বা মেধাবীরা উপেক্ষিত হয়েছেন কি না—এমন প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি তিনি।
ব্যাপক ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ : বিআইডব্লিউটিএ নিয়োগ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাকরি পাওয়া ও চাকরিপ্রত্যাশী কয়েকজন আলাপচারিতায় ঘুষ দেয়ার কথা স্বীকার করেছেন। কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে ঘুষ চুক্তি করেছেন বলেও জানান তারা। ঘুষ দিয়ে চাকরি পেয়েছেন—এমন কথা স্বীকার করে একাধিক ব্যক্তি নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, আমাদের নাম প্রকাশ করা হলে চাকরি থাকবে না। তারা জানান, অর্থ পুলের নিম্নমান সহকারী পদে ৫ লাখ ও সাধারণ পুলের নিম্নমান সহকারী পদে ৪ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন। সাধারণ পুলের নিম্নমান সহকারী পদে চাকরিপ্রত্যাশী আলমগীর (রোল ৬১৭৫৭) ঘুষ দেয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, চাকরির জন্য বিআইডব্লিউটিএর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে ৪ লাখ টাকায় চুক্তিবদ্ধ হন। প্রথম পর্যায়ে দেড় লাখ টাকা আগাম পরিশোধ করেছেন, বাকি টাকা চাকরির পর পরিশোধ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। একাধিক সূত্র জানায়, বিভিন্ন পদে ৩-১৫ লাখ টাকা ঘুষবাণিজ্য হয়েছে। এসব টাকার ভাগ নৌ মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পেয়েছেন। এ কাজে মধ্যস্থতা হিসেবে কাজ করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী ও দালাল। সূত্র আরও জানায়, সহকারী সচিব, সহকারী পরিচালক (নৌ ও ক্রয়), সহকারী পরিচালক (বন্দর), সহকারী কর্মকর্তা পদের জন্য ১২-১৫ লাখ টাকা, সহকারী পরিচালক (মেরিন সেফটি, হিসাব, অর্থ, নিরীক্ষা) ৭-১০ লাখ টাকা, সহকারী হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা/সহকারী অর্থ কর্মকর্তা/সহকারী নিরীক্ষা কর্মকর্তা ও সাধারণ পুলের সহকারী, তত্ত্বাবধায়ক কাম রক্ষণাবেক্ষণকারী কর্মকর্তা পদে ৬-৮ লাখ টাকা, নিম্নমান সহকারী/সময় রক্ষক ও সমমানের পদগুলোতে ৩-৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়েছে।
সময় শেষ হওয়ার পরও নিয়োগ চলছে : নৌ মন্ত্রণালয় জনবল নিয়োগে সময়সীমা বেঁধে দেয়ার পর নিয়োগ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে বিআইডব্লিউটিএ। এ পর্যন্ত তিন দফায় সময় বাড়ানো হলেও নিয়োগ কার্যক্রম শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছে সংস্থাটি। সূত্র জানায়, বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ প্রথম পর্যায়ে ১৪৬ পদে নিয়োগ দেয়। পরে ৪৬৫ পদে নিয়োগের জন্য সময় বৃদ্ধির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তত ৩ দফায় নিয়োগের সময়সীমা বাড়িয়ে গত ৩০ জুন নির্ধারণ করা হয়। এ সময়সীমা পার হওয়ার পরও নিয়োগপত্র দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আগস্ট মাসেও বেশ কয়েকজনের নিয়োগপত্র দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে সাধারণ পুলের গবেষণা কর্মকর্তা/পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মো. আবদুল মোমিন ও মো. আইনুল হকের নিয়োগপত্র জারি করা হয়েছে ১৩ আগস্ট। অর্থ পুলের সহকারী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রাজবংশী, নুরুল হক, মাসুদ আকন্দ, মো. আবু মুসাসহ কয়েকজনের নিয়োগপত্র জারি করা হয়েছে ৬ আগস্ট। একই দিন আরও কয়েক পদে নিয়োগপত্র জারি করা হয়েছে।
নৌমন্ত্রী ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, অনিয়ম, ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান আমার দেশ-কে বলেন, লিখিত পরীক্ষায় পাস করেনি—এমন কাউকে চাকরি দেয়া হয়নি। এ নিয়োগ দিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। নিয়োগের নামে কেউ ঘুষ লেনদেন করেছে কি না, তা আমি জানি না। নৌ সচিব আবদুল মান্নান হাওলাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। বিআইডব্লিউটিএ’র সব নিয়োগ চূড়ান্ত করেন চেয়ারম্যান শামছুদ্দোহা খন্দকার। তিনি আমার দেশ-কে বলেন, সাবেক চেয়ারম্যান মালেক মিয়ার আমলে বেশিরভাগ নিয়োগ হয়েছে। আমি চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পাওয়ার পর ইউনিয়ন নেতাদের সুপারিশে ২০-২৫ জনকে পোষ্য কোটায় চাকরি দিয়েছি। মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মালেক মিয়াকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে বলেন, জেলা ও মুক্তিযোদ্ধা কোটা ঠিক রেখে ২-৩টি পদে নিয়োগ দেয়ার পরই সব নিয়োগ স্থগিত করা হয়েছে। সুতরাং আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি বলেন, নিয়োগ নিয়ে অনেক অভিযোগ আমিও শুনেছি। এসব নিয়ে কথা বলতে চাই না।
সূত্র
আমার দেশ পত্রিকার সাংবাদিক কাজী জেবেলের দুঃসাহসিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনঃ বিআইডব্লিটিএতে নিয়োগ পরীক্ষার নামে প্রহসন 
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
অনু কবিতা

(১)
গল্প স্বল্প আড্ডার ভেতর
ডাকে পুরোনো দিন,
বিষন্ন স্মৃতির পাতা
ক্লান্ত বিলীন।
(২)
শোকের ধুলো জানালাতে,
বসে থাকে রোদ না মেখে,
হারিয়ে গেলো কারো মুখ
ভুল ঠিকানায় নাম লিখে।
(৩)
চায়ের ধোঁয়ায় মুখ লুকিয়ে
একাকী নিরালায়,
গল্প শেষেও... ...বাকিটুকু পড়ুন
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন 2026 : BJP কি জিততে চলেছে ?
আসন্ন বিধান সভা নির্বাচনে(2026) কি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে BJP জিততে চলেছে?
আসুন জেনে নিই প্রকৃত সম্ভাব্য রেজাল্ট।
রাজ্য সরকারের IB এবং মোদী সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র অনুসারে,কোন দল কত আসন পেতে পারে... ...বাকিটুকু পড়ুন
সোনালু ফুল
সোনালু ফুল
সাইফুল ইসলাম সাঈফ
উত্তরার এক পথে দেখে চমকিত
সোনালি সৌন্দর্যে সোনালু ফুল
ঝুলে আছে যেন রমণীর কানের দুল
সূর্যের কিরণে জাঁকালো শোভিত!
সোনালু গাছ গ্রামেই দেখেছি
এর রূপ দেখে বিমোহিত হয়েছি।
লম্বা ফল বলে যাকে বাঁদরলাঠি
বুঝি... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা যে আসলে কী চাই, নিজেরাও জানি না

কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই একটাই দৃশ্য—হতাশার গল্প আর সমালোচনার স্রোত। বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন সাহেবকে নিয়ে নানামুখী আলোচনা বেশ জমে উঠেছে। ক্ষমতায় আসার দুই মাসও... ...বাকিটুকু পড়ুন
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান- ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই!

অসুস্থ মানুষের সেবা করা, অবশ্যই মহৎ একটি কাজ।
বয়স হয়ে গেলে মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে। আসলে মানুষ অসুস্থ হয়ে গেলেই অসহায় হয়ে যায়। অবচেতন মন বারবার বলে- এবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।