somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পথে পথে ১

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ দুপুর ১:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পাখির ভাই হুসেন। হুসেনের শখ ঘু ঘু পোষা। সে বারো মাস ঘু ঘু পোষার কাজটি করে দক্ষতার সাথে। তাঁর পাখি বড় হয়, পোষ মানে, তাঁর ঘাড়ে বসে থেকেই এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করে। আমরা দুর থেকে এই দৃশ্য দেখি আর আহা উহু করি। আহা, নিজেদের মালিকানায় যদি এমন একটা পাখি থাকত ! এই কথা ভাবতে ভাবতেই মনে মনে চিন্তার ঝড় বয়। ভাবি, পাখি থাকলে বরং সমস্যা আরও বাড়ত। মেঝো ভাই নির্ঘাত সেই পাখি তাঁর দখলে নিয়ে নিত। এই নিয়া ওজর আপত্তি করতে গেলে তাঁর দুই হাতের সেইরাম চড় হজম করতে হত। এই ঘরে কোন বিচার নাই, বিচারের বালাইও নাই। তা না হইলে আমি হইলাম ঘরের সবচে ছোট, আর আমাকেই কিনা সকাল বিকাল এই রকম অমানবিক জীবন যাপন করতে হয় ? আহ, আফসোস। এই সংসারে জন্মানোই বৃথা। অথচ জেঠাতো ভাই মুকুল, আমার চেয়ে মাত্র ছয় মাসের ছোট। তাঁর চার বোন এক ভাই সব সময় তারে কোলে কোলে রাখে। আমার মা’য় ঘুম থিকা উইঠাই কি মরার অফিস না কই জানি চইলা যায়। শ্মশান হইয়া যাওয়া বাড়িতে আমি একাই থাকি, হাসি, কাঁদি, ঘুমাই...... দেখার কেউ নাই।



যতদুর, বুঝতে পারি গ্রামে বেড়ে উঠা পাঁচ বছরের একটা শিশুর প্রতিকুলতার সাথে যুদ্ধ করে বেড়ে উঠার যে শক্তি তা সম্ভবত শহরের পনের বছর বয়েসীদেরও নেই। আর সেইজন্যেই ঘুঘুর মালিক হবার আগেই এর মেরিট’স ডিমেরিট’স নিয়া আমার এত চিন্তা। হুসেনের সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করি নিরন্তর পাছে তাঁর ঘুঘু’র বাচ্চাটাকে হাত দিয়ে সামান্য ছুঁয়ে দেখা যায়। হুসেন ফ্লোর দেয়... প্রশ্রয়ের হাসি দেয়, আমি সামনে বাড়ি। এক সময় নিজের অজান্তেই ঘুঘুর দিকে হাত বাড়িয়ে দেই আর ঠিক তখনই হুসেনের চিকন বেতের বাড়ি অথবা কানমলা কপালের অবধারিত লিখনে পরিনত হয়। কান ডলতে ডলতে বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করি। নিরাপদ দুরত্ব পার হবার পর হুসেনের চৌদ্দ গোষ্ঠীর মুন্ডুপাত করি। দুর থেকে জোরে জোরে বলি, হুসেনের পরিবার এই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা না। চাইলেই এক ইশারায় পথে নামিয়ে দিতে পারি। অথচ এদের পরিবার কিন্তু এখানে স্থায়ী; তারপরেও এরা অস্থায়ী এমন একটা রটনা কিভাবে সমাজে প্রচলিত হয়েছিল তা আজ আর মনে নেই। বড়দের মুখের কথা লুফে নিতে গ্রামের অকালে পেকে যাওয়া ছেলেরা ভীষণ ওস্তাদ।



হুসেনের পোষা ঘুঘু খাঁচা ভাইঙ্গা পালাইছে- এমন একটা খবর এক ভোঁরে ছোটদের মাঝে তুমুল আলোড়ন তুলল। যেসিন ঘটনা ঘটল সেইদিন কেউ আর মক্তবের দিকে পা বাড়ানোর মত কাজ করার চিন্তাও করলাম না। সবাই মুখ ভার করে হুসেনদের বাড়ির পথে পা বাড়ালাম।এত দিনের পোষ মানা পাখি, সেও কিনা পালাইল ? আমরা তাঁর দুঃখে সমব্যাথি হয়ে আহা উহু করছি। ওই পোষা ঘুঘুটার সাথে কবে কি করেছি না করেছি সেইসব আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। সবাই মিথ্যে কথা বলছি। আসলে কেউ কোনদিন ওটার ধারে কাছেও যেতে পারিনি। সবাই সবার বানানো মিছে গল্প জেনে শুনেই সহ্য করছি। আমাদের নিজেদের মনে যেসব অব্যক্ত কথা থাকে সেসব সমাজে চালিয়ে দেয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা ডিল হল,- তুমি আমার গল্প শুনবে এবং একে সত্য বলে স্বীকৃতি দিবে। তাহলে তুমি পরে যা কিছুই বলনা কেন ,আমি স্বাক্ষী দেব যে আমি তোমার সাথে ছিলাম’ ।এভাবে সবাই সারাদিন মিথ্যে কথাই বলি। গ্রামে মিথ্যের মর্যাদা এবং প্রচলন দুটোই বেশি। বেসামাল গপ মারতে মারতে সবাই এগিয়ে যাচ্ছি। তলে তলে সবাই দারুন খুশি !! আসলে আমরা যাচ্ছি হুসেনের করুন চেহারাটা দেখতে। কেমন উচিত একটা শিক্ষা হল সেটা ইশারা ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়ে আসতে।



হুসেনের ঘু ঘু ফিরত আসছে’- বলে হুসেনের বোন পাখি চিৎকার করে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দিল। আমাদের বুকে যেন কেউ পাথর দিয়ে আঘাত করল, এইটা কিভাবে সম্ভব ? তবু খুশি খুশি ভাব ধরে ঝড়ের বেগে তাঁদের ঘরের সামনে উপস্থিত হলাম। পাখির নিউজ সত্য। তাঁদের পোষা পাখি দেখা যাচ্ছে কাঁঠাল গাছে বসে আছে। আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না যখন মনে হল পাখিটা’ র আচার আচরনে যেন কিছুটা অনিশ্চিত ভাব দেখা যাচ্ছে। কি করবে না করবে যেন সে জানে না। আমার খুব ইচ্ছে করল পাখিকে কানে কানে বলি, -চলে যা। খাঁচা থেকে যত দুরে পারিস চলে যা। এই অবাস্তব চিন্তাটার বাস্তবায়ন তখন কিংবা এখন কোন কালেও সম্ভব ছিল না। তবু আকাশ পাতাল ভেবে কোন কুল কিনারা করতে পারছিলাম না, সে কেনই দুরে চলে যাচ্ছে না ? কেন কাছাকাছি থাকতে চাইছে ? আজ পথে বেড়িয়ে ঘুঘুর দুরে চলে না যাওয়ার কারন ধরতে পেরেছি। কেউই সম্ভবত তাঁর নিজের রুটের খুব বেশি দুরে চাইলেও যেতে পারেনা। সে আসলে খাচার বাইরের জীবন খুব বেশি কিছু চিনেও না। যাবেই বা কোথায় ? যত বড় বদ্ধ খাঁচাতেই থাকুক না কেন এখানেই সে কাটিয়েছে তাঁর শৈশব, কৈশোর আর যৌবন। চাইলেও সব অস্বীকার করে ফেলা যায় না। সে হয়ত কাছাকাছি কোথাও থেকেই কিছুটা হলেও স্বাধীন থাকতে চায়।


০৫.১২.১৫ইং
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ দুপুর ১:৪০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২০


৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

দেখা হবে যুদ্ধ ফুরোলে সন্ধের মাহফিলে;
দেখা হবে ঠিক চেনা রাস্তার অচেনা-অন্ত্যমিলে।
ছড়াব আবার শস্যের দানা দেশ থেকে মহাদেশে
মানুষই জেতে, খুঁজে নেয় আলো অন্ধকারের শেষে...

তোমার গল্পে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

×