somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিদার ভারতে ৪০ কোটিরও বেশি মুসলমানরা কত নিষ্পেষিত, দলিত-মথিত তা এদেশের হিন্দু তোষণবাদীরা খবর রাখে কী?

০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ১২:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইতিহাস পাঠে জানা যায়, ত্রয়োদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মুসলমানরা অধিক হারে প্রথম পশ্চিমবঙ্গে আসেন। ক্রমান্বয়ে ইসলাম প্রসারিত হয়ে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৮৭২ সালের আদমশুমারি অনুসারে পশ্চিমবঙ্গে ৪৮ শতাংশ জনগণ ছিল মুসলমান।
পশ্চিমবঙ্গের মোট ১৭টি জেলার মুর্শিদাবাদ জেলায় বর্তমানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫৮.৬৬%)। উত্তর দিনাজপুর ও মালদহ জেলায় মুসলিম-অমুসলিম জনসংখ্যা প্রায় সমান সমান। অন্যান্য জেলায় মুসলমানের সংখ্যা কম হলেও ৪০%এর কম নয়।
পশ্চিমবঙ্গসহ গোটা ভারতেই মুসলমানদের অবস্থা খুবই করুণ। শিক্ষা ক্ষেত্রে তারা পশ্চাৎপদ এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বঞ্চিত ও অবহেলিত। পশ্চিমবঙ্গে সাধারণভাবে ৭০ শতাংশ অধিবাসী শিক্ষিত। সেখানে মুসলমানদের শিক্ষার হার মাত্র ৩০ শতাংশ। মাধ্যমিক পর্যায়ে মুসলিম ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৫ শতাংশ। কলেজ পর্যায়ে মুসলিম ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৩ শতাংশ। মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা অতি নগণ্য। মুসলমানদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত স্কুল মাত্র ১২টি। কলেজ নেই একটিও। সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের সংখ্যা খুবই কম।
ভারত গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ দাবিদার একটি দেশ। ভারতীয় শাসকচক্রের দাবি অনুসারে ভারতে অসাম্প্রদায়িক ও সেক্যুলার সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত। তাই যদি হয়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর এ করুণ অবস্থা কেন বা গোটা ভারতেই মুসলমানদের অবস্থা এত দলিত-মথিত কেন? ঈসায়ী উনিশ ও বিশ শতাব্দীতে ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা যে হারে বেড়েছে, সে হারে শিক্ষার হার বাড়েনি।
পশ্চিমবঙ্গে প্রতি বছর মেধা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ৮০০ ছাত্রছাত্রী মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়। এর মধ্যে মুসলিম ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা মাত্র ১০ জন। অপরদিকে প্রতিবছর প্রকৌশল বিভাগে ১০০০ ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়, সেখানে মুসলমান মাত্র ১২-১৫ জন, যার হার ১ শতাংশ।
মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে ইসলামিয়া কলেজ ও লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় দেশবিভাগ পূর্বকালে অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে। তখন এ কলেজ দুটি শুধু মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। বর্তমানে ইসলামিয়া কলেজ, (মাওলানা আযাদ কলেজ) ও লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে মুসলিম ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা মাত্র ১০ শতাংশ। এ নগণ্য সংখ্যক ছাত্রছাত্রীকে অন্যান্য বিষয় থেকে বঞ্চিত করে শুধু উর্দু, ফার্সি ও আরবী বিভাগে অধ্যয়নের সুযোগ দেয়া হয়।
গোটা ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে শহরাঞ্চলে গরিব মুসলমানের আনুপাতিক হার সবচেয়ে বেশি, ৩৩.৯ শতাংশ।
হিন্দু নিয়ন্ত্রিত ভারতে কমবেশি প্রায় ৪০ কোটি মুসলমানের বাস। মুসলমানরা বারবার অভিযোগ করছেন, ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ মুসলিমদের নির্দিষ্ট করে অশোভনভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। অর্থাৎ তাদেরকে অকারণে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। সরকারি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মুসলমানদের আরও অভিযোগ, তাদের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে গৎবাঁধা কতকগুলো বুলি আউড়ানো হয়ে থাকে। যুগ যুগ ধরে ভারতীয় মুসলমানরা অভিযোগ করে আসছেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তারা অবহেলিত। সমাজের সর্বস্তরে তারা বৈষম্যের শিকার এবং তাদের উপর চরম নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ভারতীয় হিন্দু এবং অন্য সংখ্যালঘু খ্রিস্টান ও শিখদের তুলনায় শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলমানদেরকে অনেক পিছিয়ে রাখা হয়েছে এবং বেকারত্বের হারও তাদের মধ্যে বেশি।
ভারতীয় মোট জনসংখ্যার ১.৫ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও শিখেরা ভারতীয় পুলিশ বাহিনীর অফিসার পদের শতকরা ১৯ ভাগ দখল করে আছে। পক্ষান্তরে সেখানে মুসলিম অফিসারের সংখ্যা এক শতাংশেরও কম।
এমনকি ভারতের প্রায় শতভাগ মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরের মুসলমানরা সরকারি চাকরিতে মারাত্মক বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। নির্দয় দমন-পীড়ন চালানোয় সংঘাতকবলিত এ রাজ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে মুসলিমের সংখ্যা ৩ শতাংশেরও কম। অথচ ভারতে সব মিলিয়ে অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদর চাকরির হার ৪ শতাংশেরও বেশি।
গোটা ভারতে সরকারি আমলাদের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা আরো অনেক কম। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কোনো মুসলিম কর্মকর্তা নেই বললেই চলে।
কতিপয় ভারতীয় বিশ্লেষক প্রায়শ বলে থাকে যে, সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের পারসেন্টেজের হার কম হওয়ার কারণ উচ্চ শিক্ষায় মুসলমানদের অনুপস্থিতি। তবে তাদের এ যুক্তি সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে সাচার কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের পর। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ভারতের মুসলমানদের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং শিক্ষাগত অবস্থার সর্বশেষ অবস্থা জানার লক্ষ্যে ২০০৫ সালে রাজেন্দার সাচার কমিটি নিয়োগ করে। দিল্লী সুপ্রীম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারক রাজেন্দার সাচারের নেতৃত্বে গঠিত এ কমিটি দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে ৪০৩ পৃষ্ঠার একটি বিশাল প্রতিবেদন তৈরি করে। এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে এর মাধ্যমে জানা যায়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতীয় মুসলমানরা মারাত্মক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এতে জানা যায়, সরকারি চাকরি, সাক্ষরতা, শিক্ষা, আয় এবং সামাজিক সক্ষমতার বিষয়ে মুসলমানরা অনেক ক্ষেত্রে নিম্নবর্ণের লোকদের চেয়েও খারাপ অবস্থায় রয়েছে।
কর্মবিনিয়োগ কেন্দ্রের দেয়া তথ্য থেকে জানা যায়, এক বছরে পশ্চিমবঙ্গে সরকারি চাকরি পেয়েছে ১৪ হাজার ৪৬৫ জন। এর মধ্যে মুসলমান খুঁজতে হয় অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে, মাত্র ৭১৭ জন। আধা-সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মুসলিমপ্রার্থী নিয়োগের কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না, তবে অভিজ্ঞতার নিরিখে বলা যায়- তার হারও অনুরূপভাবে কম।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দাবি, পুলিশে শতকরা ৯ জন মুসলিম চাকরি করছেন। কিন্তু বাস্তবে তা মেলে না।
সরকারি চাকরিতে মুসলিমরা শতকরা ৭ ভাগের কম, রেলওয়ে কর্মী হিসেবে শতকরা মাত্র ৫ ভাগ, ব্যাংকিংয়ে শতকরা ৪ ভাগ এবং ভারতের ১৩ লাখ সদস্যের সেনাবাহিনীতে মুসলিমদের সংখ্যা মাত্র ২৯ হাজার।
ধর্মনিরপক্ষে দাবিদার দেশ ভারতে মুসলমানদের প্রতি শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ বহু পুরনো। এবার সরকারি ব্যাংকগুলোতেও মুসলমানদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। আর এ অভিযোগ এনেছে খোদ ভারতের জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন!
কমিশন বলেছে, মুসলমানদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে দেয়া হচ্ছে না বলে তারা অসংখ্য অভিযোগ পেয়েছে। সরকারি ব্যাংকগুলো সম্পর্কে এই অভিযোগ ২০১১ সালের তুলনায় ২০১২ সালে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ধরনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে দক্ষিণাঞ্চলীয় অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যে। ওই রাজ্যের ৯০ হাজারেরও বেশি মুসলিম ছাত্রকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে দেয়া হয়নি।
উল্লেখ্য, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে আমাদের দেশের অতি উৎসাহীরা সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিচার বিভাগসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে সব জায়গায়ই পারলে পায়ে ধরে হিন্দুদের অধিষ্ঠিত করে। কিন্তু ওপারে ধর্মনিরপেক্ষতা দাবিদার ভারত কীভাবে মুসলমানদের বঞ্চিত, দলিত-মথিত, নিষ্পেষিত, নির্যাতিত করে রেখেছে সে খবর তারা দেখেও না দেখার, শুনেও না শোনার ভান করে। এরা মুসলমান নামের কলঙ্ক। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে- “সমগ্র মুসলিম বিশ্ব একটি দেহের ন্যায়। দেহের একপ্রান্তে আঘাত লাগলে যেমন তা গোটা দেহে সঞ্চালিত হয়, তেমনি কোনো দেশের মুসলিম আক্রান্ত হলে তা গোটা মুসলিম বিশ্বেই সঞ্চালিত হবে।” (সুবহানাল্লাহ)
সঙ্গতকারণেই ভারতে মুসলিম অবদমনের বিপরীতে বাংলাদেশকে জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। প্রতিবাদ জানাতে হবে। মুসলিম বিশ্বে জনমত গড়তে হবে। মুসলিম নির্যাতনের অবসান ঘটাতে হবে।

১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×