১.৪
বুড়োর লাইটারে সিগারেট ধরিয়ে বিজু বলে, জানো একবার এক বন্ধুর কাছে দেশলাই চাইলাম। বন্ধু গম্ভীর মুখে বললো, সিগারেট নেই, ম্যাচও নেই, শুধু অভ্যাসটা আছে!
দু'জনেই খুব মজা পেয়ে গলা খুলে হাসে। বুড়ির প্রশ্ন, কোথা থেকে আসছো তুমি?
আমি এ শহরেই থাকি, বস্টনে গিয়েছিলাম একটা কাজে।
মুচকি হেসে বুড়ো জিজ্ঞেস করে, কতোদিন ছিলে?
তিনদিন।
তিনদিনেই তুমি বস্টনের লোকদের কায়দায় বস্টন বলতে শিখে ফেলেছো দেখছি। টেক্সাসে আমরা বস্টনকে তো বস্টন বলি।
থতমত খেয়ে বিজু বুঝতে পারে, ওর অবস্থা এখন সেইসব মানুষের মতো যারা চোরকে চুর বলে, কিন্তু চোর আর চুর উচ্চারণের পার্থক্য কিছুতেই ধরতে পারে না। বুড়ো বস্টন শব্দটা নিশ্চয়ই দু'রকম করে বলেছে পার্থক্য বোঝানোর জন্যে, কিন্তু তার কানে ধরা পড়েনি। বোকার মতো হাসতে হয়।
বুড়ো আবার জিজ্ঞেস করে, তোমার দেশ কোথায়? ইন্ডিয়া?
না, বাংলাদেশ।
ওঃ ব্যাংলাডেশ, সেই জর্জ হ্যারিসনের কনসার্ট।
বিজু দেখেছে, এ দেশী অপেক্ষাকৃত কম বয়স্করা বাংলাদেশ নামের দেশটি এই পৃথিবীতে নাকি অন্য কোনো গ্রহে - জানেই না। কেউ কেউ নামও শোনেনি। একটু বয়স্করা চেনে জর্জ হ্যারিসনের কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর সুবাদে। মনে থাকারই কথা, তাদের যৌবনের উদ্দাম সময়ের ঘটনা! আজকাল যে কোনো অজুহাতেই বেনিফিট কনসার্ট করে তহবিল সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশের নামে সেই ধারণার শুরু হয়েছিলো, সে কথা ক'জন মনে রেখেছে?
বিজু বলে, হ্যাঁ। সেই বাংলাদেশ।
রাভি শ্যাঙ্কারের জ্যায় বাংলাও শুনেছি আমি।
জয় বাংলা নামে রবি শঙ্করের কোনো রেকর্ড আছে, বিজু জানতো না। জয় বাংলা শুনলে তার এক ধরনের অহংকার হয়। এ শুধু আমাদের নিজস্ব, আর কোনো দেশের মানুষের কোনো ভাগ নেই সেখানে। কী ধ্বনিময়, কাব্যিক এবং উদ্দীপক!
বিজুর যখন বোঝার বয়স হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে জয় বাংলা উধাও হয়ে গেছে ততোদিনে, কেউ আর বলে না। যারা এর উদগাতা, তারাও যে কী করে ভুলে গেলো! জয় বাংলা বলে বাঙালি যুদ্ধ করেছিলো, বীরের মতো জয় করেছিলো। তারপর সব ভুলেও গেলো। এগুলো তার শোনা কথা, গল্পের মতো।
তবু জয় বাংলা তার ভেতরে গাঁথা হয়ে আছে, প্রকাশ্যে বলতে গেলে কেউ কেউ খুব অদ্ভুত চোখে তাকায়। কোনো অশ্লীল কথা শুনলেও অনেকেই ওভাবে তাকাবে না। জয় বাংলা কি এতোটাই অশ্লীল, অস্পৃশ্য, অনুচ্চারণীয়?
এবার বুড়ো অজান্তে তার হাতে একটা লোপ্পা ক্যাচ তুলে দিয়েছে। সুযোগটা ছাড়ে না বিজু। বলে, আমরা কিন্তু রাভি শ্যাঙ্কারকে চিনি না, ওঁর নাম রবিশঙ্কর।
বুড়োর মুখ লাল হয়ে উঠতে দেখে বিজু, একটুও খারাপ লাগে না। এ দেশে এসে প্রথম প্রথম এসব নিয়ে কিছু না বলে চুপ করে থাকতো। এখন সুযোগ পাওয়ামাত্র অপমানটা ফিরিয়ে দেয়। অপমান না তো কী? ওরা আশা করবে ওদের নামধামসহ ইংরেজি সবকিছু ওদের মতো আমরা উচ্চারণ করবো, আর আমাদের নামগুলি যেমন খুশি বলার সব অধিকার ওদের!
বাংলাদেশকে বলবে ব্যাংলাডেশ। আবদুলকে অ্যাবডুল। এমন
তো নয় যে ওদের ভাষায় দ-এর উচ্চারণ নেই - ফাদার, মাদার বলতেও তো দ লাগে। বাংলাদেশ বলার সময় দ আর মুখে আসে না। যতোসব!
বরাবর যা হয়, বিজু তাই হতে দেখে আবার। বুড়োবুড়ির বাস চলে এসেছে। বিজুরটা তো সবার শেষে আসার কথা - ওর জন্মের আগেই এসব ঠিক হয়ে আছে। জানতে এবং হজম করতে তার একটু সময় লাগছে, এই যা।
আরো খানিক পরে বাসের দেখা মেলে। নীল রঙের বাসের গায়ে সাদা অক্ষরে লেখা - পার্ক অ্যান্ড ফ্লাই। বিজুর সিগারেট প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো, সুতরাং ফেলে দিতে কষ্ট হয় না। খুবই ধীরে এগিয়ে আসছে বাসটা, থামবে কি না বোঝা যাচ্ছে না। অগত্যা হাত তুললে বাস থামে। তাড়াতাড়ি উঠে এলে ড্রাইভার জানায়, বিজু ভুল জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলো, ওখানে এই বাসের থামার কথা নয়। ক'দিন আগে ওখানে বাস থামানোর কারণে এক ড্রাইভারকে জরিমানা দিতে হয়েছে।
কী আশ্চর্য! অন্যসব বাস থামার জায়গাতেই বিজু দাঁড়িয়ে ছিলো। তার বাসের জন্যে ওটা ভুল জায়গা!
বাসে আরো চার-পাঁচজন যাত্রী। খালি একটা সীটে বসতে বসতে বিজু ড্রাইভারকে জানায়, আমার জন্যে থেমেছো বলে ধন্যবাদ। ভয় পেয়ো না, কাউকে আমি বলতে যাচ্ছি না। শুধু তোমার বসকে একটু না জানালে ব্যাপারটা কিন্তু খুবই খারাপ দেখাবে!
জোরে হেসে ওঠে কৃষ্ণকায় ড্রাইভারটি, ভালো বলেছো কিন্তু!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



