somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উপন্যাস : পৌরুষ - কিস্তি ৫

০২ রা মে, ২০০৭ রাত ১২:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১.৫

মিনিট কয়েকের মধ্যে বাস ঢুকে পড়ে পার্ক অ্যান্ড ফ্লাই-এর পার্কিং লট-এ। সারি সারি গাড়ি পার্ক করা। '...চোখে পড়বে মানুষের সাধ্যমতো ঘরবাড়ি...' আল মাহমুদের কবিতার লাইন না? নাকি অন্য কারো? এ দেশে অবশ্য ব্যাপারটা সাধ্যমতো গাড়ি। গাড়ি দেখে মানুষের বিত্তের আন্দাজ মেলে, চালককেও খানিকটা চেনা যায়।

বিশ-বাইশ বছরের উদ্দাম যুবক কখনো মার্সিডিস চালাবে না, চালাবে যারা সমাজে স্থিত, আর্থিকভাবে নিশ্চিত। করভেট-এর চালক সশব্দ গতির প্রেমিক। টয়োটা করোলা নিতান্ত মধ্যবিত্তের। মার্সিডিসের গরিবি সংস্করণ লেক্সাস আরেকটু উঁচু জাতের মধ্যবিত্তের বাহন, বিএমডবি্লউ বা জাগুয়ার-এর মালিকরা আভিজাত্যের প্রতিনিধি।

দেশে ফেরিঘাটে যেমন হরেক রকমের দোকানপাট গড়ে ওঠে মানুষের দরকারের কথা মনে রেখে, এখানে এয়ারপোর্টের আশেপাশে পার্ক অ্যান্ড ফ্লাই-এর মতো ব্যবসা ফেঁদে বসে গেছে এরা। মানুষের প্রয়োজনেই উদ্ভাবিত হয় নতুন ব্যবসা। দু'চারদিনের জন্যে বা দিনে-দিনে ফেরার মতো সময়ের জন্যে বিমানযাত্রার কালে এদের জিম্মায় গাড়ি রেখে যাওয়া যায়। পয়সার হেরফেরে খোলা জায়গায় অথবা ছাদঢাকা জায়গায় গাড়ি রেখে যেতে পারো। ওরা নিজেদের বাসে নির্দিষ্ট এয়ারলাইনের টার্মিনালে পৌঁছে দেবে। বাসগুলো এয়ারপোর্টের বিভিন্ন টার্মিনালে সারাদিন টহল দিতে থাকে। ফেরার সময় বাস চিনে উঠে পড়লেই হলো, ফিরিয়ে নিয়ে আসবে নিজেদের পার্কিং লটে।

নিউ ইয়র্কের মতো ট্যাক্সিবহুল শহর নয় ডালাস, তবু ফোন করে দিলে সময়মতো পাওয়াও কঠিন নয়। কিন্তু এখানে গাড়ি রেখে গেলে খরচ পড়ে ট্যাক্সিভাড়ার তুলনায় অনেক কম। তিনদিনের জন্যে বিজুর খরচ হবে গোটা পঁচিশেক ডলার। ট্যাক্সিতে বাসা থেকে এয়ারপোর্টে যাতায়াতে পঞ্চাশ-ষাটের ওপর অনায়াসে লেগে যেতো। পঁচিশ-পঞ্চাশে বিজুর নিজের কিছু আসে-যায় না, পয়সা দেবে অফিস।

বন্ধুবান্ধব বা পরিচিত কাউকে বলা যেতো। সময়মতো এয়ারপোর্টে নামিয়ে দেবে, তুলেও নেবে ঠিক। অনেকে বউ বা বন্ধু-বান্ধবের গাড়িতে এয়ারপোর্টে যাতায়াত করলেও অফিসের কাছে ট্যাক্সিভাড়ার টাকা ঠিক ঠিক বিল করে আদায় করে নেয়। যেসব খরচের জন্যে রসিদ না থাকলেও চলে, ট্যাক্সিভাড়া বা পোর্টারের টিপস সেগুলোর মধ্যে পড়ে। এই কারণে বন্ধুদের অনুরোধ করতে ইচ্ছে করে না বিজুর। তারা ভেবে বসতে পারে, বিজু অফিসের পয়সা পকেটে ঢোকাবে। দরিদ্র দেশের মানুষ হলেও বিজুর কাছে খুব অরুচিকর লাগে এই ক্ষুদ্র অসততা।

বিজু খুব সাধুপুরুষ, এমন নয়। হাতের কাছে মিলিয়ন ডলারের দাঁও পেয়ে গেলে কী হবে বলা শক্ত, কিন্তু এরকম ছিঁচকেমিতে তার রুচি নেই। অফিসের কাজে না হয়ে ব্যক্তিগত কারণে এয়ারপোর্টে যাতায়াতের দরকার হলে অবশ্য আলাদা কথা। তবু কাউকে বলতে ভালো লাগে না বিজুর। নিজেকে দিয়েই জানে, সবারই ব্যস্ততা আছে, কাজকর্ম আছে। রানুকে বলা যেতো। যেতো কি? নাঃ, হয়তো যেতো না।

ড্রাইভারের হাতে নিজের গাড়ির হদিস লেখা কাগজখানা ধরিয়ে দিয়েছিলো বিজু। কাগজ দেখে পার্কিং লটে ওর গাড়ির সামনে বাস থামিয়ে দেয় ড্রাইভার। ব্যাগ দুটো তুলে নিয়ে দরজার কাছে আসতে ড্রাইভার বলে, হ্যাভ আ নাইস ডে।

আবার সেই নাইস ডে! দিন যেমনই যাক, ধন্যবাদ দেওয়া রেওয়াজ। বিজুও দিলো।

পার্কিং লট থেকে বেরোনোর পথে একটা খুপরিমতো ঘরে জানালা খুলে বসা এক মহিলা। গাড়ি থেকে নামার দরকার নেই। গাড়ি রেখে যাওয়ার সময় পাওয়া দিন-সময়ের ছাপ মারা কার্ডটা এগিয়ে দেয় বিজু। মহিলা কমপিউটার টিপে বলে দেয়, কতো দিতে হবে। পয়সা মিটিয়ে দিলে সামনে যাওয়ার রাস্তা উন্মুক্ত হয়ে যায়।

রাস্তায় নেমে এক মিনিটের মধ্যে হাইওয়ে। 'মানুষের সাধ্যমতো ঘরবাড়ি...'। কোন কবিতার লাইন এটা? আগে-পরের লাইনগুলো মনে পড়ে না, শুধু এইটুকু মাথার ভেতরে আটকে আছে! আহ্, কতোদিন কবিতা পড়া হয় না, বিজুর মনেও নেই। মাঝে মাঝে এমন আচমকা একেকটা লাইন কোথা থেকে মাথার ভেতরে ফিরে ফিরে আসে। ক'দিন আগে মনে পড়েছিলো এরকম একটি পংক্তি, '...প্রিয়তম পাতাগুলি ঝরে যাবে, মনেও রাখবে না...'। মনে পড়ে না - কোথায় পড়েছিলো, কোন কবিতা, কার লেখা।

এবার দেশ থেকে কিছু কবিতার বই আনিয়ে নিতে হবে। ভাবতেই তার মুখে এক টুকরো হাসি ফুটে ওঠে। ওই ভাবা পর্যন্তই। এই তো গত বছর নিজে দেশে গিয়েছিলো, ইচ্ছেটা তেমন হলে তখন নিয়ে আসতে পারতো। করবো করবো করেও কতো কিছু করা হয় না, দিনযাপনের বায়না নিয়ে কেটে যায় একটিমাত্র জীবন।

গাড়ির ভেতরে সিগারেট খাওয়া একেবারে বারণ। রানু আজকাল পৃথিবীর ধূমপান নিষিদ্ধকরণ অভিযানের অগ্রসেনানীদের একজন। সুতরাং ওই বিষয়ে বিজুর ওপর যাবতীয় খবরদারির একচ্ছত্র অধিকার তার। অথচ এই রানু বুয়েটে পড়ার দিনগুলোতে বিজুর জন্যে বেনসন অ্যান্ড হেজেস-এর আস্ত প্যাকেট কিনে আনতো। সিগারেট হাতে না থাকলে নাকি ছেলেদের ঠিক পুরুষালি ভাবটা আসে না। বিয়ের পরেও কিছুদিন নিজের হাতে সিগারেট ধরিয়ে দেওয়া কী সাংঘাতিক রোম্যান্টিক ব্যাপার ছিলো রানুর কাছে!

হায়, কোথা দিয়ে যে কী হয়ে গেলো, কোথায় কোন কলকব্জা কখন বিকল হয়ে গেলো - জানাও হলো না। এখন নাকি সিগারেটের গন্ধে রানুর বমি আসে। ভাবা যায়!
১১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এই সমাজ- ৭২

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৩



দেশের সরকার অযোগ্য অদক্ষ হলে, জনগনের শান্তি থাকে না।
দেশের জনগন সারাদিন কাম কাজ করে। অফিসে নানান রকম যন্ত্রনা পোহায়। নানান জক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়। অফিসে থাকে না... ...বাকিটুকু পড়ুন

তেল গ‍্যাস অনুসন্ধান আর বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে, সুদি মহাজন আর খাম্বা/কার্ড সরকারের মিথ্যাচারের জবাব॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৮



২০০৮-২০২৪ এই ১৬ বছরকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন "chronicle of shoddy gas exploration" - মানে গ্যাস অনুসন্ধানের ধীরগতির ইতিহাস।

২০০৮-২০২৪ এর মূল চিত্র

< Between 2008 and 2024, bureaucratic interference... ...বাকিটুকু পড়ুন

মূল ইশরাত মঞ্জিল ধ্বংসের আসল খলনায়ক কে?

লিখেছেন মৌন পাঠক, ২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:১১

কথায় কথায় বামপন্থী, সেক্যুলারদের গালি দেয়া হচ্ছে ইশারাত মঞ্জিলের ইতিহাস মুছে ফেলার জন্য।

কিন্তু দালিলিক ইতিহাস হলো— ১৯৫১-৫২ সালে মূল ইশারাত মঞ্জিল বিল্ডিংয়ে কোনো হিন্দু, বামপন্থী বা আওয়ামী লীগার বুলডোজার চালায়নি!

তাহলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবননগর

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:৪১



গ্রাম দেখতে কোলাহলের বাইরে গিয়ে দেখি-
কোথাও নেই একরত্তি গ্রাম!
বিলুপ্ত হয়েছে যাবতীয় সবুজ সুন্দর;
সর্বত্র বিস্তার লাভ করেছে কংক্রিটের বন!
ভ্রমণক্লান্তিতে খুব তৃষ্ণার্ত হয়ে-
জলপানাঙ্ক্ষা জানাতেই পেলাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ নেপালের চেয়েও ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে।

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:২৬

বাংলাদেশ নেপালের চেয়েও ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে।



বাংলাদেশে যদি একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প বা বড় ধরনের নগর দুর্যোগ আঘাত হানে, তাহলে দেশটি নেপালের অভিজ্ঞতার চেয়েও বহুগুণ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×