somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উপন্যাস : পৌরুষ - কিস্তি ১৩

০৬ ই মে, ২০০৭ রাত ১২:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


৪.১

বিজু নিজে জানে, বাচ্চা ছেলেরা কোনো খেলনা চাই বলে যেরকম জেদ করে, সে নিজেও ঠিক তাই করছে। রানুর প্রেমে সে আকণ্ঠ ডুবে ছিলো, তা নয়। তবু মুখ ফুটে তোমাকে চাই বলে ফেলে সেটা গিলে ফেলতেও পারছিলো না। পিছিয়ে আসতে মনের জোর লাগে। তবু প্রত্যাখ্যানের এক ধরনের শক্তি আছে জেদ বাড়িয়ে তোলার। সময়ে তা-ও ভোঁতা হয়ে আসে।

শুধু শুধু জেদ করে, কান্নাকাটি দিয়ে খেলনা পাওয়া যাবে না বুঝে বাচ্চারাও একসময় চুপ করে যায়, মেনে নিতে শেখে। মুখে যতো বড়াই করুক, বিজুর জেদও থিতিয়ে আসছিলো।

রানুর ক্রমাগত প্রত্যাখ্যানকে আর অবজ্ঞা করা সম্ভব হয় না। সহ্য করার বদলে এক ধরনের আত্মসম্মানবোধ জেগে উঠছিলো। কী এমন রানু, আমিই বা কেন তাকে উপেক্ষা করতে পারবো না? রানুর খোঁজে তার ডিপার্টমেন্টে যাওয়া বন্ধ করে দিলে কেমন হয়? রানুর চোখ কি তখন তাকে খুঁজবে? না-থাকাই হবে আমার সবচেয়ে বড়ো থাকা!

ডিসেম্বরের শেষে এক শীতসকালে বিজু ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছে দেখে, ক্লাস হবে না, অঘোষিত ধর্মঘট। কী নিয়ে ধর্মঘট ঠিকমতো জানা যায় না। সবগুলো বিল্ডিং-এর সদর দরজায় তালা, ভেতরে যাওয়া যাবে না। সবাই ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে, কেউ কেউ খোলা মাঠে গোল হয়ে বসে গল্প করছে। বিজুর মনে হলো, ক্লাস না হলে ভালোই তো। আগে থেকে জানা থাকলে এই সাতসকালে উঠতে হতো না, লেপমুড়ি দিয়ে আরো খানিকটা বেলা পর্যন্ত ঘুমানো যেতো।

আশেপাশে তাকিয়ে বন্ধুবান্ধবদের কাউকে চোখে পড়ে না। অনির্দিষ্টভাবে হাঁটতে শুরু করেছিলো সে। উত্তরে পলাশীর দিকের গেটে পৌঁছে মনে হয়, ইউনিভার্সিটির আর্টস বিল্ডিং-এর দিকে যাওয়া যায়। লাইব্রেরির আশেপাশে কাউকে না কাউকে পাওয়া যাবেই। রিকশা নেওয়ার দরকার নেই, হেঁটে যাওয়া যায়। রাস্তা পেরোতে যাবে, এই সময় পেছন থেকে কেউ বলে, একটু শুনবেন?

মেয়েলি গলার স্বর, নাম ধরে ডাক নয়, যে কেউ যে কোনো কাউকে ডাকতেই পারে। ঘুরে না তাকিয়েও বিজু জানে, তাকেই ডাকা হচ্ছে। চিনতে ভুল হয়নি। রানু।

রাস্তা না পেরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে, ফিরেও তাকায় না। অপেক্ষা করে। রানু পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বলে, আপনাকে ডাকছি অনেকক্ষণ, শুনতে পাচ্ছেন?

রাস্তায় এতো মানুষের কে কোথায় কাকে ডাকছে, কী করে বুঝবো! আমার নাম ধরে তো ডাকতে শুনিনি। সে যাকগে, কেন ডাকছিলে তাই শুনি।

শুনেছেন তো, আজ ক্লাস হবে না।

হ্যাঁ। সেজন্যেই ভাবছিলাম আড্ডা দিতে যাই। আড্ডাখানায় কখনো ধর্মঘট হয় না।

রানু বলে, তাহলে আর আপনাকে আটকাবো না।

কী আশ্চর্য, আমার তো কারো সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমন্টে করা নেই, আড্ডায় সেটা লাগেও না। যখন খুশি যাবো, নাহলে যাবো না। তোমার কথা শুনি।

আপনার সঙ্গে কথা ছিলো।

বিজু গলায় কিছু শ্লেষ মেশায়, তাই তো বলি, দরকার না থাকলে আমাকে খুঁজে বের করবে কেন!

রানু খোঁচা হজম করে বলে, এখানেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলবো?

বিজু মনে মনে ভাবে, ও ব্বাবা, বেশ তো কথা ফুটেছে। কিন্তু হচ্ছেটা কী, তাই তো বোঝা যাচ্ছে না। মুখে বলে, কোথায় যেতে চাও?

তা জানি না।
তার মানে আমি যেখানে নিয়ে যাবো সেখানেই যাবে?

রানু হাসে, হ্যাঁ।

রাস্তা পেরিয়ে সলিমুল্লাহ হলের সামনের ফুটপাথে উঠে এসে বিজু বলে, জাহান্নামে?

ওই জায়গাটায় যাওয়ার ইচ্ছে নেই।

বিজু এবার হাসে, আমারও না। আর শুনেছি জাহান্নামের রাস্তায় এখন নাকি অনেক খোঁড়াখুঁড়ি করছে ওয়াসা আর মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন। রাস্তা বন্ধ।

রানু হাসতে হাসতে বলে, এসব কথা পান কোথায় আপনি?

স্বরচিত।

হাঁটতে হাঁটতে ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরির পেছনের লনে। বিজু দেখেছে, জায়গাটা এমনিতে খালি থাকে না, জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়েরা বসে থাকে। আজ এরকম জনশূন্য পাবে ভাবেনি। প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্যে কি সময়টা বেশি সকাল?

সঠিক জানে না, তবে বিজু অনুমান করতে পারছে রানু কী বলতে চায়। আজই হয়তো সমর্পণের সময়। নিঃশর্ত? বিজুর নিজেরও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।

এতোদিন একটা জেদের কারণে বারংবার প্রত্যাখ্যানের অপমান উপেক্ষা করতে পেরেছিলো। জিতে নেওয়ার নেশায় স্থির ছিলো বলে আর কিছুকে জরুরি মনে হয়নি। আবার গত কিছুদিনের হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো আলগা অবস্থায়ও সে পৌঁছে গিয়েছিলো, জয়ী হওয়াটা তখন আর ততো দরকারি ছিলো না।

এখন কী করবে সে? প্রত্যাখ্যানের অপমান ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তার আছে। নেবে কি? রানুকে সে অনায়াসে বলতে পারে, যে তোমাকে চেয়েছিলো, সে আর এখানে বাস করে না।
অথবা পারে সে ক্ষমা করে দিতে। নিঃশর্তে।
২৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শৈশব থেকে খেলতে খেলতে শিশুকে ইংরেজি শিক্ষা দিন। ২ বছর বয়স থেকে কীভাবে আপনার শিশুকে খেলাধুলা, আনন্দ এবং দৈনন্দিন জীবনের মাধ্যমে ইংরেজি শেখাবেন?

লিখেছেন rezaul827, ২২ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৩

অনেক অভিভাবকের ধারণা, ইংরেজিতে সাবলীল হতে হলে ছোটবেলা থেকেই কোচিং, টিউটর বা ব্যয়বহুল স্কুল প্রয়োজন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। আমি আমার সন্তানকে খেলার ছলে, স্বাভাবিক পরিবেশে এবং পরিবারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

=আল্লাহ মহান=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ১২:২২



একবার চিন্তায় ডুবাও মন?
ভেবে দেখো আরো একবার
আল্লাহ কত মহান, কত যে তাঁর দয়া;
ভুমিকম্প হলো প্রকট
তবুও বেঁচে আছি এ যাত্রায়
শোকর গুজার করেছো কী তাঁর?

ভাবনায় একবার আনো,
আল্লাহর দেয়া গজব-কত ভয়ঙ্কর
তবুও কী ভয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে মাঠে নামছে জামায়াত-এনসিপি।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ২:১৭


বাংলাদেশে এই প্রথম একটা অভাবনীয় ঘটনার সাক্ষী হচ্ছি আমরা। সরকার টেকানোর জন্য মাঠে নামছে বিরোধী দল! জ্বী, আপনি ঠিকই পড়েছেন। আগামীকাল আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। ওহ সরি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাইরে এসো

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৬

এসো, বৃত্তবদ্ধ খাঁচা ছেড়ে বাইরে এসো,
কল্পনাতীত উদাত্ত আকাশে চোখ পেতে
দুজনে বসি ঘাস গালিচাতে আজ পাশাপাশি ,
দেখ, পুস্প-ফলে বৃক্ষদের একাগ্র তপস্যা
দেখ, পূর্নিমাকে অর্থ দেয় বিপরীত অমাবশ্যা ।

দেখ, সাপ ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেসুরো গলায় গান গাওয়ার অপরাধে

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:০৯


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী মো. তাশরিক-ই-হাবিবকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে

যে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পপুলিস্ট দিক ও ন্যায়বিচারের দিক উভয়ই খেয়াল রাখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×