somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উপন্যাস : পৌরুষ - কিস্তি ১৫

০৬ ই মে, ২০০৭ রাত ১১:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


৫.

রানুর সঙ্গে তার সম্পর্কটা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে, কোথায় যাচ্ছে - এসব আর আজকাল তেমন ভাবতে ইচ্ছে করে না বিজুর। কী হবে? কোনোকিছু পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। যা হবে তার সঙ্গে নিজেকে মেলাতে হবে। শুরুতে এই যুদ্ধ-সন্ধি খেলাটা দুরূহ ও দুঃসহ মনে হতো, কিন্তু কালক্রমে সব সয়ে যায়।

বারো বছরের অনবরত লড়াইয়ের অভিজ্ঞতায় অতি নিপুণ ও অনিচ্ছুক এক সমরবিদ সে। এই যুদ্ধ, তো এই সহাবস্থানের সন্ধি। সহাবস্থান মানে কি? পরস্পরকে সহ্য করে অবস্থান করা? যতোক্ষণ না আবার টানাপোড়েন শুরু হয়ে যায়, টেনশন বাড়ে, যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে? প্রথম গোলাটি নিক্ষিপ্ত হয়? তাই হবে। তবে তাই হোক।

একটা প্রজেক্টের কিছু খুচরো কাজ নিয়ে বস্টনে যেতে হবে, খবরটা রানুকে জানিয়েছিলো অফিস থেকে ফিরে। শুনে রানু প্রস্তাব দেয়, আমি আর ফুলটুসও তোমার সঙ্গে গিয়ে ঘুরে আসতে পারি।

খুব ভালো কথা। কিন্তু আমি তো সারাদিন অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকবো, সন্ধ্যার আগে একটুও সময় হবে না। অচেনা জায়গায় তোমরা একা একা কোথায় ঘুরে বেড়াবে? সারাদিন হোটেলে বসে থাকারও কোনো মানে হয় না।

মিষ্টির বাসায় যেতে পারি আমরা। ওর সঙ্গে বেড়ানো যাবে। আর কিছু না হলে সারাদিন আড্ডা দেওয়া হবে। ওর ছেলেও ফুলটুসের বয়সী, ওদেরও ভালো সময় কাটবে।

বিজুর মনে পড়ে, রানুর এই বান্ধবীটি বস্টনেই থাকে। মাঝেমধ্যে ফোনে কথা হয়। ওদের বিয়ের পর বার দুয়েক ইস্কাটনের বাসায়ও এসেছে মিষ্টি।

বিজু একদিন ঠাট্টা করে বলেছিলো, আমার কোনোদিন ডায়াবেটিস হলে তুমি কিন্তু ভুলেও আমার কাছাকাছি আসবে না।

মিষ্টি প্রথমে ধরতে পারেনি, বিজু ব্যাখ্যা দিয়েছিলো, তখন কিন্তু ডাক্তারের কড়া নিষেধ থাকবে, তবু মিষ্টি দেখলে খেতে ইচ্ছে করবেই! নিষিদ্ধ হলেই লোভ বেশি হয় না!

রানুর আইডিয়াটা পছন্দ হয় বিজুর। সায় দিয়ে বলে, বেশ তো, তোমার অফিসে কাল কথা বলো, ছুটি পাবে কি না আমাকে জানাও। ট্রাভেল এজেন্টকে বলে একই ফ্লাইটে টিকেটের ব্যবস্থা করতে হবে।

রানুর ছুটির সমস্যা ছিলো না, কিন্তু গোলমাল হলো মিষ্টিকে নিয়ে। ননদের বিয়েতে সে ঢাকায় যাচ্ছে পরের সপ্তাহে। ব্যস, রানু দপ করে নিভে গেলো। এই ব্যাপারটাও বিজুর কাছে এক ধাঁধা, যে কোনো কিছু নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে রানু খলবলিয়ে উঠতে পারে, আবার কয়েক মিনিটের মধ্যে তেমন কোনো কারণ ছাড়া শোকসভায় যাওয়ার চেহারা বানিয়ে ফেলতেও দক্ষ সে।

বস্টন যাওয়ার উপলক্ষ আর মিষ্টির দেশে যাওয়ার সময় কাছাকাছি পড়ে গেছে, সেখানে কারো কিছু করার নেই! তাহলে?

তবু বিজু বলে, ছুটি যখন নিয়েই ফেলেছো, টিকেটটা করে ফেলি। আর এর মধ্যে খোঁজখবর করে দেখা যাক, বস্টনে চেনা কাউকে না কাউকে হয়তো পেয়েও যাবো। আমার কাজ শেষ হলে না হয় আরো দু'দিন থেকে তারপর ফিরবো।

রানুর তাতে সায় নেই, সে যাবে না ঠিক করে ফেলেছে। তার মন খারাপ থাকলো প্রায় সারাদিন। রাতে বিজু প্রস্তাব দেয়, যদি বস্টনে যাবে না ঠিক করে থাকো, তাহলে একটা কাজ করো। ছুটি তো নিয়েই ফেলেছো, ফুলটুসকে নিয়ে হিউস্টন ঘুরে আসতে পারো।

হিউস্টনে রানুর বড়ো বোন থাকে, গাড়ি নিয়ে চার-পাঁচ ঘণ্টায় দিব্যি চলে যাওয়া যায়। বিজু ভাবছিলো, ঘরে বসে ছুটি নষ্ট না করে এটা একটা বিকল্প হতে পারে। ওদেরও ভালো লাগবে, ফুলটুসও বড়ো খালামনির খুব ভক্ত।

রানু হঠাৎ ঝামটা দিয়ে বলে ওঠে, ফুলটুসের স্কুল আছে না?

হাসবে না কাঁদবে, বুঝে উঠতে খানিকটা সময় লেগে যায় বিজুর। আশ্চর্য, বস্টনে যাওয়ার কথা হচ্ছিলো, তখন ফুলটুসের স্কুলের কথা ওঠেনি! এখন হঠাৎ! 'দেয়ার আর মোর থিংস ইন হেভন্ অ্যান্ড আর্থ, হোরেশিও...।'

বস্টন যাওয়ার দু'দিন আগে সন্ধ্যায় অফিসে আটকে যায় বিজু। কয়েকদিন আগে একটা প্রজেক্ট প্ল্যান তৈরি করেছিলো। একটু আগে বস্ এসে জানিয়ে গেলো, বেশ কিছু অদলবদল করতে হবে এবং শেষ করে দিতে হবে আজই। তখন বিকেল চারটা।

বিজুর খুশি হওয়ার কারণ নেই, বস্ যেভাবে বলে দিয়েছিলো, আগে সেভাবেই সে করেছিলো। এখন শেষ মুহূর্তে এসে বলছে, বদলে দাও। অন্তত ঘণ্টা চারেক লেগে যাবে শেষ করতে। কিছু করার নেই, এর নাম চাকরি। বাসায় ফোন করে রানুকে বলেছিলো, আমার আজ ফিরতে দেরি হবে। কতো দেরি, তাও বলতে পারছি না।

রানুর ঠাণ্ডা গলার জবাব, এ আর নতুন কী!

রানু, প্লিজ, বোঝার চেষ্টা করো। ক'দিন আগের করা একটা প্রজেক্ট প্ল্যান বদলাতে হবে আজকের মধ্যে। আমাকে ধরিয়ে দিয়ে গেলো এই একটু আগে।

বেশ তো, কাজই করো। তোমাকে বাসায় আসতে হবে না।

মানে?

মানে আবার কী? তোমাকে দিয়ে তো ঘরের কোনো কাজই হবে না। সারাদিন অফিস করে ডে-কেয়ার থেকে ফুলটুসকে তুলে নিয়ে এসেছি। এখন রান্না করতে হবে, মেয়েকে গোসল করাতে হবে, খাওয়াতে হবে। এদিকে মেয়ে বাবার সঙ্গে গোসল করবে বলে জেদ ধরে বসে আছে।

বিজু আস্তে আস্তে বলে, আমি এখন তাহলে কী করতে পারি?

কিছু করতে তোমাকে, কেউ বলেনি। যেখানে আছো থাকো, যা করছো তাই করে যাও।

বিজুকে আর কিছু বলার সুযোগ দেয় না রানু, ফোন রেখে দিয়েছে সে। বিজু থম ধরে বেকুবের মতো বসে থাকে খানিকক্ষণ, তারপর উঠে বাইরে যায়। এইসব সময়ে সিগারেটের চেয়ে ভালো আর কী আছে!

সেই রাতে বিজুর ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় একটা বেজে গিয়েছিলো। রানু-ফুলটুস নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে গেছে, প্রায় নিঃশব্দে দরজা খুলে নিজের বাসায় চোরের মতো ঢুকে দেখে, বসার ঘর অন্ধকার। ঠিক অন্ধকার নয়, ঘরের আলো নেভানো, টিভি চলছে, সেই আলোতে ঘর আলো। রানু ঘুমিয়ে গেছে সোফার ওপরে। খিদে নিয়ে ফিরেছিলো বিজু, কিন্তু এখন খাবার টেবিলে বসলে সাড়া পেয়ে রানু উঠে পড়তে পারে। দু'গ্লাস পানি খেয়ে শুতে চলে গিয়েছিলো সে।

পরদিন সকালে ফুলটুসকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে বাসায় ফিরে এসে দেখে, রানু এক বাটি সিরিয়াল নিয়ে বসেছে খাবার টেবিলে। অন্যান্য দিনে বিজু একবারে তৈরি হয়ে মেয়েকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে অফিসে চলে যায়। গতকাল অনেকরাত পর্যন্ত কাজ করেছে, আজ দেরি করে যাবে। রানুর অফিস খুব দূরে নয় বলে সে আটটার মিনিট দশেক আগে বেরিয়েও ঠিক সময়মতো অফিসে পৌঁছতে পারে।

বিজু কফি মেকার চালু করে দিয়ে বাটিতে দুধ-সিরিয়াল ঢালে। টেবিলে এসে বসে। দু'জনে মুখ নিচু করে খুব মনোযোগের সঙ্গে খায়, যেন সিরিয়ালের বাটি ছাড়া দর্শনীয় আর কিছু নেই।

'নো স্মাইলস, নট আ সিঙ্গল ওয়ার্ড অ্যাট দ্য ব্রেকফাস্ট টেবল্ / ...সো মাচ দ্যাট আই ওয়ানা সে, বাট আই ফীল আনএবল্ / ...ওয়ান ম্যান ওয়ান উয়োম্যান, ওয়ান লাইফ টু লিভ টুগেদার..'
৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শৈশব থেকে খেলতে খেলতে শিশুকে ইংরেজি শিক্ষা দিন। ২ বছর বয়স থেকে কীভাবে আপনার শিশুকে খেলাধুলা, আনন্দ এবং দৈনন্দিন জীবনের মাধ্যমে ইংরেজি শেখাবেন?

লিখেছেন rezaul827, ২২ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৩

অনেক অভিভাবকের ধারণা, ইংরেজিতে সাবলীল হতে হলে ছোটবেলা থেকেই কোচিং, টিউটর বা ব্যয়বহুল স্কুল প্রয়োজন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। আমি আমার সন্তানকে খেলার ছলে, স্বাভাবিক পরিবেশে এবং পরিবারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

=আল্লাহ মহান=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ১২:২২



একবার চিন্তায় ডুবাও মন?
ভেবে দেখো আরো একবার
আল্লাহ কত মহান, কত যে তাঁর দয়া;
ভুমিকম্প হলো প্রকট
তবুও বেঁচে আছি এ যাত্রায়
শোকর গুজার করেছো কী তাঁর?

ভাবনায় একবার আনো,
আল্লাহর দেয়া গজব-কত ভয়ঙ্কর
তবুও কী ভয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে মাঠে নামছে জামায়াত-এনসিপি।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ২:১৭


বাংলাদেশে এই প্রথম একটা অভাবনীয় ঘটনার সাক্ষী হচ্ছি আমরা। সরকার টেকানোর জন্য মাঠে নামছে বিরোধী দল! জ্বী, আপনি ঠিকই পড়েছেন। আগামীকাল আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। ওহ সরি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাইরে এসো

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৬

এসো, বৃত্তবদ্ধ খাঁচা ছেড়ে বাইরে এসো,
কল্পনাতীত উদাত্ত আকাশে চোখ পেতে
দুজনে বসি ঘাস গালিচাতে আজ পাশাপাশি ,
দেখ, পুস্প-ফলে বৃক্ষদের একাগ্র তপস্যা
দেখ, পূর্নিমাকে অর্থ দেয় বিপরীত অমাবশ্যা ।

দেখ, সাপ ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেসুরো গলায় গান গাওয়ার অপরাধে

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:০৯


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী মো. তাশরিক-ই-হাবিবকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে

যে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পপুলিস্ট দিক ও ন্যায়বিচারের দিক উভয়ই খেয়াল রাখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×