somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উপন্যাস : পৌরুষ - কিস্তি ১৬

০৭ ই মে, ২০০৭ সকাল ১১:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


৬.

ফাইনাল পরীক্ষার শেষ হলে বিজু সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেলে, এবার বিয়েটা সেরে ফেলা দরকার।

রানু হেসে ফেলে, তোমার যে বিয়ের এতো শখ!

আরে কী আশ্চর্য, শখ হবে কেন? এটা হলো দরকারের কথা। শখ সেটাই যা মানুষ মাঝেমধ্যেই করে থাকে। আমার এখনো একবারও বিয়ে করা হলো না।

সবাই যে বলে, বিয়ে দিল্লিকা লাড্ডু। খেলে মানুষ পস্তায়, না খেলেও নাকি পস্তায়।

তাহলে খাওয়াটাই লাভ, কী বলো? চলো খেয়ে দেখা যাক।

দু'বাড়িতেই কমবেশি জানাজানি হয়ে গেছে ততোদিনে। রানুকে একদিন বাসায় নিয়ে গিয়ে মা-র সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলো বিজু। পরে মাকে জিজ্ঞেস করেছিলো, কেমন দেখলে মা? তোমার ছেলের বউ হলে কেমন হয়?

মা-র সঙ্গে বিজুর হাসি-ঠাট্টাও চলে। মা বলেছিলো, বাঁদরের গলায় মুক্তার মালা হয়ে যাবে না তো?

আজকালকার বাঁদররা মুক্তার কদর জানে মা।

বিয়ের আনুষ্ঠানিক কথা পাড়ার একটা ব্যাপার থাকে, সেটা সামলাবে কে? বিজুকে নিয়ে রানু যায় ধানমণ্ডিতে বোনের বাসায়। দুপুরে খাবার টেবিলে বসে বোন-দুলাভাইকে সব বৃত্তান্ত খুলে বলা হলো। দুলাভাই খুব গম্ভীর মুখে জানায়, আমার কিন্তু একদম মত নেই।

থতমত খেয়ে যায় রানু। দুলাভাইয়ের ওপর অনেক ভরসা তার, সেই কারণেই আসা। রানু বলে, মানে?

একটিমাত্র শ্যালিকার দখল কোন দুলাভাই ছাড়তে চায়? যে চায় সে মহা আহাম্মক। এতোদিন ধরে আশা করে আছি, শ্যালিকাসুন্দরীর মন একদিন না একদিন গলবেই। এখন সে আশাও গেলো বলে।

একচোট হাসাহাসির পর রানু বলে, তোমার সঙ্গে আমার প্রেম তো জন্ম-জন্মান্তরের। তাই বলে বোনের অফিসিয়াল সতীন তো আর হতে পারি না।

সেখানেই তো কথা। আমার যদি সত্যি সত্যি আরেকটা বিয়ে করতে ইচ্ছে করে তাহলে কী হবে, বল তো? কোথাকার কে এসে তোর বোনের সতীন হয়ে বসবে। তার চেয়ে তুই রাজি হয়ে গেলে সবদিক থেকে ভালো হতো। দুই বোনে মিলেমিশে থাকতিস। ঝগড়াঝাটি চুলোচুলি হলেও ঘরের কথা ঘরেই থাকতো। কতো সুবিধা, বল তো!

আপা বলে উঠেছিলো, আহা, শখ কতো!

রানু বলে, তোমার সঙ্গে প্রেম বিয়ের পরেও চলতে পারে, দুলাভাই।

তখন কি আর তুই আমকে পাত্তা দিবি?

তুমি এমন আনাড়ি, তা জানতাম না। তখন হবে পরকীয়া প্রেম। জানো না, পরকীয়া প্রেম সবচেয়ে মিষ্টি!

রানুর দুলাভাই উদ্যোগী মানুষ বোঝা গেলো। সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে দেখাদেখি, কথাবার্তা সব শেষ। কোনো পক্ষ থেকেই আপত্তি ওঠেনি, কারণও কিছু ছিলো না।

বিয়ের রাতে রানুর প্রথম কথা, আমাকে তুমি বিয়ে করলে কেন?

আমাকে কতোবার ফিরিয়ে দিয়েছিলে মনে আছে, এখন যাবে কোথায় জাতীয় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো বিজু, তার আগেই বোমা ফাটিয়েছে রানু। ওই একবারই অবশ্য, কিন্তু তার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি কোনোভাবে।

বিয়েতে ছেলেকে নিয়ে ভাই-ভাবী এসেছিলো। বউভাতের পরদিন বড়ো ভাই বিজুর হাতে দু'খানা প্লেনের টিকেট ধরিয়ে দিয়ে বলে, যা, দু'জনে মিলে ঘুরে আয়। সিঙ্গাপুরের টিকেট। ভাইয়ের পরামর্শমতো সিঙ্গাপুরে দু'দিন থেকে মালয়েশিয়ার দেসারু বলে একটা সমুদ্রসৈকতে চলে গিয়েছিলো। সিঙ্গাপুর থেকে গাড়িতে ঘণ্টা দেড়েক।

কী যে সুন্দর জায়গা দেসারু। বিজু-রানুর মুগ্ধতার শেষ ছিলো না। জায়গাটা এখনো ট্যুরিস্ট স্পটের মতো করে তৈরি হয়ে ওঠেনি। ভ্রমণকারীদের জন্যে থাকা-টাকার ব্যবস্থা আছে, কিন্তু বড়ো হোটেল-শপিং সেন্টার এসব নিয়ে হৈ হৈ করা বাণিজ্যিক রিসর্ট হয়ে ওঠেনি। অনেকখানি প্রাকৃতিক, যেন ইচ্ছে করেই এভাবে ফেলে রাখা হয়েছে। সমুদ্রের পানি এতো স্বচ্ছ যে, কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়েও পায়ের পাতা স্পষ্ট দেখা যায়।

বিজু মনে মনে বলে, এই জায়গাটা যেন চিরদিন এরকম থাকে। দেসারুর কথা বেশি লোকের জানার দরকার নেই। জানলে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়বে, সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে। এটা তার নিজস্ব ভ্রমণবিলাস হয়ে থাক, এখানে বারবার ফিরে আসবে সে।

খুব নামকরা নয়, এরকম অপ্রচলিত জায়গাই বেড়ানোর জন্যে বিজুর বরাবর পছন্দ। দেসারুতে দুই কামরার একটা কটেজে উঠেছিলো। বাসনকোসনসহ কিচেন আছে, রান্নাবান্না ইচ্ছে করলে করা যায়। মধুচন্দ্রিমায় কেউ রান্না করে সময় নষ্ট করে?

খাওয়ার জন্যে আধমাইল হেঁটে যেতে হয় রেস্টুরেন্টে। সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে ঘন গাছগাছালির ছায়াঢাকা রাস্তায় হাঁটতেও ভালো লাগে। বিকেলে সমুদ্রস্নান, সন্ধ্যায় সমুদ্রের পাড়ে খালিপায়ে হাঁটাহাঁটি। এখানে নিজেদের নাম-পরিচয় মনে না রাখলেও চলে।

ইস্কাটনের বাড়িতে নতুন সংসার শুরু হয়েছিলো। বিয়ের পরপরই বাবা-মাকে একদম একা ফেলে আলাদা বাসায় যেতে চায়নি বিজু, বড়ো ভাই আগেই দেশান্তরী। ধীরেসুস্থে একটু গুছিয়ে নিজেদের আসতানায় যাওয়ার ইচ্ছে। রানুর আপত্তি ছিলো না।

কর্মজীবন শুরু না করলে নাকি পুরুষমানুষ হয়ে ওঠা সম্পূর্ণ হয় না। চাকরিটা বিজু বেশ উপভোগ করতে শুরু করেছিলো। অফিসে এক ধরনের পরিবেশ, যার সঙ্গে আগে কখনো পরিচয় ছিলো না। আগে কখনো কখনো কোনো অফিসে গেছে কোনো কাজে, কিন্তু নিজে সে অফিসের কেউ ছিলো না, ছিলো শুধু অতিথি বা কারো সাক্ষাতপ্রার্থী। এখন তার নিজের অফিস, নিজস্ব বসার জায়গা, নিজের চেয়ার-টেবিল। নির্দিষ্ট কাজের দায়িত্ব, সে কাজ সময়মতো সম্পন্ন করার শর্ত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার পরিতৃপ্তি একটি সফল যৌনসঙ্গমের চেয়ে কম নয়।

দিনের শেষে নির্ভার হয়ে ঘরে ফেরা, অপেক্ষমান একটি সুন্দর মুখের মুখোমুখি হওয়া। শুধু সাতসকালে উঠে তৈরি হওয়াটাই যা কষ্টের। মনে হতো, সদ্যবিবাহিতদের দেরি করে অফিসে যাওয়ার অধিকার থাকা উচিত। তার হাতে কোনোদিন ক্ষমতা এলে এই নিয়ম সে চালু করে দেবে।

যারা অফিসের সময় ঠিক করে, তারা সবাই নিশ্চয়ই চিরকুমার নয়, তারা নিজেরাও সদ্যবিবাহিত ছিলো কোনোদিন। তবু বোঝে না কেন? ভুলে গেছে? নাকি খুবই অসুখী দাম্পত্য ছিলো তাদের? বউয়ের কাছ থেকে দূরে থাকাতেই আনন্দ?

বিজুর অবশ্য বউয়ের কাছাকাছি থাকতেই ভালো লাগছিলো। আমাকে তুমি বিয়ে করলে কেন প্রশ্নটা কাঁটার মতো তবু ফুটছিলো থেকে থেকে। জিজ্ঞেস করবে করবে ভেবেও করা হয়নি। মুখে আটকায়। ওই প্রশ্নের সঙ্গে মেলানো যায়, এমন কোনোকিছুর কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি।

একসময় বিজুর নিজের সন্দেহ হতে থাকে, রানু কি সত্যি সত্যি বলেছিলো? যদি না-ই বলে থাকে, কথাটা সে পেলো কোথায়? কোনো একটা ঘটনা আদৌ কখনো ঘটেনি, তবু তাকে সত্যি বলে ভ্রম হতে পারে। এটা সেরকম কিছু?
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মে, ২০০৭ সকাল ১১:২৫
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শৈশব থেকে খেলতে খেলতে শিশুকে ইংরেজি শিক্ষা দিন। ২ বছর বয়স থেকে কীভাবে আপনার শিশুকে খেলাধুলা, আনন্দ এবং দৈনন্দিন জীবনের মাধ্যমে ইংরেজি শেখাবেন?

লিখেছেন rezaul827, ২২ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৩

অনেক অভিভাবকের ধারণা, ইংরেজিতে সাবলীল হতে হলে ছোটবেলা থেকেই কোচিং, টিউটর বা ব্যয়বহুল স্কুল প্রয়োজন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। আমি আমার সন্তানকে খেলার ছলে, স্বাভাবিক পরিবেশে এবং পরিবারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

=আল্লাহ মহান=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ১২:২২



একবার চিন্তায় ডুবাও মন?
ভেবে দেখো আরো একবার
আল্লাহ কত মহান, কত যে তাঁর দয়া;
ভুমিকম্প হলো প্রকট
তবুও বেঁচে আছি এ যাত্রায়
শোকর গুজার করেছো কী তাঁর?

ভাবনায় একবার আনো,
আল্লাহর দেয়া গজব-কত ভয়ঙ্কর
তবুও কী ভয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে মাঠে নামছে জামায়াত-এনসিপি।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ২:১৭


বাংলাদেশে এই প্রথম একটা অভাবনীয় ঘটনার সাক্ষী হচ্ছি আমরা। সরকার টেকানোর জন্য মাঠে নামছে বিরোধী দল! জ্বী, আপনি ঠিকই পড়েছেন। আগামীকাল আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। ওহ সরি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাইরে এসো

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৬

এসো, বৃত্তবদ্ধ খাঁচা ছেড়ে বাইরে এসো,
কল্পনাতীত উদাত্ত আকাশে চোখ পেতে
দুজনে বসি ঘাস গালিচাতে আজ পাশাপাশি ,
দেখ, পুস্প-ফলে বৃক্ষদের একাগ্র তপস্যা
দেখ, পূর্নিমাকে অর্থ দেয় বিপরীত অমাবশ্যা ।

দেখ, সাপ ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেসুরো গলায় গান গাওয়ার অপরাধে

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:০৯


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী মো. তাশরিক-ই-হাবিবকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে

যে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পপুলিস্ট দিক ও ন্যায়বিচারের দিক উভয়ই খেয়াল রাখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×