৯.
ধূমপায়ীরা সাধারণত আহারের পরের সিগারেটটি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করে। ব্যতিক্রম দেখেছে বিজু বাবাকে। খাওয়ার পরে বাবা সিগারেট ধরানোর জন্যে অপেক্ষা করতো প্রায় আধঘণ্টা। তার আগে চাই মিষ্টান্ন। ঘরে তৈরি পায়েস হোক বা দই, কিংবা দোকানের রসগোল্লা-সন্দেশ। একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত একই নিয়ম ছিলো। বিজু মিষ্টি খেতে একেবারেই পছন্দ করে না, তার পছন্দ খুব ঝাল।
বিজু প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে লাইটার হাতে নেয়। বসার ঘরের টিভির পাশে কাচের স্লাইডিং ডোর, দরজায় লম্বালম্বি ব্লাইন্ড। ঝোলানো সরু রশি টেনে পর্দা সরিয়ে দেওয়ার মতো ব্লাইন্ড খানিকটা সরিয়ে ভারী স্লাইডিং দরজা ঠেলে বাইরের বারান্দায় এসে দরজাটা বন্ধ করে দেয়।
এ দেশে এই বারান্দার নাম প্যাটিও। বুকসমান উঁচু করে কাঠ দিয়ে ঘেরা, ওপরে ছাদ। বারান্দায় আলো জ্বালানো হয়নি, দরকার হয় না। কাচের দরজা দিয়ে বসার ঘরের আলো খানিকটা আসে। বাইরে একটু দূরে রাস্তার আলো। প্যাটিওর একপাশে গোটাকতক চেয়ার আর একটা গোলাকার টেবিল। প্লাস্টিকের, রোদবৃষ্টিতে এগুলোর কিছু হয় না। অন্য পাশে বারবিকিউ গ্রিল, ফুলটুসের ট্রাইসাইকেল, রাজ্যের বাতিল হয়ে যাওয়া খেলনা।
আর আছে রানুর শখের ছোটোবড়ো নানা আকারের টবে লাগানো প্ল্যান্ট। কোনো কোনোটা আবার শীত সহ্য করতে পারে না, তখন টেনে ঘরের ভেতরে ঢুকিয়ে রাখতে হয়। এই প্ল্যান্টগুলো নিয়ে রানু একটু মনে হয় বাড়াবাড়িই করে।
একসময় এমন হলো, প্যাটিও আর বসার ঘর প্রায় পুরোটা প্ল্যান্টে আর টবে সয়লাব। পা ফেলারও জায়গা হয় না। বসার ঘরে টিভির ওপরে, সোফার ফাঁকে-ফোকরে, দেয়ালের ধার ঘেঁষে, এমনকী স্টিরিও সিস্টেমের দুই স্পীকারের ওপরেও দুটো টব বসে গেলো।
এক ছুটির দিনে দুপুরে রানু লিভিং রুমে বসে টিভি দেখছিলো। বিজুকে ঘুরঘুর করতে দেখে আদুরে গলায় বলে, আমার পাশে এসে একটু বসো না!
দাঁড়াও, আমার একটা ইমেল পাঠাতে হবে এক্ষুণি।
একটু পরেই না হয় করলে।
বিজু গম্ভীর মুখ করে রানুকে বলে, আমি লিভিং রুমে আজকাল কেন বেশিক্ষণ বসি না জানো?
রানু প্রশ্নটার মাথামুণ্ডু বুঝতে না পেরে চোখে জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকায়। বিজু ঠাট্টা করছে কি না বোঝার চেষ্টা করে বোধহয়। বলে, না তো। কেন?
বিজু বলে, কিছুক্ষণ এ জায়গায় বসে থাকলে তুমি একটা টব এনে আমার মাথার ওপরে বসিয়ে দেবে, এই ভয়ে!
খুবই নির্দোষ, নিষ্কণ্টক হাসাহাসি হয়েছিলো খানিকক্ষণ।
ইঙ্গিতটা রানু বুঝেছিলো। পরের উইকএন্ডে কিছু টব বসার ঘর থেকে বিদায় হলো। তবু এখনো নেহাত কম নেই। সকালে উঠেই রানু প্রথম প্ল্যান্টগুলোকে পানি খাওয়ায়।
বিজুর হঠাৎ মনে হয়, আচ্ছা প্ল্যান্ট শব্দটার বাংলা কী? গাছ বললে খুবই অবিচার করা হয়। গাছ বললে একটা শক্তপোক্ত ব্যপার মনে আসে। লতা? লতা নিজে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, কোনোকিছুকে আশ্রয় করে লতিয়ে ওঠে। সব মিলিয়ে লতা জিনিসটার ভেতরে বেশ একটা কোমল নরম-সরম মেয়েলি ব্যাপার আছে। কিন্তু এগুলো টবে দিব্যি নিজের শক্তিতে দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো মেয়েলি নয়? মানিপ্ল্যান্ট আবার লতাই। প্ল্যান্ট তাহলে দু’রকমেরই হতে পারে, লতা আবার শুধুই মেয়েলি।
বারান্দার পাশে তরুণ বয়সী একটা গাছ বেড়ে উঠছে। কী গাছ, কে জানে! বিজু গাছপালা তেমন চেনে না। আম-কাঁঠালের গাছ চেনে। পাইন-ইউক্যালিপটাস না চেনার কোনো কারণ নেই। আর চেনে বটগাছ। ‘বটবৃক্ষের ছায়া যেমন রে...।’ বটবৃক্ষ না বললে ঠিক মানায় না, বটগাছ বললে তার বিশাল বিস্তৃতি বোঝা যায় না।
কোনো কোনো জিনিসকে অনেক সময় চলতি নামে বললে বেড় পাওয়া কঠিন হয়। একবার নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখতে যাওয়া হয়েছিলো। ফুলটুস তখনো পানিকে মাম বলে। যে কোনো বিখ্যাত ও দর্শনীয় জায়গায় যাওয়ার ব্যাপারে বিজুর এক ধরনের বিরাগ আছে, পরে মনে হবে কী হতো না দেখলে? জলপ্রপাত কখনো দেখা ছিলো না। আগ্রহও খুব একটা ছিলো না - অনেক উঁচু একটা জায়গা থেকে নিচে সশব্দে পানি পড়ছে, এই তো, এর মধ্যে আর দেখার কী হলো!
কিন্তু নায়াগ্রার প্রপাতের সামনে দাঁড়িয়ে মুগ্ধতা গোপন রাখা অসম্ভব। কী অবিশ্বাস্য, বিশাল ও আশ্চর্য সেই সুন্দর! এ জিনিসকে তো মাম বা পানি বা জল বললে যথেষ্ট মনে হচ্ছে না। জলরাশি বললেও হালকা লাগে। জলধি বরং খানিকটা মানায়, কিন্তু অভিধানে তার অন্য অর্থ লেখা আছে।
সিগারেট ধরিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসে বিজু। রানু আসবে নাকি? একসময় রাতের খাওয়ার পরে দু’কাপ চা নিয়ে দু’জনে এসে বসা হতো আধো অন্ধকার প্যাটিওতে। শীতের সময় অবশ্য বাইরে বসা যায় না, তখন বসার ঘরে। খুব শীতে চায়ের বদলে কফি, ঠাণ্ডায় কফিটা জমে ভালো।
বিজু আজকাল চা-কফিতে দুধ-চিনি কোনোটাই নেয় না। প্রথমে দুধ ছেড়েছে, তারপরে চিনি। প্রথম প্রথম বিস্বাদ লাগতো, এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। রানুর সঙ্গে সম্পর্কের মতোই? একটা-দুটো করে মধুর-সুন্দর ব্যাপারগুলো ঝরে যেতে শুরু করেছে। যতো অনিচ্ছায় হোক, হয়েছে তো।
চূড়ান্ত সিনিকের মতো কখনো কখনো বিজু ভাবে, এই ভালোবাসাবাসি আসলে চুইংগামের মতো - প্রথম প্রথম ভারি মিষ্টি, তারপর একসময় স্বাদ চলে যেতে থাকে, চলে যায়ও, যেহেতু নিয়তিই চলে যাওয়া, তখন শুধু অভ্যাসবশে চিবিয়ে যাও যতোক্ষণ না ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার সুযোগ ঘটছে!
ঘাড় ঘুরিয়ে বসার ঘরে তাকায় বিজু, রানুকে দেখা যায় না। হয়তো রান্নাঘরে কিছু একটা করছে। চা বানাতে গেছে? বিজু সিগারেটে মন দেয়। শেষ হওয়ার পরও খানিকক্ষণ বসে থাকে। তখনো আশা থাকে, যদি রানু আসে চা নিয়ে। আসে না, আসবে তার কোনো লক্ষণও নেই। উঠে পড়ে বিজু।
শরৎকালের শুরু থেকে সন্ধ্যার পরে একটু শীত শীত করে, শেষরাতে ঘুমের মধ্যে কম্বল খুঁজতে হয়। বাংলাদেশের মতো এদের শরৎ-হেমন্ত ঋতু আলাদা করা নেই, একত্রিত হয়ে গেছে ফল নামে। স্কুলে পড়ার সময় শরৎকালের ইংরেজি অটাম শিখেছিলো। এ দেশে এসে শিখলো, ফল। ফল-এর একটা অর্থ তো হয় পতন। প্রেমে নিপতিত হলে ফলিং ইন লাভ। প্রেমের অন্তর্ধানও তো এক রকমের পতন, তখন কী বলা হবে? ফল ফ্রম গ্রেস? স্বর্গ হইতে বিদায়?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




