১৪.২
গাড়ি কেনা হলো। পুরনো। বিজু গাড়ি চালাতে শিখেছিলো দেশে থাকতে খানিকটা শখের বশে, বাবার অফিসের গাড়ির ড্রাইভার শিখিয়েছিলো আগ্রহ করে। লাইসেন্স পেতে অসুবিধা হয় না। এখন বিজু রানুকে ক্লাসে আনা-নেওয়া করতে পারে। গাড়ি কিনতে হাতের টাকাপয়সায় টান পড়ে। দেশ থেকে আনা টাকায় আর বড়োজোর মাস দু’তিনেক চলতে পারে।
রানুর স্কলারশীপের টাকার পরিমাণ প্রথমে অনেক মনে হলেও এখন বোঝা যায়, দু’জনের সংসার চালানোর জন্যে খুব একটা কিছু নয়। মোটামুটি চালানো হয়তো সম্ভব ছিলো যদি না নতুন পাতা সংসারে আজ এটা কাল ওটার দরকার হতো। সংসারে যে এতোকিছু লাগে, আগে কে জানতো!
রোজগারের ধান্দায় বিজুকে নেমে পড়তে হয়। বুয়েট পাশ করা ইঞ্জিনিয়ার বলে এখানে কেউ পাত্তা দেবে না তাকে, বুঝে ফেলতে সময় লাগে না। আর সে ধরনের কাজকর্ম খোঁজার কৌশল তার জানতে-বুঝতে সময় লাগবে আরো।
ফাস্ট ফুড রেস্টুরেন্টের কাজ সবচেয়ে সহজলভ্য, যার জন্যে বুয়েটের বিদ্যা তুলে রাখতে হয়। ফ্রিজার থেকে বের করা বরফ-জমাট মাংসের প্যাটি গ্রিলে ভেজে মেয়োনেজ-মাস্টার্ড-লেটুস-টমেটো-চীজ দিয়ে বারগার বানানো, টগবগে গরম তেলে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
কাজে ঢুকে আরেক নতুন ঝামেলা, তার কাজ আর রানুর ক্লাসের সময় মেলে না। কয়েকমাস পয়সা জমিয়ে আরেকটা গাড়ি। তারপর রানুকে ড্রাইভিং শেখাও, লাইসেন্স করাতে নিয়ে যাও। ক্রমে রানু নিজে ক্লাসে যাওয়া-আসা করতেও শেখে।
একটা-দুটো করে ঘরের ফার্নিচার বাড়ে, পুরনোর বদলে নতুন আসতে থাকে। ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে আর সব জিনিসপত্র। কিছু শখের, কিছু প্রয়োজনের। প্রয়োজন তৈরি করতে মনুষ্য প্রজাতির তুলনা হয় না। আরো প্রতিভাবান এ দেশের বিজ্ঞাপনের মানুষগুলো। কী করে যে কোনো তুচ্ছ জিনিসকেও যে তারা দরকারি জিনিস ভাবিয়ে ছাড়ে! টিভির বিজ্ঞাপন দেখলে মনে হবে, এই জিনিস এক্ষুণি না হলে চলছে না।
কেনা আর শেষ হয় না, শুধু কিনে যাও। আরো কিনতে আরো পয়সা চাই, সুতরাং রোজগার বাড়াও। রানুর ক্লাসে যাতায়াতের চিন্তা নেই, সুতরাং আরেকটা কাজ নিয়ে ফেলো। বিজুর দ্বিতীয় কাজের ব্যবস্থাও হয়ে যায়, গ্যাস স্টেশনে।
বাইরে গাড়ির গ্যাসোলিনের পাম্প, ভেতরে ক্যান্ডি-সিগারেট-কোক-কফিসহ রাজ্যের জিনিসপত্রের পসরা। চব্বিশ ঘণ্টা খোলা কনভেনিয়েন্স স্টোর। বিজুর কাজ রাত দশটা থেকে সকাল ছ’টা। রাতে খদ্দের কম থাকে, ব্যস্ততাও কম। কবরখানার স্তব্ধতা বা স্থবিরতা ঠিক নেই, তবু এর নাম গ্রেভইয়ার্ড শিফট।
বসে থাকার জো নেই, কাজের ফর্দ করে দেওয়া আছে - ভেতরের এবং বাইরের সবকিছু ঝকঝকে তকতকে করে রাখতে হবে, সবগুলো গারবেজ ক্যান খালি করে গারবেজ ফেলো, শেলফের জিনিসপত্রগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে রাখো, বাথরুম পরিষ্কার করো।
রাতজাগা কোনো সমস্যা নয়, শারীরিক পরিশ্রমও না, তবু এক ধরনের গ্লানিতে মন ভরে যায় এই কাজ করতে। ঝাড়পোঁছ করতে করতে বিজুর মনে হয়, আমি এখানে কেন, কী করছি? বাথরুমের কমোড-ফ্লোর পরিষ্কার করার সময় কান্না পেয়ে যায়। এই কাজের জন্যে সে পৃথিবীতে এসেছিলো!
দুটো কাজ নিয়ে টাকাপয়সার সংকট কাটে। কিন্তু রানুর সঙ্গে দেখা হয় কখন? বিজুর দিন শুরু হয় রাতের কাজ থেকে ফিরে, তখন রানু তৈরি হচ্ছে ক্লাসে যাওয়ার জন্যে। ঘণ্টাতিনেক ঘুমিয়ে নিয়ে ফাস্ট ফুডের কাজে যায় বিজু। সন্ধ্যায় ফিরে এলে তখন রানু রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত। বিজু হতক্লান্ত শরীরে কিঞ্চিৎ বেড়াল-ঘুমের পর গোসল এবং খাওয়া সেরে নেয়, তারপর আবার গ্রেভইয়ার্ড শিফটের শুরু।
সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া কোথায় ভালোবাসিবার আর মরিবার অবসর! ভালো করে কেউ কারো চেহারাও দেখে না। দাঁতে দাঁত চেপে বিজু নিজেকে সচল রাখে - এ জীবন দোয়েলের ফড়িং-এর তো নয়ই, এমনকী মানুষেরও নয়।
রানুর পড়াশোনা শেষ হওয়ামাত্র এ দেশ থেকে কেটে পড়তে হবে। রানুও আজকাল সেরকম ভাবতে শুরু করেছে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
মানুষের জীবনে নাটকীয়তাও বড়ো কম নয়। গ্রেভইয়ার্ড শিফটে কাজ করছে, এরকম এক রাতে দুটোর দিকে একজন খদ্দের একটা গ্যাস পাম্পের সামনে গাড়ি থেকে নামতে বিজু লক্ষ্য করে, লোকটা সম্ভবত ভারতীয়। গাড়িতে গ্যাস ভরা হয়ে গেলে লোকটা ভেতরে আসে, বয়স চল্লিশ-বিয়াল্লিশ আন্দাজ হয়। গাড়ি এবং পোশাক-আশাক দেখে মনে হয়, ভালো কাজকর্ম করে।
গ্যাসের দাম দিয়ে বিজুকে জিজ্ঞেস করে, দেশ কোথায়?
বিজু উত্তর দিতে লোকটা পরিষ্কার বাংলায় বলে, আরে দেশী!
লোকটার তাড়া নেই মনে হয়, দিব্যি গল্প জুড়ে দেয়। কফি নিতে গেলে বিজু বলে, দাঁড়ান, কফিটা পুরনো হয়ে গেছে। টাটকা বানিয়ে দিই।
কফি মেশিন চালু করে দিয়ে পরিচয় বিনিময় হয়। ভদ্রলোকের নাম আসাদউল্লাহ কবির, এ দেশে আছে প্রায় বিশ বছর। এসেছিলো পড়াশোনা করতে, শেষ করে এখানেই থেকে গেছে। বিয়ে করেছে এ দেশীয় এক শ্বেতাঙ্গিনীকে। দু’জনে মিলে একটা ব্যবসা চালায়। দুই ছেলেমেয়ে কলেজে পড়াশোনা করে।
বিজু বুয়েট থেকে পাশ করেছে শুনে বলে, এখানে আপনি কী করছেন?
বিজু সংক্ষেপে তার কাহিনী বিবৃত করে বলে, বউয়ের পড়াশোনা শেষ হলেই দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে।
কফি তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। দুধ-চিনি মিশিয়ে কফিতে চুমুক দিয়ে আসাদউল্লাহ বলে, গুড লাক। ইচ্ছেটা মহৎ, স্বীকার করছি। কিন্তু আপনার যাওয়া হচ্ছে না, তা আমি এক্ষুণি সাদা কাগজে লিখে দিতে পারি।
বিজু হাসে, কেন?
শতকরা নিরানব্বুই জন ফিরে যাওয়ার বাসনা নিয়ে এ দেশে আসে। ফিরতে পারে সম্ভবত শতকরা এক-দুই ভাগ। দেখতেই পাচ্ছেন, আমিও ওই মেজরিটির দলে।
আমি খুব চেষ্টা করবো মাইনরিটি হতে।
বলেইছি তো, গুড লাক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




