১৪.৩
আসাদউল্লাহ পকেট থেকে একটা বিজনেস কার্ড বের করে দিয়ে বলে, যদি সত্যি সত্যি দেশে ফিরে যেতে পারেন, আমাকে ফোন করে জানিয়ে যাবেন।
বিজু ভাবে, অদ্ভুত মানুষ তো! কার্ডটা এক নজর দেখে বলে, তাহলে বছর দুয়েকের মধ্যে আমার একটা ফোন আপনি আশা করতে পারেন।
আসাদউল্লাহর যাওয়ার কোনো তাড়া ছিলো না মনে হয়। বলে, আপনি আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামটা দেখেছেন লক্ষ্য করে?
বিজু সামান্য লজ্জা পায়, তার অমনোযোগ ভদ্রলোক ঠিক ধরে ফেলেছে। কার্ডটা চোখের সামনে তুলে ধরে দেখে, এ কে ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস। অর্থাৎ আসাদুল্লাহ কবির ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস। ভদ্রলোক কোম্পানির প্রেসিডেন্ট।
বিজু জিজ্ঞেস করে, কী ধরনের কাজ করেন আপনারা?
আসাদুল্লাহ বলে, আমি নিজেও আপনার মতো ইঞ্জিনিয়ার, তবে মেকানিক্যালের। এখানে কয়েক বছর চাকরি করার পর ব্যবসা শুরু করি। প্রথমদিকে মেকানিক্যাল ড্রাফটিং-এর কাজ বেশি করতাম। এখন ইলেকট্রিক্যাল, এনভায়রনমেনটাল, ইলেকট্রনিকস-এর ডিজাইন, ড্রাফটিং, মডিফিকেশন, প্রসেস অটোমশেন সব ধরনের কাজই করি। একটা মেশিন শপও আছে, পার্টস-অ্যাসেম্বলি-প্রোটোটাইপ বানাই।
কফিতে আরেকটা চুমুক দিয়ে আসাদুল্লাহ বলে, আপনাকে কার্ড দিয়েছি দু’বছর পরে ফোন করার জন্যে নয়। আপনার ফোন চাই দিন দুয়েকের মধ্যে। অফিসে এলে আলাপ করে দেখা যায়, আমাকে আপনি পছন্দ করছেন কিনা বা আপনাকে আমার কোনো কাজে লাগবে কি না।
এক সপ্তাহের মধ্যে বিজু এ কে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ কাজ শুরু করেছিলো। পুরোপুরি ইঞ্জিনিয়ারিং-এর চাকরি নয়, তবু তার লাইনের কাজ তো! তিনশো ডিগ্রী তাপের গ্রিলের পাশে দাঁড়িয়ে বারগার বানানো বা দুই পায়ে ঠায় দাঁড়িয়ে গ্যাস বিক্রির পয়সা গোনার চেয়ে ভালো।
চাকরিতে ঢুকে বিজুর মনে হয়, এটাও এক ধরনের ফাঁদ। এই যে একটা লাইনে ওঠার ব্যাপার ঘটলো, চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করার সুযোগ পাওয়া গেলো, এরপরে আর পিছু হটা নেই। এই নেশা তোমাকে সামনে ঠেলে নিয়ে যেতে থাকবে। তখন দেশে ফিরে যাওয়া কি আর ততো জরুরি মনে হবে? এই ফাঁদে তার পড়া চলবে না, কিছুতেই না। পড়লে নিজের কাছে ছোটো হয়ে থাকবে সে। আত্মবিশ্বাসের অহংকার তাহলে কোথায় থাকবে তার?
রানু অবশ্যই খুশি হয়েছিলো। আত্মীয়-পরিজনবিহীন এই শহরে দু’চারজনের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়, সামান্য ঘনিষ্ঠতাও হয়ে গেছে। তবু শেষ পর্যন্ত পরস্পরকে ছাড়া অবলম্বন আর কোথায় তাদের! এখন দিনের শেষে একত্রে বসে চা খাওয়ার সময় পাওয়া যায়, টিভির সামনে বসা হয়। দরকারি-অদরকারি, সাংসারিক ও সুইট নাথিংস বলাবলি।
তারপরেও অদূর বা সুদূর ভবিষ্যত নিয়ে জরুরি কথাগুলো উহ্য থেকে যাচ্ছিলো। আমেরিকায় স্থিত হওয়া বিষয়ে তাদের ইচ্ছে যে বিপরীতমুখী, তা দুজনেরই কমবেশি জানা। বাচ্চা-টাচ্চা নেওয়ার বিষয়ও এই মুহূর্তে খুব স্পর্শকাতর। ঢাকায় সেই রাতের পরে তারা কেউ এই নিয়ে একটা কথাও উচ্চারণ করেনি। দু’জনে খুব যত্ন করে একটা দেয়াল তুলে রেখে তার পরিচর্যা করে যাচ্ছিলো। ‘আই ফীল ইউ আর স্লিপিং আওয়ে, আই অ্যাম লুজিং ইউ।’
আসাদুল্লাহ একদিন লাঞ্চে নিয়ে যায় বিজুকে। জিজ্ঞেস করে, কাজ কেমন লাগছে আপনার?
বয়সের বিস্তর তফাৎ সত্ত্বেও আসাদুল্লাহ আপনি থেকে তুমিতে নামেনি। বিজু বলে, যা করছিলাম তার তুলনায় তো ভালোই।
একটা কথা আপনাকে স্পষ্ট করে বলি। আমি জানি, এই কাজ আপনার খুব বেশিদিন ভালো লাগবে না। আমিও চাই না আপনাকে চিরদিন আটকে রাখতে। কোথাও আপনার শুরু করাটা দরকার ছিলো, আমি সেখানে একটু হয়তো সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। ক্যারিয়ারের জন্যে আপনার এখানে কিছু কোর্স নিয়ে নেওয়া উচিত। আপনার ব্যাকগ্রাউন্ডে আপনি ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমটা নিলে ভালো করবেন বলে আমার মনে হয়। খোঁজখবর নিয়ে ভর্তি হয়ে যান, অফিসের পরে সন্ধ্যায়ও ক্লাস নিতে পারবেন।
কিন্তু আমি এ দেশে থাকতে চাই না, আপনাকে বোধহয় বলেছিলাম।
আসাদুল্লাহ হাত তুলে বিজুকে থামিয়ে দিয়ে বলে, না চাইলে থাকবেন না। কিন্তু যেটা শিখবেন, পৃথিবীর সবখানে সেটা আপনার কাজে লাগবে। আমি আপনার ক্যারিয়ারের কথা ভেবেই বলছি, নতুন কিছু একটা বিদ্যা বা স্কিল আয়ত্ত্ব করার সুযোগ ছেড়ে দেওয়ার কোনো মানে নেই।
অস্বীকার করার বা অসম্মত হওয়ার কারণ খুঁজে পায়নি বিজু। সে ভর্তি হয়েছিলো যখন রানুর এম এস শেষ হতে আর মাসকয়েক বাকি। তাতে ক্ষতি কিছু নেই, দুটো বছর দেখতে দেখতে চলে যাবে। শেষ হলে দেশে ফেরার ব্যাপারটা রানুর সঙ্গে ফয়সালা করে নিতে হবে।
পাশ করার পরপরই রানু চাকরি পেয়ে যায়। সে সময় আর্কিটেক্টদের চাকরির বাজারে বেশ মন্দা, চারদিকে ছাঁটাই হচ্ছিলো। কয়েকজন বাঙালি আর্কিটেক্টের বেকার হয়ে যাওয়ার খবরও শোনা গিয়েছিলো। সেই বাজারে কোনোরকমের অভিজ্ঞতা ছাড়া রানুর চাকরি হওয়াটা অভাবিত বটে।
বিজুর ধারণা ছিলো, চাকরির বাজারের মন্দা অবস্থাটাকে রানুর সঙ্গে দেশে ফেরার দরকষাকষির সময় ব্যবহার করা যাবে - চাকরি না পেলে এখানে থাকা যাবে কী করে! তা বোধহয় আর হলো না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




