somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

উপন্যাস : পৌরুষ - কিস্তি ৩০

১৪ ই মে, ২০০৭ সকাল ১০:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১৪.৩

আসাদউল্লাহ পকেট থেকে একটা বিজনেস কার্ড বের করে দিয়ে বলে, যদি সত্যি সত্যি দেশে ফিরে যেতে পারেন, আমাকে ফোন করে জানিয়ে যাবেন।

বিজু ভাবে, অদ্ভুত মানুষ তো! কার্ডটা এক নজর দেখে বলে, তাহলে বছর দুয়েকের মধ্যে আমার একটা ফোন আপনি আশা করতে পারেন।

আসাদউল্লাহর যাওয়ার কোনো তাড়া ছিলো না মনে হয়। বলে, আপনি আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামটা দেখেছেন লক্ষ্য করে?

বিজু সামান্য লজ্জা পায়, তার অমনোযোগ ভদ্রলোক ঠিক ধরে ফেলেছে। কার্ডটা চোখের সামনে তুলে ধরে দেখে, এ কে ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস। অর্থাৎ আসাদুল্লাহ কবির ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস। ভদ্রলোক কোম্পানির প্রেসিডেন্ট।

বিজু জিজ্ঞেস করে, কী ধরনের কাজ করেন আপনারা?

আসাদুল্লাহ বলে, আমি নিজেও আপনার মতো ইঞ্জিনিয়ার, তবে মেকানিক্যালের। এখানে কয়েক বছর চাকরি করার পর ব্যবসা শুরু করি। প্রথমদিকে মেকানিক্যাল ড্রাফটিং-এর কাজ বেশি করতাম। এখন ইলেকট্রিক্যাল, এনভায়রনমেনটাল, ইলেকট্রনিকস-এর ডিজাইন, ড্রাফটিং, মডিফিকেশন, প্রসেস অটোমশেন সব ধরনের কাজই করি। একটা মেশিন শপও আছে, পার্টস-অ্যাসেম্বলি-প্রোটোটাইপ বানাই।

কফিতে আরেকটা চুমুক দিয়ে আসাদুল্লাহ বলে, আপনাকে কার্ড দিয়েছি দু’বছর পরে ফোন করার জন্যে নয়। আপনার ফোন চাই দিন দুয়েকের মধ্যে। অফিসে এলে আলাপ করে দেখা যায়, আমাকে আপনি পছন্দ করছেন কিনা বা আপনাকে আমার কোনো কাজে লাগবে কি না।

এক সপ্তাহের মধ্যে বিজু এ কে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ কাজ শুরু করেছিলো। পুরোপুরি ইঞ্জিনিয়ারিং-এর চাকরি নয়, তবু তার লাইনের কাজ তো! তিনশো ডিগ্রী তাপের গ্রিলের পাশে দাঁড়িয়ে বারগার বানানো বা দুই পায়ে ঠায় দাঁড়িয়ে গ্যাস বিক্রির পয়সা গোনার চেয়ে ভালো।

চাকরিতে ঢুকে বিজুর মনে হয়, এটাও এক ধরনের ফাঁদ। এই যে একটা লাইনে ওঠার ব্যাপার ঘটলো, চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করার সুযোগ পাওয়া গেলো, এরপরে আর পিছু হটা নেই। এই নেশা তোমাকে সামনে ঠেলে নিয়ে যেতে থাকবে। তখন দেশে ফিরে যাওয়া কি আর ততো জরুরি মনে হবে? এই ফাঁদে তার পড়া চলবে না, কিছুতেই না। পড়লে নিজের কাছে ছোটো হয়ে থাকবে সে। আত্মবিশ্বাসের অহংকার তাহলে কোথায় থাকবে তার?

রানু অবশ্যই খুশি হয়েছিলো। আত্মীয়-পরিজনবিহীন এই শহরে দু’চারজনের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়, সামান্য ঘনিষ্ঠতাও হয়ে গেছে। তবু শেষ পর্যন্ত পরস্পরকে ছাড়া অবলম্বন আর কোথায় তাদের! এখন দিনের শেষে একত্রে বসে চা খাওয়ার সময় পাওয়া যায়, টিভির সামনে বসা হয়। দরকারি-অদরকারি, সাংসারিক ও সুইট নাথিংস বলাবলি।

তারপরেও অদূর বা সুদূর ভবিষ্যত নিয়ে জরুরি কথাগুলো উহ্য থেকে যাচ্ছিলো। আমেরিকায় স্থিত হওয়া বিষয়ে তাদের ইচ্ছে যে বিপরীতমুখী, তা দুজনেরই কমবেশি জানা। বাচ্চা-টাচ্চা নেওয়ার বিষয়ও এই মুহূর্তে খুব স্পর্শকাতর। ঢাকায় সেই রাতের পরে তারা কেউ এই নিয়ে একটা কথাও উচ্চারণ করেনি। দু’জনে খুব যত্ন করে একটা দেয়াল তুলে রেখে তার পরিচর্যা করে যাচ্ছিলো। ‘আই ফীল ইউ আর স্লিপিং আওয়ে, আই অ্যাম লুজিং ইউ।’

আসাদুল্লাহ একদিন লাঞ্চে নিয়ে যায় বিজুকে। জিজ্ঞেস করে, কাজ কেমন লাগছে আপনার?

বয়সের বিস্তর তফাৎ সত্ত্বেও আসাদুল্লাহ আপনি থেকে তুমিতে নামেনি। বিজু বলে, যা করছিলাম তার তুলনায় তো ভালোই।

একটা কথা আপনাকে স্পষ্ট করে বলি। আমি জানি, এই কাজ আপনার খুব বেশিদিন ভালো লাগবে না। আমিও চাই না আপনাকে চিরদিন আটকে রাখতে। কোথাও আপনার শুরু করাটা দরকার ছিলো, আমি সেখানে একটু হয়তো সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। ক্যারিয়ারের জন্যে আপনার এখানে কিছু কোর্স নিয়ে নেওয়া উচিত। আপনার ব্যাকগ্রাউন্ডে আপনি ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমটা নিলে ভালো করবেন বলে আমার মনে হয়। খোঁজখবর নিয়ে ভর্তি হয়ে যান, অফিসের পরে সন্ধ্যায়ও ক্লাস নিতে পারবেন।

কিন্তু আমি এ দেশে থাকতে চাই না, আপনাকে বোধহয় বলেছিলাম।

আসাদুল্লাহ হাত তুলে বিজুকে থামিয়ে দিয়ে বলে, না চাইলে থাকবেন না। কিন্তু যেটা শিখবেন, পৃথিবীর সবখানে সেটা আপনার কাজে লাগবে। আমি আপনার ক্যারিয়ারের কথা ভেবেই বলছি, নতুন কিছু একটা বিদ্যা বা স্কিল আয়ত্ত্ব করার সুযোগ ছেড়ে দেওয়ার কোনো মানে নেই।

অস্বীকার করার বা অসম্মত হওয়ার কারণ খুঁজে পায়নি বিজু। সে ভর্তি হয়েছিলো যখন রানুর এম এস শেষ হতে আর মাসকয়েক বাকি। তাতে ক্ষতি কিছু নেই, দুটো বছর দেখতে দেখতে চলে যাবে। শেষ হলে দেশে ফেরার ব্যাপারটা রানুর সঙ্গে ফয়সালা করে নিতে হবে।

পাশ করার পরপরই রানু চাকরি পেয়ে যায়। সে সময় আর্কিটেক্টদের চাকরির বাজারে বেশ মন্দা, চারদিকে ছাঁটাই হচ্ছিলো। কয়েকজন বাঙালি আর্কিটেক্টের বেকার হয়ে যাওয়ার খবরও শোনা গিয়েছিলো। সেই বাজারে কোনোরকমের অভিজ্ঞতা ছাড়া রানুর চাকরি হওয়াটা অভাবিত বটে।

বিজুর ধারণা ছিলো, চাকরির বাজারের মন্দা অবস্থাটাকে রানুর সঙ্গে দেশে ফেরার দরকষাকষির সময় ব্যবহার করা যাবে - চাকরি না পেলে এখানে থাকা যাবে কী করে! তা বোধহয় আর হলো না।
১৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৪



“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

এই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক দর্শনে। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো জনগণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ সময়ের ব্যবধানে তারা দুজন

লিখেছেন সামিয়া, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৩



কোর্টের সামনের চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। দুপুরের রোদটা তখন কিছুটা নরম হয়েছে। মানুষের ভিড়, আইনজীবীদের কালো কোট, চায়ের দোকানের ধোঁয়া আর ফাইল হাতে ছুটে চলা লোকজন মিলে জায়গাটা যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মের অবমাননা রুখতে গিয়ে নিজের ধর্মকেই ছোট করছেন না তো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৫


সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ধর্ম অবমাননার আবার একটা ঘটনা ঘটলো। ২৩ জুন ২০২৬। প্রিন্স রায় দীপ্ত নামের পঁচিশ বছরের একটা ছেলে নবীজিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারতীয় মুসলিমদের অসহনীয় জীবন

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৫ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৫


পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার সুপুরডিহি গ্রামের ঠেলাগাড়িতে বাসনপত্র বিক্রেতা দরিদ্র মুসলিম আকবর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারী জঙ্গি হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিলেন, আর মুক্তি পেলেন অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে। পুরুলিয়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×