১৪.৪
বিজুর কোর্স শেষ হওয়ার ঠিক আগে এক রাতে রানু জানায়, ডাক্তার কনফার্ম করেছে।
একটু তন্দ্রামতো এসেছিলো বিজুর। সচকিত হয়ে ওঠে সে, কী কনফার্ম করেছে? রানু ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলো, তা-ও জানা ছিলো না তার। কথাটা খুবই আচমকা এবং কোনো প্রসঙ্গ ছাড়া এসেছে। বিজুর মনে হয়, সে যা ভাবছে, তাই কি?
সাড়া না পেয়ে রানু বলে, তুমি কি ঘুমিয়ে গেলে?
না, বলো। শুনছি।
ডাক্তার আজ রিপোর্ট দিয়েছে, দু'মাস চলছে।
এই খবরে খুশি হওয়াটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। বিজু খুশি কি না, নিজে বুঝতে পারে না। এই প্রসঙ্গ চাপা দেওয়া ছিলো এতোদিন, আজ হঠাৎ ঢাকনা উঠে যাওয়ায় সে খানিক অপ্রস্তুত বোধ করে। মুখে কোনো কথা আসে না।
প্রথমবার রানু তার আমেরিকাযাত্রা ঠেকানোর জন্যে বিজুর চেষ্টা বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলো। এবার কি বিজুকে এই দেশে আটকে রাখার ষড়যন্ত্র রানুর? অভিযোগটা এখন ফিরিয়ে দেওয়া যায় না!
রানু অন্ধকারে হাতড়ে বিজুর হাত ধরে, তুমি কিছু বলছো না যে!
কী বলবো, বলো তো! অনেক বছর ধরে যে কথাটা মনে না করার চেষ্টা করে আসছি, তোমার কথায় তা মনে পড়ে যাচ্ছে।
তুমি আমাকে এখনো ক্ষমা করোনি, তাই না?
আমি ক্ষমা করার কে, রানু? তুমি নিজেকে ক্ষমা করতে পেরেছো কিনা, সেটা সবচেয়ে বড়ো কথা। আর আমার কথা যদি বলো, তাহলে বলি, ওই ঘটনার পর আমাদের জীবন ওলটপালট হয়ে যাওয়ার কথা ছিলো। যায়নি, এখনো আমরা এক ছাদের নিচে বাস করি।
বিজু একটু থামে। রানু চুপ করে শুনছে। বিজু মৃদু স্বরে বলে, ওই বিষয়ে কোনোদিন কারো কাছে একটা শব্দও উচ্চারণ করিনি। করলে নিজেকে লজ্জিত হতে হতো, তোমাকে ছোটো করা হতো। কিন্তু ভুলে যাওয়া তো সম্ভব হয়নি। সেই ঘটনা ছিলো আমার জন্যে এক ধরনের রূঢ় জাগরণ।
ফুলটুস জন্মানোর সময় বিজু লেবার রুমে ছিলো রানুর সঙ্গে। হাসপাতালে ডাক্তার এসে জিজ্ঞেস করেছিলো, তুমি লেবার রুমে যেতে চাও?
এদেশে সাধারণত কেউ না করে না। রানুও চায়, বিজু তার সঙ্গে যাক। বিজু সাহস করে হ্যাঁ বললেও মনে মনে যে একটু দ্বিধা বা ভয় ছিলো না, তা নয়। বাচ্চা জন্মানোর বিষয়ে যা কিছু শোনা ছিলো, তা-ই যথেষ্ট ভয়ংকর। যা কিছু যন্ত্রণা সব যাবে রানুর ওপর দিয়ে, তার ভূমিকা তো শুধু দেখা, সঙ্গে থেকে রানুকে সাহস দেওয়া। তবু মনে হয়, সেই যন্ত্রণা অবলোকনের যন্ত্রণা সহ্য করা যাবে তো?
পরদিন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে রানু লেবার রুমে কেমন লাগলো জিজ্ঞেস করে।
বিজু বলে, বিশ্বাস করবে কি না, জানি না। কিন্তু লেবার রুমে তোমার সঙ্গে না গেলে একটা অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হতাম। মেয়েদের ওপর আমার শ্রদ্ধায় মাথা নিচু হয়ে এসেছিলো। সব পুরুষমানুষের কথা বলতে পারবো না, কিন্তু আমি জানি এই অমানুষিক যন্ত্রণা আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হতো না। এই কষ্টের কথা জেনেও মেয়েরা কীভাবে আবার বাচ্চা নিতে চায়, আমার বুদ্ধিতে কোনোদিন কুলাবে না।
মেয়েকে পাশে নিয়ে শুয়ে ছিলো রানু। পরিতৃপ্ত দেখায় তাকে। মাতৃত্বের অহংকার কথাটা শোনা ছিলো, এবার দেখা হলো বিজুর।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




